আজব সব ‘ঘুম রোগ’

আপডেট : ০৬ জুলাই ২০১৪, ২১:৫৫
সারাদিন কাজ শেষে রাতে বিছানায় শুয়ে এক ঘুমে রাত কাবার, আর সকালে উঠে ফের জীবন সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়া- এমন ছকেই ঘুরপাক খাচ্ছে বিশ্বের অধিকাংশ মানুষের জীবন। একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষ সাধারণত রাতে ৫/৬ ঘন্টা ঘুমায়। শিশুদের ক্ষেত্রে হয়তো সময়টা আরেকটু বেশি। কিন্তু এই স্বাভাবিক শান্তির ঘুম সবার ভাগ্যে জোটে না। অনিদ্রা রোগ বা ইনসমোনিয়ায় ভুগছে সমাজের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ। আবার অস্বাভাবিক ঘুমের অসুখও রয়েছে কারো কারো। একনাগাড়ে ১২ থেকে ১৩ দিন ঘুম, কাজ করতে করতে হঠাত্ ঘুমিয়ে পড়া, হাসতে হাসতে ঘুম, ঘুমন্ত অবস্থায় অতিরিক্ত খাবার খেয়ে স্থূলাকৃতি হওয়া, জেগে ওঠার পরও ঘুমের রাজ্যে বিচরণ করা, ঘুমাতে ঘুমাতে একেবারে মরণঘুমের অতলে তলিয়ে যাওয়া- এমন বিচিত্র সব ঘুমের অসুখের কথাই তুলে ধরা হলো— টানা তেরদিন ঘুম রূপকথার সেই ঘুমন্ত রাজকন্যার কথা মনে আছে? টানা একবছর ঘুমানোর পর এক প্রিয়দর্শন রাজপুত্র এসে তার ঘুম ভাঙায়। বাস্তবেও এমন ঘুমকাতুরে মেয়ের সন্ধান মিলেছে যে একবছর না হলেও টানা তেরদিন পর্যন্ত ঘুমিয়ে কাটিয়েছে। যুক্তরাজ্যের বাসিন্দা ১৫ বছর বয়সী এই কিশোরীর নাম লুইসা বেল। ডাক্তাররা এই অতিঘুম রোগের নাম দিয়েছেন স্লিপিং বিউটি সিনড্রম। ঘুমন্ত লুইসাকে খাওয়াতে বা প্রাকৃতিক কর্মকাণ্ড সম্পন্ন করাতে তার বাবা-মাকে যথেষ্ট বেগ পেতে হতো। আধো ঘুম অবস্থাতেই লুইসা সেসব সেরে আবার গভীর ঘুমে তলিয়ে যেত। শুধু লুইসাই নয়, এই ‘অতিঘুম’ রোগে ভুগছে বিশ্বের আরও বেশ কিছু মানুষ। তবে তাদের কেউই লুইসার ঘুমের রেকর্ড ভাঙতে পারেনি। টিনএজাররাই সাধারণত এ রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকে। তবে স্বস্তির বিষয় হলো ৮ থেকে ১০ বছর পর আপনা-আপনি এ রোগ ভাল হয়ে যায়। কাজ করতে করতে ঘুম স্কুলে ক্লাসে পড়তে পড়তে, অথবা অফিসে কাজ করতে করতে হঠাত্ ঘুমের রাজ্যে চলে যাওয়ার অভিজ্ঞতা কমবেশি আমাদের সবারই আছে। সেইসঙ্গে রয়েছে শিক্ষকের পিটুনি বা অফিসের বসের বকুনি খাওয়ার মতো তিক্ত স্মৃতিও। তবে শ্রান্ত শরীরে বসে বসে ঘুম আর রীতিমতো কাজ করতে করতে ঘুমিয়ে পড়ার মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে। যেমন- গাড়ি চালাতে চালাতে বা জগিং করতে করতে অথবা প্লেট-গ্লাস মাজতে মাজতে হঠাত্ যদি কেউ ঘুমিয়ে পড়ে, তাকে আর যাই হোক স্বাভাবিক ঘুম বলা যাবে না। এমন ঘুমের অসুখকে ডাক্তাররা নাম দিয়েছেন নারকোলেপ্সি রোগ। এই রোগ কারো হলে তার জীবনটাই প্রায় কেটে যায় ঘুমে ঘুমে। একবার ঘুমিয়ে পড়লে বহুকষ্টে তাকে ঘুম থেকে তোলা গেলেও বেশিক্ষণ তাকে জাগিয়ে রাখা যায় না। ডাক্তাররা এ রোগের কারণ এখনও হাতড়ে বেড়াচ্ছেন, চিকিত্সা বলতে রয়েছে কিছু ঘুম তাড়ানো ওষুধ (যেগুলোর যথেষ্ট ক্ষতিকর পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া রয়েছে) এবং সম্মোহনী চিকিত্সা। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে খাও আর মোটা হও রাতে আধো ঘুম চোখে ফ্রিজ খুলে হাবিজাবি খাওয়ার অভ্যাস অনেকেরই আছে। তবে কারো কারো ক্ষেত্রে বিষয়টা অস্বাভাবিক পর্যায়ে গিয়ে ঠেকে। যেমনটা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বাসিন্দা অ্যানা রিয়ানের বেলায়। রাতে ঘুমের ঘোরে খেতে খেতে দেড় বছরে তার ওজন বেড়েছে ২৭ কেজি। মজার ব্যাপার হলো সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর রাতের অতিভোজনের কথা একেবারেই মনে থাকে না তার। রাতের পর রাত এটি করার ফলে দিনে অল্প পরিশ্রমেই ক্লান্ত হয়ে পড়তেন তিনি। আর বিষয়টা তিনি বুঝতে পারেন ডাক্তারের কাছে গিয়ে চিকিত্সা নেয়ার সময়। তার এই রোগের নাম নকটুমাল স্লিপ-রিলেটেড ইটিং ডিসঅর্ডার (এনএসআরইডি)। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে পরপারে গমন ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে মৃত্যুর ঘটনা খুব বিরল নয়। ঘুমন্ত অবস্থায় কেউ মারা গেলে লোকে বলে থাকে- ‘যাক, লোকটা ঘুমের মধ্যেই মারা গেছে। মৃত্যুর কষ্ট তাকে আর সইতে হলো না।’ কিন্তু সর্বক্ষেত্রে এমন মৃত্যুর ঘটনা খুব স্বাভাবিক নয়, বিশেষ করে যখন স্বাস্থ্যবান, তরতাজা কোন যুবক ঘুমিয়ে পড়ার পর আর জেগে ওঠে না, চিরকালের জন্য না ফেরার দেশে চলে যায়। শিশুদের ক্ষেত্রেও এমন দুঃখজনক মৃত্যুর ঘটনা ঘটে থাকে। দেখা গেছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতেই ঘুমের মাঝে মৃত্যুর ঘটনা সবচেয়ে বেশি। তবে এতে বোধহয় স্বস্তির কিছু নেই। কারণ ঘুমের মধ্যে মৃত্যু হলেই যে যন্ত্রণা হবে না, সে কথা কি হলফ করে বলা যায়? হাসতে হাসতে ঘুম যুক্তরাষ্ট্রের বাসিন্দা ক্লেয়ার স্কটের হয়েছে এক অদ্ভুত ঘুম রোগ। হাসি পেলেই তার চোখ ঘুমে জড়িয়ে আসতে থাকে। আর অট্টহাসি হাসলে তো কথাই নেই- ঘুমে একেবারে অজ্ঞান। ২৪ বছর বয়সী ক্লেয়ারের রয়েছে ফুটফুটে দুটি ছেলেমেয়ে, যাদেরকে মায়ের ঘুম রোগের ব্যাপারে খুব সতর্ক থাকতে হয়। এই সেদিনের ঘটনা। মেয়ে স্কুল থেকে এসে মাকে ক্লাসের একটা হাস্যকর ঘটনা শোনাতেই ক্লেয়ার অট্টহাসিতে ফেটে পড়েন। এরপর তার আর কিছু মনে নেই। সম্বিত ফিরে পেয়ে তিনি দেখেন তার স্বামী তাকে রান্নাঘরের মেঝে থেকে হাত ধরে টেনে তুলছেন। দুর্লভ এই ঘুম রোগের নাম ডাক্তাররা দিয়েছেন- ক্যাটাপ্লেক্সি। বিশ্বের প্রতি ১০ হাজার মানুষের মধ্যে ৫ জনের মধ্যে এই রোগের লক্ষণ দেখা গেছে। সংখ্যাটা খুব কম নয় কিন্তু! সুতরাং হাসি থেকে সাবধান।