সব ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংকের পরামর্শ নেবে না বাংলাদেশ

আপডেট : ০৬ জুলাই ২০১৪, ২২:৫৩
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জনগণের সেবায় সবাইকে মনযোগী হওয়ার নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, জনগণের কল্যাণ করার জন্য আমরা ক্ষমতায় এসেছি। রূপকল্প-২০২১ ও ২০৪১ বিনির্মাণের মাধ্যমে বাংলাদেশকে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলায় পরিণত করা হবে। তাই কাজে প্রতিযোগিতা গড়ে তোলার জন্য সবাইকে উদ্যোগী হওয়া প্রয়োজন। গতকাল রবিবার যোগাযোগ মন্ত্রণালয় পরিদর্শন ও মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, পদ্মা সেতুর কাজ সময় মতো শেষ করতে চাই। এ সেতু নির্মাণের পর নদী তীরে হংকংয়ের আদলে একটি শহর গড়ে তোলা হবে। সেখানে থাকবে আন্তর্জাতিক মানের সম্মেলন কেন্দ্র। আর ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক মেলা সেখানেই অনুষ্ঠিত হবে। এছাড়া এ শহরে গড়ে তোলা হবে বিনোদন কেন্দ্র। এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের বিষয়ে অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে ইতিমধ্যে কথা হয়েছে। পদ্মা সেতু নির্মাণে আর যাতে কোনো বাধা না আসে সে ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক থাকার আহবান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পদ্মা সেতু নির্মাণ নিয়ে অনেক তোলপাড় হয়ে গেছে। এটা নিয়ে অন্য উদ্দেশ্য ছিলো। কোন কারণ ছাড়া বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রেসিডেন্ট তার শেষ কার্যদিবসে এদেশের একটি বিশেষ মহল ও আমেরিকার প্ররোচণায় পদ্মা সেতুর জন্য অর্থ বরাদ্দ বন্ধ করে দেন। অথচ বোর্ডে সেটা অ্যাপ্রুভড হয়নি। প্রসঙ্গত, দক্ষিণ চীন সাগর তীরবর্তী শহর হংকং পরিকল্পিত সুসজ্জিত নগরী। চীনের বিশেষ প্রশাসনিক অঞ্চল হংকং পার্ল নদীর তীরে, যার উত্তরে কুতুয়াং প্রদেশ আর তিনদিকে সাগর। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, আরো এগিয়ে যাব। বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের রোল মডেল, কারো পরমুখাপেক্ষী নয়। বিশ্বব্যাংকের অনেক পরামর্শই সরকার গ্রহণ করেনি। আর এতে বাংলাদেশের ক্ষতি নয় বরং লাভ হয়েছে। তাই সব ক্ষেত্রেই বিশ্বব্যাংকের পরামর্শ নেবে না বাংলাদেশ। তিনি বলেন, বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতু নিয়ে দুর্নীতি হয়েছে অভিযোগ করার পর আমরা চ্যালেঞ্জ করেছিলাম। কি দুর্নীতি হয়েছে তার ডকুমেন্ট চাইলাম। কিন্তু তারা যে কাগজপত্র দেখালো তা ছিল আগের সরকারের আমলের ঢাকা-ময়মনসিংহ চার লেন সড়কের কাজ নিয়ে। সে সময়ের মন্ত্রীও আমার না। কার ডায়েরিতে নাকি লেখা আছে কে কত পারসেন্ট পাবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, মূলত ওরা (বিশ্বব্যাংক) অনেক চালাকি করে, অর্থের সঙ্গে নানা শর্তের বেড়াজাল জুড়ে দেয়। একবার বলে অমুক অমুককে বাদ দিতে হবে। আবার বলে এদের গ্রেফতার করলে অর্থ বরাদ্দ পাওয়া যাবে। তিনি বলেন, অনেক চড়াই-উত্রাই পার হয়ে নিজস্ব অর্থায়নে এই পদ্মা সেতু নির্মাণের সকল প্রস্ততি শেষ করে বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়েছে। মূল সেতু নির্মাণে চায়না মেজর ব্রীজ কোম্পানি লিমিটেডের সাথে চুক্তি হয়েছে। এ কোম্পানিকে কার্যাদেশ দেয়া হয়েছে। সেতুর উভয় পাড়ের নদী শাসন কাজের আর্থিক দরপত্রের মূল্যায়ন চলছে। মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা যে কাজটি শুরু করেছি তা যেন ভালোভাবে সম্পন্ন করতে পারি, সে ব্যাপারে নজর রাখতে হবে। মুক্তিযুদ্ধ করে স্বাধীনতা অর্জন করতে পারলে একটা ব্রিজ বানাতে পারবো না কেন? তিনি বলেন, বৈদেশিক মুদ্রার অভাব নেই। দেশে এখন রির্জাভ ২১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। তার থেকে ১/২ বিলিয়ন খরচ করলে সমস্যা হবে না। তিনি বলেন, জাতির পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে তার সরকার সব সময়ই দেশের যোগাযোগ খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, অল্প জায়গায় রাস্তা তৈরি হয়ে যেতে পারে। কিন্তু অনেক সময় তা ঘুরিয়ে নেয়া হয়। মন্ত্রী-এমপিদের বাড়ি থাকলে রাস্তা ঘুরিয়ে নিতে হবে এ রকম একটি প্রবণতা আছে। এমন মানসিকতা বাদ দিতে হবে। তিনি বলেন, দেশের উন্নয়ন করতে হলে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন করতে হবে। এক্ষেত্রে সফলতার বিবরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, ভারত থেকে বাংলাদেশ, তারপর মিয়ানমার হয়ে চীনের কুনমিং পর্যন্ত সড়ক নির্মাণের লক্ষ্যে দ্রুতই শুরু হচ্ছে কর্ণফুলী নদীর নিচে টানেল নির্মাণের কাজ। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা পায়রা বন্দর করেছি। আরো বন্দর আছে। আমাদের পোর্টগুলো যাতে তারা ব্যবহার করতে পারে তা নিয়ে নেপাল-ভুটানের সাথে আলোচনা হচ্ছে। ভুটান যদি সৈয়দপুরের এয়ারপোর্টটি ব্যবহার করে তাহলে আমাদের অর্থনীতির উন্নতি হবে এবং তাদেরও ভালো হবে। এসময় প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের বর্ণনা দেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি-জামায়াত জোট বিশ্বব্যাংকের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী বিআরটিসিকে বন্ধ করে দিতে চেয়েছিল। এছাড়া খুলনা শিপইয়ার্ড, বিএডিসি, মেশিন টুলস ফ্যাক্টরীসহ দেশের সকল পাটকলগুলো তারা বন্ধের ষড়যন্ত্র করেছিল। এমন একটি পরিস্থিতিতে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকারে এসে চ্যালেঞ্জ নিয়ে বিআরটিসিকে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করে। পাঁচ বছর সময়ের মধ্যে ৬ কোটি টাকা এ প্রতিষ্ঠান লাভ করেছিল। তিনি বলেন, আমরা নতুন নতুন বাস সংগ্রহ করি। ভারত থেকে দোতলা বাস, সুইডেন থেকে ভলভো বাস ক্রয় করি। ট্রাক ক্রয় করি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারে এসে আবার বিআরটিসিকে লুটপাটের প্রতিষ্ঠানে পরিণত করে। বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে দ্বিমতের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিআরটিসি বাস সার্ভিস বা খুলনা শিপইয়ার্ডের মত অনেক প্রকল্পই বন্ধ করার পরামর্শ দিয়েছিল তারা। এমনকি বাংলাদেশের পাটকল বন্ধ করে ভারতকে এই খাতে অর্থায়ন করে বিশ্বব্যাংক। তিনি বলেন, সমস্যাটা আমাদের, দেশটা আমাদের, আমরা জানি আমরা কিভাবে করবো। তাদের কয়েকজন লোক আসে, উনারা একটা প্রেসক্রিপশন দেবে আর সেটা আমাদের মানতে হবে এটাও ঠিক না। আমাদের দেশের মানুষের মাথায় বুদ্ধি কম নেই যে তারা চিন্তা করতে পারবে না। শেখ হাসিনা বলেন, বাঙালি পারে যে কোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে। অনুষ্ঠানে যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বক্তব্য রাখেন। সেতু বিভাগের সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম, সড়ক বিভাগের সচিব এম এ এন সিদ্দিক, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব এ কে এম শামীম চৌধুরীসহ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা এ সময় উপস্থিত ছিলেন।