রমজানের হাওয়া রিকশা গ্যারেজেও

আপডেট : ০৬ জুলাই ২০১৪, ২২:৫৯
রোজার মাসকে কেন্দ করে রাজধানীতে বাড়তি আয়ের নেশায় ছোটেন হরেক রকম মানুষ । নানান পেশায় যুক্ত হন তারা। তাদের মধ্যে একটা উল্লেখযোগ্য অংশ বেছে নেন রিকশাকে। নাজির মিয়া ৪৩ বছর যাবত রিকশার গ্যারেজ চালান। ৪৩ বছরের এই গ্যারেজে ৪০ বছর ধরে রোজায় রিকশা চালাতে আসে এমন মানুষও আছে। রমজান মাসের আট-দশ দিন আগে তারা আসতে শুরু করে। সারাদিন রাজপথ আর অলিগলির প্যাসেঞ্জার টেনে মাগরিবের আযানের আগে সবাই ফেরে গ্যারেজে। রোজা থাকুন আর নাই থাকুন দিনের শেষে দশ/পাঁচ টাকা চাঁদা তুলে ইফতারি কেনেন তারা । তা নিয়ে মিলিত হন ইফতারে। সরগরম হয়ে ওঠে খিলগাঁও গোড়ান পোস্ট অফিসের গলির দেড় কাঠার গ্যারেজটি। ইফতার সেরে আবার রিকশা নিয়ে বাড়তি আয়ের আশায় বেরিয়ে পড়েন তারা । চার রোজার দিন ইফতারের আগে সেখানে পৌঁছে দেখা যায়, একটার পর একটা রিকশা নিয়ে চলে আসছেন তারা। তড়িঘড়ি করে ইফতারের প্রস্তুতিও চলছে। আজ সাংবাদিকরা আসবে বলে নাজির মহাজনকেও তারা ডেকেছেন। নাজির মহাজনের সাথে তাদের খুবই আন্তরিক সম্পর্ক। মহাজন জানান, তাদের অনেকের বাড়িতে বেড়াতেও গেছেন। তিনি বলেন, তার গ্যারেজে নিয়মিত ৩৫টি রিকশা থাকে। রোজায় ৪৫-৫০জন কখনও এর বেশিও মানুষ আসেন রিকশা চালাতে। গ্যারেজে তাদের জন্য ফ্রি থাকা, গোসল ও টয়লেট বাথরুমের ব্যবস্থা আছে। তারা তার পাওনাও মেটান ঠিকমতো। সাতক্ষীরা থেকে আরও তিনজন এই রাতেই এসে পৌঁছাবেন। কুষ্টিয়ার মিরপুর থানা থেকে মিন্টু, টাইগার সামসু,মহির উদ্দিন ,মন্ডল রোজার দশ দিন আগে এসেছেন। চার রোজায় এসেছেন আতিয়ার, নাসির, জাকির, রাজ্জাক মন্ডল, কাফরুল, সাইদার। এদের মধ্যে বেশিরভাগই আসেন বৃহত্তর কুষ্টিয়া থেকে। তাছাড়া সাতক্ষীরা, যশোর এলাকার মানুষও থাকে। প্রায় ৪০ বছর ধরে এই গ্যারেজে আসেন মহির উদ্দিন। কুষ্টিয়ার মিরপুরেও তিনি রিকশা চালান। সেখানে দিনে একশ টাকা আয় হলেও রোজার মাসে ঢাকায় প্রতিদিন আয় চার/পাঁচশ টাকা । ছেলে-মেয়ের বিয়ে, ঘরের চালে টিন লাগানোর কাজ এই আয়ে করেছেন। জাকির রাজশাহীতে বালি কাটার কাজ করেন। নদী থেকে বালি তুলে গাড়ি ভর্তি করে। এই কাজে দিনে তার আয় ৩শ/৪শ টাকা আর এসময় রিকশা টেনে আয় ৫শ/৬শ টাকা। ময়মনসিংহ থেকে এসেছেন জজ মিয়া। জজ জানান, পুলিশের লাঠির আঘাত, আটোরিকশা তাদের কাজের বড় অন্তরায়। কোন কোন রিকশা নিষিদ্ধ রাস্তায় পাঁচ/ দশ টাকা চাঁদা নিয়ে পুলিশ তাদের যেতে দেয়। কখনও তাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে বেরিয়ে যেতে পারলেও ফেরার সময় ঠিক ধরা পড়ে। বেশি টাকার আশায় ট্রাফিক পুলিশ তাদের গদিও আটকে রাখে। কৃষক নাসিরের বাস কুষ্টিয়ার খোক্সা থানায়। গত ছয় বছর তিনি রোজায় ঢাকায় রিকশা টানেন। রোজার মাসে দশ থেকে বার হাজার টাকা আয় তার। এই টাকায় তিনি বীজ, সার আর সেচ কাজে ব্যয় করে সারা বছরের খোরাকী তোলেন। তার ভাষায় এই টাকা ক্ষেতে ঢেলেইতো চাষ করি। আসার সময় বউ-ঝি ঢাকা থেকে শাড়ি, চুড়ির বায়না ধরে। দাম বেশি বলে নাসির কখনই ঢাকায় কেনা-কাটা করেন না। কুষ্টিয়ায় তাদের জন্য সুলভে জিনিস পাওয়া যায় । তবে টাকা আয়ের শেষে ঢাকায় কেনা কাটা করেন আবু তালেব, মিন্টু মন্ডল, গফুর। তাদের মতে, টাকা কমাইবার আসি যাদের জন্য, তাদের জন্য কিছু খরচ করি। গরীব হলে শখ থাকবে না তাতো নয়। চার জন সামসু থাকায় এক এক জনের নামের আগে টাইগার, ফুপা, বড় ও ছোট সামসু ডাকা হয়। টাইগার সামসু বলেন, প্রথম প্রথম ঢাকার রাস্তাঘাট চিনতে তাদের একটু অসুবিধা হতো। এখন কোন সমস্যা নেই। এমনকি একবছর পরে এলেও তাদের সব রাস্তা মুখস্থ থাকে। গ্যারেজের ওপরে চাঁঙ্গ করে তাদের থাকার ব্যবস্থা করেন মহাজন। ফলে তাদের ভাড়া দিয়ে অন্যত্র থাকতে হয় না। কথায় কথায় আযান পড়ে। কলা, জিলিপি, খুরমা, মুড়ি, পেয়াজু, বুট এক সাথে মেখে তাদের ইফতারি তৈরি। তারা জানান, ২৭ রমজান থেকে তাদের ফিরতি গাড়ি ধরার কথা। মহাজন জানান, ২৭ রোজা থেকে ঈদের দিন বিকালের মধ্যে চলে যান তার রোজায় আসা রিকশাচালকরা। তাদের সাথে আবার দেখা হয় এক বছর পর।