সাকিব আল হাসান। বাংলাদেশ ক্রিকেটাঙ্গনের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। যতদিন বাংলাদেশের ক্রিকেট বেঁচে থাকবে ততদিন সাকিবের নামটিও স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ থাকবে। দেশের হয়ে খেলা ছাড়াও দেশ এবং দেশের বাইরের বিভিন্ন বিখ্যাত ক্লাবের হয়েও তিনি অনেক ম্যাচে অংশগ্রহণ করেছেন। বাংলাদেশকে বিশ্বের বুকে পরিচিতি দিয়েছেন। গত ৮/৯ বছর বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের হয়ে বিশ্বের সবগুলো ক্রিকেট প্লেয়িং দেশের বিরুদ্ধে খেলেছেন। বোলিং, ব্যাটিং এবং ফিল্ডিংয়ে সাকিবের জুড়ি মেলা ভার। বিশ্বের শ্রেষ্ঠ অলরাউন্ডারের স্বীকৃতিও পেয়েছেন। সাকিব যখন ব্যাটে থাকেন তখন বিরুদ্ধ পক্ষের বোলারের বুক দুরুদুরু করে কাঁপে, যখন বল করেন তখন ব্যাটসম্যান অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করেন কিংবা যখন ফিল্ডিং করেন তখন ব্যাটসম্যানকে বলে আঘাত করার আগে সাকিবকে দেখে নিতে হয়। এই আমাদের সাকিব । সদা হাস্যোজ্জ্বল একটি মুখ। সাকিব বাংলাদেশের গর্বিত সন্তান।
হঠাত্ সাকিব বদলাতে শুরু করেন। এ বদলানো কি নিজের জনপ্রিয়তায় অহংকারী হয়ে নাকি অন্য কোনো কারণে সেটা সাকিবই ভালো জানেন। সবার প্রিয় সাকিব ধীরে ধীরে অনেকের অপ্রিয় হতে শুরু করলেন। তাঁর খেলায় সেই আগের মতো ধার নেই। তিনি অনেকের সঙ্গে এখন ভালো ব্যবহার করেন না। মেজাজ চড়া রাখেন। সাকিবের হঠাত্ বদলে যাওয়ায় তাঁর ভক্ত-অনুরক্তদের বুক ভাঙতে শুরু করেছে। এটা যেন সাকিব বুঝেও বোঝেন না। তাঁর স্ত্রীকে কেউ টিজ করলে আইন হাতে তুলে তিনি নিজেই তার বিচার করেন। কারো মা, বোন কিংবা স্ত্রীকে কেউ কিছু বললে তার প্রতিবাদ করা স্বাভাবিক। কিন্তু প্রশ্ন হলো, একজন খেলোয়াড়ের স্ত্রীকে টিজ করার আগে বিসিবি কর্তৃপক্ষ কেন তাঁকে নিরাপত্তা দিলেন না? একজন খেলোয়াড়ের নিরাপত্তা, গোপনীয়তা, দুর্বলতা সকল কিছুর দায়িত্ব বিসিবির। যেহেতু একজন খেলোয়াড় বিসিবির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ থাকা অবস্থায় তার সকল দায়-দায়িত্ব বিসিবির।
সাকিব আইপিএল, সিপিএল, বিগ ব্যাশ ছাড়াও ইংল্যান্ডের কয়েকটি জনপ্রিয় ক্লাবের হয়ে নিয়মিত খেলে যাচ্ছেন । কখনো তাঁকে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড থেকে বাধা দেওয়া হয়নি। সমপ্রতি আইপিএল ৭-এ তিনি অকল্পনীয় সফলতা পেয়েছেন। কলকাতা নাইট রাইডার্সকে চ্যাম্পিয়ন করার পিছনে সাকিবের ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। বাংলাদেশের জাতীয় দল ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফর করবে। এ উপলক্ষে বাংলাদেশের নবাগত কোচ শ্রীলঙ্কান হাথারুসিংহের অধীনে বিসিবি ঘোষিত জাতীয় ক্রিকেট দল অনুশীলন করছে। ব্যতিক্রম কেবল সাকিব। বিসিবির যথাযথ অনুমতি ছাড়াই তিনি ওয়েস্ট ইন্ডিজে খেলতে পাড়ি জমিয়েছেন। পরবর্তী সময়ে ক্রিকেট বোর্ড থেকে তাঁকে ফিরে আসার কড়া নির্দেশ দেওয়ার পর তিনি ফিরতি ইমেইলে জাতীয় দল থেকে পদত্যাগ করার ঘোষণা দিয়ে কোচের কাছে বার্তা পাঠান । যদিও পরে তিনি দেশে ফিরে এসেছেন। সাকিবের কাছে বাংলাদেশ ক্রিকেট ঋণী। তার অর্থ এই নয় সাকিব ছাড়া বাংলাদেশের ক্রিকেট মাঠে গড়াবে না। সাকিব যদি মনে করে থাকেন তিনি ছাড়া বাংলাদেশের ক্রিকেট অচল তাহলে তিনি ভুলের জগতে আছেন। অতীতেও সাকিব ছাড়া বাংলাদেশের ক্রিকেট মাঠে গড়িয়েছে। ভবিষ্যতেও গড়াবে। এছাড়া সাকিব যদি দেশের স্বার্থের চেয়ে টাকা আয়কে বেশি গুরুত্ব দেন তবে সাকিবকে বাংলাদেশের ক্রিকেট থেকে স্বেচ্ছায় ছুটি দেওয়া উচিত। কেননা যাঁর কাছে দেশের সম্মানের চেয়ে টাকার মূল্য বেশি তাঁর দ্বারা দেশের ক্রিকেটকে কলঙ্কিত করা উচিত নয় ।
সাকিবের এ ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের জন্য সাকিব একা দায়ী নাকি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডও দায়ী? অতীতেও সাকিব ছোট ছোট অপরাধ করেছেন। তখন তাঁকে শাস্তি দেওয়া হয়নি কেন? তখন তাঁকে সুযোগ দিয়ে কি বড় ধরনের অপরাধ করার সাহস দেওয়া হয়নি? কাজেই সাকিবের বর্তমান আচরণের জন্য শুধু ব্যক্তি সাকিবকে দায়ী করা যাবে না বরং বোর্ডও অনেকাংশে দায়ী। অতীতেই যদি এ ব্যাপারে সাবধানতা অবলম্বন করা হতো তবে সাকিব এতোটা বেপরোয়া হতে সাহস পেতেন না। সাকিব যখন ওয়েস্ট ইন্ডিজের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমান তখন জাতীয় দলের প্রধান নির্বাচক আকরাম খানের অনুমতি পেয়েছিলেন বলে শোনা যাচ্ছে। যে ইমেইলটির মাধ্যমে সাকিবকে বিতর্কিত করে তোলা হলো সে ইমেইলটি প্রেরণের ব্যাখ্যা বোর্ড একান্তভাবে সাকিবকে ডেকে গ্রহণ করলে সেটাই কি উত্তম হতো না? সেটা মিডিয়ায় প্রকাশ করে সাকিবকে সবার কাছে ঘৃণিত করা হলো না তো? প্রকাশিত ইমেইলটির মাধ্যমে হলুদ সাংবাদিকরা সাকিবের ব্যাপারে অনেক অমূলক ঘটনা ছড়িয়েছে। এর দায়ভার কার? বোর্ড ইতিমধ্যে শাস্তির ঘোষণা দিয়েছেন। আবার কেউ কেউ সাকিবকে আজীবন নিষিদ্ধ করার দাবিও তুলেছেন। সাকিবের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত কী হবে সেটা বোর্ডের নিজস্ব ব্যাপার। তবে সাকিবকে যেন আশরাফুলের মতো বলির পাঁঠা না করা হয়। খেলোয়াড়দের আইন-কানুনের মধ্যে রাখতে বোর্ডের কঠোরতা জরুরি কিন্তু সে কঠোরতার প্রদর্শন যেন অযৌক্তিক হয়ে না যায়। সাকিবের প্রতি অনুরোধ, দেশবাসীর ভালোবাসা নষ্ট করবেন না।
পিরোজপুর
