ইলেকট্রোনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ও বাংলাদেশ ভোটার রেজিস্ট্রেশন সফটওয়ার (বিভিআরএস) ক্রয়ে দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধানে দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) এবার সহযোগিতার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এর আগে নিজেদেরকে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে আখ্যায়িত করে ইসির ভাবমূর্তি রক্ষায় বিষয়টিকে নিষ্পত্তির জন্য দুদককে চিঠি দেয়া হয়েছিল। তবে তাতে সন্তুষ্ট হতে পারেনি দুদক।
এ বিষয়ে ইসি সচিবালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব মো:সিরাজুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, ইসি কখনই তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানায়নি। বলা হয়েছিল-সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ইসির ভাবমূর্তির কথা বিবেচনায় নিয়ে বিষয়টি যাতে নিষ্পত্তি করা হয়। তারপরেও যেহেতু দুদক তথ্য চাইছে, ইসি সব তথ্যই দুদককে সহয়তা করবে।
ইসি সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, সাবেক সিইসি ড. শামসুল হুদার নেতৃত্বাধীন কমিশনের আমলে হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যার মিলে মোট ৪৭ কোটি টাকায় বিভিআরএস ক্রয় করা হয়েছিল টাইগার আইটি নামের একটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে। এছাড়াও ২০১০ সালে একাধিক স্থানীয় সরকার নির্বাচনে পরীক্ষামূলক ব্যবহারের জন্য ইভিএম ক্রয় করা হয়েছিল। তিন দফায় প্রায় ৫ কোটি টাকার বিনিময়ে ইভিএম ক্রয় করেছিল বিগত নির্বাচন কমিশন। এমনকি ২০১০ সালে কোন ধরনের প্রজেক্ট প্রোফাইল বা নিয়ম-নীতি অনুসরণ না করেই ইভিএম ব্যবহারের উদ্যোগ নেয়া হয়।
২০১০ সালের ১১ এপ্রিল সর্বপ্রথম ইভিএম ক্রয় সংক্রান্ত চুক্তি সম্পাদিত হয়। তত্কালীন নির্বাচন কমিশন সচিবালয় এবং ব্যুরো অফ রিসার্চ, টেস্টিং এন্ড কনসালটেশন, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা এর মধ্যে এক ইউনিটের ১৩০টি ইভিএম ক্রয় চুক্তি হয়। মেশিন প্রতি যার মূল্য ধার্য করা হয়েছিল ১০ হাজার ৮০০ টাকা। যার মূল্য দাঁড়ায় ১৪ লাখ ৪২ হাজার টাকা। ২০১০ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর দ্বিতীয় দফায় দুই ইউনিটের ৪০০ ইভিএম ক্রয়ের জন্য ইসি ও বুয়েটের মধ্যে দ্বিতীয় চুক্তি সম্পাদিত হয়। যার প্রতিটির মূল্য ধরা হয় ২৯ হাজার ৩৫০ টাকা। মোট মূল্য ১ কোটি ১৭ লাখ ৪০ হাজার টাকা। ২০১১ সালের ২৪ জুলাই তৃতীয় দফায় তিন ইউনিটের ৭০০ ইভিএম ক্রয়ের লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশন সচিবালয় এবং বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরী লিমিটেডের মধ্যে একটি চুক্তি সম্পাদিত হয়। মেশিনের মূল্য ধরা হয় ৪৬ হাজার ৫০১ টাকা। যার মোট মূল্য ৩ কোটি ২৫ লাখ ৫০ হাজার ৭শ’ টাকা।
ইভিএম ব্যবহারে আইন ও চুক্তি লংঘন : ইভিএম ব্যবহারে বিগত কমিশন আইন ও চুক্তির গুরুতর লংঘন করেছিল। তাড়াহুড়া করে ইভিএম ব্যবহার করতে গিয়ে কোন নীতিমালা অনুসরণ করেনি তারা। ২০১০ সালের ১১ এপ্রিল তত্কালীন নির্বাচন কমিশন সচিবালয় এবং ব্যুরো অফ রিসার্চ, টেস্টিং এন্ড কনসালটেশন, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা এর মধ্যে সম্পাদিত চুক্তি মানা হয়নি। চুক্তির অনুচ্ছেদ ৯-এ উল্লেখ করা হয়, নির্বাচন উপযোগী ইভিএম বিনির্দেশ ও ব্যবহার বিধি দ্বিতীয় পক্ষের নিকট হতে কারিগরি তথ্য নিয়ে প্রথম পক্ষ প্রণয়ন করবে। এরপর প্রায় দুই বছর অতিবাহিত হলেও বিনির্দেশ ও ব্যবহার বিধি প্রণয়ন করা হয়নি। অথচ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইনের (২০০৬) ধারা ১৫ অনুসারে কোন পণ্য বা সেবা বা কার্য ক্রয়ের প্রাক্কালে প্রথম পদক্ষেপে উক্ত পণ্য বা কার্যের বিনির্দেশ ও বর্ণনা লিপিবদ্ধ করতে হবে। আইনের ১৫ ধারা এবং চুক্তির ৯ অনুচ্ছেদের বিধান অনুসরণ না করার জন্য কাউকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা হয়নি।
ভোটার সফটওয়ার ক্রয় : ইসি সচিবালয় সূত্র জানায়, জাতীয় পরিচয়ের তথ্য সংরক্ষণের জন্য ইসি প্রিপারেশন অব অ্যান ইলেকটোরাল রোল উইথ ফটোগ্রাফস (পার্প) প্রকল্পের আওতায় টাইগার আইটির কাছ থেকে বিভিআরএস সফটওয়্যার, হার্ডওয়্যার ও অন্যান্য সরঞ্জামাদিসহ মোট ৪৭ কোটি টাকার মালামাল কিনে। এ বিষয়ে ইসি ২০১০ সালের ১৫ জুন টাইগার আইটির সঙ্গে চুক্তি করে। চুক্তি অনুযায়ী ২০১০ সালের ১৫ জুনের মধ্যে ভোটার তথ্য ভাণ্ডার ও বিভিআরএস সফটওয়্যার ইসির কাছে হস্তান্তর করার কথা। কিন্তু এখনো তা হস্তান্তর করা হয়নি।
দুর্নীতি তদন্তে দুদক : ইসি সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ইভিএম ও সফটওয়্যার ক্রয়ে দুর্নীতি তদন্তে চলতি বছরের ৯ জানুয়ারি ইসি সচিবালয়ের সচিব বরাবর প্রয়োজনীয় রেকর্ডপত্র সরবরাহের নোটিস করে দুদক। নোটিসে সুষ্ঠু অনুসল্পব্দানের স্বার্থে বিভিআরএস ও ইভিএম ক্রয়ের রেকর্ডপত্রের সত্যায়িত ছায়ালিপি ১৯ জানুয়ারির মধ্যে সরবরাহ করতে বলা হয়। দুদকের সহকারী পরিচালক মুহা. মাহবুবুল আলম ওই নোটিস করেন।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার মো: শাহনেওয়াজ ইত্তেফাককে বলেন, তথ্য দিয়ে গড়িমসির অভিযোগ ঠিক নয়। সাবেক নির্বাচন কমিশনারদের আমলে ক্রয়কৃত এসব কাগজপত্র আমরা দুদকের চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ করব। তবে বর্তমান কমিশন আগ বাড়িয়ে এমন কোন পদেক্ষপ নিতে চাইছে না যাতে কারো প্রতি বিদ্বেষ ফুটে ওঠে।
