প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জনগণের স্বার্থ রক্ষায় সকল ভয়-ভীতি, চাপ, লোভ-লালসা ও প্রলোভনের ঊর্ধ্বে থেকে আইনানুগ অর্পিত দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালনের জন্য জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) প্রতি নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি তৃণমূল পর্যায়ে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় জেলা প্রশাসকদের স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রেখে কাজ করার নির্দেশনা দেন। গতকাল মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে তিন দিনব্যাপী ডিসি সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী এসব নির্দেশনা দিয়ে বলেন, ক্ষুধা, দারিদ্র্য, নিরক্ষরতা, জঙ্গিবাদ ও সাম্প্রদায়িকতামুক্ত সুখী-সমৃদ্ধিশালী দেশ গড়তে বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকদের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আপনারা সাধারণ মানুষের কাছাকাছি অবস্থান করেন। তাই কেবল সরকারি কর্মচারী হিসাবে নয়, কাজ করবেন দেশপ্রেমিক হিসাবে। জনকল্যাণে আত্মনিয়োগ করবেন এবং সহকর্মীদের উদ্বুদ্ধ করবেন। আওয়ামী লীগ সরকারের লক্ষ্য অনুযায়ী ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশ গড়তে সবাইকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।
আশ্রয়ণ প্রকল্প বিস্তৃত করে গৃহহারা ও ভূমিহীন নাগরিকদের জন্য ঘর নির্মাণের নির্দেশ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, খাস জমির পাশাপাশি প্রয়োজন হলে জমি কিনে হলেও তাদের আবাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। লক্ষ্য রাখতে হবে একজন লোকও যেন গৃহহীন না থাকে। তিনি বলেন, আমাদের খাস জমির অভাব থাকার কথা নয়। এছাড়া অনেক জায়গায় চর রয়েছে। প্রয়োজন হলে জমি কিনে আপনারা গৃহের ব্যবস্থা করুন। তিনি বলেন, আমাদের মৌলিক অধিকারের মধ্যে বাসস্থান অন্যতম। তাই যারা গৃহহারা, ভূমিহীন থাকবে তাদের প্রত্যেককে আমরা ঘর বানিয়ে দেব।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী জেলা প্রশাসকদের ২৪ দফা নির্দেশনা দেন। কেন্দ্রীয়ভাবে নেয়া সিদ্ধান্ত মাঠপর্যায়ে দ্রুত বাস্তবায়নেরও নির্দেশ দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, মাঠ পর্যায়ে তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বিস্তারে জেলা প্রশাসকদের নেতৃত্ব দিতে হবে। ই-গভর্নেন্সের বিস্তারের ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে সমাজের বিভিন্ন স্তরে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় ই-গভর্নেন্স বিস্তার ও বাস্তবায়ন জরুরি। কারণ এর মাধ্যমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। শেখ হাসিনা জেলা প্রশাসকদের গণশুনানির আয়োজন করার নির্দেশনা দিয়ে বলেন, সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে জনগণ যেন কোনোভাবেই নাজেহাল না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকবেন। একই সঙ্গে নিজ নিজ এলাকায় আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা, স্থানীয় পর্যায়ে স্থায়ী কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মাদক প্রতিরোধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ, শিক্ষা মানোন্নয়নে ভূমিকা রাখা, ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত নাগরিক সুবিধার আওতায় আবাসন ব্যবস্থা পৌঁছাতে এখন থেকে পরিকল্পনা গ্রহণ ও কৃত্রিম সংকট তৈরি করে খাদ্যসামগ্রীর দাম বাড়ানোর অপচেষ্টা রুখে দিতে জেলা প্রশাসকদের প্রতি নির্দেশ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মাঠ পর্যায়ে সরকারের নীতি কৌশল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসকরা সরকার ও জনগণের মধ্যে সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করেন। তাই সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং উন্নয়নের ধারাকে গতিশীল রাখতে মাঠ পর্যায়ের শীর্ষ কর্মকর্তাদের দায়িত্বশীল হয়ে কাজ করতে হবে। জনগণের স্বার্থ সংরক্ষণে মাঠ পর্যায়ের শীর্ষ কর্মকর্তাদের আরো তত্পর থাকার আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, এ বিষয়ে কোনো শৈথিল্য বা পক্ষপাতমূলক আচরণ গ্রহণযোগ্য হবে না।
প্রধানমন্ত্রী গ্রামে নগরায়নের আবাসন সুবিধা পৌঁছে দেয়ার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে বলেন, ঢাকায় ফ্লাট করা হচ্ছে, এটা গ্রাম পর্যন্ত নিয়ে যেতে চাই। রাজধানীর মানুষ আরাম-আয়েশে জীপন-যাপন করবে, গ্রামের মানুষ কি অপরাধ করেছে? ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ প্রকল্প যেন ‘ভালোভাবে’ চলতে পারে সে বিষয়েও নজর রাখতে জেলা প্রশাসকদের নির্দেশ দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, নিম্ন আয়ের নাগরিকদের জন্য ইউনিয়ন পর্যন্ত ফ্লাট বাড়ি করতে ইতিমধ্যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ জন্য পরিকল্পিভাবে জায়গার ব্যবস্থার উদ্যোগ এখনই নিতে তিনি ডিসিদের প্রতি আহ্বান জানান। প্রধানমন্ত্রী বলেন, মাদককে নিয়ন্ত্রণ করতেই হবে। এক্ষেত্রে স্কুল থেকেই শিক্ষার্থীদের সচেতন করতে হবে। আপনারা বাবা-মা ও শিক্ষকদের সঙ্গেও কথা বলবেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের শতভাগ মানুষের কাছে বিদ্যুত্ সেবা পৌঁছানোর লক্ষ্যে যেসব প্রত্যন্ত গ্রামে সরবরাহ লাইন পৌঁছেনি সেখানে সৌর বিদ্যুত্ জনপ্রিয় করার জন্য জেলা প্রশাসকদের ভূমিকা রাখতে হবে। শেখ হাসিনা বলেন, ফরমালিন বিরোধী অভিযান চলছে। জেলা-উপজেলা পর্যন্ত ফরমালিন নিয়ন্ত্রণের দরকার। খাদ্যে ফরমালিন রোধ করতে ফরমালিন নির্ণয় যন্ত্র জেলা পর্যায়েও সরবরাহ করা হবে। শত প্রতিকূলতার মধ্যে গত ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে ভূমিকা রাখায় জেলা প্রশাসকদের ধন্যবাদ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, উন্নয়নের জন্য ধারাবাহিকতা দরকার।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিক্ষা খাতে ব্যয় শুধুমাত্র ব্যয় নয়, এটি এক ধরনের বিনিয়োগ। আর তার সরকারের পক্ষে সম্ভব হলে দেশের সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থা তিনি ফ্রি করে দেবেন।
অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ইসমত আরা সাদেক এবং মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ মোশাররাফ হোসাইন ভুঁইয়া। এছাড়া খুলনা বিভাগীয় কমিশনার মো. আবদুল জলিল, মাদারীপুরের জেলা প্রশাসক জি এস এম জাফরুল্লাহ, রাঙামাটির জেলা প্রশাসক মোস্তফা কামাল এবং পঞ্চগড়ের জেলা প্রশাসক এম সালাউদ্দিন বক্তব্য রাখেন।
