‘বেফাঁস’ শব্দটা যে নিজের গলায় এভাবে ফাঁস লেগে যাবে তা হয়তো ভাবেননি। সময়টা তাই সত্যিই খারাপ যাচ্ছে। নিজের ঔদ্ধত্য মন্তব্যে যে রাজনীতির মাঠ, নিজের শোবিজ পাড়া, বন্ধু-বান্ধব থেকেও একেবারে ছিটকে যাবে ভাবতেই পারেননি। সময়টা সত্যিই খারাপ যাচ্ছে তাপস পালের! কীরকম খারাপ তা হয়তো বোঝার ক্ষমতা নেই অন্য সহকর্মী নেতাদেরও। কারণ তারাও এতটা সংকটে পড়েছেন কী না ধারণা করা মুশকিল।
ছোট্ট করে জেনে নেওয়া যাক তাপস পালের এই বেফাঁস মন্তব্যে কতদিন দিয়ে তিনি নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছেন।
অববস্থা বেগতিক দেখে সংসদের চলতি বাজেট অধিবেশনেও তাকে যেতে নিষেধ করেছেন মমতা বন্দোপাধ্যায়। প্রথম দিকে এই নিকৃষ্ট মন্তব্য করার তাত্ক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় তাপস পালের নেতৃত্ব অবশ্য এই বেফাঁস পালের পাশেই দাঁড়িয়েছিলেন। মুখ ফসকে মানুষ তো কত কথায় বলে থাকে। এইভাবে বিষয়টিকে কাটিয়ে ওঠানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু অবস্থা এমন বেগতিক হয়ে দাঁড়াল যে তাপসকে পাশে রাখলে খোদ তৃণমূলেরই মূল উত্পাটন শুরু হবে, তখন আর কী উপায়! তিনটি নিউজ চ্যানেল মমতা আর তাপসের প্যারোডি গান তৈরি করে ব্যঙ্গ অনুষ্ঠান প্রচার শুরু করে। শেষ রক্ষা থেকে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন তিনি ঠিক তখনই।
নাকাশিপাড়ার চৌমুহা গ্রামে খুন-ধর্ষণের হুমকি দিয়ে বক্তৃতা করার পর সব মহলেই তিনি ধিক্কৃত হচ্ছেন। এবার চিত্পুরের অপেরাগুলো একজোট হয়ে জানিয়ে দিল, গ্রাম বাংলায় যাত্রাপালায় তারা আপাতত ডাকছেন না তাপস পালকে। কলকাতার বাংলা দৈনিক ‘বর্তমান’ প্রকাশ করেছে, রথের মৌসুমে গ্রাম বাংলায় যাত্রাপালা জমজমাট হয়ে ওঠে। তাই কয়েক দিন আগে থাকতেই চিত্পুরের অপেরাগুলো ঠিক করে ফেলে, কোন পালা কবে কোথায় হবে, কে কে অভিনয় করবেন ইত্যাদি। গতবারও তাপস পাল ডাক পেয়েছিলেন। তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত থাকা সত্ত্বেও তার জনপ্রিয়তা ছিল ব্যাপক। কিন্তু এবার ভুলেও কেউ তাপস পালের নাম মুখে আনছেন না। কারণ মিডিয়ার দৌলতে সারা দেশের পাশাপাশি গ্রাম বাংলায় তাঁর বেফাঁস কথা সবাই শুনে ফেলেছে। ফলে মঞ্চে উঠলে তিনি মারধর খেতে পারেন বলে আশঙ্কা। নিদেনপক্ষে ভাঙচুর, চটি-জুতো উড়ে আসাও অস্বাভাবিক নয়। তাই যাত্রাপালায় নিষিদ্ধ হয়ে গিয়েছেন তিনি।
চিত্পুরের একটি অপেরার মালিক কনক ভট্টাচার্য বলেছেন, ‘আমি যত দূর জানি, এখনও পর্যন্ত কেউ ডাকেনি তাপস পালকে। বড় বড় অপেরা ওকে নামাচ্ছে না। ছোট অপেরাগুলোও ঝুঁকি নেবে বলে মনে হয় না। এতদিন ওর অভিনয় দেখতে মেয়েরা ভিড় করতেন দলে দলে। অথচ মেয়েদের সম্পর্কেই এত বড় নোংরা উক্তি উনি করে বসলেন।’ অথচ এই যাত্রাপালার জনপ্রিয়তার ওপর ভর করেই মূলত গ্রামবাসীদের প্রিয় অভিনেতা নেতা থেকে নেতা হওয়ার প্রথম সোপান তৈরি করেছিলেন তাপস পাল।
সংসদ সদস্য হিসেবে নয়, টালিগঞ্জে তাপস পালের আলাদা সম্মান ছিল একজন সু-অভিনেতা হিসেবে। মাত্র মাস কয়েক আগে উত্তমকুমার মহানায়ক পুরস্কার পেয়েছিলেন প্রসেনজিত্ ও তাপস পাল যৌথভাবে। শুধু তাই নয়, মাসে দু-একটি ছবির প্রিমিয়ার বা চলচ্চিত্র বিষয়ক আনুষ্ঠানিকতায় তার অতিথি হিসেবে অবস্থান থাকত। কিন্তু বেফাঁস ও নিন্দনীয় এই মন্তব্যে এগুলোই উধাও। আগামী ৩ মাসে প্রায় হাফ ডজন চলচ্চিত্র অনুষ্ঠানে তাপস পালের থাকার কথা ছিল। এমনকি কেউ কেউ নাকি কার্ডে অতিথি হিসেবে নামটিও ছেপে ফেলেছিলেন। কিন্তু এহেন কাণ্ড আর ‘ধর্ষণ’ মন্তব্যে সেই ছবির প্রযোজক, কুশলীরাই এখন তার বিরুদ্ধে। আগাম ফোন করে তাপস পালকে আর আসতে হবে না অনুষ্ঠানে। এমনটাই বার্তা যাচ্ছে তাপস পালের ম্যানেজারের দফতরে।
এই বিতর্কিত সাংসদ ও অভিনেতা এখন নার্সিংহোমে। গত রবিবার রাত ৮টা নাগাদ তিনি বেলভিউতে ভর্তি হয়েছেন। হাসপাতাল সূত্রে জানানো হয়েছে তার পিঠে ব্যথা রয়েছে? চিকিত্সকেরা তাকে বিশ্রাম নিতে বলেছেন। কিন্তু বিরোধী শিবির এমনকি নিজ দলের নেতাকর্মীরাও এটাতে তার সুচতুর অভিনয় হিসেবেই আখ্যা দিয়েছেন। নিজের অহংকার আর অন্যায়ের পতনে তাই তাপস পাল আজ বড় একা! তার হাসপাতালে ভর্তি হওয়া নিয়ে কটাক্ষ করেছেন বিধানসভার বিরোধী দলনেতা ডা. সূর্যকান্ত মিশ্র বি জে পি-র রাজ্য সভাপতি রাহুল সিন্হা। সূর্যকান্ত বলেছেন, ওর দ্রুত আরোগ্য কামনা করছি। সংসদকে এড়াতেই হাসপাতালে গেছেন। মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশেই উনি ভর্তি হয়েছেন। রাহুল সিন্হা দাবি করেছেন, আমাদের কাছে খবর আছে তৃণমূল তাপস পালকে সংসদে যেতে মানা করেছে। বলেছে আপনি ইচ্ছে করেই অসুস্থ হয়ে যান। সংসদে গেলে নিন্দার ঝড় উঠবে। হাঙ্গামা হবে। বাক্যবানের ‘হামলা’ হবে। আমরা চাই তিনি যেন আর কোনো দিন সংসদে না যান। কারণ তিনি মহিলাদের সম্পর্কে যা বলেছেন, তাতে সাংসদ থাকার নৈতিক অধিকার হারিয়েছেন? রবিবার রাতেই হাসপাতালে যান স্ত্রী নন্দিনী পাল। তাপস পালের স্ত্রীকে ধরেন মিডিয়াকর্মী। স্বামীর অন্যায়ের লজ্জায় মুখ ঢেকে হাসপাতালের ভেতরে চলে যান তিনি। এদিকে নারীদের নিয়ে কটুক্তি করায়, হাসপাতালেও নার্সরাও প্রথমে বিক্ষোভ করেন। তার সেবাই আপাতত নারী নার্সদের হাতজোড় করে ক্ষমা চেয়েই তবে বাঁচতে হয়েছে। একদিকে ভারতের জাতীয় মহিলা কমিশন তার সংসদ সদস্যপদ বাতিলের দাবি তুলেছে। অন্যদিকে সকল নারী সংগঠনগুলোও তাকে কলকাতা ছাড়তে বলে দিয়েছে। এহেন পরিস্থিতিতে কীভাবে যে বেফাঁস পাল নিজেকে সামলিয়ে উঠবেন সেটিই এখন বিস্ময়ের বিষয়।
