নারায়ণগঞ্জে সাত খুনের ঘটনা তদন্ত নয়, অনুসন্ধান করতে সিআইডিকে নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। ইতিপূর্বে দেয়া আদেশ সংশোধন করে গতকাল বৃহস্পতিবার আদালত বলেছে, গোয়েন্দা সংস্থা ডিবি এ মামলার নিয়মিত তদন্ত করে অভিযোগপত্র দাখিল করবে। তবে সিআইডিসহ অন্যরা ঘটনা অনুসন্ধান করে এ আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করবে। ওই অনুসন্ধান প্রতিবেদনে যদি অতিরিক্ত কোনো তথ্য-উপাত্ত থাকে তা সাক্ষ্য হিসেবে মূল অভিযোগপত্রে অন্তর্ভুক্ত করা যাবে কি-না সেই বিষয়ে আদালত প্রয়োজনে সিদ্ধান্ত নেবে। বিচারপতি মো. রেজাউল হক ও বিচারপতি গোবিন্দ চন্দ্র ঠাকুরের ডিভিশন বেঞ্চ সিআইডিকে তদন্তকাজ থেকে বাদ দেয়া সংক্রান্ত সরকারের করা আবেদন খারিজ করে এই আদেশ দেন। তবে হাইকোর্টের এ আদেশের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে যাবেন এটর্নি জেনারেল এডভোকেট মাহবুবে আলম।
গতকাল বেলা সোয়া ১১টার দিকে এটর্নি জেনারেল সিআইডিকে তদন্ত কার্যক্রম থেকে বাদ দেয়ার আবেদন উপস্থাপনের অনুমতি চান। এ আবেদনের উপর শুনানির আগে আদালত এটর্নি জেনারেলকে সরকারি তদন্ত কমিটিসহ চারটি সংস্থার অগ্রগতি প্রতিবেদন উপস্থাপন করার আদেশ দেন। এটর্নি জেনারেল পর্যায়ক্রমে র্যাব, পুলিশের আইজি, সিআইডি ও সরকারি তদন্ত কমিটির অগ্রগতি প্রতিবেদন আদালতে উপস্থাপন করেন। এরপর সিআইডিকে তদন্ত কাজ থেকে বাদ দেয়ার আবেদন উপস্থাপন করে এটর্নি জেনারেল শুনানিতে বলেন, আইন অনুযায়ী একটি মামলায় দুটি সরকারি সংস্থা তদন্ত করতে পারে না। প্রধান আসামি চিহ্নিত হয়ে গেছে। তদন্ত চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। তাই সিআইডিকে বাদ দেয়ার আবেদন করেছি। আদালতের নির্দেশনা মেনে ডিবি তদন্তকাজ চালিয়ে যাচ্ছে। এ পর্যায়ে আদালত বলেন, কোনো অগ্রগতি প্রতিবেদনই সিআইডির অসুবিধা হচ্ছে তা বলা হয়নি। ডিবি আর সিআইডির প্রধান একই ব্যক্তি। তাই সমস্যা কোথায়। চার্জশিট একটিই হবে। নিয়মিত তদন্ত শেষে ডিবি চার্জশিট দেবে। ডিবির পাশাপাশি সিআইডি তদন্ত করে অতিরিক্ত তথ্য-প্রমাণ পেলে তাতে ডিবির সন্তুষ্ট হবারই কথা। জবাবে এটর্নি জেনারেল বলেন, আইনে দুটি সংস্থা দিয়ে তদন্ত করার সুযোগ নেই। এতে মামলার অসুবিধা হবে।
তখন আদালত বলেন, সাত খুনের ঘটনার পর তখন কি পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল তা বিবেচনা করতে হবে। ঘটনার পর র্যাব হেডকোয়ার্টার থেকে সংবাদ সম্মেলন করে বলে দেয়া হলো, র্যাবের কোনো সদস্য জড়িত নয়। কিন্তু পরে আরেকটি বেঞ্চ র্যাব সদস্যদের গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিলো। সিআইডি তদন্ত শুরু করলো। দেখা গেলো, তিনজন সদস্য ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে। জনমনের পরিস্থিতির পরিবর্তন হলো। এখন সিআইডিকে প্রত্যাহার করা হলে কি ভাল দেখাবে? এটর্নি জেনারেল বলেন, আইনে কি আছে তা দেখতে হবে? আদালত বলেন, আমরা ডিবির তদন্তে বাধা দেইনি। কোনো প্রতিবেদন দিতে বলিনি। এ পর্যায়ে এটর্নি জেনারেল বলেন, অতিরিক্ত তদন্তের সুযোগ নেই। সিআইডিকে তদন্তের জন্য প্রথম যখন আদালত আদেশ দেন সেই আদেশের বিরুদ্ধে আমরা আপিল বিভাগে গিয়েছিলাম। আপিল বিভাগ হাইকোর্টে আবেদন দিতে বলেন। সে অনুযায়ী আমরা আবেদন দিয়েছি। শুনানির এক পর্যায়ে আবেদনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে আইনগত প্রশ্ন তুলে আদালত বলেনঃ আপনি যে আবেদন করেছেন তাতে সরকারের কোনো নির্দেশনা দেখতে পাচ্ছি না। কোন এখতিয়ার বলে আপনি এ আবেদন দাখিল করেছেন? জবাবে এটর্নি জেনারেল বলেন, কেউ লিখিতভাবে বলুক আর নাই বলুক, আমি বলছি, আমার প্রতি নির্দেশনা রয়েছে। আদালত আমার কথা বিশ্বাস করতে পারেন। আগেও আমি বলেছিলাম। আপনারা কি আমাকে ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করবেন না? এ পর্যায়ে আদালত বলেনঃ আপনি আইনগত প্রশ্ন তুলেছেন। এ কারণে আমরা আইনের কথা বলছি। এটা আইনগত প্রশ্ন। সরকারি নির্দেশনা ছাড়া এটর্নি জেনারেল কার্যালয় হাইকোর্টের রুলের বিরুদ্ধে আবেদন করতে পারে কি-না জবাবে এটর্নি জেনারেল বলেন, আগের আদেশ দেয়ার পর আমরা আপিল বিভাগে গিয়েছিলাম। সে আবেদন আপিল বিভাগে বিচারাধীন। আপিল বিভাগ সংশ্লিষ্ট বেঞ্চে আসতে বলায় এসেছি। তখন আদালত বলেনঃ আপনি আপিল বিভাগের কথা বলবেন না। এটি বললে অনভিপ্রেত চাপ সৃষ্টি হবে।
এটর্নি জেনারেল বলেন, আমি আইনের কথা বলছি। সিআইডি তদন্ত করায় মারাত্মক সমস্যা হচ্ছে।
এ পর্যায়ে আদালত বলেনঃ আপনি কি গোটা আদেশ, নাকি সিআইডির অংশটুকু সংশোধন চান? আপনি আদেশ চাইলে আমরা তা দিবো। আদালত এসময় দুটি পত্রিকা দেখিয়ে বলেন, প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে সিআইডিকে যেন প্রত্যাহার না করা হয়। প্রতিবেদনে কয়েকটি চাঞ্চল্যকর মামলার প্রসঙ্গ দিয়ে বলা হয়েছে, ডিবির সুষ্ঠু তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। সিআইডি ছাড়া সুষ্ঠু তদন্ত হবে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। এটর্নি জেনারেল বলেন, কে কি বললো সেটা দেখার বিষয় নয়। আইনে কি আছে তা দেখতে হবে। শুনানি শেষে হাইকোর্ট উপরোক্ত আদেশ দেন।
উপস্থাপিত র্যাবের অগ্রগতি প্রতিবেদনে বলা হয়, এ পর্যন্ত র্যাবের নিজস্ব সদস্য, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্য ও সাধারণ জনগণসহ মোট ৮০ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। আরো কিছু ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ করার প্রয়োজন রয়েছে। এজন্য দুই সপ্তাহ সময় প্রয়োজন।
সিআইডির প্রতিবেদনে বলা হয়, হত্যা মামলায় ১৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এদের মধ্যে ৪ জন ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। এছাড়া ৩ জন সাক্ষীও ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে। এ জবানবন্দি সংগ্রহের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
সরকারি তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, এ পর্যন্ত ৩শ’ ৫০ জনের বক্তব্য গ্রহণ করা হয়েছে। যে তিনজন র্যাব সদস্য ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন তাদের কারা ফটকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। প্রাপ্ত সব তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। আরো কিছু তথ্য জানার জন্য আরো কিছু সাক্ষীর জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন রয়েছে। এজন্য চার সপ্তাহ সময় দরকার।
