রংপুরে ১৫০ জাতের ধান বিলুপ্তপ্রায়

আপডেট : ১০ জুলাই ২০১৪, ২২:৪৮
উচ্চ ফলনশীলসহ উদ্ভাবিত নতুন ধানের চাষাবাদ বৃদ্ধি পাওয়াতে রংপুর অঞ্চল থেকে সাবেক আমলের বহুমাত্রিক ধানের ১৫০টি জাত প্রায় বিলুপ্ত হতে চলেছে। রংপুর বিভাগের নীলফামারী, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, লালমনিরহাট, দিনাজপুর, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও ও রংপুর জেলার ৫৮টি উপজেলার বীজের বাজার চষেও এ সমস্ত ধানবীজ জোগার সম্ভব হচ্ছে না। এ সমস্ত ধান এখন বয়স্ক কৃষকদের নিকট শুধু অতীত কাহন হিসেবেই গণ্য হচ্ছে। আউশ, রোপা আমন এবং বোনা আমন প্রজাতির এসমস্ত ধানের অন্যতম আড়াই, চেংড়ি, বাউরস, নাজিমুদ্দিন, লাটিসাইল, বালাম, ভুতুবালাম, মুরালী, কাতিছিনি, নিহি, খৈসা, পশু আইল, ছিরমইন, পাখ বিরনী ও দুধ কাতারী। আরও কয়েক প্রজাতির ধান ছিলো যেগুলোর নাম বিস্মৃতির আড়ালে ঢাকা পড়ে গেছে। ষড়ঋতুর সাথে সঙ্গতি রেখে পরিবেশবান্ধব এ সমস্ত ধানের ফলনও ছিলো ভালো। এখন থেকে দুই দশক আগেও আউশ মৌসুমে চাষাবাদ হতো আড়াই, চেংড়ি ও বাউরস। চারা বপন থেকে ফলন পর্যন্ত আড়াই মাসে ধান পেকে যেত বলেই ধানের নামকরণ হয়েছিল আড়াই। ঘন বৃষ্টি এমনকি কোমর সমান পানিতেও ফলন ভালো হতো বাউরস এবং চেংড়ি ধানের। চেংড়ি ধানের চিড়া খেতে সুস্বাদু বিধায় প্রতি কৃষক পরিবারেই এ ধানের চাষাবাদ ছিল অপরিহার্য। আউশ মৌসুমশেষে সাইল তথা রোপা আমন মৌসুমে নাজিমুদ্দিন, লাটি সাইল, বালাম, ভুতু বালাম, মুরালী, কাতিছিনি ও নিহি ধানের চাষাবাদ হতো। নাজিমুদ্দিন ধান ছিল আভিজাত্যের প্রতীক। ঈদ, পার্বন ও বিয়েশাদীতে নাজিমুদ্দিনের চাল না হলেই নয়। পাকিস্তানি বাসমতির মতো ছিল নিহি ধান। ধান পাকার আগেই জমি থেকে গন্ধ ছড়িয়ে পড়তো নিহি ধানের। বালাম ও ভুতু বালাম ধানের রং ছিল খয়েরি। তাই ধান পাকার মুহূর্তে নানান বর্ণের ধানে ভরা বিস্তীর্ণ ধানের মাঠকে মনে হতো বিরাট এক নকশীকাঁথা। দিন বদলে সে নকশীকাঁথা মিইয়ে গেছে কালের প্রবাহে। বোনা আমন ধানের মাঠে ছিরমইন ছিল সবার রাজা। দশ হাত পানির মধ্যেও এ ধান তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সমর্থ হতো। অন্যদিকে বোরো মৌসুমে স্থানীয় ধানের মধ্যে ছিল খৈসা ও পশু আইল। খৈসা ধানের চাল ছিল আউস মৌসুমের চেংড়ির সমতুল্য। সুগন্ধে ভরা পশু আইলের চাল ছিল বনেদী ঘরের বারো মাসের রসদ। মৌসুমভিত্তিক উচ্চ ফলনশীল চান্দিনা, চায়না, মুক্তা ইরি এবং বিআর-২৮, বিআর-২৯ এবং অন্যান্য ধানের দাপটের মুখে উল্লিখিত ধান হারিয়ে গেছে গত দুই দশক আগে। নীলফামারী কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, নতুন ধান উদ্ভাবিত হওয়ায় এবং ফলন ঐসব ধানের বেশি পাওয়ায় চাষিরা এখন এসব ধান চাষ করতে চায় না। সেসব ধানবীজও রীতিমত দুষ্প্রাপ্য হয়ে পড়েছে।