ডিজিটাল দারিদ্র্য শুমারি না থাকায় দেশের দারিদ্র্য বিমোচন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ এতে করে প্রকৃত দরিদ্র নির্ধারণে সমস্যা এবং তাদের জন্য সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ সঠিকভাবে পৌঁছে দেয়া কঠিন হয়ে যাচ্ছে। ফলে দরিদ্র না হয়েও সরকারি সুবিধা নিচ্ছেন কেউ কেউ। আর প্রকৃত দরিদ্ররা সুযোগ বঞ্চিত হচ্ছেন। আবার কোনো কোনো দরিদ্র একাধিক প্রকল্পের সুবিধা নিচ্ছেন।
ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০১৫ সালের মধ্যে দারিদ্র্যের হার সাড়ে ৩১ থেকে ২২ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বর্তমানে দারিদ্র্য হার হ্রাসের যে গতি তাতে এ লক্ষ্য পূরণ না হওয়ার আশঙ্কাই বেশি। কারণ দরিদ্রদের জন্য কোনো বরাদ্দ করা হলে তাতে দুর্নীতির কারণে প্রকৃত দরিদ্ররা বঞ্চিত হচ্ছেন। তাছাড়া দেশে প্রকৃত দরিদ্রের সংখ্যা নিয়েও বিভ্রান্তি রয়েছে। ফলে তাদের জন্য পরিকল্পনা গ্রহণেও সমস্যায় পড়তে হচ্ছে সংশ্লিষ্টদের। যে পরিকল্পনা করা হয় তাতেও দুর্নীতির কারণে সঠিক ফল পাওয়া যায় না। এ অবস্থায় দারিদ্র্য শুমারির প্রচলন করা হলে দুর্নীতির প্রকোপ কমবে। পাশাপাশি তাদের জন্য পৃথক পরিকল্পনা নেয়া সহজ হবে।
জানা গেছে, ডিজিটাল দারিদ্র্য শুমারির মাধ্যমে প্রতিটি ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা ভিত্তিক দরিদ্রদের প্রতিটি পরিবারের পূর্ণাঙ্গ প্রোফাইল তৈরি করা হবে। যাদের মধ্যে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তাদের কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার আওতায় কাজ করতে সহজ হবে। সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি কার্যক্রমও সহজ হবে। এ কার্যক্রমের অর্থ অপচয় ও ভিন্ন খাতে ব্যয় হবে না। দরিদ্রদের নিয়ে বিভিন্ন এনজিওগুলোর জন্য কাজ করাও সহজ হবে।
জানা গেছে, বাংলাদেশে দারিদ্র্য হার নির্ধারণের জন্য খানা ব্যয় জরিপ পরিচালনা করা হয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো প্রতি চার বছরে একবার খানা জরিপ পরিচালনা করে দারিদ্র্য পরিস্থিতি নির্ণয় করে। আর দারিদ্র্য পরিস্থিতি বাত্সরিক ভিত্তিতে বুঝার জন্য ১৯৯৪ সাল থেকে দারিদ্র্য পরিবীক্ষণ জরিপ চালু করা হয়। এ পদ্ধতিতে একটি দারিদ্র্য রেখা বিবেচনা করা হয়। এখানে সমাজের ন্যূনতম গ্রহণযোগ্য জীবন যাত্রার মান নির্দেশ করে। এর মাধ্যমে সমগ্র জনগোষ্ঠীকে একটি অংশ দরিদ্র আর অপর অংশ দরিদ্র নয় এমন দুটি অংশে ভাগ করা হয়। এর বাইরে ডিজিটাল দারিদ্র্য জরিপ করতে পারলে দুর্নীতি ও অনিয়ম অনেকাংশে কমে যাবে। সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করা সহজ হবে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো সূত্রে জানা গেছে, দরিদ্রদের তথ্যভিত্তিক ডিজিটাল তালিকা করতে টাঙ্গাইলে একটি পাইলট প্রজেক্ট রয়েছে। সারা দেশে এ ধরনের অনলাইন দরিদ্র তালিকা করার পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে। তবে এ প্রক্রিয়া প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।
দরিদ্রদের জন্য সরকারের নেয়া বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা সঠিকভাবে ও দুর্নীতিমুক্ত বিতরণে ডিজিটাল দারিদ্র্য শুমারি গুরুত্ব দিয়ে সম্পন্ন করা প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন অর্থনীতিবিদরা। তারা বলছেন, দারিদ্র্য শুমারি করা হলে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আঞ্চলিক বৈষম্যও দূর করা সম্ভব হবে। কারণ তখন প্রতি দরিদ্র নিরাপত্তা কর্মসূচির কত অংশ পাবেন তা নির্ধারণ করা যাবে। আর সে হিসাবে বরাদ্দ দেয়া হবে।
এসব প্রসঙ্গে পলিসি রিসার্চ অ্যান্ড ইন্সটিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহি পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য প্রকৃত দরিদ্র নিরূপণ করা জরুরি। এজন্য বিশ্বব্যাংকের দেখানো পথে প্রক্সি প্রসেস বা দরিদ্রদের সার্বিক দিক বিবেচনায় দরিদ্র নিরূপণ করার প্রক্রিয়া সরকারের রয়েছে। তবে দ্রুত এ কাজ সম্পন্ন করতে হবে। এতে তাদের উন্নয়নে সরকারের পদক্ষেপ নেয়া সহজ হবে। পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় কেউ সরকারি সুবিধা গ্রহণ করতে পারবে না। দারিদ্র্য বিমোচন প্রক্রিয়াও গতিপ্রাপ্ত হবে।
