ঈদ উত্সবে উপহার

আপডেট : ১৩ জুলাই ২০১৪, ১৯:৩৩
রিকশায় বসে আছি। দু’দিকে থেমে থাকা রাশি রাশি গাড়ির সারির দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছিল যেন গাড়ির সমুদ্রের মাঝে ডুবে আছি। সমুদ্র বললে একটু ভুলই হয়। সমুদ্রের তো গতি আছে, এখানে গাড়ির কোন গতি নেই। যেন স্থির এক ছবি। সামনে ঈদ বলে কথা, সবাই কেনাকাটায় ব্যস্ত। তাই মনে হয় এসময় যদি প্লেনের ব্যবস্থাও করা হয়, তাহলেও ঢাকার আকাশে ট্রাফিক জ্যাম দেখা দেবে। দেখতে দেখতে পনেরো রোজা পেরিয়ে গেল। এবারের রোজা, ঈদ আমার জন্য বিশেষ। কারণ আমার চাকরির ছয় মাস হতে চলল। বহু কষ্টের পরেই একটি বেসরকারি ব্যাংকে পাওয়া এই চাকরি। এখন যারা চাকরি খুঁজছে, আমার সমবয়সী তারাই বুঝবে এর মূল্য। সেই চাকরি থেকে জীবনে প্রথমবারের মত ঈদের বোনাস পাব। ভাবলেই খুশিতে মন ভরে উঠছে। সারাজীবন বাবা-মায়ের দেয়া জামা-কাপড় দিয়েই ঈদ উদযাপন করেছি। এবার প্রথম ঈদে আমি তাদের উপহার দিব। ঈদ বোনাসের টাকা দিয়ে কী কী কিনব, আর কার কার জন্য কিনব সব পরিকল্পনা করা হয়ে গেছে। তবুও একমাত্র সমস্যা, এখনও অফিসের বোনাসই দিচ্ছে না। তাই যারা দোকানে দোকানে ঘুরছে তাদের দিকে তাকিয়ে খুব মন খারাপই হচ্ছিল। অফিসে গিয়ে শুনলাম বোনাস দিয়ে দিয়েছে। ইচ্ছে হচ্ছিল তখনই বেরিয়ে যাই ঈদ উদযাপনে। শেষ পর্যন্ত নিজেকে সংবরণ করলাম। এবারের ঈদে কেনাকাটা হবে একটু বেশিই। ঈদে আমি আমার মা-বাবা, ভাইয়াকে তো শাড়ি, পাঞ্জাবি কিনে দিবই। সাথে নানী, দিদা আর আমার ভক্ত ছোট-ছোট ভাগ্নে-ভাগ্নীর জন্য উপহারও আছে। আরও অনেকের কথাই মনে হচ্ছিল, কিন্তু সবাইকে কি আর দিতে পারি। হঠাত্ মনে হল আমাদের বাসায় যে আপু ছিল, ওর কথা। এখন ওই আপু চলে গেছে, ওর মেয়েও বড় হয়ে গেছে। আমার সঙ্গে থাকাই ছিল ওর কাজ। আমার বন্ধু, যার কাছেই আমি বড় হয়েছি। সে আমাকে ছোটবেলা থেকে দেখে রেখেছে। ও না থাকলে কি আমি একা থাকতে পারতাম। আমার বাবা-মা তো চাকরি করে। সেই আপুর কথা ভুলে গেলাম। তাই আপুর জন্য ঈদ উপহার হিসেবে কামিজ আর ওর মেয়ের জন্য জামা কেনার মধ্যদিয়েই চাকরি পাবার পরে এক নতুন জীবনে ঈদের সূচনা ঘটালাম। এভাবেই সুমি বললেন তার প্রথম ঈদের পরিকল্পনা। প্রতিবছর রোজায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলের প্রাঙ্গণ যেন হয়ে ওঠে এক পুনর্মিলনীর স্থান। ইফতারে মিলিত হয় নানা ব্যাচের নানা বিষয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা। তাদের কেউ এখন শিক্ষক, কেউ ব্যাংকার, তো কেউ সরকারি চাকরি করছে নানা সংস্থায়। তেমনি এক ব্যাচের প্রাক্তন ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে আলোচনা হচ্ছিল তাদের এবারের ঈদের পরিকল্পনা জানতে। কেননা তাদের মধ্যে বেশিরভাগের জন্যই চাকরি পাবার পর এবারের ঈদই প্রথম। সাদিয়ার বিয়ের পর এটিই প্রথম ঈদ। এবারের বিয়েতে স্বামী-স্ত্রী দু’জনের ঈদ বোনাস মিলিয়ে কেনা-কাটার অনেক অংশই হয়ে গেছে। সাদিয়া বলছিল: মা-বাবা, শ্বশুর-শাশুড়ী এবং অন্যদের জন্য কেনা-কাটাও শেষ। তবু প্রথম ঈদ, আরও অনেকের জন্য উপহারই কেনা বাকি রয়ে গেছে। হয়তো এবার দেয়া হবে না, তবু সামনে তো আরও দিন আছে। এবারের ঈদ আমার জন্য, মানে আমাদের জন্য, চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। এ প্রসঙ্গেই জানতে চাইলাম বর্তমানে ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষক শামীমের কাছে। তিনি বলেন, এবারের ঈদে আমার ছোট বোন, আর মায়ের জন্য বিশেষ উপহার কিনব। ঈদে আসলে নিজে কেনার চেয়ে অন্যকে কিছু দেবার মাঝেই আনন্দ অনেক বেশি। কাউকে সামান্য একটু আনন্দ দিতে পারলেও তা মনে যে অনুভূতির সৃষ্টি করে, একটি উপহার পাবার থেকে তা বহুগুণে বেশি। শামীমের কথা শুনে বন্ধুদের গ্রুপের সবাই মেতে উঠেছিল তাদের ঈদের পরিকল্পনা বলতে। ওদের মধ্যে একজন বলে উঠল, আমি এবারের ঈদে আমার সহকর্মীদেরও কিছু দিতে চাই, কারণ ওরাই এখন আমার চলার পথের সঙ্গী, আর পুরনো বন্ধুদের কথা কি ভুলতে পারি। স্কুলের শিক্ষিকা সীমা বললেন, শিক্ষিকা হিসেবে এবারের ঈদই আমার প্রথম। ঈদে আমি সবার প্রথম উপহার দেই আমার ছাত্র-ছাত্রীদের। কারণ আমি আবিষ্কার করলাম, আমার ছাত্র-ছাত্রীরাই আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধুতে পরিণত হয়েছে। আর ওদের এবারের ঈদ উপহার হিসেবে ছিল ঈদকার্ড। এসব ঈদকার্ড আমাকেও আমার ছোটবেলায় ফিরিয়ে নিয়ে যায়। ঈদকার্ড পাবার পর প্রতিটি শিশুর মুখের হাসি আমার কাছে চিরস্মরণীয় হয়ে রয়ে যাবে। প্রতি ঈদই আমার উদযাপন হয় আমার ছোটবেলার বন্ধুদের সাথে। তাই ওদের জন্য ছোট ছোট উপহারও কেনা হয়ে গেছে। মাত্র একবছর হতে চলল আমার বিয়ের। আমার শ্বশুর-শাশুড়ীর জন্য শাড়ি-পাঞ্জাবি কিনেছি। তবে ভাবীর কাছে একমাত্র দেবরের নানা অবদার শুরু হয়ে গেছে। সেসব অবদার কি আর ফেলতে পারি। আমার স্বামীর কাছে আমার ছোট বোন, মানে ওর একমাত্র শালীর অবদারও কম নয়। ঈদের আগে দু’জনের ইচ্ছাই পূরণ করার আশা রাখি। এভাবেই নানা উপহার কেনার মধ্যদিয়ে সবার ঈদ শুরু হয়ে গেছে। কী উপহার সেটি বড় নয়, খুব সামান্য একটি উপহারও এনে দিতে পারে অপরের মনে অসীম আনন্দ আর ভালবাসার অনুভূতি। সামান্য উপহারও ভালবাসার নিদর্শন। ছবি: রেজা চৌধুরী কৃতজ্ঞতা: প্রিয়রঞ্জনীর পরিবার