চারদিকে বিশ্বকাপ নিয়ে চলছে সমান উন্মাদনা। প্রায় এক মাসের এই উন্মাদনা শেষে অনুষ্ঠিত হয়েছে ২০১৪ সালে ফাইনাল ম্যাচ। আর বরাবরই ফাইনাল মানেই উত্তেজনার চূড়ান্ত রূপ। নতুন প্রজন্ম এমনই উত্তেজনায় ভাসছে। কেমন ছিল এর আগের বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচগুলো আর কেমনই ছিল আগের প্রজন্মের ফাইনাল প্রত্যাশা। তাই জানাচ্ছেন রিয়াদ খন্দকার
নানা জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনাল। মুখোমুখি হতে যাচ্ছে আর্জেন্টিনা ও জার্মানি। তৃতীয়বারের মতো ফাইনালে পরস্পরের বিপক্ষে খেলছে ফুটবল বিশ্বের এই দুই পরাশক্তি। আগের দুই ফাইনালে দুই দলই একটি করে জিতেছে। কেউ কাউকে ছাড়িয়ে যেতে পারেনি। তাই ২০তম এই আসরের ফাইনালে জিতে নিজেদের ঝুলি আরও সমৃদ্ধ করতে চাইবে উভয় দলই। জার্মানিকে আশাহত করে ৮৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে জয় তুলে নিলেও বেশিরভাগ সময় আর্জেন্টিনার জয়রথে বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে জার্মানি। তাই এমনই একটি ফাইনাল নিয়ে বর্তমান প্রজন্মের উন্মাদনা শত গুণে বেড়েছে। আসুন দেখা যাক ফাইনাল ম্যাচ নিয়ে এর আগের প্রজন্মের উন্মাদনার কিছু চাল চিত্র।
১৯৩০ সাল :স্বাগতিক রাষ্ট্র উরুগুয়ে। ফাইনালের তারিখ ৩০ জুন। ভেন্যু, সেন্টেনারিও স্টেডিয়াম, মন্টিভিডিও। ৯৩ হাজার দর্শকের সামনে উরুগুয়ে ৪-২ গোলে পরাজিত করে আর্জেন্টিনাকে।
১৯৩৪ সাল :ইতালিতে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় আসরের ফাইনাল ম্যাচের ভেন্যু ছিল রোমের পিএনএফ স্টেডিয়াম। পঞ্চান্ন হাজার দর্শকের উপস্থিতিতে ইতালি ২-১ ব্যবধানে পরাজিত করে চেকোশ্লোভাকিয়াকে।
১৯৩৮ সাল :ফ্রান্সের আসরের ফাইনালের ভেন্যু ছিল কলম্বিস প্যারিস। ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হয় ১৯৩৮ সালের ১৯ জুন। মাঠে দর্শক সমাগম হয়েছিল পঞ্চান্ন হাজার। হাঙ্গেরিকে ৪-২ গোলে হারিয়ে দ্বিতীয় আসরে জেতা শিরোপাটা ধরে রাখে ইতালি।
১৯৫০ সাল :ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত আসরের ফাইনালের ভেন্যু ছিল রিওডি জেনিরোর মারকানা স্টেডিয়াম। স্বাগতিকদের ২-১ ব্যবধানে পরাজিত করে শিরোপা জেতে উরুগুয়ে। সেবার ফাইনালের দর্শকসংখ্যা ছিল দুই লাখ পাঁচ হাজার। এটি যেকোনো স্থানে অনুষ্ঠিত যেকোনো ম্যাচের সর্বোচ্চ দর্শকসংখ্যার রেকর্ড হিসেবে আজও টিকে আছে।
১৯৭০ সাল :স্বাগতিক মেক্সিকোর রাজধানী মেক্সিকো সিটির আজটেকা স্টেডিয়ামে ১৯৭০ সালের ২১ জুন অনুষ্ঠিত ফাইনালে ইতালিকে ৪-১ গোলে পরাজিত করে হ্যাটট্রিক শিরোপা জেতে ব্রাজিল। এর মধ্য দিয়ে সে সময়ে পরিচিত ‘জুলে রিমে’ ট্রফিটা জীবনের তরে নিজেদের করে নেয় দক্ষিণ আমেরিকানরা। প্রথমবারের মতো টেলিভিশনে সম্প্রচারিত হয় বিশ্বকাপের রঙিন চিত্র।
১৯৭৪ সাল :ভেন্যু পশ্চিম জার্মানির মিউনিখ অলিম্পিক স্টেডিয়াম। ফাইনালের তারিখ ৭ জুলাই ১৯৭৪ সাল। সাতাত্তর হাজার আটশত তেত্রিশ জন দর্শকের সামনে নেদারল্যান্ডসকে ২-১ ব্যবধানে পরাজিত করে শিরোপা ঘরেই রেখে দেয় স্বাগতিকরা।
১৯৭৮ সাল :স্বাগতিক দল আর্জেন্টিনার শিরোপা জয়ের বলি হয় আবারও নেদারল্যান্ডস। ২৫ জুনের ফাইনালে বুয়েন্স আয়ার্সের এস্তাদিও মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামে সাতাত্তর হাজার দুইশত ষাটজন দর্শকের সামনে ডাচদের ৩-১ গোলে হারিয়ে শিরোপা রেখে দেয় আর্জেন্টিনা।
১৯৮২ সাল :স্পেনের স্যান্টিয়াগো বার্নাব্যু স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ১১ জুলাইয়ের ফাইনালে পশ্চিম জার্মানিকে ৩-১ ব্যবধানে পরাজিত করে তৃতীয়বারের মতো শিরোপার স্বাদ পায় ইতালি। দক্ষিণ আফ্রিকা, এশিয়া এবং উত্তর ও মধ্য আমেরিকার কনকাকাফ অঞ্চল থেকে চূড়ান্ত পর্বে খেলার জন্য দলের সংখ্যা বাড়ানো হলে সেবার ২৪টা দল পায় স্পেনের টিকিট। তবে আধিপত্য ছিল ইউরোপিয়ানদের।
১৯৮৬ সাল :মেক্সিকো সিটির আজটেকা স্টেডিয়ামে ফাইনাল অনুষ্ঠিত হয় ২৯ জুন। ১ লাখ ১৪ হাজার ৫৯০ জন দর্শকের সামনে পশ্চিম জার্মানিকে ৩-২ ব্যবধানে পরাজিত করে শিরোপা ঘরে তোলে আর্জেন্টিনা। আসরটি অনুষ্ঠানের কথা ছিল কলম্বিয়ায়। কিন্তু ব্যয় নির্বাহের বিধিনিষেধ থাকায় এবং যথাযথ অবকাঠামো না থাকার কারণে বিশ্বকাপ আয়োজনে অপারগতা প্রকাশ করে কলম্বিয়া। ফিফা আসরটি আয়োজনের দায়িত্ব দেয় মেক্সিকোকে। প্রথম দেশ হিসেবে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের আয়োজক হয় মেক্সিকো।
১৯৯০ সাল :ইতালির রোমের অলিম্পিক স্টেডিয়ামে ৮ জুলাইয়ের ফাইনালে ১৯৮৬ সালে পরাজয়ের প্রতিশোধ নেয় পশ্চিম জার্মানরা। সেবারের আসরে ভালো ম্যাচ যেমন ছিল, তেমনি বাজে ম্যাচের সংখ্যাও নেহাত কম নয়। ফাইনাল ম্যাচটা ছিল বাজে ম্যাচের উদাহরণ। বেশ কিছু ম্যাচের নিস্পত্তি হয় পেনাল্টি শুট আউটে। ফুটবল পাগল ইতালিয়ানদের জন্য সেবারের আসরটা কিছু তিক্ত স্মৃতিও উপহার দেয়।
১৯৯৪ সাল :টাইব্রেকারে নিস্পত্তি হওয়া ম্যাচে ব্রাজিলের জয় ৩-২-এ। প্যাসাডেনার রোজ বোলে ১৭ জুলাই অনুষ্ঠিত ফাইনালে ৯৪ হাজার ১৯৪ জন দর্শকের সামনে নির্ধারিত ৯০ মিনিটের পর অতিরিক্ত সময়েও ব্রাজিল এবং ইতালি গোলের দেখা পায়নি। যে কারণে টাইব্রেকার ছাড়া চ্যাম্পিয়ন দল নির্বাচনের ভিন্ন কোনো উপায় ছিল না।
১৯৯৮ সাল :স্বাগতিক ছিল ফ্রান্স। রাজধানী প্যারিসের স্তাদে ডি ফ্রান্স স্টেডিয়ামে ৮০ হাজার দর্শকের সামনে ব্রাজিলকে ৩-০ ব্যবধানে পরাজিত করে শিরোপা ইউরোপে রেখে দেয় স্বাগতিকরা।
২০০২ সাল :প্রথমবারের মতো এশিয়ার মাটিতে আয়োজিত হয় বিশ্বকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট। সিদ্ধান্তটি নিয়ে ব্যাপক প্রশংসা পায় ফিফা। জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় যৌথভাবে আয়েজিত আসরের ফাইনাল অনুষ্ঠিত হয় ৩০ জুন। জাপানের ইয়োকাহামা স্টেডিয়ামে সমবেত ষাট হাজার উনত্রিশ জন দর্শকের সামনে জার্মানিকে ২-০ ব্যবধানে পরাজিত করে শিরোপার স্বাদ পায় ব্রাজিল।
২০০৬ সাল :জার্মানিতে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের ফাইনালের ভেন্যু ছিল বার্লিনের অলিম্পিক স্টেডিয়াম। ইতালি এবং ফ্রান্সের মধ্যকার ফাইনাল ম্যাচ নির্ধারিত এবং অতিরিক্ত সময়ে ১-১ ব্যবধানে অমীমাংসিত থাকার কারণে শিরোপা জয়ী দল নির্ধারণ হয় টাই ব্রেকারে। পেনাল্টি শুট আউটে ইতালি ৫-৩ ব্যবধানের জয়ে ঘরে তোলে শিরোপা।
২০১০ সাল :বিশ্বকাপ আয়োজনের সুযোগ পায দক্ষিণ আফ্রিকা। জোহানেসবার্গের সকার সিটি স্টেডিয়ামের ফাইনালে নেদারল্যান্ডসকে ১-০ ব্যবধানে পরাজিত করে ট্রফি ঘরে তোলে স্পেন। প্রথমবারের মতো দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে যেসব আশা নিয়ে বিশ্বকাপের আয়োজন করা হয়েছিল, তার কোনোটাই বলতে গেলে পূরণ হয়নি।
২০১৪ সাল :কোয়াটার ফাইনালে ব্রাজিল ও নেদারল্যান্ডকে হারিয়ে ফাইনালে উঠে জার্মানি ও আর্জেন্টিনা। এস্তাদিও দো মারাকানা স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয় ম্যাচটি। এই মাঠে এই নিয়ে দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ ফাইনাল হচ্ছে। এর আগে ১৯৫০ সালে এই মাঠে ফাইনাল হয়েছিল। মারাকানার দর্শক আসন সংখ্যা ৭৬,৯৩৫। প্রতিটি আসনই কানায় কানায় পূর্ণ থাকবে এমনই আশা করা যায়।
