আমাদের সকলেরই জানা চিকিত্সা একটি সেবামূলক পেশা। বহুযুগ আগে থেকেই রোগ নিরাময়ে মানুষ দ্বারস্থ হতে হতো চিকিত্সকদের। সময়ের সাথে সাথে পেশায় এসেছে নতুনত্ব বেড়েছে এর নানামুখী চাহিদা। আর পেশা হিসেবে বরাবরই প্রজন্মের প্রথম পছন্দ এই পেশাটি। তাই এই প্রজন্মের তিনজন চিকিত্সককে নিয়ে আমাদের এবারের আয়োজন। গ্রন্থনা করেছেন রিয়াদ খন্দকার, সাজেদুল ইসলাম শুভ্র ও আহসান রনি
ডা. এ কে এম শামসুল কবীর
সহযোগী অধ্যাপক
হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
রাজশাহী ক্যাডেট কলেজের বিস্তৃত প্রান্তরে কেটেছে শৈশব-কৈশোরের উচ্ছল দিনগুলো। ছোটবেলা থেকেই বিতর্কের সাথে যুক্ত ছিলেন, কথাবার্তাতে সেই প্রাঞ্জলতা তার এখনও। বাংলাদেশ ডিবেট ফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট ছিলেন, ‘বিডিএফ বাবু’ নামেই পরিচিতি পেয়ে গিয়েছিলেন একটা সময়। পড়ালেখা নিয়ে সবসময় সিরিয়াস ছিলেন তিনি। শুধু পড়ালেখা নয়, যখন যেটা করেছেন, শতভাগ আন্তরিকতা দিয়ে তিনি চেষ্টা করেছেন সেখানে। এসএসসি ও এইচএসসিতে রাজশাহী বোর্ডে মেধাতালিকায় স্থান করে নেওয়া এই চিকিত্সক সুযোগ করে নেন ঢাকা মেডিকেল কলেজে। তিনি এ কে এম শামসুল কবীর, হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।
ডা. এ কে এম শামসুল কবীর শুধুই লিভার চিকিত্সা নয়, কাজ করছেন এর সচেতনতামূলক বিভিন্ন কার্যক্রমে। নিয়মিত টেলিভিশনে স্বাস্থ্য বিষয়ক একাধিক অনুষ্ঠানে যোগ দেন। তিনি মনে করেন, রোগীদের রোগটা না যতটা প্রকট, তার চেয়ে বড় বিষয় মানসিক সুস্থতা। এ ক্ষেত্রে একজন চিকিত্সকের দুটি কথাও তার জন্য শত ওষুধের চেয়ে বেশি কার্যকর। এই বিষয়টা যারপরনাই উপলব্ধি করেন ডা. এ কে এম শামসুল কবীর। কলেজজীবনে তার বন্ধুদের কাছে অসংখ্যবার হাসির পাত্র হয়েছেন এই ক্যালরি মেপে খাওয়ার সুবাদে। তাতেও তিনি দমে যাননি, স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল, এই মূলবাণীটা মেনে চলেছেন সবসময়। এই সময়ের চিকিত্সকদের নিয়ে তিনি অনেক আশাবাদী, তারা আমাদের চিকিত্সাব্যবস্থায় আরও নতুন নতুন সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচন করবে। বগুড়া শহরের এক সময়ের প্রখ্যাত চিকিত্সক শামসুল আরেফীনের অনেক বড় শখ ছিল ছেলেও খ্যাতনামা চিকিত্সক হবেন। বাবার সেই স্বপ্নপূরণ করেছেন ডা. এ কে এম শামসুল কবীর। স্ত্রী মেহেরা পারভীনও একজন বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক। অবসরের সময়টা তিনি দেন পরিবারকে। একমাত্র সন্তান মাহির দাইয়ানকে নিয়ে তার অনেক স্বপ্ন। শত ব্যস্ততার মাঝেও একটা সময় তিনি রেখে দেন সন্তানের লেখাপড়ার হাতেখড়ি দেওয়ার জন্য। সামনের দিনগুলোতে মেধাবী এই চিকিত্সক আমাদের চিকিত্সাব্যবস্থায় অনন্য অবদান রেখে যাবেন, এমনটাই প্রত্যাশা।
ডা. এ কে এম শামসুল কবীর
ডাকনাম :বাবু
জন্মতারিখ ও স্থান :
মায়ের নাম :বেগম রোকেয়া আরেফীন
বাবার নাম :শামসুল আরেফীন
প্রথম স্কুল :বগুড়া প্রি ক্যাডেট স্কুল
প্রিয় মানুষ :আমার বাবা-মা
প্রিয় পোশাক :শার্ট, প্যান্ট
অবসর কাটে যেভাবে :ছেলেকে সময় দিই
সাফল্যের সংজ্ঞা :যেটা করতে চাই, সেটা ঠিকমতো করতে পারা।
০০০০০০০
ডা. মো. আক্তারুজ্জামান
ইমার্জেন্সি মেডিকেল অফিসার,
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, মুন্সিগঞ্জ
মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তান তিনি। আট-দশটা মধ্যবিত্ত সন্তানের মতো তার শৈশব এবং কৈশোর কেটেছে পারিবারিক গণ্ডির মধ্যে স্কুল এবং পাড়ার বন্ধুবান্ধবের সাথে খেলাধুলা করে। ছোটবেলা থেকে ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন ছিল তার। সেই অনুযায়ী পড়াশোনা করেছেন ও পরিশ্রম করেছেন। তিনি জানালেন তার ডাক্তারী পেশায় আসার পেছনে পরিবারের ভূমিকা অনস্বীকার্য। এছাড়া আল্লাহ সহায় ছিলেন বিধায় অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে পেরেছেন বলে মনে করেন ডা. মো. আক্তারুজ্জামান। তার মতে, ‘মানব সেবা আমার প্রধান কাজ। অসুস্থ মানুষের করুণ মুখ যখন সুস্থতার খুশিতে ঝলমল করে উঠে তখন নিজের কাজটা ঠিকঠাকভাবে করতে পেরেছি বলে মনে হয়।’ তাই এই পেশায় সবসময় স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন তিনি এবং চেষ্টা করেন নিজের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করার। এই পেশা আমাদের দেশে কতটা উপযোগী—এমন এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশের প্রেক্ষিতে ডাক্তারী পেশা খুবই চ্যালেঞ্জিং। নানান প্রতিকূলতা সত্ত্বেও ডাক্তাররা সর্বদা সচেষ্ট থাকি। কতটুকু সফল হতে পারছি তা দেশের জনগণই মূল্যায়ন করবে।’ নতুনদের কাজের সম্পর্কে মূল্যায়ন করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘তারা শিক্ষানবিশ পর্যায়ে আছে। এ পর্যায়ে তারা যতটুকু কাজ সম্পন্ন করছে তা সন্তোষজনক তবে সিনিয়রদের তাদের আরও কাজ শেখাতে হবে এবং তা প্রয়োগের সুযোগ দিতে হবে।’ তাদের জন্য পরামর্শ দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘কঠোর পরিশ্রম করুন। যত দ্রুত সম্ভব উচ্চ শিক্ষা সম্পন্ন করুন। অতঃপর প্র্যাকটিস আরম্ভ করুন।’ তিনি জানালেন, ডাক্তারী পেশার মাধ্যমে যত সহজে মানুষের কাছে আসা যায় তা অন্য কোনো পেশার মাধ্যমে সম্ভব নয়। তার প্রার্থনা, আল্লাহ ডাক্তারদের তৌফিক দান করুক যাতে তারা মানুষকে তাদের নিজ নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন করতে পারেন। নিজেকে ভবিষ্যতে দেশের শীর্ষ সারির চিকিত্সক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চান এই চিকিত্সক।
ডা. মো. আক্তারুজ্জামান
ডাকনাম :লিকু
জন্ম তারিখ ও স্থান :১৮ জানুয়ারি, মাতুয়াইল যাত্রাবাড়ী, ঢাকা।
মায়ের নাম :আসমা বেগম
বাবার নাম :ওমেদ আলী
প্রথম স্কুল :মাতুয়াইল বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়
প্রিয় মানুষ :বাবা
প্রিয় উক্তি :সময়ের কাজ সময়ে করা।
প্রিয় পোশাক :শার্ট-প্যান্ট
অবসর কাটে যেভাবে :গান শুনে আর বই পড়ে
সাফল্যের সংজ্ঞা :প্রতিটি সাফল্যের পেছনে লুকিয়ে থাকে কঠোর পরিশ্রম ও অধ্যবসায়।
০০০০০০০০০০০
ডা. নাফিয়া ফারজানা চৌধুরী
মেডিকেল অফিসার, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজ
মেডিকেলের ৫ম বর্ষেই সিদ্ধান্ত নেন অধিক পরিশ্রমের কোনো পেশা বেছে নেবেন না। যেমন গাইনী কিংবা হূদরোগ, কারণ তিনি পেশার পাশাপাশি পরিবারের সাথে সময় কাটাতে ভালোবাসেন এবং পেশার বাইরে তার কিছু একান্ত সময় চাই। শুরুতে রেডিওলোজি বিভাগে কিছুদিন ট্রেনিং করে দেখলেন রোগীর সাথে গল্প বা আলাপ না করে আরাম পাচ্ছেন না, তাই মনোরোগ বিদ্যায় যোগদান করেন। এখানে রোগীর সাথে আলাপ করার অফুরন্ত সুযোগ। জীবনকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার এক অদ্ভুত অনুভূতি। সেই থেকেই শুরু ডা. নাফিয়া ফারজানা চৌধুরীর। বাবার চাকরির সুবাদে বিভিন্ন জায়গাতে ছোটবেলা কেটেছে—কখনো দেশে কখনো বা দেশের বাইরে। ছোটবেলা বাবা তার সন্তানদের নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়িয়েছেন আর ঘুরে বেড়ানোর একটা পোকা মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছেন। প্রকৌশলী বাবা, শিক্ষিকা মা, এক ভাই, চিকিত্সক স্বামী ও একমাত্র ছেলে রামীনকে নিয়ে ডা. নাফিয়া ফারজানা চৌধুরীর পারিবারিক আবহ। তার কাজ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মানসিক রোগীদের নিয়ে কাজ করি। ওষুধ দিয়ে চিকিত্সা এবং কাউন্সিলিং—দুইটাই করে থাকি। পেশা হিসেবে এটা আমাদের দেশে কতটা উপযোগী? উত্তরে ডা. নাফিয়া ফারজানা চৌধুরী বলেন,‘ অনেক মেধাবী এবং নিবেদিতপ্রাণ ছাত্রছাত্রীরা আসছে এই বিষয় নিয়ে পড়তে। ফলে আমাদের দেশেই এখন অনেক গবেষণামূলক কাজ হচ্ছে, তাই চিকিত্সাব্যবস্থা অনেক উন্নত হয়েছে আগের চেয়ে। মনোরোগ বিদ্যায় আছে অনেক শাখা-প্রশাখা, ক্যারিয়ার হিসেবে এখন অনেক সম্ভাবনাময় একটি বিষয়। নতুনদের মাঝে একটা ধারণা কাজ করে হয়তো আয়-রোজগার অন্যান্য শাখার চেয়ে অনেক কম—বাংলাদেশের কোনো মনোচিকিত্সক এখন বসে নেই, তাই এটা এখন একটি ভুল ধারণা।
তার ভবিষ্যত্ স্বপ্ন—যতদিন সুস্থ থাকবেন মানসিক রোগীদের চিকিত্সা ও সেবা করে যাবেন এবং তাদের দুঃখ-কষ্টের সাথি হয়ে থাকবেন।
ডা. নাফিয়া ফারজানা চৌধুরী
ডাকনাম :রুমা
জন্ম তারিখ ও স্থান :২২ ডিসেম্বর, ঢাকা
মায়ের নাম :সাবেরা খানম
বাবার নাম :মো. শামসুল হক চৌধুরী
প্রথম স্কুল :লায়ন্স কিন্ডারগার্ডেন স্কুল
প্রিয় মানুষ :বাবা-মা
প্রিয় পোশাক :সালওয়ার-কামিজ, শাড়ি।
অবসর কাটে যেভাবে :নতুন জায়গাতে ঘুরে বেড়িয়ে।
সাফল্যের সংজ্ঞা :সাফল্য আপেক্ষিক একটা ব্যাপার, যা নির্ভর করে জীবনে কী চাই এবং কতটুকু চাই তার উপর।
