[ জ ন স্বা স্থ্য ]

ফরমালিনের মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব ও জনস্বাস্থ্য

আপডেট : ১৩ জুলাই ২০১৪, ২১:২১
বিভিন্ন প্রকার জীবাণু, প্যারাসাইট ও ছত্রাকের আক্রমণ থেকে রক্ষা করার জন্য মাছ চাষে স্বল্পমাত্রার ফরমালিন ব্যবহারের বিধান থাকলেও মাছ, ফলমূল এবং অন্যান্য খাদ্যদ্রব্য সংরক্ষণে ফরমালিনের ব্যাপক ব্যবহার জনস্বাস্থ্যের জন্য এক মারাত্মক হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এই রাসায়নিক পদার্থটি দ্রবণ হিসেবে ব্যবহার করলে শুধু মাছ নয়, হরেক রকম ফলমূলও বেশ তাজা ও সতেজ থাকে, দেখতে খুব আকর্ষণীয় দেখায়। পচন রোধকল্পে মৃতদেহ, মৃত জীবজন্তু বা তাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ফরমালিন দ্রবণে ডুবিয়ে রাখা হলে বহুদিন সংরক্ষণ করা সম্ভব। অথচ এ ধরনের একটি বিষাক্ত দ্রব্য সামপ্রতিককালে অসাধু ব্যবসায়ীরা খাদ্যদ্রব্যে ব্যবহার করে মানুষকে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছে। ফরমালিন ব্যবহার শুধু বাংলাদেশে সীমাবদ্ধ নয়। আমাদের আশেপাশের অনেক দেশেই ফরমালিন ব্যবহার ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। ইন্দোনেশিয়ার খাদ্য ও ওষুধ সংস্থা, যাকে সংক্ষেপে বিপিওএম বলা হয়, এক সমীক্ষায় দেখতে পায় যে এক শ্রেণীর অসাধু ও দুর্নীতিবাজ ব্যবসায়ী খাদ্যদ্রব্য বিশেষ করে মাছ, টফু ও আর্দ্র নুডুলস সংরক্ষণে ব্যাপকহারে ফরমালিন ব্যবহার করে আসছে। অসাধু ব্যবসায়ীরা মাছ ও খাদ্যদ্রব্যে ফরমালিন মেশান এটা সত্যি হলেও সমস্যাটা ওখানে নয়। কী মাত্রায় ফরমালিন মেশানো হয়েছে সেটা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। মাছ, ফলমূল এবং খাদ্যদ্রব্যে বিভিন্নভাবে ফরমালিন প্রয়োগ করা যায়। ইনজেকশনের মাধ্যমে মাছের মধ্যে ফরমালিন প্রয়োগ করা ছাড়াও স্প্রে করাসহ ফরমালিনে ডুবিয়ে মাছ, ফলমূল বা খাদ্যদ্রব্য সতেজ রাখা যায়। স্বল্পমাত্রায় ফরমালিন শরীরের ক্ষতি করার কথা নয়। মাছ, মাংস,ফলমূল ও অন্যান্য খাদ্যদ্রব্যে প্রাকৃতিক উপাদান হিসেবেই ফরমালডিহাইড উপস্থিত থাকে। প্রতি কিলো আপেলে ৬.৩ থেকে ২২.৩ মিগ্রা, কলায় ১৬.৩ মিগ্রা , বিটে ৩৫ মিগ্রা , পেঁয়াজে ১১ মিগ্রা , ফুলকপিতে ২৭ মিগ্রা, আঙ্গুরে ২২.৪ মিগ্রা , নাশপাতিতে ৩৮.৭-৬০ মিগ্রা, শূকরের মাংসে ৫.৬-২০ মিগ্রা, গরুর মাংসে ৪.৬ মিগ্রা ফরমালডিহাইড থাকে। প্রতিদিনই আমরা প্রকৃতি ও পরিবেশ থেকে কম-বেশি ফরমালডিহাইড শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে গ্রহণ করি। কল-কারখানা থেকে নির্গত ধোঁয়া ও বাষ্পের মধ্যেও ফরমালিন থাকে যা প্রতিনিয়ত আমাদের শরীরে ঢুকছে। সিগারেটের ধোঁয়া এমনকি বৃষ্টির পানিতেও ফরমালডিহাইড থাকে। ফরমালডিহাইড শরীরের জন্য অতি প্রয়োজনীয় একটি প্রাকৃতিক উপাদান। তবে মাত্রাতিরিক্ত ফরমালডিহাইড বিষাক্ত। ফরমালিনের কারণে কার কতটুকু ক্ষতি হবে তা নির্ভর করবে ফরমালিনের মাত্রার ওপর। প্রিয় পাঠক, এবার আপনাদের অবগতির জন্য ফরমালিনের একটি সংক্ষিপ্ত পরিচিতি উপস্থাপন করতে চাই। ফরমালিন বর্ণহীন তীব্র ঝাঁঝালো এক ধরনের রাসায়নিক পদার্থ। ফরমালডিহাইড পানিতে সহজে দ্রবণীয়। পানিতে ৩৭ শতাংশ ফরমালডিহাইড এবং ০-১৫ শতাংশ মিথানলের দ্রবণকে ফরমালিন হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। ফরমালডিহাইড শরীরে পুঞ্জীভূত হয় না। ফরমালডিহাইড হলো একটি মধ্যবর্তীকালীন রূপান্তরিত রাসায়নিক পদার্থ এবং প্রতিটি কোষেই ফরমালডিহাইড উত্পন্ন হয়। ফরমালডিহাইড অত্যন্ত ক্রিয়াশীল এবং প্রোটিন ও নিউক্লিক অ্যাসিডের সাথে বন্ধনে মিলিত হয়। রক্তে ফরমালডিহাইডের হাফলাইফ (যে সময়ের মধ্যে কোন রাসায়নিক পদার্থের পরিমাণ বা মাত্রা অর্ধেকে নেমে আসে) মাত্র ৯০ সেকেন্ড। ফরমালডিহাইড অক্সিডাইজড(রাসায়নিক রূপান্তর) হয়ে অতি দ্রুত ফরমিক অ্যাসিডে রূপান্তরিত হয় যা প্রস্রাবের মাধ্যমে এবং কিছু অংশ কার্বন-ডাই-অক্সাইডে রূপান্তরিত হয়ে নিঃশ্বাসের মাধ্যমে শরীর থেকে বেরিয়ে যায়। তাছাড়াও ফরমালডিহাইড শরীরে প্রোটিন ও নিউক্লিক অ্যাসিড সংশ্লেষণের আবশ্যকীয় উপাদান হিসেবে ব্যবহূত হয়। দু’ভাবে ফরমালিন আমাদের শরীরে প্রবেশ করে। মুখ ও শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে ফরমালিন আমাদের দেহে ঢুকার সুযোগ পায়। মানুষ ও জীবজন্তুর মধ্যে দেখা গেছে—গলাধঃকরণ করা হলে ফরমালিন বিষাক্ত হতে পারে। আত্মহত্যার উদ্দেশ্যে বা আকস্মিক ভুল-ভ্রান্তির কারণে ফরমালডিহাইড ব্যবহারে মুখ, গলা, অন্ত্র জ্বলে গিয়ে ক্ষত সৃষ্টি করতে পারে। ফরমালডিহাইড শরীরে ঢুকার সাথে সাথে যকৃতে(লিভার) ফরমিক অ্যাসিডে রূপান্তরিত হয়ে মেটাবলিক অ্যাসিডোসিস (রক্তের অম্লত্ব বৃদ্ধি) উত্পন্ন করে। ফরমিক অ্যাসিড শ্বাস-প্রশ্বাস প্রক্রিয়ায় বিঘ্ন ঘটানো ছাড়াও যকৃত ও কিডনি ধ্বংস করতে পারে। পরিস্থিতি তীব্র হলে শরীরে খিঁচুনি ও কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রেও (Central Nervous System) বিষাদগ্রস্ততার (ডিপ্রেশন) কারণে মানুষের মৃত্যু হতে পারে। ৩১৭-৪৭৫ মিলিগ্রাম/কেজি ফরমালিন ৭০ কিলো ওজনের একজন মানুষের মৃত্যু ঘটাতে পারে। ফরমালিনে মিথালনের উপস্থিতি মানুষের শারীরিক অবস্থার আরো অবনতি ঘটায়। ফরমালিনের ছিটা চোখে পড়লে অস্বস্তি ছাড়াও চোখের দৃষ্টিশক্তি লোপ পেতে পারে। ফরমালডিহাইড মানবদেহে ক্যানসার সৃৃষ্টি করে। ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যানসার পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর উপসংহারে এসেছে যে, বারবার ও দীর্ঘ সময়ের জন্য ফরমালডিহাইডের সংস্পর্শে মানবদেহের নাক, ফুসফুস, গলায় ক্যানসার উত্পন্ন করে। ফরমালডিহাইড নিজে ক্যানসার উত্পন্ন করে অথবা এই মরণঘাতী রোগ সৃষ্টিতে সহায়কের ভূমিকা পালন করে। ইঁদুর ও কুকুরের মধ্যে পরীক্ষা চালিয়ে দেখা গেছে ফরমালিনের কারণে পাইলোরাসে অ্যাডেনোকারসিনোমার মত অন্ত্রের ক্যানসার সৃষ্টি করে। অন্যান্য পরীক্ষায়ও দেখা গেছে শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে ফরমালিন গ্রহণের কারণে গার্মেন্টস শ্রমিকদের গলা, সাইনাস, নাকের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ে। প্রতিলিটারে ০.৫-২.০ মিগ্রা ফরমালিন চোখ, নাক, গলার সংস্পর্শে এসে জ্বালা-যন্ত্রণা সৃষ্টি করে। প্রতি লিটারে ৩-৫ মিগ্রা ফরমালিন চোখে পানি আনতে পারে। ১০-২০ মিগ্রা ফরমালিনের কারণে শ্বাস-প্রশ্বাসের কষ্ট বাড়ায়। ২৫-৩০ মিগ্রা ফরমালিন শ্বাসনালীর মারাত্মক ক্ষত সৃষ্টি করে। ১০০ মিগ্রা ফরমালিন স্বাস্থ্য ও জীবনের জন্য বিপদ বয়ে আনতে পারে। শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে ফরমালডিহাইড শরীরে প্রবেশ করাটা যেমন বিপজ্জনক, গলাধঃকরণ তেমনি বিপজ্জনক। চামড়ার সংস্পর্শে ফরমালিন এলে চামড়া পুড়ে যেতে পারে ও বিভিন্ন ধরনের এলার্জির উপদ্রব দেখা দিতে পারে। বেশিমাত্রায় ফরমালিন শরীরে ঢুকলে কোষের প্রতিটি উপকরণের সাথেই তা বিক্রিয়া করার ক্ষমতা রাখে এবং ফলশ্রুতিতে কোষ তথা প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গেও স্বাভাবিক কর্মকাণ্ডে বিঘ্ন ঘটায়। ফরমালিনে মিথানলের উপস্থিতি ফরমালডিহাইডের প্রতিক্রিয়ার মাত্রা বৃদ্ধি করে পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটায়। কারণ মিথানলও লিভারে রাসায়নিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রথমে ফরমালডিহাইড এবং পরে ফরমিক অ্যাসিডে রূপান্তরিত হয় যা রক্তের অম্লত্বের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। রক্তে অম্লত্ব বৃদ্ধি কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রেরওপর প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে শ্বাস-প্রশ্বাসের মারাত্মক অবনতি ঘটাতে পারে। ফরমালডিহাইড দ্রবণে থাকলে তা ফরমিক অ্যাসিডে রূপান্তরিত হয়। ফরমিক অ্যাসিড ক্ষত সৃষ্টিকারী বস্তু। সুতরাং ফরমালডিহাইড এবং ফরমিক অ্যাসিড মাত্রাভেদে শরীর-চামড়ার সংস্পর্শে এলে জ্বালাপোড়া ছাড়া স্থায়ী ক্ষতচিহ্ন রেখে যেতে পারে। ক্ষয়িষ্ণু বলে ফরমালিন চোখেও বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করতে পারে। ফরমালিনের মতো ক্ষয়িষ্ণু পদার্থ চোখের দৃষ্টিশক্তির অবনতি ঘটানো ছাড়াও চোখের দৃষ্টি কেড়ে নিতে পারে। ফরমালিন থেকে অব্যাহতি লাভের জন্য কোন ম্যাজিক ফর্মূলা নেই। ফরমালিনের ব্যবহার আমাদের জন্য এক মহাবিপর্যয় হিসেবে দেখা দিয়েছে। তারপরও ছোটখাটো কিছু পরামর্শ হয়ত পাঠকদের ফরমালিনের মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষা করতে পারে। এক. আমদানিকৃত মাছে ফরমালিন মেশানোর সম্ভাবনা বেশি থাকে। সুতরাং বিদেশ থেকে আমদানিকৃত মাছ কেনার ব্যাপারে সতর্ক থাকা উত্তম। দুই. পরিচিত বাজার বা দোকানদারের কাছ থেকে মাছ বা ফলমূল কিনলে ফরমালিনমুক্ত মাছ বা ফলমূল পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তিন. মাছ টিপে দেখুন। আঙ্গুল দিয়ে টিপলে অস্বাভাবিক শক্ত মনে হলে তাতে ফরমালিন থাকার সম্ভাবনা বেশি। মাছ নাকের কাছে নিয়ে শুঁকে দেখতে পারেন, ঝাঁঝালো গন্ধ নাকে লাগে কিনা। ফরমালিন ঝাঁঝালো হয়। চার. মাছ বা ফলমূল কিনে এনেই পানিতে ঢুবিয়ে রাখুন বেশ কিছুক্ষণ। দরকার হলে দু’য়েকবার পানি বদলিয়ে নিতে পারেন। মাছ বা ফলমূলের গায়ে ফরমালিন থাকলে তা পানিতে অনেকটা দ্রবীভূত হয়ে যাবে। সম্ভব হলে মাছ বা ফলমূল ভালো করে ঘষে-মেজে ধুয়ে নিন কাটার আগে। পাঁচ. ফরমালডিহাইডযুক্ত মাছ বা ফলমূল ধোয়া পানি যেন আপনার শরীরের সংস্পর্শে না আসে। এ ব্যাপারে শিশুদের প্রতি সতর্ক থাকতে হবে। ছয়. স্বল্প পরিমাণে উপস্থিত ফরমালিন শরীর মেটাবলাইজড (রাসায়নিক রূপান্তরের মাধ্যমে নিষ্ক্রিয় পদার্থে পরিণত করা ) করতে পারে যা শরীরের জন্য তেমন ক্ষতিকর নাও হতে পারে। সাত. সুষম পুষ্টিকর খাবার ও ব্যায়ামের মাধ্যমে আপনার শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ান। শরীরে ঢুকলে আমাদের শরীরের সহজাত প্রতিরোধ ক্ষমতা ফরমালিনের মত বিষাক্ত ও ক্ষতিকর উপাদান প্রতিরোধ বা নিষ্ক্রিয় করে দিতে পারে। আট. মাছ ৫ শতাংশ ভিনেগার (এক লিটার পানিতে ৫০ মিলিলিটার ভিনেগার) দ্রবণে ১৫ মিনিট ঢুবিয়ে রাখলে ফরমালিন মুক্ত হতে পারে। নয়. ভ্রাম্যমাণ আদালতের তদারকি বৃদ্ধি করলে ফরমালিনের উপদ্রব অনেক কমে যাবে। দশ. ফরমালিনের ব্যবহারের বিরুদ্ধে গণসচেতনতা সৃষ্টি করুন ও তা প্রতিহত করার জন্য সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করুন। স্বস্তির ব্যাপার হলো- সরকার ফরমালিন নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইন প্রণয়ন করতে যাচ্ছে। এই প্রচেষ্টাকে আমরা সাধুবাদ জানাই। এগার. ভয়-ভীতি নয়, উপস্থিত বুদ্ধি, জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা থেকে ফরমালিন সমস্যার সমাধান করতে হবে। বারো. স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়ানোর জন্য সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আমাদের কিছু পড়াশোনারও দরকার। লেখক : অধ্যাপক, ফার্মেসী অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। [email protected]