পিতার হত্যাকারীরাই আমাকে অপহরণ করেছিল

আপডেট : ১৩ জুলাই ২০১৪, ২২:৩৮
গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের কাউন্সিলর পারভীন আক্তারকে তার পিতা হত্যা মামলার প্রধান আসামি দুলাল হাজীর নেতৃত্বেই অপহরণ করা হয়েছিল। শনিবার রাতে হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ থেকে উদ্ধারের পর গতকাল রবিবার দুপুরে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে গাজীপুরের পুলিশ সুপার মো. আবদুল বাতেন পিপিএম সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, আসামিরা পারভীন আক্তারকে তার পিতার হত্যা মামলা তুলে নিতে চাপ দেয়। অন্যথায় তাকে হত্যারও হুমকি দেয়। পরে পারভীন নিজ মুখে তাকে অপহরণের ঘটনা সংবাদিকদের বর্ণনা করেন। পারভীন আক্তার জানান, বৃহস্পতিবার রাতে ও শুক্রবার ভোরে অজ্ঞাত এক মহিলা ফোন করেন। ঐ মহিলা নিজেকে দক্ষিণ পানিশাইলের রহিম আফরোজ ব্যাটারী কারখানা এলাকার বাসিন্দা পরিচয় দিয়ে জানান, স্বামী তাকে প্রায়ই অমানুষিক নির্যাতন করে। স্বামীকে তিনি ঘরের ভিতর কৌশলে আটকে রেখেছেন। তিনি যেন বিষয়টি সমাধান করে দেন। মহিলার কাছে কিছু স্বর্ণালঙ্কার আছে। সেগুলোও যেন বিক্রির ব্যবস্থা করে দেন। শুক্রবার সকাল ৮টার দিকে মহিলার দেয়া বর্ণনা অনুযায়ী জিরানী বাজারের কাছে তিনি অপেক্ষা করতে থাকেন। ঐ অজ্ঞাত মহিলা উপস্থিত হয়ে বাসায় যাওয়ার আগে স্বর্ণালঙ্কার দেখানোর নাম করে সড়কের উল্টো পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটি হায়েস মাইক্রোবাসের কাছে নিয়ে যায়। স্বর্ণালঙ্কার দেখার জন্যে মাইক্রোবাসের ভিতর উঠে বসেতেই মহিলা দরজা লাগিয়ে দেয়। এসময় পিছনের আসনে তার পিতা মুক্তিযোদ্ধা চাঁন মিয়ার হত্যাকারী দুলাল হাজী, সোহেল, জুয়েলসহ আরো অপরিচিত ৩-৪ জনকে দেখতে পান। এরপর একজন তার নাকে-মুখে রুমাল চাপা দিয়ে ধরে। মাইক্রোবাসটি সাভারের দিকে যেতে শুরু করার কয়েক মিনিটের মধ্যেই তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। শুক্রবার রাতে জ্ঞান ফিরলে তিনি একটি ঘরের ভিতরে নিজেকে দেখতে পান। তিনি বলেন, ঐ ঘরে অজ্ঞাত ঐ মহিলা এবং মাইক্রোবাসের ভিতরে থাকা অজ্ঞাত লোকজন ছিল। তারা আমাকে পিতা হত্যা মামলা তুলে নিতে বলে। অন্যথ্যায় খুন করার হুমকি দেয়। তারা আবার রুমাল চাপা দিয়ে অজ্ঞান করে। মাইক্রোবাস চলন্ত অবস্থায় শনিবার রাতে জ্ঞান ফিরলে বুঝতে পারি কাপড় দিয়ে চোখ ও রশি দিয়ে হাত-পা বাঁধা। শুনতে পাই মোবাইলে বলাবলি করছে সামনে পুলিশ। পরে চালক মাইক্রোবাস ঘুরিয়ে অন্য একটি রাস্তা দিয়ে যেতে থাকে। এক পর্যায়ে তারা সড়কের পাশে আমাকে ফেলে রেখে পালিয়ে যায়। এক সিএনজি চালক দেখে আমাকে উদ্ধার করে। পরে তার মাধ্যমে মোবাইলে স্বামীকে ঘটনা জানাই। তিনি গাজীপুরের পুলিশকে জানান। গাজীপুরের পুলিশের কাছ থেকে খবর পেয়ে নবীগঞ্জের পুলিশ আমাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করে। পারভীন আক্তার আরো জানান, ২০১১ সালের ২৩ জুলাই তার বাবা মুক্তিযোদ্ধা চাঁন মিয়াকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে খুন করা হয়। দুলাল হাজীর দখলবাজের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় তার বাবাকে খুন করা হয়। এ মামলার বাদী ছিলেন কাউন্সিলর পারভীন আক্তার। দুলাল হাজীর প্রভাবে পুলিশ সন্দেহভাজন আসামীদের চার্জশীট থেকে বাদ দিয়ে আদালতে প্রতিবেদন জমা দেয়। জানতে পেরে পারভীনের নারাজিতে আদালতে নতুন করে মামলা তদন্তের দায়িত্ব দেয় সিআইডিকে। গত দুইমাস আগে বিষ্ণু ওরফে সাগর, রমজান, সোহেল ও জুয়েল নামে চারজনকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করে এলাকাবাসী। এদের মধ্যে বিষ্ণু ওরফে সাগর আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করে। এরপর থেকেই আসামিরা পারভীনকে হুমকি দিয়ে আসছিল। পারভীন বলেন, ‘এখন আমার জীবনের নিশ্চয়তা আছে কিনা জানি না। কত দিন বেঁচে থাকব তাও জানি না। আমি, আমার তিন বোন, একমাত্র ছোট ভাই, মাসহ সবাই দুলাল হাজীর টার্গেটে পরিণত হয়েছি’। রবিবার বেলা দেড়টার দিকে পুলিশ পারভীনকে উদ্ধার দেখিয়ে জবানবন্দি প্রদানের জন্যে আদালতে পাঠায়। আদালত জবানবন্দি গ্রহণ শেষে তাকে স্বামী মিনহাজ উদ্দিনের জিম্মায় প্রদান করেন। এ ব্যাপারে পুলিশ সুপার মোঃ আবদুল বাতেন পিপিএম জানান, দুলাল হাজী ও তার সহযোগীদের গ্রেফতার করতে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালানো হয়েছে।