চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে প্রতিদিন অর্ধকোটি টাকার অবৈধ লেনদেন

আপডেট : ১৪ জুলাই ২০১৪, ২২:৪৩
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজে দালাল চক্র আর কাস্টম কর্মকর্তাদের যোগসাজশে আমদানি ও রপ্তানি প্রক্রিয়ায় প্রতিদিন সাড়ে ৪৭ লাখ টাকা নিয়ম বহির্ভূতভাবে আদায় করা হয়। এছাড়া পণ্য আমদানি ও রপ্তানির ক্ষেত্রে প্রতিটি ঘাটে অবৈধ অর্থ আদায় করা হচ্ছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) গবেষণা প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে। চট্টগ্রাম বন্দর ও কাস্টম হাউজের চলমান কার্যক্রমের উপর চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে টিআইবি এই গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করে। গতকাল রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে এক সাংবাদিক সম্মেলনে ওই গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। গবেষণাটি পরিচালনা করেন মনজুর ই খোদা ও জুলিয়েট রোজেটি। প্রতিবেদনে বলা হয়, ব্যবসায়ী ও কাস্টমস হাউসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে মুখ্য সহায়তাকারীর দায়িত্ব পালন করে ৬০-৭০ জন ‘বদি আলম’ বা ‘ফালতু’। এরা মূলত দালাল। এই অবৈধ লেনদেনের সুবিধা নেন কাস্টমস হাউসের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ব্যবসায়ীদের একাংশ। প্রতিবেদনে বলা হয়, বাণিজ্যিক পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে কমপক্ষে ১১টি ধাপ পার হতে হয়। সব ধরনের কাগজপত্র ঠিক থাকার পরও প্রতিটি চালানের ক্ষেত্রে কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের কমপক্ষে ৩ হাজার টাকা দিতে হয়। এছাড়া জেটিতে পণ্যের কায়িক পরীক্ষার জন্য ৬টি ধাপে কন্টেইনার প্রতি গড়ে ৪ হাজার টাকা দিতে হয়। নন কমার্শিয়াল পণ্যের ক্ষেত্রেও ১ হাজার ২শ’ টাকা করে দিতে হয়। মূলত আমদানিকারক হয়রানি এড়াতে এই টাকা দিয়ে থাকেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, অনেক সময় আমদানিকারক শুল্ক ফাঁকির উদ্দেশ্যে শুল্ক কর্মকর্তাদের যোগসাজশে শুল্কায়ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে থাকে। এক্ষেত্রে অবৈধ লেনদেন কয়েক কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে। প্রতিবেদনে বলা হয়, বন্দরে অটোমেশন বা স্বয়ংক্রিয় শুল্কায়ন ব্যবস্থা চালু করা হলেও এখনো বেশিরভাগ কার্যক্রম আগের নিয়মে ম্যানুয়ালি পরিচালনা করা হয়। এখনো আমদানি রপ্তানিকারক বা তাদের প্রতিনিধি সিএন্ডএফ এজেন্টদের সরাসরি স্বাক্ষাতের সুযোগ রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে ‘টেবিলের নিচ দিয়ে’ অবৈধ অর্থ লেনদেন রীতি বিদ্যমান। টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজ অটোমেশন করা হলেও প্রকৃত উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন হয়নি। শুল্কায়নে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা চালু করার পরও দুর্নীতির এই মাত্রায় অবাক হয়েছি। তিনি বলেন, শুল্ক কার্যক্রম পুরোপুরি অটোমেশন করা গেলে সেবা প্রদানকারী ও গ্রহীতার মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ থাকবে না। তখন দুর্নীতির মাত্রা কমে আসবে। তবে তিনি বলেন, ২০০৬ সালে টিআইবি এ ধরনের একটি গবেষণা পরিচালনা করেছিল। তখন আমদানি কার্যক্রমে ৩৯টি ধাপ ছিল। সেই তুলনায় বর্তমানে আমদানি সংক্রান্ত জটিলতা কমেছে। তিনি বলেন, বর্তমানে শুল্কায়ন পদ্ধতিতে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা চালু হওয়ার পর এই ধাপ আরো কমার কথা ছিল। কিন্তু এসব ধাপ ধরে রাখার উদ্দেশ্য হচ্ছে দুর্নীতিকে জিইয়ে রাখা। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা প্রতিবেদন রাজনৈতিক কারণে অস্বীকার সাংবাদিক সম্মেলনের এক পর্যায়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে সমপ্রতি টিআইবি’র গবেষণা নিয়ে সরকারের প্রতিক্রিয়ার প্রসঙ্গ উঠে আসে। এ প্রসঙ্গে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সরকার রাজনৈতিক কারণে আমাদের প্রতিবেদন অস্বীকার করছে। এতে দুর্নীতিবাজরা উত্সাহিত হয়। আগেও আমাদের ক্ষমা চাইতে বলা হয়েছে। কিন্তু পরবর্তীতে আমাদের প্রতিবেদন যথার্থ বলে প্রমাণিত হয়েছে এবং টিআইবি’র প্রতিবেদনের ভিত্তিতে অনেক পরিবর্তন আনা হয়েছে। অর্থাত্ সরকার সমালোচনা করলেও মূল বিষয় মেনে নেয়। প্রতিবেদন নিয়ে সরকার গণমাধ্যমে যা বলে বাস্তবে হয়তো সেটা নয়। সরকারের ভালো উদ্যোগ যাতে কাজ না করতে পারে সে জন্য একটি প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী সচেষ্ট মন্তব্য করে। এ সময় টিআইবি’র ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য এম হাফিজ উদ্দিন খান, টিআইবি’র উপ-নির্বাহী পরিচালক ড. সুমাইয়া খায়ের প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।