আলোকপাত

সমুদ্র-সীমানায় বাংলাদেশের অধিকার

আপডেট : ১৫ জুলাই ২০১৪, ২১:৪৪
আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ের কারণে মায়ানমার ও ভারতের সমুদ্রসীমায় বাংলাদেশের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ২০১৪ সালের ৮ জুলাই সমুদ্র সীমানায় আনুমানিক ২৫ হাজার ৬০২ বর্গকিলোমিটারের মধ্যে ১৯ হাজার ৪৬৭ বর্গকিলোমিটারে আন্তর্জাতিক সালিশী আদালত (পিসিএ) যুক্তি তর্ক ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে বাংলাদেশের সমুদ্র সীমানা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। সরকার দলীয় সমর্থকেরা এ রায়কে সমুদ্রসীমা জয়ের অভাবনীয় সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করছে। অন্যদিকে বিরোধী রাজনৈতিকগোষ্ঠী তালপট্টি দ্বীপ (চর) সহ আরো কিছু এলাকা হাতছাড়া হওয়াকে সরকারের আইনি লড়াইয়ে পরাজয় হিসেবে মন্তব্য করছে। এটা ঠিক এর আগে সমুদ্র সীমানায় বাংলাদেশের অধিকার বঞ্চনা ছিল দীর্ঘদিন। আমরা একমত হতে পারি যে, সমুদ্রসীমা নিয়ে ভারতের সাথে বাংলাদেশের বিরোধ নিষ্পত্তি হয়েছে। বাংলাদেশের সাথে প্রতিবেশী রাষ্ট্রসমূহের সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপিত হলে ব্যবসা-বাণিজ্য, যাতায়াত, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক চুক্তি বাস্তবায়ন সহজ হয়। গ্লোবাল ভিলেজে রাস্ট্রসমূহকে একে অন্যের সাহায্যকারী হয়ে উঠার বিকল্প নেই। বাংলাদেশে অপার সম্ভাবনাময় তেল, গ্যাসের অনুসন্ধান করার সুযোগ বিস্তৃত হবে বলে আমাদের বিশ্বাস। পৃথিবীব্যাপী দুর্বলের উপর শক্তিশালীদের যে হুঙ্কার, যুদ্ধ ঘোষণা তার অবসান হওয়াও জরুরি। বাসযোগ্য পৃথিবী করতে না পারলে মানবজাতির অস্তিত্ব বিপন্ন হবে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট যতই ঘনীভূত হোক না কেন, বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারে পৃথিবীব্যাপী সুনাম অক্ষুণ্ন রেখেছে। আমাদের অর্জনকে ধরে রাখতে হবে। সমুদ্র সীমানায় মিয়ানমার ও ভারত সংলগ্ন এলাকায় অধিকার প্রতিষ্ঠা আমাদের কাছে নতুন বার্তা পৌঁছে দিয়েছে। আমরা আশা করি ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা সংক্রান্ত জটিলতার অবসান হবে এই রায়ে। সমুদ্র সীমানা থেকে প্রাণীজ ও খনিজ সম্পদ বাংলাদেশ অর্জন করতে সক্ষম হবে এ ধারণা করা যায়। বিরোধিতার খাতিরে আমরা অধিকাংশ সময় বিরোধিতা করি। কাগজে-কলমে তালপট্টি কি বাংলাদেশ অঞ্চলের ছিল এমন প্রশ্ন আসা স্বাভাবিক। সত্তরের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ে এ অঞ্চলে তালপট্টি দ্বীপের জন্ম হয়। তালপট্টির অবস্থান ছিল হাড়িয়াভাঙ্গা নদীর শেষ প্রান্তে। আস্তে ধীরে দ্বীপটি পানির অতল তলে হারিয়ে যায়। এখন তালপট্টি দ্বীপের অবস্থান চিহ্নিত করা কঠিন। জৈব সম্পদ, খনিজ সম্পদ আহরণ এবং এ থেকে অর্থ আয়ের ধারণা, প্রস্তুতি ও পরিকল্পনা গ্রহণ করা আবশ্যক। সমুদ্র সীমানায় কর্মরত জেলেদের পৃষ্ঠপোষকতা করার বিষয়টি অগ্রাধিকার দিতে হবে। অজৈব রাসায়নিক খনিজ সম্পদ উত্তোলন, গ্যাস তেলের অনুসন্ধানে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করতে পারলে সমুদ্র সীমানায় আমাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা কাগুজে অর্জন হয়েই থাকবে। প্রয়োজন সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা। ২৮টি ব্লকে কাজ করার সময় বিপত্তি বেধেছিল। সরকার টেন্ডার আহবান করলে মিয়ানমার ও ভারত টেন্ডার বন্ধের জন্যে নোটিস পাঠিয়েছিল। ফলে কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। আশা করা যায়, সমুদ্রসীমার বিশাল অংশ বাংলাদেশের অধিকারভুক্ত হওয়ায় বাংলাদেশ সমুদ্রে গবেষণায় আশানুরূপ ফল পাবে। এতে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের অযাচিত হস্তক্ষেপ বন্ধ হবে। এটা বললে অত্যুক্তি হবে না যে সমুদ্র সম্পদ অনুসন্ধানে বাংলাদেশ পিছিয়ে আছে। বাংলাদেশের প্রকৌশলীদের মেধা ও প্রযুক্তি, তথ্য-উপাত্ত ব্যবহার, প্রয়োগিক পরিকল্পনা তেল, গ্যাস ও অন্যান্য সম্পদ উত্তোলনে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। বিদেশি বিশেষজ্ঞ দিয়ে নয় দেশের সমুদ্র বিশেষজ্ঞরা এ ক্ষেত্রে অবদান রাখতে পারবেন। অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন। যথাযথ নীতিমালা প্রণয়নের মাধ্যমে আগামী বাংলাদেশের বিপুল সমুদ্র সম্পদ ব্যবহারে উদ্যোগী হতে হবে সংশ্লিষ্ট মহলকে। সুসংবাদের জন্যে জাতি অপেক্ষা করছে। লেখক :প্রাবন্ধিক, গবেষক ই-মেইলঃ [email protected]