পদ্মা যমুনা তিস্তার ভয়াল রূপ, ব্যাপক ভাঙ্গন

আপডেট : ১৫ জুলাই ২০১৪, ২৩:০৮
দেশের উত্তরাঞ্চল ও পূর্বাঞ্চলে পদ্মা, যমুনা ও তিস্তা পানি বৃদ্ধির ফলে ভয়াল রূপ ধারণ করেছে। সেইসাথে শুরু হয়েছে ব্যাপক ভাঙন। হাজার হাজার পরিবারে দেখা দিয়েছে ভাঙন আতঙ্ক। ঘরবাড়ি ভেঙ্গে নিয়ে তারা নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটেছে। সারিয়াকান্দি (বগুড়া) সংবাদদাতা বগুড়ার সারিয়াকান্দিতে যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধির সাথে সাথে নদী ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। নদী ভাঙনে বিলীন হচ্ছে একের পর এক স্থাপনা গ্রাম জনপথ। গত ২ মাসে নদী ভাঙনে কুতুবপুর ইউনিয়নের কর্নিবাড়ী, ধলিরকান্দি, কামালপুর ইউপির রহদহ, ইছামারা, চন্দনবাইশা ইউনিয়নের নিজ চন্দনবাইশা, এলাকায় ২ হাজার পরিবার তাদের বাড়িঘর অন্যত্র স্থানান্তর করেছে। নদী ভাঙনে রহদহ হাট, রহদহ-কুড়িতলা পাকা সড়ক, নব-নির্মিত বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ হুমকির মুখে পড়েছে। গতকাল মঙ্গলবার নদী ভাঙন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, মানুষের অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্ট। লোকজন তাদের বাড়িঘর অন্যত্র স্থানান্তর করে নিচ্ছে। বগুড়া-১ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল মান্নান নদী ভাঙন এলাকা পরিদর্শন করেছেন। তিনি বলেন, যমুনার ভাঙনে সাময়িকব্যবস্থা নেয়ার জন্য ১ লাখ জিও বরাদ্দ নেযা হয়েছে। আগামীকাল ভাঙন এলাকায় ডামপিং শুরু হবে। চিলাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চিলাপাড়া কমিউনিটি ক্লিনিক, আদবাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় হুমকির মুখে পড়েছে। নীলফামারী প্রতিনিধি \ রাত হলেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে তিস্তা পাড়ের গ্রামগুলোতে। উজানে ভারি বর্ষণ আর ধেয়ে আসা ঢলে প্রতি রাতেই তিস্তা ফুলে-ফেঁপে রাক্ষুসী রূপ ধারণ করায় চরম আতঙ্ক নিয়ে রাত পার করছে তিস্তা পাড়ের হাজার হাজার পরিবার। বিশেষ করে নারী-শিশু ও গবাদীপশু নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন তিস্তা পাড়ে বসবাসকারীরা। গত ক’দিন থেকে রাত পানি বেড়ে তিস্তার দুই-কুল ছাপিয়ে গ্রামের পর গ্রাম হাঁটু থেকে কোমর পানিতে প্ল¬াবিত হচ্ছে। পানিবন্দি হয়ে পড়ছেন হাজার হাজার পরিবারের নারী-পুরুষ ও গবাদীপশু। গেল সোমবার রাতেও একইভাবে তিস্তায় আকস্মিকভাবে পানি বৃদ্ধি পেয়ে তিস্তা ব্যারেজ পয়েন্টে বিপদসীমার প্রায় ১০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যারাজের সবক’টি গেট খুলে রাখা হলেও তিস্তা বেষ্টিত ডিমলা ও জলঢাকা উপজেলার অন্তত ১৫-২০টি গ্রামের পাঁচ সহস্রাধিক পরিবার ১৫-২০ হাজার মানুষ বানিবন্দি হয়ে পড়েন। তবে মজার ব্যাপার হলো কাক ডাকা ভোর থেকে তিস্তায় পানি কমতে শুরু করছে। মুহূর্তে পানি বিপদসীমার নিচে নেমে গেলেও হাঁটু থেকে কোমড় পানিতে আটকা পড়া মানুষ আর গবাদীপশুর দুরাবস্থার যেন শেষ নেই। ঘরের চালে, গাছের ডালে, কলার ভেলা আর মাচায় চাল-চুলো নিয়ে বানভাসীরা ঠাঁই নিলেও গবাদীপশু নিয়ে পড়েছেন বিপাকে। পানি উন্নয়ন বোর্ড ডালিয়া ডিভিশনের বন্যা পূর্বাভাস সতর্কীকরণ কেন্দ্র সূত্র জানায়, তিস্তার উজানে অব্যাহত ভারি বর্ষণ আর পাহাড়ী ঢলের কারণে ভাটি এলাকায় পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। খালিশা চাঁপানী ইউনিয়নের ওয়ার্ড সদস্য রমজান আলী জানান, পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় পশ্চিম বাইশপুকুর, পূর্ব বাইশপুকুর ছোটখাতা গ্রাম হাঁটু থেকে কোমড় পানিতে তলিয়ে আছে। এছাড়া খগাখড়িবাড়ি ইউনিয়নের কিসামত ছাতনাই চরের প্রায় চারশ’ পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন বলে স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়। একই অবস্থা পূর্ব ছাতনাই, টেপাখড়িবাড়ি, খগাখড়িবাড়ি-গয়াবাড়ি, খালিশা চাঁপানী, ঝুনাগাছ চাঁপানী ও জলঢাকা উপজেলার ডাউয়াবাড়ী-শৌলমারী ও কৈমারী ইউনিয়নের ১৫-২০টি গ্রামের ১৫-২০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পরেছেন। পানি উন্নয়ন বোর্ড ডালিয়া ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমান গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে এ প্রতিনিধিকে জানান, কোনরকম পূর্বাভাস ছাড়াই উজানের দেশ ভারত গজালডোবা ব্যারাজের গেট খুলে দেয়ায় রাত হলেই তিস্তা রুদ্রমূর্তি ধারণ করছে। তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তিস্তা ব্যারাজের সব গেটে খুলে রাখার পাশাপশি তিস্তার গতিবিধির উপর কড়া নজর রাখা হচ্ছে। এ রিপোর্ট লেখার সময় বিকেলে তিস্তা ব্যারাজ পয়েন্টে পানি বিপদসীমার নিচে অবস্থান করলেও রাতে পানি বৃদ্ধির আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। সদরপুর (ফরিদপুর) সংবাদদাতা ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার পদ্মা-আড়িয়াল খাঁয় পানি বৃদ্ধির পাশাপাশি ব্যাপক এলাকা জুড়ে ভাঙ্গন শুরু হয়েছে। ফলে নদীপাড়ের হাটবাজার, বন্যা নিয়োন্ত্রণ বাঁধ, স্কুল, কলেজসহ ৫০টি গ্রামের জনগণ ভাঙ্গন আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। গত কয়েক সপ্তাহ যাবত্ পদ্মার পানি বৃদ্ধির ফলে আড়িয়ল খাঁর ভাঙ্গনে আকটেচর ইউনিয়নের হাঁট নারিকেলবাড়ীয়া, শয়তানখালী। নারিকেলবাড়ীয়া ইউনিয়নের খুনেরচর, বিশ্বনাথপুর। চরনাছিরপুর ইউনিয়নের চৌধুরীর হাট, ইব্রাহীম মুন্সীরকান্দি, মুন্সীরচর, কাড়ালকান্দি, কাজী ডাঙ্গী। ঢেউখালী ইউনিয়নের চরবলাশিয়া মসজিদ ঘাট, মকিম খাঁরকান্দি, চন্দ্রপাড়া বালিয়ারচর, চরমানাঈর ইউনিয়নের দুর্বারচর ও চরআড়িয়াল খাঁ গ্রামসহ প্রায় ২০টি গ্রাম জুড়ে ভাঙ্গন শুরু হয়েছে। গত ৭ দিনে উক্ত এলাকায় ২২ ঘরবাড়ি, কয়েকশ’ একর ফসলের মাঠ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। বর্তমানে ঢেউখালী ইউনিয়নের চরবলাশিয়া, মুন্সীগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বালিয়ারচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মুন্সীরচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নদী ভাঙ্গন হুমকির মুখে পড়েছে। প্রতিদিন পানি বৃদ্ধির পাশাপাশি নদী ভাঙ্গন বৃদ্ধি পাচ্ছে। গঙ্গাচড়ায় পানির অভাবে আমন আবাদ নিয়ে বিপাকে কৃষক গঙ্গাচড়া (রংপুর) সংবাদদাতা জানান, যে সময়ে মাঠ-ঘাট পানিতে পূর্ণ থাকার কথা আর কৃষক আমন চাষে ব্যস্ত থাকতো। ঠিক সেই সময়ে মাঠ-ঘাট এখন পানি শূন্য। খাল-বিলে পানি নেই। মাঠে-মাঠে চড়ছে গরু-ছাগল। ছেলেরা খেলছে ফুটবল। আমনের এই মৌসুমে রংপুরের গঙ্গাচড়ায় জমিতে পানি না থাকায় কৃষকরা রোপা আমন চারা লাগাতে পারছে না। পানির জন্য হাহাকার পড়েছে । এ অবস্থায় চরম বিপাকে পড়েছে কৃষকরা। কৃষকরা জানান, বোরো ধান কাটার পর প্রায় দুই মাস পার হয়ে গেছে। মাঠে চারা রোপণের উপযুক্ত সময়। বীজতলায় চারার দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। পানি না থাকার কারণে জমি চাষ করতে পারছে না। চারা রোপণ করতে পারছে না। আকাশে মেঘের আনাগোনা থাকলেও বৃষ্টির কোন লক্ষণ নেই। প্রকৃতির এই বিরূপ প্রভাব কৃষকের অনেক ক্ষতি করছে। তবে কেউ কেউ প্রকৃতির উপর নির্ভর না করে শ্যালো মেশিন কিংবা মোটর দিয়ে পানি সেচ দিয়ে জমি তৈরি করে চারা রোপণ করছেন। সরেজমিনে উপজেলা গজঘন্টা, বেতগাড়ী, লক্ষ্মীটারী, মর্নেয়া নোহালী, আলমবিদিতর, কোলকোন্দ ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে মাঠে-মাঠে গবাদিপশু চড়ার দৃশ্য। ছেলেরা খেলছে ফুটবল। সদ্য রোপণ করা অনেক ক্ষেত পানির অভাবে শুকিয়ে ফেঁটে যাচ্ছে। গঙ্গাচড়া সদর ইউনিয়নের কৃষক আব্দুল খালেক জানান, বড় ধরনের বৃষ্টির কোন লক্ষণ নেই, চারার বয়স দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। বাধ্য হয়ে শ্যালোমেশিন দিয়ে জমিতে সেচ দিয়ে চারা রোপণ করেছি। খলেয়া খাপড়িখাল এলাকার কৃষক সোলায়মান বলেন, শ্যালোর পানি দিয়া ধান গাড়িয়া এলাকার ক্ষেত ফাঁটি যাচ্ছে। কত আর পানি দেই। কিসামত হাবু গ্রামের কৃষক ফেরদৌস দুঃখ করে বলেন, আকাশটা এবার টাংছে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, যেসব জমিতে আগাম আলু কিংবা অন্যান্য ফসল আবাদ করবে কৃষকরা সেসব জমিতে এখনই আমন লাগানো উচিত। বৃষ্টির অপেক্ষায় না থেকে শ্যালো কিংবা মোটর দিয়ে সেচ দিয়ে চারা রোপণ করা প্রয়োজন।