ক্লিনিকের প্যাথলজি টেস্ট করা হয় হাসপাতালে!

আপডেট : ১৫ জুলাই ২০১৪, ২৩:১০
রোগীরা হাসপাতাল এসে ডাক্তার পান না। জিজ্ঞেস করলে বলা হয়, আপনি অমুক ক্লিনিকে যান, সেখান ডাক্তার বসেন। বাধ্য হয়ে সেখানে চলে যান রোগীরা। রোস্টারে (ডিউটি তালিকা) সরকারি হাসপাতালে ডিউটি থাকলেও এক শ্রেণীর চিকিত্সক সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকেন প্রাইভেট হাসপাতাল ও ক্লিনিকে। এছাড়া সরকারি হাসপাতালে পরীক্ষা-নিরীক্ষার (প্যাথলজি টেস্ট) ব্যবস্থা থাকলেও রোগীদের বেসরকারি ক্লিনিকে পাঠিয়ে দেয়া হয়। সবচেয়ে ভয়াবহ তথ্য হলো: বিভিন্ন প্রাইভেট ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের রোগীদের সংগৃহীত রক্ত, ইউরিন ও মল-মূত্রের পরীক্ষা নিয়মিত করা হচ্ছে সরকারি হাসপাতালে। বিনিময়ে ৬০ ভাগ হারে কমিশন পাচ্ছেন সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের ডাক্তার ও মেডিক্যাল টেকনোলজিস্টরা। নাটোর জেলার বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে সরেজমিনে গিয়ে এই চিত্র দেখা গেছে। এ জেলায় সরকারিভাবে জেলা সদর হাসপাতালসহ ৬টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ১৫টি ইউনিয়ন পর্যায়ের সাব সেন্টার ও ওয়ার্ড পর্যায়ে ২০৫টি কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। এছাড়া একটি মাতৃসদন ও একটি দাতব্য চিকিত্সালয় রয়েছে। জানা গেছে, কোন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেই অপারেশন হয় না। বিভিন্ন যন্ত্রপাতি বিকল। রোগীদের খাবার নিম্নমানের। চাহিদামত সরকার ওষুধ সরবরাহ করলেও ৯৫ ভাগই পাচার হয়ে যায়। রোগীদের বাইরে থেকে ওষুধ কিনতে হয়। ডাক্তার-নার্সের সংকট বহুদিন ধরে চলছে। এ জেলায় মঞ্জুরিকৃত চিকিত্সকের পদ ১৬০টি। এরমধ্যে ৭৫টি পদ বহুদিন ধরে শূন্য। আবার কর্মরত চিকিত্সকরাও শুধু খাতাপত্রে সরকারি হাসপাতালে থাকেন, বাস্তবে অধিকাংশ সময় ব্যয় করেন প্রাইভেট ক্লিনিকে। নাটোর সদর আধুনিক হাসপাতাল: এই হাসপাতালে লোকবল ও উপকরণের অভাবে রোগীরা কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। হাসপাতাল অফিস সূত্রে জানা যায়, একশ’ শয্যার এই হাসপাতালে চিকিত্সকের ৩৫ টি পদের মধ্যে ১২টি শূন্য। চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীর পদ ৬৫টি। আছে ৪০ জন। সুইপারের অভাবে অনেক সময় আবর্জনা পরিষ্কার হয় না, দুর্গন্ধ ছড়ায়। এই হাসপাতালের বহির্বিভাগে প্রতিদিন রোগী আসে গড়ে ৬ শ’। তারা সেবা পায় নামমাত্র। রোগীদের অনেকেই দালালের খপ্পরে পড়েন। হূদরোগ ও নাক কান গলা বিভাগে কোন চিকিত্সক নেই। অন্যান্য বিভাগে অনেকের বরাদ্দ পদই নেই, আছেন প্রেষণে। স্বল্পসংখ্যক চিকিত্সকের প্রায় সকলেই বেসরকারি ক্লিনিকে কাজ করেন। তাদের অনেকেই যথাসময়ে হাসপাতালে আসেন না। অনেকে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত থাকেনও না। এই হাসপাতালে জেলার বিভিন্ন প্রাইভেট ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের রোগীদের প্যাথলজি পরীক্ষা করা হয় নিয়মিত। দীর্ঘদিন ধরে এক শ্রেণীর ডাক্তার ও টেকনোলজিস্ট কমিশনের বিনিময়ে এই অনৈতিক কাজ করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। হাসপাতালের আবাসিক চিকিত্সক ডা. আবুল কালাম আজাদ জানান, বেশি রোগী ভর্তি হলে মেঝেতে থাকতে হয়। খাবারও জোটে না। অনেক সময় রাজনৈতিক নেতাকর্মী এলে পরিবেশ উত্তপ্ত ও বেসামাল হয়ে পড়ে। অবাঞ্ছিত দর্শনার্থীর কারণেও চিকিত্সা সেবা ব্যাহত হয়। তবে অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি কোন মন্তব্য করেননি। জানা গেছে, তিন বছর পূর্বে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্থানীয় কানাইখালী মাঠে এক জনসভায় হাসপাতালটিকে ২৫০ শয্যায় উন্নীত করার কথা ঘোষণা করেন। কিন্তু আজ পর্যন্ত তার কোন কাজই শুরু হয়নি। লালপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স: এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিত্সক-কর্মচারীর ৩৮টি পদ শূন্য থাকায় সাধারণ মানুষ চিকিত্সার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ২০০৬ সালে এটি ৫০ শয্যায় উন্নীত হয়। ডাক্তারের পদ ২২টি। তবে কর্মরত আছেন মাত্র ৮জন। এর মধ্যে বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক তিনজন। অনেকেই বিভিন্ন স্থানে আছেন প্রেষণে। তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীর পদ শূন্য রয়েছে ২৩টি। এখানে দিনের অধিকাংশ সময় বিদ্যুত্ থাকে না। একমাত্র জেনারেটরটি অচল হয়ে আছে প্রায় ১৮ বছর ধরে। অতি পুরনো এক্সরে মেশিনটি আর কাজ করতে চায় না। মাত্র ২ জন সুইপার দিয়ে পরিচ্ছন্নতার কাজ চলে। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সাইদুর রহমান অসুস্থ। আবাসিক মেডিক্যাল আফিসারের পদ শূন্য প্রায় তিন বছর। সেই দায়িত্বে ভারপ্রাপ্ত হিসাবে আছেন ডা. আব্দুর রাজ্জাক। তিনি কর্মস্থলে থাকলেও অন্য সকলেই থাকেন উপজেলার বাইরে। গ্রামের গরিব মানুষ সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েন সন্তানসম্ভবা নারীদের নিয়ে। তারা এই সরকারি হাসপাতালে ছুটে এলেও কোন গাইনি কনসালটেন্ট পান না। নার্সই তাদের ভরসা। জরুরি প্রয়োজনেও সিজারিয়ান অপারেশন করা সম্ভব হয় না। এদিকে নির্মাণ ত্রুটির কারণে হাসপাতালের নতুন ভবনের দেয়ালে ফাটল দেখা দিয়েছে। উপকরণের অভাবে প্যাথলজি পরীক্ষা ব্যাহত হচ্ছে। এই এলাকায় টাইফয়েড রোগীর সংখ্যা বেশি। কিন্তু রোগ নির্ণয়ের ব্যবস্থা নেই। ওষুধও মেলে না। ব্ল¬াড ব্যাংক ও প্যাথলজি বিভাগে টয়লেট না থাকায় রোগীদের যেতে হয় বাইরে। বাগাতিপাড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স: ৩১ শয্যার এই হাসপাতালে ডাক্তার মাত্র ৭ জন। থাকার কথা ১৪ জন। এদের প্রায় সকলেই আসেন বাইরে থেকে। এখানে প্রতিদিন রোগী আসে শতাধিক। কোন কোন সময় ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৫০ পেরিয়ে যায়। তখন থাকতে হয় মেঝেতে। হাসপাতালের আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার ডা. জান্নাতুল ফেরদৌস বাগাতিপাড়ায় থাকেন না। সুইপারের অভাবে হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা ব্যাহত হচ্ছে। উপজেলা স্বাস্থ্য ও প.প. কর্মকর্তা ডা. খলিলুর রহমান জানান, ডাক্তারের অভাব ও নানা সমস্যার কথা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। সিংড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স: ২০০৫ সালে এটি ৫০ শয্যায় উন্নীত হয়। কিন্তু কোন সুবিধা আজও পাওয়া যায়নি। ৯ জন ডাক্তারের মধ্যে আছেন মাত্র ৪ জন। ১৪ লাখ জনসংখ্যার এই উপজেলার একমাত্র হাসপাতালে প্রতিদিন রোগী আসে দেড় শতাধিক। সেই তুলনায় চিকিত্সা সেবা মেলে খুব সামান্যই। মাত্র ২ জন সুইপারের পক্ষে বিরাট ভবন ও এর চত্বর পরিষ্কার রাখা খুবই কঠিন। অথচ বরাদ্দ আছে ৫ জন সুইপারের পদ। এখানে একজনও পিয়ন নেই। বর্ষাকালে চলনবিলের অধিকাংশ রাস্তা থাকে পানির নিচে। তখন নৌকাই একমাত্র বাহন। কিন্তু এর গতি কম। অনেক সময় হাসপাতালে আসার আগেই রোগী মারা যায়। প্রত্যন্ত এলাকার রোগী বহনের জন্য দুটি ‘স্পিডবোট অ্যাম্বুলেন্স’ দেয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। সমস্যার কথা স্বীকার করে উপজেলা স্বাস্থ্য ও প.প. কর্মকর্তা ডা. আঞ্জুমান আরা জানান, বিষয়গুলো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে নিয়মিত জানানো হয়। কিন্তু প্রতিকার মেলে না। বড়াইগ্রাম স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স: ৩১ শয্যার এই হাসপাতালে সার্জন ও কনসালটেন্টসহ ৯ জন চিকিত্সক থাকার কথা। কিন্তু আছেন মাত্র ৩ জন। ৭টি ইউনিয়ন উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রে ৭ জন চিকিত্সকের বিপরীতে আছে ২ জন। জুনিয়র কনসালটেন্ট গাইনি ও অ্যানেস্থেসিয়া থাকলেও তারা প্রেষণে অন্যত্র আছেন। আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার, জুনিয়র কনসালটেন্ট মেডিসিন ও সার্জন পদ দীর্ঘদিন যাবত্ শূন্য। ১৪ জন স্বাস্থ্য সহকারী, একজন আয়া ও ৩ জন সুইপারের পদ দীর্ঘদিন যাবত্ শূন্য। হাসপাতালের একমাত্র এক্স-রে মেশিন ও একটি অ্যাম্বুলেন্স প্রায় এক যুগ যাবত্ বিকল। দুজন নিরাপত্তা প্রহরীর একজনও না থাকায় রাতে হাসপাতাল থাকে অরক্ষিত। এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি সত্ত্বেও হাসপাতালটি ৫০ শয্যায় উন্নীত হয়নি। মেডিক্যাল অফিসার ডা. ডলি রাণী জানান, চিকিত্সকের অভাবে হাসপাতালের রোগীদের যথাযথ সেবা দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। উপজেলা স্বাস্থ্য ও প.প. কর্মকর্তা ডা. আব্দুল হান্নান জানান, হাসপাতালের সব সমস্যার মূলে এখন জনবল সংকট। এ ব্যাপারে বারবার লিখেও সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। গুরুদাসপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স: চিকিত্সক-কর্মচারীর অভাবে এই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লে¬ক্সে রোগীরা চিকিত্সা সেবা পাচ্ছেন না। উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. একেএম কামরুল আহসান নিয়মিত অফিসে আসেন না। ফলে কর্মচারীরাও যথাযথ দায়িত্ব পালন করেন না। ৫০ শয্যার হাসপাতালে সার্জন ও কনসালটেন্টসহ ২৬টি চিকিত্সকের পদ রয়েছে। কিন্তু কর্মরত আছেন মাত্র ৪ জন। অনেকে কাজে যোগ না দিয়েই নিয়মিত বেতন তুলছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া সুইপারের অভাবে ময়লা-আবর্জনার স্তূপ জমা হয়, দুর্গন্ধ ছড়ায়। প্রয়োজনীয় সংখ্যক নার্স ও ওয়ার্ডবয় না থাকায় রোগীদের দুর্ভোগ পোহাতে হয়। এক্স-রে মেশিনটি প্রায় সাড়ে ৩ বছর থেকে বিকল। আউটডোরে রোগীদের টিকেট দেয়ার কোন কর্মচারী না থাকায় একজনকে মাসে ২ হাজার টাকা দিয়ে (আউটসোর্সিং) কাজে রাখা হয়েছে। ভর্তি রোগীদের অভিযোগ, খাবার নিম্নমানের। হাসপাতালের খাদ্য সরবরাহকারী আব্দুল করিম জানান, কর্তৃপক্ষের নির্দেশ মোতাবেক খাবার দেয়া হয়। আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার ডা. রবিউল করিম শান্ত জানান, বিষয়গুলো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। সিভিল সার্জনের বক্তব্য: জেলার সরকারি স্বাস্থ্যসেবার নানা সমস্যার কথা স্বীকার করেন সিভিল সার্জন ডা. ফেরদৌস নিলুফার। তিনি জানান, সরকারি হাসপাতালগুলোর নানা সমস্যা-সংকটের প্রতিকার চেয়ে শীর্ষ প্রশাসনে চিঠি পাঠানো হয়েছে। এদিকে সিভিল সার্জনের অফিস জানে না জেলায় কতটি বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক আছে। ক্লিনিকগুলোতে সাধারণত কোন নিয়ম-নীতি মানা হয় না। বিধি লংঘনের অভিযোগ পেলেও সিভিল সার্জন তাদের কার্যক্রম বন্ধ করতে পারেন না। অন্যদিকে সাধারণ রোগীরা গ্রাম্য ডাক্তারের দ্বারা কিছুটা উপকার পেলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। প্রকাশিত সংবাদ প্রসঙ্গে গত ১৪ জুলাই দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত ‘অব্যবস্থাপনার আবর্তে সরকারি চিকিত্সাসেবা’ শীর্ষক প্রতিবেদনের একাংশের প্রতিবাদ জানিয়েছেন পাবনা জেলার সিভিল সার্জন ডা. তাহসিন বেগম। প্রতিবাদপত্রে তিনি দাবি করেন, কর্মরত চিকিত্সকদের ৯৫ ভাগ কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকেন এবং হাসপাতালে সরবরাহকৃত ৯৮ ভাগ ওষুধ বাইরে পাচার হয়ে যাওয়ার তথ্য সঠিক নয়। সরবরাহকৃত ওষুধের মজুদ সন্তোষজনক এবং রোগীরা প্রয়োজনীয় ওষুধ হাসপাতাল থেকে পাচ্ছেন। বিভিন্ন উপজেলা হাসপাতালে ডাক্তার, নার্স ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় জনবল সংকট থাকা সত্ত্বেও সবাই নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন বলে তিনি দাবি করেছেন। প্রতিবেদকের বক্তব্য: সরেজমিনে পাবনা জেলা সদর হাসপাতাল, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও ইউনিয়ন সাব-সেন্টার এবং কমিউনিটি ক্লিনিকে গিয়ে কর্তব্যরত ডাক্তার, নার্স, কর্মচারী ও রোগীদের সঙ্গে আলাপ করে এসব তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এসময় সরাসরি নানা অব্যবস্থাপনার চিত্রও দেখা গেছে। প্রতিবেদক শুধুমাত্র সেসব তথ্য ও অব্যবস্থাপনার চিত্রই প্রতিবেদনে তুলে ধরেছেন।