উপকূলীয় অঞ্চলে জোয়ারের দুর্যোগ

আপডেট : ১৫ জুলাই ২০১৪, ২৩:১২
পূর্ণিমার জোয়ারে দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলবর্তী অঞ্চলে মানুষের সীমাহীন সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে। বাড়িঘর, রাস্তাঘাট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পানি উঠেছে। দুর্যোগ কবলিত মানুষকে সহায়তা করার কেউ নেই। ভোলা (দক্ষিণ) প্রতিনিধি গত সোমবার ভোলা শহরের মাত্র দু কিলোমিটার দূরে নাসির মাঝি অংশে ভোলা শহর রক্ষা বাঁধের ভাঙ্গনে হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়ে ভোলা শহর। ৯ গ্রামের বিস্তীর্ন এলাকা প্লাবিত হয়। মাছের ঘের ফসলি জমি বসত ঘর হাঁটু পানিতে সয়লাভ হয়ে যায়। আতংকিত এলাকার শত শত লোক বেড়ি বাঁধের ভাঙ্গা অংশ মেরামতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। খবর পেয়ে জেলা প্রশাসক, উপজেলা চেয়ারম্যান, নির্বাহী প্রকৌশলী ঘটনা স্থলে গেলেও গতকাল মঙ্গলবার কোন সরকারি কর্মকর্তাকে দেখা যায়নি। মঙ্গলবার ঐ এলাকায় সরেজমিন পরিদর্শন কালে দেখা যায় গ্রামের শত শত লোক বাঁধের ঐ অংশে ব্লক স্থাপনের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল করছে। সাংবাদিকদের দেখে তারা আরও বেশি বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। অপরদিকে অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করার লক্ষ্যে শত শত লোক বাঁধের দুইপাশে বাঁশের পাইলিঙ্গের মধ্যে মাটি কেটে মাটি ফেলছে ও বালুর বস্তা নিক্ষেপ করছে। এলাকার লোকজন জানান, তারা স্বউদ্যোগে আপাততঃ জোয়ারের পানির হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য বেড়িবাঁধের ভাঙ্গা অংশে কাজ করছেন। তবে জোয়ারে তাদের এই প্রচেষ্টা কতটুকু সফল হবে এ ব্যাপারে তাদের সংশয় রয়েছে। বাঁধের উপরে সারি সারি বালুর বস্তা প্রশাসনের উদ্যোগে আনা হয়েছে। আপাতত পানি ঢোকা বন্ধ হওয়ায় কিছুটা স্বস্তি ফিরে এলেও বিভিন্ন বসত ঘরে, উঠানে ও রাস্তায় কর্দমাক্ত পানি। সোমবার এসব এলাকার লোকজন ইফতার ও সেহরী খেতে পারেননি। বহু ঘরে এখনও চুলা জ্বলছে না। এ ব্যাপারে, ভোলা পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী জানান, আপাতত এখানে ব্লক স্থাপনের কোন সরকারি বরাদ্দ নেই। বরাদ্দ পেলে বাঁধ সংস্কারসহ ব্লক ও জিও ব্যাগ স্থাপন করা হবে। এলাকাবাসীর অভিযোগ তারা পানি উন্নয়ন বোর্ডকে বার বার অবহিত করা সত্ত্বেও তারা কোন ব্যবস্থা নেননি। এমনকি বিকেলে বাঁধে ফাটল দেখা দেয়ার কথা জানালেও বিষয়টি তারা আমলে নেননি। অপরদিকে জেলা প্রশাসক মোঃ সেলিম রেজা ইত্তেফাককে জানান, জনগণের সাহায্য নিয়ে প্রশাসন অস্থায়ীভাবে ভোলা শহর রক্ষা বাঁধ রক্ষা করেছে। নতুবা পুরো ভোলা শহর জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হয়ে যেত। বাঁধের দুর্বল অংশগুলোসহ ভাঙ্গা বাঁধের অংশ যাতে আবারও বিপর্যয়ের সম্মুখীন না হয় সে ব্যাপারে প্রশাসন সতর্ক আছে। প্রসঙ্গ ক্রমে তিনি বলেন, চরফ্যাশনের চর মাদ্রাজসহ পাঁচটি ইউনিয়ন জোয়ারের পানিতে চরম দুর্ভোগে রয়েছে। চর মাদ্রাজে বাঁধ ভেঙ্গে পানি ঢুকে আর নামছে না। দৌলতখানেও কয়েকটি এলাকায় বেড়িবাঁধ হুমকির সম্মুখীন। এব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। ভোলা শহর রক্ষা বাঁধ সংলগ্ন এলাকায় জোয়ারের প্লাবনের আশংকায় বিভিন্ন মাছের ঘেরে মাছ ধরার হিড়িক পড়েছে। অনেকে পুকুরের মাছ ঘেরের মাছ স্বল্প দরে বিক্রয় করে দিচ্ছে। কক্সবাজার প্রতিনিধি \ টানা গত চারদিন ধরে পূর্ণিমার জোয়ারের প্রভাবে বঙ্গোপসাগরের লোনা পানিতে কক্সবাজারের উপকূলীয় এলাকা ব্যাপকভাবে প্লাবিত হয়ে রাস্তাঘাট, বসতবাড়ী, চিংড়িঘের ও ঘরবাড়ী তলিয়ে গেছে। এতে গ্রামীণ অবকাঠামো ও রাস্তাঘাট ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া ছাড়াও চিংড়িঘেরের কোটি কোটি টাকার মাছ সাগরের পানিতে ভেসে গেছে। এসময় কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকতের সবুজ বেষ্টনী হিসেবে পরিচিত ঝাউবাগানের ৫ শতাধিক গাছও সাগরের করাল গ্রাসে হারিয়ে যায়। উপকূলীয় এলাকার বাসিন্দাদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। শনিবার থেকে শুরু হওয়া পূর্ণিমার উচ্চ জোয়ারের প্রভাবে কক্সবাজার শহরের কুতুবদিয়াপাড়া, দ্বীপ উপজেলা কুতুবদিয়া ও মহেশখালী, এছাড়া টেকনাফ ও পেকুয়া উপজেলার অর্ধশতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়। এসময় উপকূলীয় এলাকার রাস্তাঘাট ও বেড়িবাঁধ উপচে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করে অর্ধশতাধিক বসতবাড়ী ও উল্লেখযোগ্য রাস্তাঘাট বিধ্বস্ত হয়। এছাড়া বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে ও উপচে সাগরের সাথে চিংড়িঘের প্রায় একাকার হয়ে যায়। এসময় কয়েক কোটি টাকার মাছ সাগরের পানিতে ভেসে যায় বলে জানান কক্সবাজার চিংড়ি চাষি সমিতির নেতা এইচ এম এরশাদ। তিনি জানান, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাবের কারণে প্রতিবছরই জলোচ্ছ্বাসের মাত্রা বাড়ছে। ফলে বেড়িবাঁধ উঁচু করা হলেও তা বিশেষ কাজ দিচ্ছে না। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তিনি উপকূলে স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণের দাবি জানান। তীব্র জোয়ারের প্রভাবে কক্সবাজার ও কুতুবদিয়া সৈকতের ঝাউবাগানও সাগরের গ্রাসে পড়ে। গত চারদিন ধরে দিনে দুইবার করে তীব্র জোয়ারের কারণে ইতোমধ্যে ৫ শতাধিক ঝাউগাছ হারিয়ে যায় বলে জানায় বনবিভাগ। তবে আকস্মিক বৃষ্টিপাত না হলে আজ বুধবার থেকে জোয়ারের মাত্রা কমতে থাকবে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া বিভাগ। চরফ্যাশন (ভোলা) সংবাদদাতা\ চরফ্যাশনে ১৫টি গ্রাম প্লাবিতের পর গতকাল মঙ্গলবার জোয়ারের পানি বৃৃদ্ধি পেয়ে নতুনভাবে প্লাবিত হয়েছে চর মাদ্রাজ ইউনিয়নের চর নাজিম উদ্দিন ১ ও ২নং ওয়ার্ড এবং মিয়াজানপুর গ্রাম, বিচ্ছিন্ন দ্বীপ চর কুকরীমুকরী ইউনিয়নের সব কয়টি গ্রাম। এছাড়াও জিন্নাগড় ইউনিয়নের উত্তর মাদ্রাজ ৯নং ওয়ার্ডে জোয়ারের পানি ঢুকতে শুরু করেছে। তলিয়ে গেছে ফসলি জমি। জোয়ারের পানির তোড়ে কাশেমগঞ্জ বাজারের পূর্ব পাশ হতে মাদ্রাজ বেড়িবাঁধ সড়কের দাসের হাটের পূর্ব দিকে নির্মাণাধীন প্রায় ৫ কি.মি. রাস্তার কাজ দুই তৃতীয়াংশ শেষ হলেও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চর কুকরীমুকরী ইউপি চেয়ারম্যান হাসেম মহাজন জনান, তার ইউনিয়নের সব কয়টি গ্রামই পানিমগ্ন হয়ে পড়েছে। জোয়ারের পানির তোড়ে অনেক বসত ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। লোকজন আত্মীয় স্বজনের বাড়ীতে আশ্রয় নিয়েছে। এদিকে জোয়ারে হু হু করে পানি বাড়তে থাকায় চরফ্যাশন সদরের জনগণের মাঝে আতংক ছড়িয়ে পড়েছে। গতকাল মাদ্রাজ এলাকা ঘুরে দেখা গেছে লোকজন প্রয়োজনীয় মালামাল নিয়ে দীর্ঘদিনের বসত ভিটা ছেড়ে আশ্রয়ের উদ্দেশ্যে অন্যত্র চলে যাচ্ছে। যারা ভিটে মাটিতে আছেন তারা জোয়ারে পানিতে দুর্ভোগে দিন যাপন করছেন। ক্ষতিগ্রস্তদের সাথে আলাপকালে তারা জানায়, ৪ দিন অতিকষ্টে কাটালেও কেউ সাহায্য সহযোগিতার হাত বাড়ায়নি। গত ৪ দিন ধরে শুকনো খাবার খেয়ে বেঁচে আছেন তারা। নলকুপ পানির নিচে থাকায় বিশুদ্ধ পানির অভাবে জোয়ারের পানি খেতে হয়। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার জনপ্রতিনিধিরা জানান, পানি উন্নয়ন বোর্ড সঠিক সময়ে বেড়িবাঁধ নির্মাণ করলে লোকজন এই বিপর্যয়ে পড়তো না। মাদ্রাজের ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ দ্রুত নির্মাণের ব্যবস্থা না নিলে চরফ্যাশন সদর শহরও পানিতে তলিয়ে যাওয়ার আশংকা রয়েছে। সোমবার ভোলা জেলা প্রশাসক মো. সেলিম রেজা ও চরফ্যাশন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিমসহ প্রশাসনের কর্মকর্তারা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাসমূহ পরিদর্শন করেছেন। এসময় তারা ধৈর্যের সাথে দুর্যোগ মোকাবেলার জন্য দুর্যোগ কবলিতদের পরামর্শ দেন। চরফ্যাশন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম ইত্তেফাককে বলেছেন, আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে থাকার চেষ্টা করছি। জুন শেষ হয়েছে মাত্র। এখন আমাদের হাতে কিছু নেই, মন্ত্রণালয়ে লিখেছি, ত্রাণ পেলে আমরা তা ক্ষতিগ্রস্তদের হাতে পৌছে দিতে পারবো। দশমিনা (পটুয়াখালী) সংবাদদাতা \ পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলায় বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে ফসলি জমি-মাছের ঘের ও বাসাবাড়ি তলিয়ে গেছে। খাবার পানির প্রকট অভাব দেখা দিয়েছে। জানা যায়, উপজেলার উত্তর বাঁশবাড়িয়া ও পূর্ব আউলিয়াপুর এলাকার বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে জোয়ারের পানিতে প্রায় দেড় হাজার ঘরবাড়ি ও মাছের ঘের তলিয়ে যাওয়ায় জনদুর্ভোগ চরমে। এদিকে জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় প্রশাসনের কোন তত্পরতা দেখা যাচ্ছে না। মত্স্য চাষীরা জানিয়েছে, জোয়ারের পানিতে ঘের তলিয়ে লাখ লাখ টাকার মাছ ভেসে গেছে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার আজহারুল ইসলাম জানান, বিষয়টি ইউপি চেয়ারম্যানদের তদারকি করে ভিজিএফ এর চাল বিতরণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। হাতিয়া (নোয়াখালী) সংবাদদাতা \ বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে হাতিয়া উপজেলার নলচিরা ইউনিয়নের ৬টি গ্রাম, চরঈশ্বর ইউনিয়নের ১টি গ্রাম, তমরদ্দি ইউনিয়নের ১টি গ্রাম ও নিঝুমদ্বীপ ইউনিয়নের ২টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে করে কয়েক শ পরিবার পানি বন্দি হয়ে পড়েছে। ফলে ক্ষেতের ফসল নষ্ট হয়েছে ও পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রচণ্ড বাতাসের কারণে প্রবল জোয়ারে নলচিরা ইউনিয়নের বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে কলাপাড়া গ্রাম, ফরাজি গ্রাম, ছয়া গ্রাম, বক্কনিয়া গ্রাম, পঞ্চায়েত গ্রাম, তুফানিয়া গ্রাম, চরঈশ্বর ইউনিয়নের লম্বরিয়া গ্রাম, তমরদ্দি ইউনিয়নের কেরালিয়া গ্রাম ও নিঝুমদ্বীপ ইউনিয়নের মদিনা গ্রাম ও আদর্শ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে করে নিমজ্জিত এলাকার মানুষেরা সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। স্বরূপকাঠি (পিরোজপুর) সংবাদদাতা \ স্বরূপকাঠির সন্ধ্যানদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় গতকাল মংগলবার উপজেলার বলদিয়া ইউনিয়নের চামী, ডুবি, গগন এবং সন্ধ্যানদীর তীরবর্তী কৌরিখাড়া, কামারকাঠি, জলাবাড়ি, রাজবাড়ি, নান্দুহারসহ বিভিন্ন গ্রামের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। গত কয়েকদিন যাবত সন্ধ্যানদীতে স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে ২/৩ ফুট জোয়ারের পানি বেড়ে যাওয়ায় রাস্তাঘাট, ফসলের মাঠ, পানের বরজ তলিয়ে গেছে। বসতঘরে পানি ঢুকে পড়ায় বিপাকে পড়েছেন গ্রামাঞ্চলের বাসিন্দারা। গ্রামাঞ্চলের কাঁচা রাস্তাঘাট তলিয়ে যাওয়ায় জন চলাচলে বিঘ্নিত হচ্ছে। জোয়ারের পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় মিয়ারহাট বন্দরের কালিবাড়ি খাল তীরবর্তী কয়েকটি দোকানে পানি ঢুকেছে এবং কৌরিখাড়া লঞ্চঘাট সড়কটি ডুবে গেছে। বাকেরগঞ্জ (বরিশাল) সংবাদদাতা \ প্রবল জোয়ারে বাকেরগঞ্জের সবকটি ইউনিয়নের নিম্নঅঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। চরামদ্দি, চরাদী, দাড়িয়াল, দুধল, দূর্গাপাশা, ফরিদপুর, কলসকাঠী, নলুয়া, ভরপাশা, রঙ্গশ্রী, পাদ্রীশিবপুর, নিয়ামতি এলাকা থেকে প্রাপ্ত সংবাদে জানা যায়, উক্ত ইউনিয়নগুলোতে প্রায় ২ হাজার মাছের ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত ঘেরগুলোর চারপাশে পাড়ের উপর দিয়ে প্রবাহিত পানিরতোরে বিপুল পরিমাণ মাছ উঠে যায়। বর আউলিয়ার পুকুরের প্রায় ১ লক্ষ টাকার মাছ পাড় ভেঙ্গে ভেসে গেছে। অধিকাংশ ঘেরের মালিকরা ব্যাংক অথবা এনজিও থেকে লোন নিয়ে মাছের চাষ করে। মাছের ঘেরগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ঘেরের মালিকরা হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। মারেলগঞ্জ (বাগেরহাট) সংবাদদাতা \ বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জে গত তিন দিনে অতিরিক্ত জোয়ারের পানিতে পৌরসদরসহ ১০ ইউনিয়নের প্রায় ২০ গ্রাম প্ল¬¬াবিত হয়েছে। পানিতে ¬প্লাবিত হয়ে আউশ বীজতলা, রবিশস্যসহ মত্স্য ঘেরের ব্যাপক ক্ষতিসাধিত হয়েছে। নদীর তীরবর্তী এলাকার ঘের ডুব গিয়ে লক্ষ লক্ষ টাকার মাছ ভেসে গেছে। পৌর সদরের রাস্তাগুলো অতিরিক্ত জোয়ারের পানিতে প্ল¬¬াবিত হওয়ায় বাজারের ক্রেতা বিক্রেতারা চরম ভোগান্তির শিকার হয়। অধিকাংশ দোকানে জোয়ারের পানি ঢুকে মালামালের ক্ষতি সাধিত হয়েছে। পৌর সদরের কাপুড়িয়া পট্টি, কলেজ রোড, পুরাতন থানা এলাকা, ফেরিঘাট এলাকা, উপজেলা চত্বর, ছোলমবাড়িয়া বাসস্ট্যান্ড অতিরিক্ত জোয়ারের পানিতে তলিয়ে গেছে। পৌর সদরের বারইখালী পুরাতন থানা এলাকা, কাঠালতলা, পূর্ব সরালিয়া গ্রামের কয়েকশ’ পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। মোরেলগঞ্জ সদর উপজেলা গাবতলা গ্রামের ভাঙ্গা বেড়িবাঁধ থেকে জোয়ারের পানি ঢুকে পুরা গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে অত্র গ্রামের শতাধিক পরিবার। অতিরিক্ত জোয়ারের পানিতে এলাকার ফসলি জমি প্ল¬াবিত হয়ে রোপা আউশ ও অন্যান্য ধানের বীজতলা ডুবে ব্যাপক ক্ষতিসাধিত হয়েছে। কৃষি দপ্তর সূত্রে, জোয়ারের পানিতে ২ হাজার হেক্টর জমির আউশ বীজতলা ক্ষতিসাধিত হয়েছে। এছাড়াও জোয়ারের পানির লবণাক্ততার কারণে রবি শস্যের ক্ষতিসাধিত হতে পারে। স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে ৪/৫ ফুট বেশি পানিতে পৌর সদরসহ উপজেলার মোরেলগঞ্জ সদর, বারইখালী, খাউলিয়া, পুটিখালী, হোগলাবুনিয়া, বলইবুনিয়া, পঞ্চকরন, বহরবুনিয়া ইউনিয়নের ২০ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে অনেক গ্রামের ফসলি জমিতে পানি ঢুকে পড়ে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। উপজেলা মত্স্য অফিস সূত্রে জানা গেছে, জোয়ারের পানিতে উপজেলা প্রায় সাড়ে তিনশ’ ঘের ডুবে গেছে। এতে ক্ষতির পরিমাণ ১০ লক্ষাধিক টাকা ধরা হলেও বাস্তবে ক্ষতির পরিমাণ ৩/৪ গুণ ছাড়িয়ে যাবে বলে ঘের মালিকরা জানান। এলাকার গণমানুষের দীর্ঘদিনের দাবি, বেড়িবাঁধ না থাকায় অতিরিক্ত জোয়ারে ব্যাপক এলাকা প্লাবিত হয়ে ব্যাপক ক্ষতিসাধিত হয়। কেশবপুর (যশোর) সংবাদদাতা \ পানি উন্নয়ন বোর্ডের শ্রীহরি ও ভদ্রা নদীর গ্রাম রক্ষা বাঁধ ভেঙ্গে সন্ন্যাসগাছা, গৌরীঘোনা ও আগরহাটি গ্রাম প্লাবিত হয়ে আড়াই শতাধিক পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। জোয়ারের পানিতে ভেসে গেছে পুকুর ও ঘেরের কোটি টাকার মাছ। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সবজি ক্ষেত, বীজতলা ও কাঁচা ঘরবাড়ি। পূর্ণিমার জোয়ারে অস্বাভাবিকভাবে নদীর পানি বেড়ে যাওয়ায় উপজেলার ভদ্রা নদীর সন্ন্যাসগাছা গ্রামের গাজী বাড়ি নামক স্থানে ও শ্রীহরি নদীর আগরহাটি নতুন আশ্রয় কেন্দ্র থেকে হাকিম গোলদারের বাড়ি পর্যন্ত গ্রাম রক্ষা বাঁধ ভেঙ্গে সন্ন্যাসগাছা, গৌরীঘোনা ও আগরহাটি গ্রামে পানি ঢুকে পড়েছে। ফলে শতাধিক পুকুর, ৩০টি মাছের ঘের, শতাধিক বিঘা ফসলের ক্ষেত ও আড়াই শতাধিক পরিবারের ঘরবাড়ি প্ল¬াবিত হয়েছে। বাঁধ সংলগ্ন গ্রামের বাসিন্দা রাজ্জাক গোলদার, শাহাজান গোলদার, রেজাউল ইসলাম, রোস্তম আলী, আসাদুল ইসলাম, রবিউল ইসলাম, শরিফুল ইসলাম বলেন, যখন নদীতে জোয়ার আসছে তখন দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করছে। স্থানীয় ইউপি সদস্য সরদার মুজিবুর রহমান গত তিনদিন যাবত্ এলাকার বাঁধ রক্ষার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন বলে জানান। গৌরীঘোনা ইউপি চেয়ারম্যান এস এম আলী রেজা বলেন, ভদ্রা নদীর বাঁধ ভেঙ্গে পানি প্রবেশ করায় ৩ গ্রামের আড়াই শাতাধিক পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সঞ্জয় কুমার দাস বলেন, আমনের বীজতলা, আউশের ও সবজির ক্ষেত তলিয়ে ৫ লক্ষাধিক টাকার ফসলের ক্ষতি হয়েছে। উপজেলা মত্স্য কর্মকর্তা আলমগীর কবির ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে এসে জানান, ঐ এলাকার ৩০টি মাছের ঘের ও শতাধিক পুকুর প্লাবিত হয়ে প্রায় ১ কোটি টাকার মাছের ক্ষতি হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম বলেন, জোয়ারের পানি অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পাওয়ায় বাঁধের ২/৩ জায়গা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। উপজেলা চেয়ারম্যান এইচএম আমির হোসেন, প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাকে সাথে নিয়ে মঙ্গলবার এলাকা পরিদর্শন করেছেন। যশোর অফিস \ কেশবপুরে পূর্ণিমার জোয়ারের প্রভাবে পানি উন্নয়ন বোর্ডের শ্রীহরি ও ভদ্রা নদীর গ্রাম রক্ষা বাঁধ ভেঙ্গে তিনটি গ্রামের আড়াই শতাধিক পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। মঙ্গলবার ভোরে এই বাঁধ ভেঙ্গে উপজেলার সন্ন্যাসগাছা, গৌরীঘোনা ও আগরহাটি গ্রামে নদীর পানি ঢুকে প্লাবিত হয়। এই বাঁধ ভাঙ্গা জোয়ারের পানিতে ভেসে গেছে পুকুর ও ঘেরের কোটি টাকার মাছ। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সবজি ক্ষেত, বীজতলা ও কাঁচা ঘরবাড়ি। এলাকাবাসী জানিয়েছেন, জোয়ারে অস্বাভাবিকভাবে নদীর পানি বেড়ে যাওয়ায় উপজেলার ভদ্রা নদীর সন্ন্যাসগাছা গ্রামের গাজী বাড়ি নামক স্থানে ও শ্রীহরি নদীর আগরহাটি নতুন আশ্রয় কেন্দ্র থেকে হাকিম গোলদারের বাড়ি পর্যন্ত গ্রাম রক্ষা বাঁধ ভেঙ্গে গেছে। এতে উপজেলার সন্ন্যাসগাছা, গৌরীঘোনা ও আগরহাটি গ্রামে পানি ঢুকে পড়েছে। ফলে শতাধিক পুকুর, ৩০টি মাছের ঘের, শতাধিক বিঘা ফসলের ক্ষেত ও আড়াই শতাধিক পরিবারের ঘরবাড়ি প্ল¬াবিত হয়েছে। শ্যামনগর (সাতক্ষীরা) সংবাদদাতা \ সাতক্ষীরার শ্যামনগরে ৫নং পোল্ডারের আওতাধীন বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নে খোলপেটুয়া নদীতে হঠাত্ অস্বাভাবিক জোয়ার বৃদ্ধি পেয়েছে। বৈরী আবহাওয়ায় ও বর্ষা মৌসুমে পাউবো বেড়িবাঁধে কয়েকটি স্থান ভাঙ্গন দেখা দেয়ায় যে কোন মুহূর্তে লোনা পানি ভিতরে প্রবেশ করে এলাকা প্লাবিত হয়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। দ্রুত পদক্ষেপ নেয়ার দাবী জানিয়েছে এলাকাবাসী। বুড়িগোয়ালিনী ইউপি চেয়ারম্যান হাজী নজরুল ইসলাম জানান, গত সোমবার রাতে নদীতে হঠাত্ জোয়ার বৃদ্ধি পাওয়া ইউনিয়নের দুর্গাবাটি নেছার মালির বাড়ি থেকে হুলো পর্যন্ত তিনটি স্থান, টুঙ্গিপাড়া হতে মাদিয়া পর্যন্ত দুটি স্থান, নীলডুমুর বিজিবি স্থাপনার উত্তর ধারে একটি স্থান এবং দাতিনাখালী কয়াল বাড়ির পার্শ্বে একটি স্থানে বেড়িবাঁধ মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে। দুর্গাবাটি নেছার মালির বাড়ি থেকে হুলো পর্যন্ত তিনটি স্থানে পাউবো বেড়িবাঁধের তলদেশ দিয়ে লোনা পানি ভিতরে প্রবেশ করছে বলে জানান। বৈরী আবহাওয়ায় নদীতে জোয়ারে প্রবল ঢেউয়ের আঘাতে ঐসব স্থানে যে কোন মুহূর্তে বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্ভাবনা বিদ্যুমান। এলাকার মানুষ আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে। পাউবো কর্তৃপক্ষকে জানানোর পরও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নেয়ায় তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। পটুয়াখালী প্রতিনিধি \ পটুয়াখালীর দুমকি উপজেলার পায়রা নদীর পাড়ের ইটবাড়ীয়া-লেবুখালী পোল্ডারের বন্যা নিয়ন্ত্রণ বেড়িবাঁধের উপর দিয়ে জোয়ারের পানি উপচেপড়ে অন্তত পাঁচ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। পূর্ণিমার ‘জো’য়ের প্রভাবে গত চার দিন ধরে জেয়ারে নদীর পানি অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়ে বাঁধের উপর দিয়ে লোকালয়ে প্রবেশ করছে। পানিতে তলিয়ে গেছে কৃষকের বীজতলা, ভেসে গেছে পুকুরের মাছ। জোয়ারের পানি অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পেয়ে পায়রা নদীর পানির প্রবল স্রোতে বেড়িবাঁধের ৬ শ’ মিটারের বেশি বাঁধ ধসে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। বাঁধ এলাকার পাঁচ গ্রামের মানুষ এখন চরম উত্কণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) পটুয়াখালী কার্যালয় জানায়, পটুয়াখালী জেলা শহর থেকে ১২ কিলোমিটার উত্তরে দুমকি উপজেলায় পায়রা নদীর পাড়ের মানুষের বসতবাড়ি-ফসলি জমি রক্ষাসহ দুর্যোগের জলোচ্ছ্বাস থেকে রক্ষায় আশির দশকে ৩৩ কিলোমিটার দীর্ঘ ইটবাড়ীয়া-লেবুখালী বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হয়। সিডর-আইলায় বেড়িবাঁধের ব্যাপক ক্ষতি হলে পরে তা মেরামত করা হয়। বর্ষা মৌসুমে জোয়ারের পানি বৃদ্ধি পেয়ে প্রবল স্রোতে নতুন করে বাঁধে ধস দেখা দেয়। লেবুখালী গ্রামের ইউনুচ হাওলাদার বলেন, ‘এমনিতেই নদীর পাড়ে বাড়ি থাকতে হয় আতংকে। বর্ষা মৌসুম এলেই বেড়িবাঁধে নতুন করে ভাঙ্গতে শুরু করেছে। তবে গত চার দিন ধরে জোয়ারের পানি অস্বাভাবিক ভাবে বৃদ্ধি পেয়ে বাঁধের উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে লেবুখালী, মোল্ল¬াখালী, মরিচের খাল, আলগী ও পাঙ্গাশিয়া এই পাঁচ গ্রাম প্লাবিত হচ্ছে। নতুন করে বাঁধ নির্মাণ করা না হলে এই এলাকার মানুষদের জলোচ্ছ্বাসের আতংক কমবে না। পানি উন্নয়ন বোর্ড পটুয়াখালীর নির্বাহী প্রকৌশলী (দায়িত্বপ্রাপ্ত) মো. শফিউদ্দিন বলেন, লেবুখালী বেড়িবাঁধের উপর দিয়ে জোয়ারের পানি উপচেপড়ার খবর পেয়েছি। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে নতুন বেড়িবাঁধ নির্মাণ করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এজন্য জন্য অর্থ বরাদ্দ চাওয়া হবে। উজিরপুর প্রতিনিধি \ বরিশালের উজিরপুরের পশ্চিম হারতা গ্রামে বাড়ির আঙ্গিনায় পানিতে ডুবে সাইমুন নামের দেড় বছরের এক শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। গতকাল ১৫ জুলাই সকাল ৭টার সময় এই ঘটনা ঘটে। জানা গেছে, ঐ গ্রামের ব্যবসায়ী রিয়াজ হাওলাদারের স্ত্রী সাবিনা বাড়ির রান্নাঘর তলিয়ে গেলে শিশুটিকে বারান্দায় রেখে পাশের ঘরে শিশুটির জন্য খাবার তৈরি করতে যায়। খাবার তৈরি করে এসে দেখতে পায় শিশুটি পানির উপরে মৃত অবস্থায় ভাসছে। এ ঘটনায় এলাকায় শোকের মাতম চলছে। মনপুরায় দুই শিশুর মৃত্যু ভোলা (দক্ষিণ) প্রতিনিধি জানান, মনপুরায় জোয়ারের পানিতে ভেসে গিয়ে ওমর (৩) ও মিজানুর রহমান (৬) দুই শিশু মারা গেছে। এলাকাবাসী জানায়, মনপুরার হাজির হাট ইউনিয়ন ও দক্ষিণ শাকচিয়া এলাকার বিস্তীর্ণ এলাকা ও ঘরবাড়ি এক হাঁটু পানির নিচে থাকায় এ ঘটনা ঘটে। শিশু ওমর ও মিজানুর রহমান গতকাল মঙ্গলবার ঘর থেকে বেরিয়ে দরজার সামনে এসে খেলা করতে থাকলে এক পর্যায়ে জোয়ারের পানির স্রোত তাদের ভাসিয়ে নিয়ে যায়। অনেক দূরে তাদের লাশ পাওয়া যায়। নিহত শিশুদের স্বজনের আহাজারিতে এলাকার বাতাস ভারি হয়ে রয়েছে।