ছোট্ট একটি ঘটনা। ২০০৯ সালের ৯ জুন। সালেহ তার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ঘুমাচ্ছিলেন। গভীর ঘুমে। রাত তখন ৩টা। হঠাত্ করে গভীর ঘুমই পরিণত হলো আতঙ্কে। একটি ক্ষেপণাস্ত্র আকাশ থেকে ছাদের ওপর এসে পড়ল। ছাদ ভেদ করে সেটির গমন একটি কক্ষে। ওই কক্ষে ঘুমিয়ে ছিলেন সালেহ পরিবারের ৬ জন সদস্য। তাদের রাতের ঘুম চিরতরের ঘুমে পরিণত হলো। তারা জানতে পারলেন না কেন এবং কেন এই ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করল এবং তাদেরই বা কী দোষ ছিল। আর কোনোদিন তারা জানতেও পারবে না। সালেহও জানেন না কী তার অপরাধ। এমনকি সামান্য ক্ষতিপূরণ আদায়ে ইসরাইলের আদালতে মামলা করেছিলেন সালেহ। ক্ষতিপূরণ পাওয়া তো দূরের কথা। উল্টো আদালত মামলা করে ঝামেলা তথা খরচ বৃদ্ধি করার জন্য তাকেই ক্ষতিপূরণ দিতে হলো। আদালত রায়ে বলেন, ওই সময়টা যুদ্ধের সময়। তাই এ বিষয়ে কিছু করার নেই। আর ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ছিল সতর্কতা সৃষ্টির জন্য। সালেহ জানান, মাত্র তিন মিনিটের মধ্যে সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেল। মাত্র কয়েকজন আমরা বের হতে পারছিলাম। পৃথিবীর সবার কাছে ঘটনাটি ছোট হলেও সালেহের কাছে সারাজীবন সেটা জীবনের মহাবিপর্যয় হয়েই থাকবে।
ইসরাইলি সেনাবাহিনী প্রথমে দাবি করেছিল সালেহের বাড়িতে হামাসের অস্ত্রাগার এবং জঙ্গিদের সদরদপ্তর রয়েছে। পরে তারা ভুল স্বীকার করেন। ২০০৯ সালের পর ঠিক ৫ বছর পর আবারও সেই একই ঘটনা। তবে এখন আরও ভয়াবহ। সময় পরিবর্তন হয়েছে কিন্তু গাজাবাসীর মৃত্যুর জন্য দায়ী মানুষ এবং অস্ত্রের নৃশংসতা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। এ যেন পড়ছে বোমা, পুড়ছে মানুষ, পুড়ছে মানবতা। খবর পাওয়া যাচ্ছে, ইসরাইল ক্যান্সার সৃষ্টিকারী বোমাও নিক্ষেপ করছে।
ছয়জনের মৃত্যুটা হয়তো অনেকে মেনে নিতে পারবেন যদি জানতে পারেন, একই পরিবারের ১০ জনসহ আশপাশের বাড়ির ১৮ জন নিহত হয়েছেন ইসরাইলের বর্বর হামলায়। এই হামলা হয় গত শনিবার মধ্যরাতে। পুলিশ কমান্ডার তাসির আল-বতসের চাচাতো ভাই মাজেদ আল-বতসের তিনতলা বাড়িতে যুদ্ধ বিমান দিয়ে হামলা চালায় ইসরাইলি সেনাবাহিনী। মাজেদ ভাগ্যের জোরে গুরুতর আহত হয়ে বেঁচে গেলেও তার পরিবারের ১০ জন প্রাণ হারান। এদের মধ্যে কয়েকজন শিশুসহ বৃদ্ধ বাবাও আছেন। ৫ জনের মৃতদেহই পাওয়া যায়নি, কেবল বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ছোট ছোট টুকরা ছাড়া। তার পরিবারের কেউ তো ইসরাইলের জন্য হুমকি ছিল না। ফিলিস্তিনি কর্মকর্তারা এবং গাজার বাসিন্দারা জানিয়েছেন, হাজার হাজার মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছে। গাজায় এখন আর কোনো নিরাপদ আশ্রয় নেই। এমনকি কবরস্থানেও। নিহতদের বাড়ির আশপাশেই কবর দিতে হচ্ছে। কারণ এক জায়গায় বেশি লোক জড়ো অবস্থায় দেখলে ইসরাইল সেখানে আকাশ থেকে বোমা নিক্ষেপ করে। তাই কাউকে কবরস্থানে মাটি দেওয়া হয় না।
কেবল এখনই নয়।
নিহতের সংখ্যা যখন হাতিয়ার
ইসরাইল সরকার চায় বিশ্ব তাদের ইহুদিবাদী রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিক। তারা একটি সংবিধান প্রণয়ন করতে চান। তাদের কোনো সংবিধান নেই। নিজেদের প্রতাপশালী রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে চায়। তারা ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রকে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করতে এবং শাসন করতে চায়। আধুনিক যুগে তাদের ঔপনিবেশিক আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু কেন হঠাত্ করে এই হামলা চালানো হলো। এর পেছনে রয়েছে ইসরাইলি রাজনীতিকদের নিষ্ঠুর আকাঙ্ক্ষা। সম্প্রতি ফিলিস্তিনের ফাতাহ সরকার এবং ইসলামপন্থী সংগঠন হামাসের মধ্যে ঐতিহাসিক চুক্তি হয়েছে। ইসরাইল মনে করে এতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) হাত আছে। ফিলিস্তিনে তত্ত্বাবধায়ক সরকার হলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউ স্বীকৃতি দিতে পারে। আর এই ধারণায়ই কপাল পুড়েছে গাজাবাসীর। এই চুক্তির পর দেশের অভ্যন্তরে চাপে পড়েন প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু। তার জনপ্রিয়তা কমে আসে। বিরোধীরা তার প্রতি বিষোদগার করেন পার্লামেন্টে। বিরোধীরা মনে করেন, নেতানিয়াহুর দুর্বলতার কারণে হামাস-ফাতাহ ঐক্যবদ্ধ হতে পেরেছে। নেতানিয়াহু মনে করেন যেভাবে হোক তার সরকারের এই দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে হবে। সেটা গাজাকে ধ্বংস করে হলেও! ইসরাইল সরকারের অনেকের ধারণা, গাজায় হামলার কথা বললে এবং করলে তাদের ভোটব্যাংক বাড়বে। তাছাড়া দেশটির অর্থনৈতিক অবস্থাও খুব একটা ভালো নয়। তাই নেতানিয়াহু নিজের ব্যর্থতার কলঙ্ক ঢাকতে এবং মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি অন্যদিকে সরিয়ে নিতে গাজায় হামলার সিদ্ধান্ত নিলেন। অনেক রাজনীতিকের মতে, গাজায় হামলা এবং নিহতের সংখ্যা যত বাড়বে তাদের জনপ্রিয়তাও তত বৃদ্ধি পাবে। ইসরাইলি
স্বস্তি পাবে কি ইসরাইল?
বোমা এবং ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মাধ্যমে মানুষ মরছে, বাড়ি-ঘর ধ্বংস হচ্ছে। রাস্তায় লাশ পড়ে আছে। রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে। ইসরাইলি হামলায় গাজার পরিস্থিতি এমনই। তাদের উদ্দেশ্য কিন্তু আরও আছে। ইসরাইলের ধারণা, অন্তত কয়েকটা বছর ইসরাইল আবার শান্তিতে থাকতে পারবে। হামাস দুর্বল হবে। রকেট হামলা হবে না। কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে, ইসরাইলের এই আশা করাটা ভুল। ইসরাইলি সামরিক বাহিনী বিশ্লেষক রন বেন ইশাইয়ের মতে, এ ধরনের নাটকীয় পরিবর্তনের কোনো সম্ভাবনা নেই। আসলে নির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্য এই হামলায় নেই। একই মত ইসরাইলি কলামিস্ট গাইড ওন লেভিরও। তিনি ইসরাইল সরকারের এবং রাজনীতিকদের এই ধরনের আকাঙ্ক্ষার সমালোচনা করেন। তিনি মনে করেন, হামলা করে এই রোগ থেকে মুক্তি পাবে না ইসরাইল। বরং রোগকে আরও বাড়িয়ে দেওয়া হবে। তার মতে, এতে হয়তো সাময়িক একটা লাভ হবে। হামাস বরং রাজনৈতিক এবং সামরিক দিক থেকে আরও শক্তিশালী হবে। ইতিহাস কিন্তু তাই-ই বলে। বেন ইশাই বলেন, সরকার এর মাধ্যমে জনগণের দৃষ্টি ভিন্ন দিকে নিতে চেষ্টা করছে। জনগণ যখন এটা নিয়ে আলোচনায় ব্যস্ত থাকবে তখন সরকার অর্থনীতিসহ বিভিন্ন নেতিবাচক পরিস্থিতির উন্নতি ঘটানোর চেষ্টা করবে। কিন্তু এটা খুব ফলপ্রসূ হবে না। এটা হবে শূন্য একটি ব্যাগ জয় করার মতো। বরং পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে এবং ফিলিস্তিনিদের মনে প্রতিশোধের আকাঙ্ক্ষা জাগ্রত হবে। বেন বলেন, এইগুলো না করে ফিলিস্তিনিদের মনে এই আকাঙ্ক্ষা জাগ্রত করতে হবে তারা আর ভয়ে থাকবে না। তাদের আর গুম হতে হবে না। তাদের বাড়িতে আর কোনো বোমা পড়বে না এবং তাদের মানচিত্র থেকে মুছে দেওয়ার চেষ্টা চলবে না। না হলে এসব সামরিক অভিযান আরও রক্তপাতের দিকেই যাবে।
