আর্জেন্টিনার স্বপ্ন তখন কার্যত শেষ হয়ে গেছে। খেলার আর মাত্র মিনিট তিনেক বাকি; জার্মানি এগিয়ে ১-০ গোলের ব্যবধানে। চোখ মুছতে মুছতে আর্জেন্টাইন সমর্থকরা মাঠ ছাড়তে শুরু করেছেন। তখনই রেফারির তীব্র একটা বাঁশি—জার্মানির ডি বক্সের বাইরে ফ্রি কিক পেয়ে গেছেন তিনি।
মারাকানা স্টেডিয়াম তো বটেই; সারা পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ যেন নিঃশ্বাস বন্ধ করে ফেললেন। এই জায়গা থেকে তো গোল করাটা তার অভ্যেসের অংশ। তিনি বুক ভরে একটা নিঃশ্বাস নিলেন, একটু পিছিয়ে গেলেন, সব শব্দ থেমে গেল। শুধু টেলিভিশনে ভেসে এলো ধারাভাষ্যকারের জলদগম্ভীর কণ্ঠ, ‘ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম নাটকীয় মুহূর্তের সামনে দাঁড়িয়ে আছি আমরা। অমরত্ব এবং তার মাঝে এখন একটাই ব্যাপার পার্থক্য গড়ে দিতে পারে—আরেকটা মেসি ম্যাজিক। মেসি কি পারবেন আরেকটা ঐশ্বরিক শট নিয়ে নিজেকে অমর করে ফেলতে? পারবেন নিজেই নিজের ভাগ্য লিখে নিতে?’
না, পারেননি মেসি। অত্যন্ত বিস্ময়করভাবে সেই ফ্রি-কিক পোস্টের ওপর দিয়ে মেরে দিয়েছেন। বিশ্বকাপ জিতে নিজেকে সর্বকালের সেরা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার সুযোগ নিজেই উড়িয়ে দিয়েছেন মাঠের বাইরে। আপাতত অন্তত বিশ্বকাপজয়ী সেরাদের তালিকায় নাম লেখা হলো না লিওনেল আন্দ্রেস মেসির।
তবে ব্রাজিলের কিংবদন্তি রোনালদো, আর্জেন্টিনার ম্যারাডোনাসহ অনেকেই মনে করেন, সর্বকালের সেরা হওয়ার জন্য মেসির বিশ্বকাপ জেতাটা খুব জরুরি ছিল না। এই বিশ্বকাপে তিনি কিছু না করলেও অনেকেই তাকে সেরাদের তালিকায় রাখতেন। তারপর দুর্বল একটি দলকে নিয়ে অনেকটাই একক প্রচেষ্টায় ফাইনালে উঠে আসায় এখন রোনালদোরা বলছেন, এই মেসিকে আর কিচ্ছু করতে হবে না। তিনি এমনিতেই বিশ্বসেরা।
সেই বিশ্বসেরা মেসির গল্প শুনি বরং।
রোজারিও থেকে বার্সেলোনা
দাঁড়িয়ে, বসে বা চলন্ত অবস্থায়—যে যেখানে এ লেখাটা পড়ছেন একবার ‘ধন্যবাদ’ শব্দটি উচ্চারণ করুন। ধন্যবাদ দিন আর্জেন্টাইন একজন মা, সেলিয়া মারিয়া কুচিত্তিনিকে। একটা ধন্যবাদ এ মায়ের প্রাপ্য।
আজ থেকে ২৭ বছর আগে তখনকার এ পরিচ্ছন্নতাকর্মী ভদ্রমহিলা জন্ম দিয়েছিলেন ফুটফুটে এক সন্তানকে। কালক্রমে সেই সন্তান আজ দুনিয়া কাঁপানো ফুটবলার লিওনেল আন্দ্রেস মেসি। এমন ছেলে জন্ম দেওয়ার জন্য একটা ধন্যবাদ সেলিয়া মারিয়া কুচিত্তিনি পেতেই পারেন।
রোজারিওর সেন্তা ফেতে অত্যন্ত দরিদ্র এক পরিবারে জন্ম নিয়েছিলেন মেসি। ইতালিয়ান বংশোদ্ভূত বাবা হোর্হে হোরাসিও মেসি ছিলেন একটা স্টিল কারখানার কর্মী। আর মা সংসার চালাতে কাজ করতেন পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে। এমন ‘নুন আনতে পান্তা ফুরোয়’ পরিবারের চতুর্থ সন্তান হিসেবে ঘিঞ্জি এক আবাসস্থলে দুনিয়ার আলোয় চোখ মেলেছিলেন আজকের বিলিওনিয়ার মেসি! মাত্র পাঁচ বছর বয়সে বন্দরনগরীর আর সব শিশুর সঙ্গে মিলে ফুটবল খেলতে শুরু করেছিলেন। বাবা হোর্হে কাজের ফাঁকে ফাঁকে গ্রান্দোলি নামে একটা পাড়ার ক্লাব দলকে কোচিং করাতেন। বাবার হাত ধরে ওই বছর পাঁচেক বয়সেই গ্রান্দোলির হয়ে খেলা শুরু করলেন। তখনই ছেলেটার বল নিয়ন্ত্রণ আর ড্রিবলিং ক্ষমতা দেখে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন স্থানীয় ফুটবলাররা।
আট বছর বয়সেই ক্ষুদে এ ফুটবল জাদুকরের কাণ্ডকীর্তি দেখে তাকে দলে ভিড়িয়ে ফেলল রোজারিওরই ক্লাব নিউওয়েল ওল্ড বয়েজ। এখানেই রাতারাতি আর্জেন্টাইন ফুটবলের আলোচনায় চলে আসতে শুরু করলেন। ওই বয়সী মেসির খেলা দেখেই আর্জেন্টাইন পত্রপত্রিকা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছিল। ততদিনে মেসির ওপর বিভিন্ন ইউরোপিয়ান ক্লাবের চোখও পড়ে গেছে। এমন অবস্থায় দারুণ সুখের একটা ভবিষ্যত্ নিয়ে স্বপ্ন দেখতে হোর্হে মেসির কোনো বাধা ছিল না। কিন্তু বজ্রপাতের মতোই খবরটা এল মেসি পরিবারে—দুরারোগ্য এক হরমোন রোগে আক্রান্ত মেসি।
এই রোগের চিকিত্সায় দীর্ঘকাল ধরে বহুমূল্য ওষুধ, ইনজেকশন চালিয়ে যেতে হবে। এ সামর্থ্য তো মেসি পরিবারের নেই। হোর্হে মেসির কাছে তখন ইউরোপিয়ান ক্লাবগুলো থেকে একটার পর একটা প্রস্তাব আসছে। আর যে স্কাউটই আসছে, তাকে হোর্হে মেসি বলছেন, ‘ছেলের চিকিত্সার কী হবে?’
বার্সেলোনার স্কাউটরা বললেন, ক্লাব ডিরেক্টরের ছেলেটাকে দেখে পছন্দ হলে চিকিত্সার একটা ব্যবস্থা হতে পারে। ট্রায়াল দিতে মেসিকে নিয়ে আসা হলো স্পেনে। এবার আরেকটা ধন্যবাদ দিন কার্লেস রেক্সাসকে। রেক্সাস তখন বার্সেলোনার ক্রীড়া পরিচালক। অত্যন্ত বিরক্তিভরে আর্জেন্টিনা থেকে উড়িয়ে আনা বাচ্চাটির অনুশীলন দেখতে গিয়েছিলেন। দেখেই চমকে উঠলেন। এ কী! মেসির সামান্য কয়েক মিনিটের কারিকুরি দেখে রেক্সাস এতটাই মোহিত হয়ে গিয়েছিলেন যে, উঠে গিয়ে কাগজ আনার বিলম্ব সহ্য হয়নি। পকেটে ছিল টিস্যু পেপার। তাতেই মেসিকে দিয়ে তার জীবনের প্রথম চুক্তিপত্রটা সই করিয়ে ফেললেন রেক্সাস। শুরু হয়ে গেল বার্সেলোনায় মেসির অতিমানবীয় এক যুগের।
‘কাতালান’ শিল্পীর পায়ে বিশ্ব
একসময় আর্জেন্টাইনরা বলত—মেসি আর্জেন্টাইন নন, কাতালান! স্পেনের কাতালান অঞ্চলের ক্লাব বার্সেলোনার জন্য মেসি এতটাই নিবেদিত এবং এত সাফল্য এই দলের হয়ে পেয়েছেন যে, তাকে কাতালান বলে ভুল করায় দোষের কিছু নেই।
মেসি বার্সেলোনায় এসে কী কী করেছেন, তার খতিয়ান দিতে গেলে মহাভারত হয়ে যাবে। তারপরও সংক্ষেপে একটু বলে নেওয়া যায়। ২০০৪ সালে বার্সেলোনা সিনিয়র দলের হয়ে যাত্রা শুরু করার পর থেকেই ছিলেন আলোচনায়। ২০০৬ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত ইউরোপের সেরা তরুণ খেলোয়াড়ের পুরস্কার পেয়েছেন টানা তিন বার। আর এরপর থেকেই শুরু পায়ের নিচে বিশ্বকে রাখার খেলা।
২০০৯ সাল থেকে টানা চারবার ফিফা ও ইউরোপের বর্ষসেরা ফুটবলার হয়েছেন। তিন বার ওয়ার্ল্ড সকারের সেরা খেলোয়াড় হয়েছেন। তিন বার ইউরোপের গোল্ডেন বুট, দু বার ফিফা ক্লাব কাপের গোল্ডেন বল জিতেছেন। চার বার চ্যাম্পিয়নস লিগের সর্বোচ্চ গোলদাতা এবং পাঁচ বার স্প্যানিশ লিগের সেরা খেলোয়াড় হয়েছেন।
এর বাইরে বিশ্বরেকর্ড সব ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছেন। এক মৌসুমে সব ধরনের ফুটবল মিলিয়ে ৯১ গোল করে গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে নাম লিখিয়েছেন।
আর্জেন্টাইন স্বপ্ন, আর্জেন্টাইন হতাশা
আর্জেন্টিনার হয়ে শুরুটা স্বপ্ন তৈরি করার মতোই ছিল মেসির। খুদে জাদুকরের গল্পটা বাইরের বিশ্ব আসলে প্রথমে জানল আর্জেন্টিনার কারণেই। বার্সেলোনার হয়ে বিশ্ব মাতানোর আগেই মেসি আর্জেন্টিনাকে এনে দিলেন একটা বিশ্বকাপ, যুব বিশ্বকাপ। ২০০৫ সালে নেদারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত ফিফা বিশ্ব যুব চ্যাম্পিয়নশিপ জেতার পথে নিজে জিতলেন গোল্ডেন বল আর গোল্ডেন বুট। লোকে জানল, আরও একজন ম্যারাডোনা আসছেন। কিন্তু জাতীয় দলে এসে পড়ার পর নানাভাবেই হতাশা ছাড়া আর কিছু জুটছিল না কপালে। ২০০৬ বিশ্বকাপে হোসে পেকারম্যানের খামখেয়ালিতে মাঠের বাইরে বসে দেখলেন কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে দলের বিদায়। ২০০৭ কোপা আমেরিকায় দুরন্ত খেলেও ফাইনালে স্বপ্নভঙ্গ হলো। ২০১০ বিশ্বকাপে মোহময় ফুটবল খেলেও গোল পেলেন না এবং আবার কোয়ার্টার ফাইনালে বিদায়। অবশেষে এমন একটা সুর উঠে গিয়েছিল যে, আর্জেন্টিনার হয়ে মেসি কখনোই বার্সেলোনার রূপটা তুলে ধরতে পারেন না। ফলে তার আর ম্যারাডোনা হয়ে ওঠা হচ্ছিল না।
এই কথাটাকে গত বছর তিনেক ধরে মিথ্যে প্রমাণ করে চলেছিলেন। নতুন কোচ আলেহান্দ্রো সাবেলা এসে তাকে অধিনায়কত্ব দেওয়ার পর অনেকটাই স্বরূপে ফিরলেন জাতীয় দলেও। আর্জেন্টাইন রেকর্ড-টেকর্ডও করে ফেলছিলেন। ফলে স্বপ্নটা আকাশ ছুঁতে শুরু করেছিল। বলা হচ্ছিল—এবার অন্তত আর্জেন্টিনার ২৮ বছরের খরা ঘুচিয়ে মেসি হয়ে উঠবেন আরেকজন ম্যারাডোনা। বিশ্বকাপের শুরুটা ম্যারাডোনার চেয়েও ভালো হয়েছিল। সেই ২০০৬ সালে প্রথম বিশ্বকাপ গোলের পর বছরের হিসেবে আটটা বছর পার করে, ৯টা ম্যাচ এবং ৫৪৮ মিনিট পার করে এসে প্রথম গোল পেলেন নিজেদের প্রথম ম্যাচেই। সেই গোলে আর্জেন্টিনা জিতল। গ্রুপ পর্বের প্রতিটি ম্যাচে এই একই চিত্র—মেসি গোল করেন এবং আর্জেন্টিনা জেতে।
নকআউট পর্বে চিত্রটা একটু বদলালো। দলের প্রয়োজনে নেমে এলেন মিডফিল্ডে। ওপরে গোলের জন্য থাকলেন ডি মারিয়া, হিগুয়েইন, আগুয়েরোরা। তাদের দিয়েই ম্যাচ জিতিয়ে জিতিয়ে ফাইনালে নিয়ে এলেন। এই আসার পথে বিশ্বকাপে টানা চার ম্যাচে ম্যান অব দ্য ম্যাচ হয়ে বিশ্বরেকর্ড করলেন। তখন আর কারও সন্দেহ নেই যে এবার বিশ্বকাপটা অন্তত মেসির জন্যও লিখে রেখেছেন বিধাতা।
কিন্তু মেসি যেন এক গ্রিক ট্র্যাজেডির চরিত্র!
ফাইনালে শ্রেয়তর ফুটবল খেলল জার্মানি। কিন্তু সহজ সুযোগগুলো পেল কাউন্টার অ্যাটাকে খেলতে থাকা আর্জেন্টিনা। হিগুয়েইন ও প্যালাসিও পাড়ার ফুটবলের মানের গোল মিস করলেন। এমনকি মেসি তার ট্রেডমার্ক শটেও একটা মিস করলেন। বারবার ডিফেন্স চিড়ে ঢুকে বল দেন, কিন্তু গোল করার কেউ নেই। নিয়তিই যেন ঠিক করে দিল—ট্র্যাজেডি মেসির পিছু ছাড়বে না। সেই ট্র্যাজেডি আর কান্নাতেই তাই শেষ হলো লিওনেল মেসির বিশ্বকাপ। ইতালিয়ান গ্রেট নেস্তা বলেছেন, ‘মেসির সামনে এখনও চমত্কার সুযোগ আছে বিশ্বকাপ জেতার। সেটা আসলেই মেসি পারবেন কি না, আরও চার বছর এই বিধ্বংসী ফর্মটা ধরে রাখতে পারবেন কি না; তা সময় বলবে।’
আমরা শুধু বলতে পারি, একজন কিংবদন্তির আফসোস লম্বাই হচ্ছে। আর কত আফসোস চলবে!
ছবি ও কথা
ছবিটা একদৃষ্টে দেখতে অনেক সাধারণ। কিন্তু ক্যামেরার ফাঁকে রাজধানীর জ্যামজটলা ধরতেই বেরিয়েছিলাম। এর ভেতরে হঠাত্ মৃদু হাসি নিয়ে এই কিশোরের টাকা হাতে উচ্ছ্বাসটি অদ্ভুত এক ভাললাগার জন্ম দিল। নিজের উপার্জন। টানা গুনতে গুনতে স্বপ্নের বুনন। আরো অনেক ব্যাখ্যা আছে ছবিটার। ন্যাচারাল এই ছবিটা আমার নিজস্ব আর্কাইভের অন্যতম একটি সংগ্রহ।
ছবি ও লেখা : আরাফাত সৈকত
