ব্রিকস ব্যাংক :বিকল্প অর্থলগ্নী ও উন্নয়ন সহায়ক উদ্যোগ

আপডেট : ১৭ জুলাই ২০১৪, ২০:৫২
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিকল্প অর্থলগ্নী সংস্থা লইয়া বেশ উচ্চাশা দেখা দিয়াছে। দীর্ঘদিন ধরিয়াই উন্নয়নশীল দেশগুলি এই ধরনের প্রতিষ্ঠানের তাগিদ অনুভব করিলেও সক্ষমতার অভাবে ইতিবাচক কিছু হয় নাই। অবশেষে পাঁচটি দেশের জোট মিলিয়া একটি ব্যাংক করা হইতেছে দেখিয়া অনেকেই আশান্বিত হইয়াছে। এই ব্যাংকটির নাম ব্রিকস ব্যাংক। বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বিকল্প হিসাবেই এই ব্যাংকটি করা হইয়াছে। কারণ, ঐ দুইটি সংস্থার ভোটাধিকার লইয়া অসন্তোষ এবং পশ্চিমা কব্জায় রহিয়াছে এমন ধারণার কারণেই বিকল্প ব্যাংকের উদ্যোগ গ্রহণ করা হইয়াছে। বিশেষজ্ঞরা বলিয়াছেন, ঋণবাজারে ভারসাম্যের জন্যও ইহা দরকার ছিল। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ-এর শর্তযুক্ত ঋণ লইয়া নানান বিতর্ক রহিয়াছে। বাস্তবিক ও প্রায়োগিক দিক বিবেচনা না করিয়াই ঋণদানের শর্ত হিসাবে এমন সব জুড়িয়া দেওয়া হইয়া থাকে, যাহা হিতে বিপরীত হইয়া যায়। ঋণের শর্তগুলি লাগসই না হওয়ায় উন্নয়নশীল দেশগুলি বিকল্প চিন্তা করিতে থাকে। যদিও তাহাদের নানান সীমাবদ্ধতার দরুন তাহা সম্ভবপর হয় নাই। তবে ব্রিকস ব্যাংকের খবরে সবাই খুশীই হইয়াছে। গত ১৫ থেকে ১৭ জুলাই ব্রাজিলের ফোরতালেজায় অনুষ্ঠিত পাঁচ অগ্রসর উন্নয়নশীল দেশের জোট ব্রিকসের শীর্ষ সম্মেলন শেষে এই ব্যাংক প্রতিষ্ঠার ঘোষণা আসে। দেশ পাঁচটি হইতেছে—ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকা। প্রথম ৪টি দেশ লইয়া শুরুতে ব্রিক গঠন করা হইলেও পরবর্তীতে দক্ষিণ আফ্রিকা যুক্ত হওয়ায় ইহার নাম হয় ব্রিকস। এই পাঁচ জাতি জোট একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক জোট হিসাবে আত্মপ্রকাশ করিবার জন্যই এক হইয়াছিল। ইহা সকলেরই জানা যে, প্রতিষ্ঠার পর হইতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বব্যাংক এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন আইএমএফ-এর নেতৃত্ব দিয়া আসিতেছে। ফলে পশ্চিমা বিশ্বের কর্তৃত্বেই থাকিয়া যায় বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ। কিছু অগ্রসর অর্থনীতির দেশ এই কর্তৃত্বকে ভালভাবে দেখে নাই। উপরন্তু, বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ উন্নয়নশীল ও গরিব দেশগুলোকে অর্থায়ন ও সহযোগিতা করিলেও তাহা যথেষ্ট উপকারে আসে নাই। এই অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে বিকল্প অর্থায়নকারী আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান গঠনের একটি চাহিদা তৈরি হয়। ব্রিকস ব্যাংক মূলত তাহারই ফল। ইহা দরিদ্র দেশগুলিকে কিভাবে ঋণদান করিবে তাহা জানা আরো সময়সাপেক্ষ। তবে জানা গিয়াছে, পর্যায়ক্রমে এই ব্যাংকে আরো কয়েকটি দেশকে সদস্য দেশ হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করা হইবে। যাহার মধ্যে আর্জেন্টিনা, মেক্সিকো, ইন্দোনেশিয়ার মতো উন্নয়নশীল দেশগুলির নাম থাকিতে পারে। ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয় হইবে চীনের সাংহাইয়ে। ভারত হইবে প্রথম সভাপতি। রাশিয়া হইবে প্রতিনিধিদের চেয়ারম্যান। পাঁচ সদস্যেরই সমান অংশীদার ও ভোটাধিকার থাকিবে। ব্যাংকের পর্ষদে সদস্য দেশগুলির অর্থ মন্ত্রণালয় বা কেন্দ্রীয় ব্যাংক হইতে প্রতিনিধি পাঠানো হইবে। প্রাথমিক ভাবে ব্যাংকটি ৫ হাজার কোটি ডলার লইয়া শুরু করিলেও ইহার মোট পুঁজি হইবে ১০ হাজার কোটি ডলার। সদস্য প্রতিটি দেশ এক হাজার কোটি ডলার প্রদান করিবে। অনুমোদিত মূলধনের বাহিরে ১০ হাজার কোটি ডলারের একটি কন্টিনজেন্ট রিজার্ভ এ্যারেঞ্জমেন্টও থাকিবে। এই তহবিলে চীন একাই ৪ হাজার ১শ’ কোটি ডলার প্রদান করিবে। রাশিয়া, ব্রাজিল ও ভারত এক হাজার ৮শ’ কোটি ডলার করিয়া এবং দক্ষিণ আফ্রিকা প্রদান করিবে ৫শ’ কোটি ডলার। ব্রিকস নেতারা বলিয়াছেন, ইহার ফলে পাশ্চাত্যের উপর আর্থিক নির্ভরতা কমিবে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলিয়াছেন যে, এই ব্যবস্থায় বিশ্ব আর্থিক বাজারের সংকট হইতে জাতীয় অর্থনীতিকে কার্যকরভাবে সুরক্ষা দেওয়ার ভিত্তি তৈরি হইবে। উল্লেখ করিতে হয় যে, ব্রিকস দেশগুলি বিশ্বের মোট পুঁজি বিনিয়োগের ১১ শতাংশ এবং বৈশ্বিক জিডিপির ২০ শতাংশ যোগান দিয়া আসিতেছে। বিশ্বের মোট জনগোষ্ঠীর ৪২ শতাংশ এই দেশগুলিতে বসবাস করে। দেশগুলির আন্তঃবাণিজ্য ছয় লাখ ১৪ হাজার কোটি ডলার, যাহা বিশ্ব বাণিজ্যের প্রায় ১৭ শতাংশ। ব্রিকস ব্যাংক প্রতিষ্ঠার সংবাদ পাইয়া বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়াং কিম ইহাকে স্বাগত জানাইয়াছেন। আমরাও স্বাগত জানাই। আশা করি এই ব্যাংক দরিদ্র দেশগুলির অর্থায়ন চাহিদা মিটাইতে সক্ষম হইবে এবং বিদ্যমান ব্যাংকগুলির সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক ভিত্তিতে অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে ভূমিকা রাখিবে। এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এআইডিবি) নামেও আরেকটি ব্যাংক প্রতিষ্ঠা পাইতেছে। তাহাও অবকাঠামো উন্নয়নে সহায়ক হইবে বলিয়া আমরা মনে করি।