সরকারি ডাক্তার খাতায় আছে, হাসপাতালে নেই

আপডেট : ১৭ জুলাই ২০১৪, ২২:৪৬
নোয়াখালী জেলার চিকিত্সা ব্যবস্থা অত্যন্ত নাজুক। একদিকে চিকিত্সক, নার্স, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের অসংখ্য পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। অন্যদিকে নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতাল ও বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কর্মরত এক শ্রেণীর ডাক্তারদের কর্মস্থলে উপস্থিতি হাজিরা খাতায় থাকলেও বাস্তবে থাকে না। অনেকে কর্মস্থলে আসেন বিলম্বে, যান ডিউট শেষ হওয়ার আগেই। অধিকাংশ চিকিত্সক ব্যস্ত থাকেন প্রাইভেট হাসপাতাল ও নিজস্ব চেম্বারে। জেলার অধিকাংশ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অপারেশন থিয়েটার নেই। এক্স-রে মেশিন, ইসিজিসহ চিকিত্সা কাজে ব্যবহূত যন্ত্রপাতি বহুদিন ধরে অব্যবহূত ও নষ্ট হয়ে রয়েছে। বিভিন্ন রোগের বেশির ভাগ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হয় প্রাইভেট ক্লিনিকগুলোতে। হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় ওষুধ-পত্র থাকলেও রোগীদের সব ওষুধ দেয়া হয় না। খাবার মান নিম্নমানের। নোংরা পরিবেশ ও দালালদের দৌরাত্ম্যে গরীব ও অসহায় রোগীরা প্রতিনিয়তই হররানির শিকার হচ্ছেন। জানা গেছে, নোয়াখালী জেলার ৩৩ লাখ ৭০ হাজার ২৫১ জন অধিবাসীর স্বাস্থ্য সেবার জন্য ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতাল, ৫০ শয্যার ৬টি ও ৩১ শয্যার ১টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ২০ শষ্যার চর আলগী হাসপাতাল, ১টি বক্ষ্যব্যাধি হাসপাতাল, ২৫টি ইউনিয়ন উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্র, ৫৯টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র এবং ২৬৬টি কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। জেলায় চিকিত্সকের ২৬০টি পদ থাকলেও ১১১টি পদই দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। এতে সাধারণ মানুষ চিকিত্সাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। সবচেয়ে দুরবস্থা সেনবাগ ও হাতিয়া উপজেলার। এ দুই উপজেলায় স্বাস্থ্য ব্যবস্থা একেবারেই ভেঙ্গে পড়েছে। সরকারি চিকিত্সা সেবার নানা অনিয়মের সুযোগে জেলায় গড়ে উঠেছে ৫৬টি প্রাইভেট হসপিটাল ও ৭১টি ডায়াগনষ্টিক ও প্যাথলজি ক্লিনিক। নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতাল:২৫০ শয্যার নোয়াখালী আধুনিক জেনারেল হাসপাতালে আধুনিক চিকিত্সার কোন ছোঁয়া নেই। অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার মধ্যে চলছে হাসপাতালের কার্যক্রম। নেই সিসিইউ, ইসিও ও বার্ন ইউনিট। দীর্ঘদিন অকেজো থাকার পর এক্স-রে মেশিন কিছুদিন আগে চালু হয়েছে। প্রতিদিন এ হাসপাতালে অতিরিক্ত দুই থেকে আড়াইশ’ রোগী ভর্তি থাকে। সিটের বাহরে ফ্লোর ও বারান্দায় এসব রোগীদের থাকতে হয়। রোগীদের চিকিত্সা কাজে নিয়োজিত ৫৫ জন চিকিত্সকের মধ্যে ৪৭ জন, ১৪০ জন সিনিয়র ও জুনিয়র ষ্টাফ নার্সের মধ্যে ১২৫ জন রয়েছে। এছাড়া প্রশাসনিক কর্মকর্তা, ২ জন নার্সিং সুপারভাইজার এবং ২৬ জন তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীর পদ কয়েক বছর ধরে শূন্য রয়েছে। একদিকে হাসপাতালে অতিরিক্ত রোগীর চাপ অপরদিকে চিকিত্সক ও সেবা কাজে নিয়োজিতদের পদ শূন্য এবং কর্মরতরা ঠিকমতো দায়িত্ব পালন না করায় হাসপাতালে চিকিত্সা ব্যবস্থা মারাত্মক ভাবে ব্যাহত হচ্ছে। হাসপাতালে নোংরা পরিবেশ। মশা-মাছি, মলমূত্র ও ময়লা-আবর্জনায় ভরে আছে ড্রেনগুলো। সবচেয়ে নোংরা পরিবেশ মহিলা ও শিশু ওয়ার্ডে। হাসপাতালে রোগীদের নিম্নমানের খাবার সরবরাহ করা হয়। হাসপাতালে দালাল চক্র খুব তত্পর। হাসপাতালের পাশে অসংখ্য প্রাইভেট হাসপাতাল ও ক্লিনিক রয়েছে। অধিকাংশ প্রাইভেট হাসপাতাল ও ক্লিনিকে দালালরা কাজ করে। রাতে রোগী আসলে হাসপাতালে ডাক্তার নেই, চিকিত্সা হবে না বলে জোরপূর্বক রোগীকে টানা-হেঁচড়া করে প্রাইভেট হাসপাতালে নিয়ে যায়। সরেজমিনে দেখা গেছে, হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়কসহ অধিকাংশ চিকিত্সক ডিউটির সময় অনুপস্থিত রয়েছেন। তিন শিফটে চিকিত্সকদের ডিউটি থাকলেও খুব কম সংখ্যক চিকিত্সককেই দুপুর ও সন্ধ্যার পর দেখা যায়। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তাদের অনেকে পাশের বিভিন্ন প্রাইভেট হাসপাতাল, ক্লিনিক ও চেম্বারে প্রাইভেট প্যাকটিসে রয়েছেন। তত্ত্বাবধায়ক ডা. আহসান উল্যা খান জেলা শহর থেকে ১২ কি.মি. দূরে চৌমুহনীতে থাকেন। সরকারি গাড়িতে আসেন আর যান। সেখানে তার নিজস্ব কম্পিউটার ল্যাবটরি লি. ও চেম্বার রয়েছে। তিনি কোন মতে হাসপাতালে দায়সারা গোছের কর্তব্য পালন করে নিজস্ব চেম্বারে রোগী দেখতে চলে যান। অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে তত্ত্বাবধায়ক ডা. আহছান উল্যা খান ক্ষোভের সাথে বলেন, ‘আমি কি সারা দিন অফিসে বসে থাকবো।’ হাসপাতালের আরএমও ডা. ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী জানিয়েছেন, ওষুধ ও খাবার নিয়ে অনেকে অভিযোগ করেন, আসলে সমস্যা ততটা নয়। তিনি আরো জানান, সিসিইউ, ইসিও ও বার্ন ইউনিট চালুর বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। কর্তব্যরত চিকিত্সকরা দেরীতে আসেন এবং কেন তাড়াতাড়ি চলে যান- এ প্রশ্নে তিনি নিরব থাকেন। সুবর্ণচর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স :এই হাসপাতালে স্বাস্থ্য কর্মকর্তার পদটি শূন্য থাকায় তদারকি করার মতো কেউ নেই। চলছে অব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে নামমাত্র চিকিত্সা। এক্স-রে মেশিনসহ বেশির ভাগ যন্ত্রপাতি অকেজো। ৫০ শয্যার এ হাসপাতালে ৭ জন চিকিত্সক ও ১৫ জন কর্মকর্তা ও ৩২ জন কর্মচারীর পদ শূন্য রয়েছে। যারা কর্মরত, তাদের মধ্যে অধিকাংশই প্রাইভেট চেম্বার ও ক্লিনিক নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। কবিরহাট স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স:৩১ শয্যার প্রস্তাবিত এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নির্মাণ কাজ প্রক্রিয়াধীন। এখানে আরএমও এবং মেডিক্যাল অফিসারসহ ৬ জন এবং ১৫ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর পদ শূন্য রয়েছে। উন্নয়ন খাতে পরিচালিত এ উপজেলার চর আলগীতে ২০ শয্যার একটি হাসপাতাল রয়েছে। এ হাসপাতালে ৪ জন মেডিক্যাল অফিসারের মধ্যে ২ জনের পদ শূন্য। এ হাসপাতালে কয়েক লাখ টাকার জরুরি চিকিত্সা কাজের যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। বেগমগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স:৩১ শয্যার এই হাসপাতালের অবস্থা খুবই করুণ। এ হাসপাতালে মাতৃসদন ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র রয়েছে। এখানে আরএমও নেই। একজন জুনিয়র কন্সসালটেন্টসহ তিন জনের পদ শূন্য। অন্যান্য বিভাগের ডাক্তার ও কর্মচারী থাকলেও তা কাগজে কলমে সীমাবদ্ধ। চিকিত্সকরা এসে হাজিরা খাতায় সই করে চলে যান। রোগীদের অভিযোগ সময় মত ডাক্তারদের পাওয়া যায় না। সোনাইমুড়ী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স: এ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বজরা হাসপাতাল নামে পরিচিত। এখানে আরএমও, একজন জুনিয়র কন্সালটেন্ট ও ৯ কর্মকর্তা-কর্মচারীর পদ শূন্য। ৫০ শয্যার এ কমপ্লেক্সে চিকিত্সা নিয়ে নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। রোগীরা ঠিকমতো চিকিত্সা সেবা পান না। কাগজে কলমে হাজির থাকলেও অধিকাংশ চিকিত্সক থাকেন তাদের প্রাইভেট চেম্বার ও ক্লিনিকে। এক্স-রে মেশিন থাকলেও বাইর থেকে করাতে হয়। এখানে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগে সিভিল সার্জন দপ্তর থেকে একটি তদন্ত টিম গঠন করা হয়েছে বলে জানা গেছে। চাটখিল স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স: নানা অনিয়মের মধ্যে চলছে ৫০ শয্যার এ হাসপাতাল। এ কমপ্লেক্সে অপারেশন থিয়েটার, এক্স-রে, ইসিজি ও প্যাথলজির প্রয়োজনীয় সুবিধা থাকলেও তা রোগীরা পাচ্ছেন না। হাসপাতালের কর্মরতদের একাংশ প্রাইভেট হাসপাতাল ও ক্লিনিকের মালিক। দিনের কোন এক সময়ে এসে তারা হাজিরা খাতায় সই দিয়ে যান এবং মাসের শেষে বেতন তুলে নেন। জরুরি বিভাগ চলে সহকারী চিকিত্সক দিয়ে। সহকারী চিকিত্সক নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে রোগীদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগে তদন্ত চলছে বলে সিভিল সার্জন দপ্তর সূত্রে জানা গেছে। উপজেলার ইউনিয়ন উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্র্রে মেডিক্যাল অফিসারের পদ শূন্য। ৮টি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের মধ্যে ৫টিতে সহকারী সার্জন নেই। সেনবাগ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স: ৫০ শয্যার এ হাসপাতালে মেডিক্যাল অফিসার ও জুনিয়র কন্সালটেন্টসহ ১১ জন এবং ১০ জন কর্মকর্তা ও ৪৩ জন কর্মচারীর পদ শূন্য। ১০ জন চিকিত্সক থাকলেও তাদের মধ্যে অনেকে অনিয়মিত। বেশির ভাগ চিকিত্সক প্রাইভেট চেম্বার ও ক্লিনিকে ব্যস্ত থাকেন। আরএমও কোন মতে জোড়াতালি দিয়ে চিকিত্সা দেয়ার চেষ্টা চালান। হাসপাতালের এক্স-রে মেশিনটি দীর্ঘদিন থেকে বিকল। রোগীর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হয় হাসপাতালের বাইরে। দুইটি ইউনিয়ন উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রে মেডিক্যাল অফিসারের পদ এবং ৭টি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে সহকারী সার্জনের পদ শূন্য দীর্ঘ দিন। কোম্পানীগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স: এ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অপারেশন থিয়েটার, এক্স-রে, ইসিজি ও প্যাথলজির সব ধরনের সুবিধা থাকলেও সাধারণ রোগীরা সে সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এ হাসপাতালে জুনিয়ার কন্সালটেন্টদের ৬টি পদ শূন্য, ৪৫ জন কর্মকর্তা ও কর্মচারীর পদ শূন্য। যে সব চিকিত্সক হাসপাতালে কর্মরত রয়েছেন তারা অনেকে প্রাইভেট হাসপাতালের সাথে জড়িত। উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা বেশির ভাগ সময় কর্মস্থলের বাইরে থাকেন বলে অভিযোগ রয়েছে। হাতিয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স:এ উপজেলার ৫ লাখ মানুষ অনেকটাই চিকিত্সা সেবা থেকে বঞ্চিত। এই হাসপাতালে না আছে চিকিত্সক, না আছে কর্মকর্তা-কর্মচারী! চিকিত্সার কিছু যন্ত্রপাতি থাকলেও তা কাজে আসে না। ৫০ বেডের এ হাসপাতালে ২১ জন চিকিত্সকের মধ্যে মাত্র ৬ জন আছেন। এর মধ্যে তিনজনই নিয়মিত অনুপস্থিত থাকেন। গাইনী কনন্সালটেন্ট ডা. মো. আবু নাছের গত ৮ এপ্রিল যোগদান করে ৯০ দিনের ছুটির দরখাস্ত দিয়ে আর আসেননি। শিশু বিভাগের কনন্সালটেন্ট ডা. ইয়াকুব আলী মুন্সী ও চক্ষু বিভাগের কনন্সালটেন্ট ডা. শাহেদ আহামেদ গত ১ জুন কাজে যোগদান করে চলে যান। তারা আর কর্মস্থলে ফিরেননি। বিষয়টি স্বীকার করেছেন খোদ সিভিল সার্জন। এছাড়া এ হাসপাতালে ৩৬ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর পদ শূন্য রয়েছে। ৬টি ইউনিয়ন উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রে ৬ জন মেডিক্যাল অফিসার ও চারটি স্বাস্থ্য পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে চারজন সহকারী সার্জন এর পদ বছরের পর বছর শূন্য। জেলার সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থা সম্পর্কে সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন জানান, চিকিত্সকসহ বিভিন্ন শূন্য পদ পূরণের জন্য আগেই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। বিভিন্ন অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা বিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রদক্ষেপ গ্রহণ করবেন বলে তিনি জানান।