মিরপুরে অপরাধের নেপথ্যে পুলিশ-সন্ত্রাসী সখ্য

আপডেট : ১৭ জুলাই ২০১৪, ২২:৫৫
দিনের পর দিন অপরাধীরা গ্রেফতার হয়নি। পুলিশ কর্মকর্তারাও অপরাধ করে থেকেছেন ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। কতিপয় পুলিশ কর্মকর্তার সন্ত্রাসীদের সঙ্গে গড়ে উঠেছে বিশেষ সখ্য। এসব কারণে সব মিলিয়ে ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে মিরপুরের পরিবেশ। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ব্যবসায়ী পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় সদ্য গ্রেফতার মিরপুর থানার এসআই জাহিদুর রহমান খান পল্লবী থানায় থাকার সময় একই ধরনের অপরাধ করলেও তাকে কোন শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়নি। যে কারণে মিরপুরে এসে তিনি হয়ে উঠেছিলেন আরো বেপরোয়া। জাহিদ দীর্ঘদিন ধরে মিরপুরের বিভিন্ন থানায় দায়িত্ব পালন করেছেন। মিরপুর এলাকায় পুলিশ কেন বেপরোয়া হয়ে উঠেছে— এমন প্রশ্নের জবাবে একজন রাজনীতিবিদ বলেন, প্রথমত এখানে স্থানীয় সংসদ সদস্যদের একজন অন্যজনের বিরুদ্ধে লেগে আছেন। ফলে সুযোগ নিচ্ছে পুলিশ। আর পুলিশের শীর্ষ মহলের আশীর্বাদে এখানকার অনেক কর্মকর্তা দীর্ঘদিন ধরে একই জায়গায় দায়িত্ব পালন করছেন। গ্রেফতার হওয়া পুলিশের এসআই জাহিদ ৭ থেকে ৮ বছর ধরে মিরপুর এলাকায় আছেন। মিরপুরের কাফরুল, পল্লবী, ভাষানটেক, রূপনগর ও মিরপুর থানাতে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। তার বিরুদ্ধে সংসদেও একজন এমপি বক্তব্য দিয়েছেন। স্পিকার তত্কালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে বিষয়টি দেখার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। কিন্তু ওই এসআই-এর বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থাই নেয়া হয়নি। উল্টো তার পছন্দমতো জায়গায় বদলি করা হয়েছে। রমজান শুরুর আগের দিন মিরপুরে সড়ক অবরোধ করে মিছিল-সমাবেশ করেন স্থানীয় সংসদ সদস্য কামাল আহমেদ মজুমদার। তার অভিযোগ ছিল বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রীর ছবি সম্বলিত তোরণ পুলিশ ভেঙে ফেলেছে। পাশাপাশি বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রীর ছবি অবমাননাও করা হয়েছে। এমপির প্রতিবাদ জানানোর প্রক্রিয়া ভুল হলেও একজন পুলিশ কর্মকর্তার নেতৃত্বে এভাবে এমপির বানানো তোরণ ভেঙে ফেলতে পারেন কি-না তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। আর এই তোরণ ভাঙার কাজ সিটি কর্পোরেশনের। এ নিয়ে স্থানীয় রাজনীতিবিদদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় সংসদ সদস্য কামাল আহমেদ মজুমদার বলেন, উক্ত পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিচার হওয়া উচিত। কারণ তিনি বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রীর ছবি অবমাননা করেছেন। অপর একজন নেতা বলেন, এই পুলিশ কর্মকর্তার পরিবারের একজন সদস্য বিএনপির পদধারী নেতা। অভিযোগ রয়েছে, এসআই জাহিদুর রহমান খান কাফরুলে থাকার সময় বছর তিনেক আগে এক ব্যবসায়ীকে ধরে তার বাড়ি থেকে শতাধিক ভরি স্বর্ণালংকার নিয়ে যান। পাশাপাশি ১৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। টাকা না দিলে ওই ব্যবসায়ীকে ক্রসফায়ারে হত্যার হুমকি দেন। পরে ওই ব্যবসায়ী ১৫ লাখ টাকা দিয়েই মুক্তি পান। তবে স্বর্ণালংকার ফিরে পাননি। বিষয়টি স্থানীয় সংসদ সদস্য কামাল আহমেদ মজুমদার সংসদেও তোলেন। স্পিকার বিষয়টি দেখার দায়িত্ব দেন তত্কালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুনকে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জাহিদের কিছুই হয়নি। তিনি ছিলেন বহাল তবিয়তে। সর্বশেষ গ্রেফতার হওয়ার পর জাহিদ দাবি করেছেন, তিনি যা করেছেন তার সবই ওসির নির্দেশেই করেছেন। নিজে বাঁচার জন্য ওসি এখন তার উপর দিয়েই সব চালিয়ে দিচ্ছেন বলে দাবি জাহিদের। মিরপুর থানা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মাহমুদুর রহমান ইত্তেফাকের কাছে অভিযোগ করে বলেন, এসআই জাহিদ এতদিন মিরপুরে ছিলেন উপ-কমিশনারের শেল্টারে। তার প্রশ্রয় ছাড়া জাহিদ এতদিন ধরে পুলিশের একই বিভাগে থাকতে পারতেন না। তিনি বলেন, ব্যবসায়ীকে থানায় ধরে নিয়ে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় শুধু এসআই নয়, ওসি সালাহউদ্দিন খানও জড়িত। স্থানীয়রা বলছেন, পাশাপাশি দু’টি আসনের দুইজন সংসদ সদস্যের মধ্যে রেষারেষির কারণেই পুলিশ সুযোগ নিচ্ছে। এই এলাকার ব্যবসায়ীরাও অসহায়। নিয়মিত চাঁদা দিয়েই চলতে হচ্ছে তাদের। কখনও পুলিশকে আবার কখনও সন্ত্রাসীকে চাঁদা দিতে হয়। সামগ্রিক বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশের মিরপুর বিভাগের উপ-কমিশনার ইমতিয়াজ আহমেদ ইত্তেফাককে বলেন, একজন এসআই কোন থানায় যাবেন সেটা দেখে ডিএমপি হেডকোয়ার্টার। তিনি কোন অপরাধীকে কখনও প্রশ্রয় দেননি। ২০০৫ সালে বিএনপি-জামায়াত জোটের শাসনামলে রাজধানীতে দায়িত্ব পালনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সব সময় তিনি পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন।