ঈদ এলেই মহাযন্ত্রণার কারণ হয় মহাসড়ক

আপডেট : ১৮ জুলাই ২০১৪, ২২:৪৭
প্রতি বছর মহাসড়কে যানজটের শিকার হওয়া যেন যাত্রীদের নিয়তি লিখন। প্রতিটি ঈদের আগে ও পরে মানুষের এই দুর্ভোগের যেন শেষ নেই। স্বজনদের কাছে ঈদের আনন্দ করতে যাওয়া যেন সীমাহীন দুর্ভোগের আরেক নাম। ভুক্তভোগীরা বলছেন, পুলিশ প্রশাসনের অবহেলা ও চাঁদাবাজির কারণে মহাসড়কগুলো লোকাল বাস, দোকানদারদের দখলে থাকে। আর তাদের দৌরাত্ম্যে আতঙ্কময় যাত্রার মুখোমুখি হতে হয় লাখো মানুষকে। রাজধানী ঢাকা থেকে বাস বের হওয়ার পথে যেসব পয়েন্টে যানজট বাঁধে সে সব স্থান ঘুরে এবং মানুষের সঙ্গে কথা বলে এবারও ভয়াবহ জ্যামের আশঙ্কাকে উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না। রাজধানী ঢাকা থেকে সারাদেশে যাওয়ার প্রধান পথ হচ্ছে চারটি। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক, ময়মনসিংহ সড়ক, সাভার-নবীনগর হয়ে বঙ্গবন্ধু সেতু ও ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক। এসব রাস্তায় ঈদের দিন কয়েক আগে থেকে ভয়াবহ জ্যামের সৃষ্টি হয়। ৫-৬ ঘণ্টার পথ পেরুতে ১০ থেকে ১২ কখনো কখনো ১৬ ঘণ্টা লেগে যায়। রাস্তায় আটকা পড়ে যাত্রীরা সীমাহীন দুর্ভোগের শিকার হন। ঈদের আনন্দ তো মাঠে মারা যায়ই উপরন্তু গোটা ব্যাপারটা তাদের কাছে যন্ত্রণায় পরিণত হয়। এসব পথে প্রধানত জ্যাম বাঁধে গাবতলী, আমিন বাজার, সাভার বাজার হয়ে নবীনগর মোড় হয়ে চান্দিনা বাসস্ট্যান্ড হয়ে কালিয়াকৈর পর্যন্ত। অপর দিকে টঙ্গী ব্রিজ, গাজিপুর চৌরাস্তা, রাজেন্দ পুর হয়ে বাঘের বাজার পর্যন্ত। আর ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক তো ফ্লাইওভারের পর থেকে শনির আখড়া, কাঁচপুর ব্রিজ হয়ে কুমিল্লা পর্যন্ত দীর্ঘ জ্যামের কারণে পুরো রাস্তা অকার্যকর হয়ে পড়ে। যানজটের জন্য সড়ক মহাসড়কের পাশে সওজের জমিতে অবৈধভাবে গড়া ওঠা কাঁচাবাজার, ফুটপাতে হকারদের দৌরাত্ম্য, নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে রাস্তার ওপর যানবাহন এলোপাথাড়ি পার্কিং, রাস্তা আটকে লোকাল বাসের যাত্রী তোলাকেই মূলত দায়ী করছেন দূরপাল্লার বাসের চালক, পরিবহনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। সেইসঙ্গে মহাসড়কে শৃংখলার দায়িত্বে থাকা ট্রাফিকদের কাজে অবহেলা ও চাঁদাবাজিকে সড়কে যানজটের জন্য অনেকটা দায়ী বলে অভিযোগ করেন পরিবহন শ্রমিকরা। এর পাশাপাশি মহাসড়কের মূল যানজটের কারণ হিসাবে খানাখন্দে ভরা রাস্তাকে দায়ী করা হয়ে থাকে। টঙ্গী-আশুলিয়া সড়কের বিভিন্ন স্থানে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। এসব সড়কে যানবাহন চলাচলে মারাত্মক বিঘ্ন সৃষ্টি হয়। অনেক ক্ষেত্রে ঝুঁকি নিয়ে যানবাহন চলাচল করে। বৃষ্টি হলে এ ভোগান্তি বেড়ে যায় বহুগুণে। তখন সড়কে যানবাহন বন্ধ থেকে যানজটের স্থায়ী রূপ লাভ করে। ঈদের সময় যানবাহনের চাপ বাড়ে। খারাপ রাস্তার জন্য পরিবহনগুলো দ্রুত যেতে পারে না। স্বভাবতই যানজট বাড়তে থাকে। কল্যাণপুরে শ্যামলী পরিবহনের ম্যানেজার আসলাম হোসেন বাবলু জানান, সাভার বাজারের রাস্তার ওপরের দোকান-পাট উচ্ছেদ করা, নবীনগর থেকে কালিয়াকৈর, এলেঙ্গা পর্যন্ত লোকাল বাসগুলো যাতে রাস্তার ওপরে দাঁড়িয়ে না থাকে-এ দুটি জিনিস যদি পুলিশ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে- তবে মহাসড়কে কোন যানজট হবে না। কিন্তু আইন-শৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা এটা করে না। মহাখালী বাসস্ট্যান্ডে ঢাকা-ময়মনসিংহ রুটে চলাচলকারী এনা পরিবহনের কাউন্টার মাস্টার আব্রাহাম পিউরিফিকেশন উজ্জ্বল বললেন, টঙ্গী বাজার থেকে গাজীপুর পর্যন্ত সড়কের মাঝের টার্নগুলো বন্ধ করে দিলে এই যানজট কমে আসবে। এছাড়া লোকাল বাস নিয়ন্ত্রণের কথাও বললেন তিনি। ঈদে আতঙ্কের নাম ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক সাভার থেকে রিপোর্টার তুহিন খান জানান, ঈদকে সামনে রেখে ঘরমুখো মানুষের বাড়ি ফিরতে ভোগান্তির যেন শেষ নেই। রাজধানী থেকে ছেড়ে যাওয়া পরিবহনগুলো যানজটে আটকে থাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। রাজধানীর প্রবেশদ্বার ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের আমিনবাজার, নবীনগর, সাভার বাজার বাসস্ট্যান্ড,নবীনগর-কালিয়াকৈর মহাসড়ক, বাইপাইল, টঙ্গী-আশুলিয়া সড়কের জামগড়া এলাকায় সবসময় যানজট লেগেই থাকে। ঈদ এলে তা এক বিভীষিকায় পরিণত হয়। রাজধানী থেকে বের হওয়ার প্রধান পথ হচ্ছে আমিন বাজার এলাকা। এই আমিন বাজার এলাকা পার হতে ১ থেকে ২ ঘন্টা সময় লেগে যায়। এলাকার বাসিন্দা দেলোয়ার হোসেন জানান, ঈদের সময় কোন নিয়ন্ত্রণ থাকে না। ট্রাক, বাস এই স্থানে কোন নিয়ম মানে না। তবে সড়কের উপর দাঁড় করিয়ে রাখা ট্রাক ও বাসই যানজট সৃষ্টির মূল কারণ বলে তিনি মনে করেন। একই অবস্থা মহাসড়কের হেমায়েতপুর বাসষ্ট্যান্ড, সাভার বাজার বাসষ্ট্যান্ড, নবীনগর বাসষ্ট্যান্ড, বাইপাইল ও জামগড়া বাসষ্ট্যান্ডে। যানজট এখন এসব ষ্ট্যান্ডে নিত্য সঙ্গী। দুই পাশে সারি সারি যানবাহন আটকে থাকায় দূর দূরান্ত থেকে যানবাহনে আসা যাত্রীদের ভোগান্তি চরমে পৌঁছায়। দুর্ভোগের আরেক নাম ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে টঙ্গী থেকে গাজীপুর গাজীপুর প্রতিনিধি মুজিবুর রহমান জানান, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের গাজীপুর অংশে বেশ কয়েকটি স্থানে নিত্যদিন তীব্র যানজট লেগেই থাকে। ঈদ এলে এসব রাস্তা যেন ছবির মত স্থির দাঁড়িয়ে থাকে। টঙ্গী ব্রিজ থেকে গাজীপুর চৌরাস্তা পেরোতেই ৩-৪ ঘণ্টা সময় লেগে যায়। এসব স্থানে যানজট নিরসনে প্রশাসন ও পুলিশের পক্ষ থেকে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলেও যানজট থেকে মুক্তি পাচ্ছে না এ রুটে চলাচলকারী যাত্রীসাধারণ। গাজীপুর জেলার প্রবেশমুখ রাজধানী ঢাকার দিকে আব্দুল্লাহপুরের কাছে টঙ্গী ব্রিজের দক্ষিণ প্রান্ত থেকে যানজটের সূত্রপাত হয়। এর পরে টঙ্গী বাজার, স্টেশন রোড, মুন্নু গেট, চেরাগআলী মার্কেট, কলেজগেট, হোসেন মার্কেট, বাস্তুহারা, গাজীপুরা, বড়বাড়ি, বোর্ড বাজার, সাইনবোর্ড, মালেকের বাড়ি, ভোগড়া বাইপাস মোড় এবং চান্দনা চৌরাস্তা পর্যন্ত প্রায় ১২ কিলোমিটার পথে যানজট বর্তমানে নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। এ সব স্থানে যানজট লেগে থাকার অন্যতম কারণ হচ্ছে অবৈধ পার্কিং, রাস্তার ওপর দোকান পাট, কাঁচাবাজার, নির্মাণ সামগ্রী রেখে দেয়া, রাস্তার পাশে আবর্জনার স্তূপ এবং বৃষ্টির পানি জমে থাকা। এ ছাড়া প্রতিদিন সড়কের উভয় পাশে গড়ে উঠা শত শত শিল্প কলকারখানার হাজার হাজার পোশাক শ্রমিক দিনে অন্তত ৪/৫ বার দলে দলে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক পারাপার হয়ে থাকে। এ জন্যও এ সড়কে যানজট লেগে থাকতে দেখা যায়। গাজীপুর শিল্প এলাকা হওয়ায় ঢাকা ও অন্যান্য স্থান থেকে ওই সব কারখানার মালিক, শ্রমিক কর্মচারী ও বিদেশি বায়াররা প্রতিদিন এ সড়ক দিয়ে গাজীপুরের কারখানাগুলোতে যাতায়াত করেন। এ ছাড়া জেলার আভ্যন্তরীণ রোডের যানবাহন ছাড়াও দেশের উত্তরাঞ্চলের ৩২টি রুটের যানবাহন এ সড়ক ব্যবহার করে চলাচল করে। উত্তরাঞ্চল থেকে পণ্যবাহী ট্রাক, কভার্ড ভ্যান, পিকআপ ঢাকাসহ দেশের দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলে যাতায়াত করে। ফলে এটি একটি ব্যস্ত সড়ক হওয়ায় এতে যানবাহনের চাপও অত্যন্ত বেশি। মহাসড়কের ওই অংশে যানজট লেগেই থাকে। ট্রাফিক পুলিশকে প্রতিদিন এ যানজট নিরসন করতে হিমশিম খেতে হয়। গাজীপুর ট্রাফিক বিভাগের এএসপি সাখাওয়াত্ হোসেন জানান, যানজট নিরসন করতে হলে প্রথমে ঢাকার প্রবেশমুখ আব্দুল্লাহপুর এলাকা উন্মুক্ত রাখতে হবে। সড়কের ওপর পর্যাপ্ত ফুট ওভার ব্রিজ নির্মাণ, স্টেশন রোড এলাকার পরিধি বৃদ্ধি এবং এ সড়কের বিভিন্ন স্থানে মোট ৮টি টার্ন বিদ্যমান এ টার্ন গুলোর জন্যও যানজটের সৃষ্টি হয়। এ ছাড়া মহাসড়ক থেকে অবৈধ রিকশা ও কাঁচা বাজার অপসারণ করতে হবে। তিনি জানান, স্বল্প সংখ্যক ট্রাফিক পুলিশ এ এলাকায় দায়িত্ব পালন করছে। যা প্রয়োজনের তুলনায় মাত্র ১০ ভাগের এক ভাগ। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক এক সীমাহীন ভোগান্তির নাম সোনারগাঁও (নারায়ণগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ঢাকা থেকে মেঘনাব্রিজ পর্যন্ত ৪টি পয়েন্টে সবসময় যানজট লেগেই থাকে। যানজট লেগে থাকা এলাকাগুলো হচ্ছে শনির আখড়া, কাঁচপুর, মদনপুর এবং মোগড়া পাড়া চৌরাস্তা। এ মহাসড়কে যানজটের প্রধান কারণ হচ্ছে যত্রতত্র লোকাল বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠানামা করানো, যেখানে সেখানে রাস্তার দুই পাশে মালবাহী ট্রাক থামিয়ে রাখা, যত্রতত্র বেবি টেম্পো স্ট্যান্ড, রাস্তার ওপর দুই পাশে দোকান, এলোপাতাড়িভাবে যাত্রীদের রোড ক্রস করা। যানজট সম্পর্কে কাঁচপুর পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ বলেন, কাঁচপুর, মদনপুর, যানজটের মূল কারণ হল- সিলেট, ভৈরব, কিশোরগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়ীয়াসহ দূরপাল্লার গাড়িগুলো কাঁচপুর মোড়ে এসে মোড় ঘুরতে অনেক সময় লাগে। ফলে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। তাছাড়া মোড়ে গাড়ি দাঁড় করিয়ে যাত্রী ওঠানামা করে লোকাল গাড়িগুলো। সর্বোপরি মোড়টি আরো বেশি প্রশস্ত হলে হয়ত এই যানজট কিছুটা হলেও রোধ করা যেত। মদনপুর ডান বাম উভয় দিকেই এলোপাতাড়িভাবে গাড়িগুলো রোড ক্রসিং করে ফলে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। যানজট নিরসন করতে হলে এখানে ট্রাফিক কন্ট্রোল সার্ভিস চালু করা খুবই জরুরি বলে এলাকাবাসী মনে করেন। তবে ঈদ যতই ঘনিয়ে আসছে যানজটের তীব্রতা ততই বেড়ে চলছে। সোনারগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানান, এবারে যাতে নির্বিঘ্নে ঘরে ফিরে মানুষ ঈদ উত্সব পালন করতে পারে এই ব্যাপারে যানজটমুক্ত রাখতে সম্ভাব্য সকল প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে।