ভাবছি কিভাবে শুরু করা যায়! কোথা থেকে শুরু করলে ঠিক হবে? বিয়ে এবং ঈদ— দুটোই সামাজিক একটি প্রতিষ্ঠানের নামান্তর। যেখানে চর্চিত হয় ভালোবাসা, পারস্পরিক সমঝোতা, সম্প্রীতি, বন্ধন। দুটোর মধ্যেই একত্রিত হবার অভিপ্রায় সংযুক্ত। বিয়ের মধ্য দিয়ে একত্রিত হয় দুজন ভিন্ন মানুষ, দুটি ভিন্ন পরিবার। ঈদের মধ্য দিয়ে একত্রিত হয় অসংখ্য পরিবার, অগণিত মানুষ। আর তাই বিয়ে এবং বিয়ের পর প্রথম ঈদ যখন আড্ডার বিষয় তখন সেখানে স্বপ্নের কথা থাকবে, ভালোবাসার কথা থাকবে-এটাই তো স্বাভাবিক। মানুষের সহজাত প্রবণতা হলো সে আনন্দ খোঁজে, শান্তি চায়, আকুল থাকে ভালোবাসার যাপিত মুহূর্তগুলোর জন্য। আড্ডার শুরুতেই ভাবগম্ভীর ভাষায় রিতু একথা বলতেই সবার হাস্যোজ্জ্বল প্রতিক্রিয়া, ‘আঁতেল’।
সেতু, রিতু, সিথী, কান্তা, বাবলি, ইভা, নিশু, শম্পা, সান্তনা— ওরা প্রত্যেকে ছোটবেলার বন্ধু। স্কুল পেরিয়ে কলেজ, কলেজ পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশাল প্রাঙ্গণ পেরিয়ে জীবনের ময়দানে প্রতিনিয়ত ওরা যুদ্ধরত। কেউ চাকরি করছে, কেও ছোটখাটো ব্যবসা। কেওবা আবার পুরোদস্তুর সংসারী। ছেলে মেয়েকে স্কুলেও দিয়ে দিয়েছে কেও কেও। ওদের মধ্যে অনেকেই আবার সদ্য বিবাহিত। সব রকম ব্যস্ততার মাঝেও ওরা সময় করে মাঝে মাঝেই এক হয়। আজও হয়েছে। আজ ওদের আড্ডার মধ্যমনি নববিবাহিত বন্ধুরা। আর কদিন পরেই যারা পালন করবে বিয়ের পর প্রথম ঈদ। এ বিষয়ে অভিজ্ঞরাও বেজায় খুশী। মুরুব্বিয়ানা করতে কার না ভালো লাগে! তারাও ঠিক করে রেখেছে আজকের আড্ডায় তারা চলে যাবে নষ্টালজিয়ায়— বিয়ের পর প্রথম ঈদের সেই দিনগুলোতে।
রিতুর কথার রেশ ধরেই সেতু বলল, ‘আমি কিন্তু ভাই বলব বিয়ের পর প্রথম ঈদটা ছেলেদের চাইতে মেয়েদের কাছে অন্যরকম হয়। মেয়েদের ক্ষেত্রে পরিবর্তনটা বেশি আসে। হতে পারে তা আনন্দদায়ক কিংবা বেদনাদায়ক।’ একমত হলো ওরা প্রত্যেকেই। বিয়ের পর জীবনযাপনের ক্ষেত্রে অভ্যস্ততায় পরিবর্তন আসে মেয়েদের। তাদের একেবারেই ভিন্ন একটি পরিবেশ, পরিবারের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে হয়। খাপ খাইয়ে নেয়ার সেই ধারাবাহিকতায় ঈদটাও মিলে মিশে একাকার।
কান্তা স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলল, ‘আমার খুব একটা সমস্যা হয়নি। বাসার পাশেই আমার মার বাসা। চাঁদ রাতেও নিজের বাসার কাজ গুছিয়ে মার বাড়িতে একটু ঢুঁ দিয়ে এসেছি। আবার ঈদের দিন সকালেও অল্প সময়ের জন্য হলেও দেখা করে এসেছি। ও (স্বামী) নিজেও নামাজ পরে মা বাবাকে সালাম করে এসেছে। আমার শ্বশুও বাড়ীর মানুষগুলো খুবই অন্যরকম। তারাও আমাকে বার বার তাগিদ দিয়েছেন।’ কিন্তু যাদের বিয়ের পর প্রথম ঈদটা করতে হয় অনেক দূরে, ভিন্ন একটি পরিবেশে? তাদের বেলায় কেমন হয় ঈদের দিনটি। বাবলি বলল একটু ভিন্ন কথা। ‘আসলে সংসারের কিছু অনুভূতি থাকে যা কখনই বলা হয় না কিংবা বলা ঠিকও না। এই যেমন আমি বেড়ে উঠেছি পুরোপুরি ঢাকা শহরে। বিয়ের পর প্রথম ঈদটা করতে হয়েছিল গ্রামের বাড়ীতে। বিয়ের আগে কোনদিন গ্যাসের চুলোতেই রান্না করিনি, সেখানে গ্রামে ছিল লাকড়ি চুলা। শ্বশুর বাড়ির কেও যাতে কষ্ট না পায় কিংবা না ভেবে নেয় অহংকারী সেজন্য আপ্রাণ চেষ্টা ছিল আমার। কিন্তু মানিয়ে নিতে আমার খুব কষ্ট হয়েছিল। আমি ছিলাম বাবা মায়ের একমাত্র মেয়ে। সারাটা দিন বাবা মায়ের কথা মনে হয়েছিল। কেমন যেন একা একা লাগছিল। স্বামীকেও বলতে পারছিলাম না।’
নববিবাহিতরা এসব দুঃখ দুঃখ স্মৃতি শুনে ভয় পেয়ে যেতে পারে বলে মন্তব্য করে ইভা বলল, ‘আমার বিয়ের পর প্রথম ঈদটা ছিল ভীষণ এক্সাইটিং। বাবার বাড়ীতে স্বাধীনতা ছিল কম। বিয়ে হয়েছিল বন্ধুর সাথে। বন্ধুবান্ধব মিলে বিয়ের পর প্রথম ঈদটা ছিল দারুণ। অভিজ্ঞদের অভিজ্ঞতাগুলোর পর এবার নববিবাহিতরা জানাল তাদের পরিকল্পনার কথা। ভীষণ এক্সাইটেড তারা বিয়ের পর প্রথম ঈদটা কিভাবে স্মরণীয় করে রাখা যায় তা নিয়ে। শম্পা ভীষণ আনন্দিত সালামি পাবার প্রত্যাশায়। পরিবারের ছোট ছেলের সাথে বিয়ে হয়েছে বিধায় এবারের ঈদে গিফটও পেয়েছি প্রচুর, সালামিও হবে সেইরকম!
ঈদের রান্নাবান্না সামলানো নিয়ে খুব বেশি চিন্তিত নয় তারা। প্রত্যেকেই মনে করে তাদের স্বামীরা যথেষ্ট সহানুভূতিশীল। শ্বশুর বাড়ির লোকেরাও বিবেচক। এখন কি আর সেই দিন আছে যে মেয়ে মাত্রই তার জায়গা রান্নাঘরে! কোন কিছুই প্রেসার নেই বউয়ের উপর। নিজে থেকেই তারা তাদের প্রিয় মানুষগুলোকে নিয়ে সাজিয়েছে ঈদ এর নানান পরিকল্পনা।
নিশুর অবশ্য মনটা খারাপ। বাবা মারা যাবার পর সেই ছিল মায়ের একমাত্র বন্ধু। মাকে ছেড়ে বিয়ের পর এবারের প্রথম ঈদটা তাই নিশুর জন্য অতটা আনন্দদায়ক নয়। এই নিয়মটা মানতে খুব কষ্ট হয় নিশুর। কান্তা আশ্বস্ত করল নিশুকে। এখন যুগ পাল্টেছে। বউকে এখন আর কেও নিজস্ব কেনা সম্পত্তি ভাবে না। দুজনেই দুজনার বন্ধু হয়ে দুজনার কষ্ট বাগ করে নেয়।
লা রোশেফুকোর বলেছিলেন, ‘ভালো বিবাহ আছে কিন্তু অপরূপ নিখুঁত সুন্দর কোন বিবাহ নাই।’ ভালো মন্দ মিলিয়ে জীবনের সাথে মানিয়ে নেয়ার মতোই বিবাহ একটি সহানুভূতির বন্ধন। পল ভ্যালরি বলেছেন, ‘প্রতি পরিবারেই একটা একঘেয়েমি জনিত ক্লান্তির বোধ গোপনে ভেতরে ভেতরে লুকিয়ে থাকে যেজন্য তার সদস্যরা, সেখান থেকে পালিয়ে গিয়ে নিজ নিজ জীবনযাপন করে। প্রতি পরিবারেই আবার একটা প্রাচীন ও প্রবল শক্তি বিরাজ করে যা লক্ষ্য করা যায় তার সদস্যরা যখন রাত্রে নৈশাহারের জন্য খাবার ঘরে মিলিত হয়, যখন তারা অবাধে নিজ নিজ রূপকে মেলে ধরতে পারে।’ বিয়ের পর প্রথম ঈদে তাই নতুন এবং পুরোনো দুই পরিবারকে ঘিরেই নতুন করে বাড়ুক ভালোবাসা, ত্যাগ এবং তিতীক্ষার মনমানসিকতা। ঘুরে ফিরে বারে বারে ঈদ আসে ঈদ চলে যায়/ ঈদ হাসতে শেখায়/ ভালোবাসতে শেখায়/ ত্যাগের মহিমা শেখায়।
ছবি: কে-ক্রাফট
