শিল্পী দিলারা বেগম জলি। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে শিল্পচর্চায় মগ্ন। সব-সময়ই তার শিল্পকর্মে প্রাধান্য পেয়েছে জেন্ডার। অনুষঙ্গ উপজীব্য চরিত্র, ভাবনা ও বিন্যাসে তার শিল্পকর্ম নারীর জীবন, যন্ত্রণার গহন গল্পকথা হয়ে ওঠে। সম্প্রতি বেঙ্গল গ্যালারি অব্ ফাইন আর্টস শিল্পীর একক শিল্পকর্ম প্রদর্শনীর আয়োজন করতে চলেছে। এবারে শিল্পীর শিল্পকর্মে উঠে এসেছে গার্মেন্টস কর্মীদের জীবনের যন্ত্রণার নিনাদ। দেশের এতো বড়ো একটি উল্লেখযোগ্য শিল্পখাতে সম্পৃক্ত আছে লক্ষ লক্ষ নারী শ্রমিক। অথচ বছরের পর বছর ধরে এরা কেবল বঞ্চনারই শিকার নয়, বিপন্ন মানবতার দুঃসহ পরিণতির দলিলের উপাখ্যান হয়েছে। আর তাই একাট্য বাস্তবতা তাজরিন, রানা প্লাজার বিপন্ন অন্তর্বেদনা সমাজ বাস্তবতার দৈনন্দিন অস্তিত্ব, প্রতিবাদ, সঙ্কট ও পরিণতির রূপায়ণে ঋদ্ধ। শিল্পী দিলারা বেগম জলির শিল্প মাধ্যমের বিবর্তন বৈচিত্র্যময়। শিল্পের ফ্রেমবন্দি রূপ থেকে তিনি তার শিল্পকর্মকে রূপায়িত করেছেন ভিন্ন ভাষায় ও বহুমাত্রিক রূপকল্পে। ক্যানভাস, প্রিন্ট, ভাস্কর্য ছাপিয়ে ইন্সটলেশন বা স্থাপনা শিল্প অতপর পারফর্মিং আর্ট ও ভিডিও ফুটেজে তিনি তুলে ধরেছেন নারীসত্তার নৈমিত্তিক বাস্তবতা, স্বপ্ন ও বাঁচার লড়াই। শিল্পী দিলারা বেগম জলির জন্ম খুলনায়। পাঁচবোন তিন ভাইর বড়ো সংসারে বেড়ে উঠেছেন, বাবা ছিলেন রেলওয়েতে মা ছিলেন শিক্ষক। চট্টগ্রামেই বেড়ে ওঠা, চারুকলার পাঠ নেয়া, আরও একজন নন্দিত শিল্পী ঢালী আল মামুনের সঙ্গে জীব-বন্ধনের সঙ্গী হওয়া এবং নিয়ত শিল্পের সঙ্গে জীবনের গল্প বলার যাত্রাটা তিনিও অবিচল রেখেছেন জীবন যুদ্ধের নানা চড়াই উত্রাইয়ে সওয়ার থেকে।
বছর তিনেক আগে দেশের অকাল প্রয়াত বরেণ্য চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদ ও খ্যাতিমান সাংবাদিক ও সিনেমাটোগ্রাফার মিশুক মুনীরের সঙ্গে একই মাইক্রোবাসে ভয়াবহ দুর্ঘটনার শিকার হয়েছিলেন শিল্পী দম্পতি ঢালী আল মামুন ও দিলারা বেগম জলি। জীবনের দুঃসহ বাস্তবতাকে খুব অন্তিকভাবে দেখেছেন শিল্পী। শত যন্ত্রণায়ও সচল রেখেছেন শিল্প চর্চার নিত্য চলা। এবারের শিল্পকর্মে তাজরিন নামা, সুমাইয়া, রানা-প্লাজার কথা এমন এক্সপ্রেশন ধর্মী কাজে শিল্পী নিজেই পারফর্ম করেছেন। বাংলাদেশের দর্শক, শিল্প প্রিয় মানুষেরা ছাড়াও সকল মানুষের কাছে যা হয়ে উঠবে মানবতাবাদী ভাষায় দৃঢ় এক মানবিক মেসেজ! ‘তাজরিন নামা’য় শিল্পী স্বয়ং পারফর্ম করেন দহনের অনুভব, বাঁচার আকুতি অতপর নির্মম দহনের নিথর পরিণতি। এছাড়াও রানা প্লাজার একটি ভিডিও পারফর্মিং এ দেখা যায় ভেসে আসছে সেলাই মেশিনের অবিশ্রান্ত চলার শব্দ, সূতার পরতে পরতে মোড়ানো শিল্পী... গ্রাস হয়ে গেলেন সূতার মধ্যেই। এছাড়াও শাড়িতে স্ক্রীন প্রিন্ট, নিখোঁজনামা, ব্লাউজ, গার্মেন্টস কর্মীদের ছিদ্র খাবার বাসন, সংখ্যা ১১৩৫ অর্থাত্ তাজরিন দুর্ঘটনায় নিখোঁজ হয় ১১৩৫ জন শ্রমিক, সুঁই দিয়ে ছিদ্র করে করে পেপারে কিছু কাজ করেছেন শিল্পী, ৩০টি ড্রইং, ইনস্টলেশন, ভিডিও ও ভিডিও পারফর্মিং প্রাধান্য পাবে শিল্পীর সাম্প্রতিকতম আসন্ন প্রদর্শনীতে। শিল্পী বলছিলেন, ‘যাপিত-জীবনের নিদারুণ বাস্তবতা ও তার প্রতিচ্ছবি আমাকে স্পর্শকাতর ও শিল্পের কাছে দায়বদ্ধ করে তোলে। প্রতিদিনের সংবাদপত্রের খবর, যাপিত-জীবনের অসহায়ত্বের মানবিক আকুতি, সংহিংসতা.. লড়াই আমার কাজের মূল-প্রেরণা। জীবন ও জীবিকার জন্য গার্মেন্টস কর্মীদের নিদারুণ ও নিরন্তর লড়াই এর কথাগুলো আমি আমার শিল্প মাধ্যমে প্রকাশ করেছি। অনেক না বলা কথা এবং অনেকে যা বলতে পারেনি সে কথাগুলোই উঠে এসেছে এবারের প্রদর্শনীর কাজে।’
দেশে ও বিদেশে বহু দলীয় ও একক প্রদর্শনী করেছেন শিল্পী। বিবর্তনশীল তার প্রকাশের বৈচিত্র্য। প্রাধান্য পেয়েছে নারীসত্তা! সেজন্যই তাঁর বিগত কাজগুলোতে দেখা যায়, ‘লাল সালু’ রোকেয়ার কথা, বিজ্ঞাপনে নারী, ক্যালেন্ডারে নারী, বস, কোরবানি, চাঁদের অমাবস্যা, ঘরে বাইরে, দিবা-রাত্রীর কাব্য, নূরজাহান, তাজরিন নামা, উই, সুমাইয়া... এমন বিষয়গুলোই দৃঢ়ভাবে উঠে এসেছে শিল্পের উত্স ও বক্তব্য হয়ে। এক সময় শিল্পীকে ভাবাত শিল্পী ভ্যানগগ। পরবর্তীতে ফ্রিদা কাহলো, লুই বুর্জোয়া, জুডি শিকাগো, অর্পিতা সিং, নলিনী মালানি... এমন শিল্পীদের কাজ শিল্পীকে প্রাণিত করে। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের নারী শিল্পীদের প্রকাশের ভাষা খুবই বলিষ্ঠ। শিল্পী দিলারা বেগম জলি ‘ভ্রণ’, জরায়ু ও স্তন নিয়ে কাজ করেছেন। তিনি বলছিলেন, ‘একই সঙ্গে এটি নারীর পাওয়ার ও ভিকটিম হওয়ার কারণ। এই পাওয়ারফুল অরগান নিয়ে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি নারীদেহ নিয়ে কাজ করলে অনেক ক্ষেত্রেই দৃষ্টিভঙ্গিটা কিছুটা অনুসন্ধিত্সু.. কিছুটা ভোগ্য উপকরণ সুলভ দেখা হয়। সমাজ ও মনস্তাত্ত্বিকতার গঠনের দৃষ্টিভঙ্গিরও শিকার হয়ে থাকে নারী প্রকাশ্যে বা অপ্রকাশ্যে! শিল্পী দিলারা বেগম জলির কাজে ইংরেজীতে যাকে বলে, ‘কোয়াড্রেটিক’ অর্থাত্ যেখানে বিষয় বিন্যাসকে শিল্পী টেনে আনেন বাস্তবতার খুব নৈকট্যে... অস্বস্তিকর নো ম্যানস ল্যান্ডের তীব্র যন্ত্রণার শূন্যতায়... যেখানে শিল্পী স্বয়ং অবস্থান করেন সৃজনের মানচিত্রে। মাধ্যমগত বৈচিত্র্যের বিবর্তনশীল আঙ্গিক থাকলেও শিল্পীর স্বকীয় অসামান্য সৃষ্টিশীলতার ঐক্যকে প্রকাশ করে সেলফ আইডেনটিটির স্পষ্টতা! প্রতিক্ষণই নিপীড়ন, যন্ত্রণা, বঞ্চনার দাহে দগ্ধ হচ্ছে নারীসত্তা, বিপন্ন যেখানে মানবতা! দহন, লড়াই ও পীড়নের জান্তব আলাপনের মধ্য দিয়েই বেঁচে থাকতে হচ্ছে... মৃত্যু বরণের গ্রাস হতে হচ্ছে নারীকে প্রাণীর মতন। মানবতার স্বপক্ষে শিল্পী দিলারা বেগম জলি তাঁর শিল্পকর্মে সর্বত্রই অনুভূতির প্রকাশকে প্রাধান্য দিয়েছেন, শাশ্বত মানবতার জন্য শিল্পীর বলিষ্ঠ অবস্থান জীবন অনুসন্ধানের এক একান্ত ইতিবাচক স্বরলিপি! শান্তির অমিত আহ্বানের বার্তা!!!
