‘আমরা যখন ছোট ছিলাম, তখন তো ঈদ হতো পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে ঘুরে। অনেক হৈচৈ হতো, সে আনন্দের সঙ্গে এখনকার আনন্দের কোনো তুলনা হয় না। আমাদের মা-খালারা সারারাত জেগে ঈদের জন্য এটা ওটা তৈরি করতেন’, বলছিলেন ধানমন্ডির বাসিন্দা প্রকৌশলী মঈন রহমান। তিনি বলছিলেন, ‘তারাও সেসময় বন্ধুদের সঙ্গে সারারাত জেগে পরদিন কী করবেন কোথায় যাবেন—এসব পরিকল্পনা করতেন। তবে, মঈন সাহেবের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করলেন তার স্ত্রী জুনাইদা রহমান। তার ছেলেবেলা কেটেছে পুরোনো ঢাকায়। তিনি বলছিলেন, তাদের সময় বিভিন্ন জায়গায় মেলা হতো বটে, তবে সেসবের ব্যাপ্তি এখনকার আয়োজনগুলোর মতো ব্যাপক ছিল না। তবে তাদের ভার্সিটি-পড়ুয়া ছেলে পলাশ রহমান জানালেন তার অভিজ্ঞতায় ঈদের দিনটি সম্পর্কে, তিনি বলেন, ‘নামাজ শেষে পরিবার বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গেই কেটে যায় ঈদের দিনটি। তবে নামাজ শেষে বাসায় থাকলেও বিকেলের দিকে বন্ধুদের সঙ্গে বের হই।’ মঈন সাহেব ছেলের কথার সঙ্গে যোগ করলেন, ‘তখন তো এখনকার মতো অত্যাধুনিক বিনোদন ছিল না। এখন ফ্যান্টাসি কিংডম বা নন্দন পার্ক আছে। আগের মতো খোলামেলা পরিবেশ না পেলেও নতুন প্রজন্মের জন্য উত্সবের কমতি হয় না।’ তবে, বিভিন্ন প্রজন্মের কাছে ঈদ উদযাপন ভিন্ন হলেও একটি ব্যাপারে সবাই একমত পোষণ করলেন, আর তা হলো এই একটি বিশেষ দিনে সকলের সঙ্গে যোগাযোগ হয়। আর যেহেতু আজকাল মানুষের সাথে মানুষের সরাসরি যোগাযোগ অনেক কমে যাচ্ছে ফলে এই যোগাযোগটাই হয় বিশেষ পাওয়া। আধুনিকতার ছোঁয়ায় উদযাপনের ধরন হয়তো পাল্টেছে কিন্তু আমেজটি একই আছে।
ঢাকা যেমন চারশত বছরে ধীরে ধীরে বদলে গেছে তেমন এর অধিবাসীদের ঈদ উদযাপনের বিষয়টিও পরিবর্তিত হয়েছে। যেমন বর্তমানে শহর জুড়ে শপিং সেন্টার, ফ্যাশন হাউসের ছড়াছড়ি কিন্তু সে সময়ে ঢাকাবাসীরা ঈদের কেনাকাটা সারতেন বাদশাহী বাজারে (বর্তমান চকবাজার)।
বর্তমানে চাঁদ দেখা নিয়ে খুব বেশি উতসাহ লক্ষ্য করা যায় না। কেননা জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির খবর শোনার জন্য আকাশের বদলে মানুষের চোখ থাকে টেলিভিশনের পর্দায়। তবে চাঁদ দেখা নিয়ে সেই সুপ্রাচীনকাল থেকেই ঐতিহ্যবাহী রীতির প্রচলন ছিল। ঐতিহাসিক তথ্য থেকে জানা যায়, ঈদের চাঁদ দেখার পর তা পরিণত হতো উত্সবে। মোগল সংস্কৃতির এ ধারা ঢাকা নগরে দীর্ঘদিন অব্যাহত ছিল। মোগলদের পর ঢাকার নায়েবে-নাজিমদের আমলে নিমতলী প্রাসাদকে কেন্দ্র করে চাঁদ দেখা উত্সব এবং ঈদ মিছিলের আয়োজন করা হতো। ঈদের চাঁদ দেখা উত্সবের ক্ষেত্রে ঢাকার নবাববাড়ির বিশেষ ভূমিকার কথা জানা যায়। আহসান মঞ্জিলকে ঘিরে নগরবাসী চাঁদ দেখা উত্সব পালন করত। আহসান মঞ্জিলের ছাদে বসে নবাববাড়ির সদস্যরা প্রথম চাঁদ দেখে কামান দাগিয়ে কিংবা আতশবাজি পুড়িয়ে তা জনগণকে জানাত। এসবের আওয়াজ শুনে তারা নিশ্চিত হতেন ঈদের চাঁদ দেখা গেছে। জানা যায়, নবাব স্যার খাজা আব্দুল গণির (১৮১৩-১৮৯৬ খ্রি.) সময় থেকে চাঁদ দেখা, ঈদ উত্সব পালন ও ঈদ মিছিল জাঁকজমকভাবে শুরু হয়। এরপর নবাব আহসান উল্লাহ (১৮৪৬-১৯০১ খ্রি.) ও নবাব সলিমুল্লাহ (১৮৭১-১৯১৫ খ্রি.) প্রমুখ ঢাকার চাঁদ দেখা ও ঈদ মিছিল পালন করেছেন। বুড়িগঙ্গা নদীর ঘাটে তাদের কিছু বজরা বাঁধা থাকত। চাঁদ দেখার জন্য সেসব বজরা ব্যবহার করা হতো। বর্তমানে চাঁদ ওঠার খবর পাওয়া গেলে শিশুরা বিচ্ছিন্নভাবে পটকা ফাটায় ও আতশবাজির উত্সব করে থাকে। দেশের ৬৪টি জেলায় ৬৪টি চাঁদ দেখা কমিটি করে দেওয়া হয়েছে। সারাদেশ থেকে খোঁজখবরের পর জাতীয় কমিটি ঈদের ঘোষণা দেয়। সেক্ষেত্রে আগের মতো আর উত্সাহ-উদ্দীপনার দেখা পাওয়া যায় না। তবে টেলিভিশনের বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের রচয়িত ‘ও মোর রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’ গানটি সকলের হূদয় ছুঁয়ে যায় সহজেই।
বর্তমানে ঈদগাহের সংখ্যা বাড়লেও ঐতিহ্য নিয়ে আজও টিকে আছে জাতীয় ঈদগাহ, ধানমন্ডি ঈদগাহ, শাহ আলী মাজার প্রাঙ্গণসহ বেশকিছু স্থান। এখন জাতীয় ঈদগাহ, বাইতুল মোকাররমসহ আরও অনেক মসজিদ রয়েছে যেখানে ঈদের জামাতগুলো অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু ১৫২৯-১৬৫০ খ্রিস্টাব্দের দিকে ঢাকায় অভিজাতদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছিল। সে সময়ে মোগলদের দ্বারা জমজমাট হয়ে উঠেছিল ঢাকা শহর। অনুমান করা যায় বছর ত্রিশেক পরেই ঢাকার ধানমন্ডিতে তৈরি করা হয়েছিল ঈদগাহ। ঢাকার অভিজাত শ্রেণীর মুসলমানরা এই ঈদগাহতে যেতেন ঈদের নামাজ পড়তে।
বর্তমানে প্রজন্মের জন্য বিনোদন কেন্দ্রের অভাব নেই। সিনেপ্লেক্স থেকে শুরু করে ফ্যান্টাসি কিংডম—সবখানে থাকে ঈদের ছোঁয়া। ব্যস্ততাকে দূরে ঠেলে শহরবাসী পরিবার-পরিজনদের নিয়ে এই বিনোদন কেন্দ্রগুলোতেই ভিড় জমায়। এছাড়া প্রতিটি স্যাটেলাইট চ্যানেলেই থাকে ঈদের বিশেষ অনুষ্ঠানমালা। তবে সেকালের ঢাকায় বিনোদনের অবকাশ ছিল না তেমন একটা। তারপরও ঈদের দিন বিশেষ আকর্ষণ ছিল বিভিন্ন মাঠে কাবুলিওয়ালাদের নাচ। বছরের অন্যসময়ে তারা বংশালে বাড়ি ভাড়া করে থাকত এবং ফলফলাদি ও হিং বিক্রি করত। ১৯১৪ সালে ঢাকায় প্রথম সিনেমা হল চালু হয়, নাম ‘পিকচার হাউজ’। ১৯৩০ সালের মধ্যে আরও ৩টি হল চালু হয়। ঈদ উপলক্ষে এসব সিনেমা হলে সারা রাত বেশ কয়েকটি সিনেমা হতো।
ঈদের ঢাকাবাসীর জন্য আরেকটি বিনোদন ছিল কাওয়ালির আসর। শামিয়ানা টানিয়ে সারা রাত কাওয়ালির আসর হতো চাঁদ রাত ও ঈদের রাতে। অতীতের ঈদ ছিল যান্ত্রিকতা মুক্ত। এখন ঈদেও আর আগের মতো পাড়ার বাড়ি বাড়ি বেড়াতে যায় না কেউ। সে সময়ে বাইরের জাঁকজমকের থেকে আত্মীয়তার বন্ধনের গুরুত্ব বেশি ছিল। এখন পাড়া-মহল্লায় ঈদ মেলার আকর্ষণ আগের মতোই আছে। পঞ্চাশ দশকের দিকে ঈদে সবার আকর্ষণ ছিল চকবাজারের মেলা। সালামির টাকা দিয়ে মেলা থেকে মাটির টোপাটাপি (হাঁড়ি-পাতিল) ও মাটির পুতুল কেনা, বায়োস্কোপ দেখা এবং ডুগডুগি ও বিভিন্ন ধরনের খাবার কিনে বাড়ি ফিরত ছোটরা। পুরানা পল্টনের ঈদ মেলায় লাঠি খেলা হতো। লাঠি খেলা দেখতে দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসত।
তখন ঢাকার বর্ণাঢ্য ঈদ মিছিলে থাকত সজ্জিত হাতি, উট, পালকি প্রভৃতি। অনুমান করা হয় এই মিছিল নিমতলী প্রাসাদ থেকে বের হয়ে হোসেনী দালান, বেগম বাজার, চকবাজার হয়ে আবার নিমতলী প্রাসাদে গিয়ে শেষ হতো। মতান্তরে ঈদ মিছিল চকবাজার থেকে শুরু হয়ে মিটফোর্ড রোড, ইসলামপুর, বাংলাবাজার ও নবাবপুর রোড ঘুরে বংশাল হয়ে জেল রোড দিয়ে চকবাজারে ফিরে আসত। ঈদ মিছিল বন্ধ হয়ে গিয়েছিল ১৯৫৪ সালে। আবার শুরু হয় নব্বই দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে। ওই সময়টিতে যেসব ব্রিটিশ পর্যটক বা সাংবাদিক এদেশ ভ্রমণ করেছে, তাদের পুরাতন অ্যালবাম ও নথিপত্রে ঢাকার এমনই নানা চিত্র ফুটে উঠে। প্রায় দু শ বছরের বাঙালির ইতিহাস নিয়ে সাদাকালো আলোকচিত্রের সন্ধান মিলেছে। ১৯৫৪ সালের ব্রিটিশ সাংবাদিক জেমস বার্কের তোলা ছবিগুলো চুয়ান্ন সালের ঈদের ছবি। সময়ের সাথে নতুন প্রজন্ম আরও আধুনিক জীবনযাপনে অভস্ত হলেও সকল প্রজন্মের মাঝেই ঈদ সমান আবেদন রাখে। ঈদ মানেই আনন্দ। এই আনন্দ বয়ে যাক সকলের মনে।
