ফটোগ্রাফির বিভিন্ন শাখার মধ্যে ন্যাচার ফটোগ্রাফি আজ সুপ্রতিষ্ঠিত। প্রকৃতির সৌন্দর্যকে শুধু দর্শনই নয়, পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে পিক্সেলের কারুকার্যে ধারণ করে যারা আমাদের সামনে উপস্থাপন করেন, তারাই ন্যাচার ফটোগ্রাফার। তারা প্রকৃতির সৌন্দর্য, নান্দনিকতা, বিবর্তনকে শিল্পিত রূপে উপস্থাপন করে চলেছেন নিরলসভাবে। বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরতে এসব আলোকচিত্রীদের অবদান অনস্বীকার্য। আমাদের আজকের আয়োজনে এমনই কিছু আলোকচিত্রীর গল্প উঠে এসেছে। গ্রন্থনা করেছেন সাজেদুল ইসলাম শুভ্র ও আহসান রনি
সানিয়ার রহমান
ছোটবেলায় বাবার কাছে যখন এসএলআর ক্যামেরা দেখেন, তখনই সানিয়ার রহমানের মনে ফটোগ্রাফির ইচ্ছা জন্মে। নিজের সেই স্বপ্নপূরণে সমর্থ হন ১৯৯৭ সালে। চর্চাটাও করেন একা একাই। কারো কাছে কিছু জানতে চাইলে খুব ভালো কিছু পেতেন না। বিদেশি বই ছিল তার একমাত্র ফটোগ্রাফি গুরু। সানিয়ার রহমানের শৈশবটা কেটেছে ইরাকে। তারপর ১৯৮০-তে দেশে ফিরেন পরিবারের সঙ্গে। তিনি পরিবারের বড় ছেলে, তার ছোট এক ভাই ও এক বোন রয়েছে। বাবা-মাসহ একসাথেই সবাই থাকেন। সানিয়ার রহমানের পরিবার ঢাকার স্থানীয়, ছোট ভাই ছাড়া (ইরাক) তাদের সবার জন্ম ঢাকার খিলগাঁওয়ে। আর তিনি মূলত অ্যাডভারটাইজিংয়ের সাথে জড়িত গত ১৮ বছর যাবত। পেশাগত দৃষ্টিকোণ থেকে সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং বিষয় কোনটি বলে আপনি মনে করেন? এমন প্রশ্নের উত্তরে সানিয়ার বলেন, ‘আসলে ন্যাচার ফটোগ্রাফার হিসেবে চ্যালেঞ্জিং বলে কিছু নেই। কেননা আমি আমার নিজের তুষ্টির জন্য কাজ করি। আর যদি চ্যালেঞ্জিং বলে কিছু থাকে, সেটা আমি নিজেই।’ একজন ন্যাচার ফটোগ্রাফার হিসেবে তিনি প্রতিটি ক্লিকেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন, ভালো ছবি পেলে তো কথাই নেই। ফটোগ্রাফি শিক্ষার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার গুরুত্ব কতটুকু? জবাবে সানিয়ার রহমান বলেন, ‘ফটোগ্রাফি শিক্ষার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার গুরুত্ব অনেক।’ চোখের সামনে যাই ভালো লেগেছে তাই ক্যামেরাবন্দি করেছেন তিনি। প্রকৃতির অনেক রঙকে করেছেন ক্যামেরাবন্দি, অনেক রঙের পাখিকে ক্যামেরায় বন্দি করেছেন। এনাম আল হকের সাথে কাজ করার সুযোগ হয়েছে তার। তার সবচেয়ে ভালো লাগে কেউ যখন ফটোগ্রাফি সম্পর্কে কিছু জানতে চায় তার কাছে। এই প্রজন্ম সম্পর্কে তার মতামত জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ফটোগ্রাফিতে গ্রামার এবং গ্ল্যামার দুটোই আছে বলেও নতুনরা এ পেশায় আসতে যথেষ্ট ইচ্ছুক। তবে এ পেশাতে বিভিন্ন ভাগ থাকার কারণে যে অংশে শুধু গ্ল্যামার আছে নতুনদের বড় একটা অংশ শুধু সেদিকে ঝুঁকছে। যার ফলে সামগ্রিকভাবে তাদের কাজের মান অনেক উন্নত। সেজন্য বেশি করে নিজের দেশ এবং দেশের ভৌগলিক অবস্থান এবং প্রকৃতি সম্পর্কে জানতে হবে। এই পেশাকে সম্মান করুন, এই পেশাকে যত্ন করুন।’ সেজন্য এখনো প্রচুর পড়ালেখা করে যান তিনি নিজের প্রয়োজনেই। এজন্য তিনি সবরকম পরিস্থিতি সামলানোর জন্য প্রত্যেকটা সময় সচেতন থাকাও উচিত। পরিশেষে আলোকচিত্র নিয়ে তার ভবিষ্যত্ স্বপ্নের কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘শুধুমাত্র ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফিই করতে চাই।’
সানিয়ার রহমান
ডাকনাম :রাহুল
জন্ম তারিখ ও স্থান :২০ আগস্ট, ঢাকা
মায়ের নাম :আনোয়ারা বেগম
বাবার নাম :লুত্ফর রহমান
প্রথম স্কুল :রোকাইয়া কিন্ডারগার্টেন
প্রিয় মানুষ :মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)
প্রিয় উক্তি :মন থেকে চেষ্টা করলে, হবেই
প্রিয় পোশাক :জিন্স প্যান্ট ও শার্ট
অবসর কাটে যেভাবে :পাখির ছবি দেখি, গিটার বাজাই
সাফল্যের সংজ্ঞা :মন থেকে চেষ্টা করলে সফলতা আসবেই।
০০০০
সামিউল মোহসেনিন
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাণিবিদ্যা বিভাগে পড়া ও ক্যাম্পাসে অনেক প্রজাতির পাখি থাকায় প্রতিদিন খুব সকালে বেরিয়ে পড়তেন ক্যাম্পাসের পাখি পর্যবেক্ষণে। তিনি শুধু ন্যাচার ফটোগ্রাফিতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। তাই বাংলাদেশের অনেক বনে জঙ্গলে ঘুরে বেড়িয়েছেন। পেশাগত কাজে অথবা অবসরে বন্ধুদের সাথে বেড়াতে যান সুযোগ পেলেই। শখের বশেই মূলত ছবি তোলেন। ন্যাচার ফটোগ্রাফিকে কখনো পেশা হিসেবে চিন্তা করেননি। বন্যপ্রাণী নিয়ে উচ্চশিক্ষার সুবাদেই হয়তো ন্যাচার ফটোগ্রাফি শুরু করা। এছাড়াও বন্ধুমহলেও বন্যপ্রাণীর সেরা ছবি তোলার জন্য একটি অঘোষিত প্রতিযোগিতা ছিল, সেটাও হয়তো প্রভাবিত করেছে তাকে। নিজের তোলা ছবি যখন বিভিন্ন প্রকাশনায় ছাপা হয় তখন মনের ভেতরে এক অনন্য ভালোলাগার অনুভূতি হয় বলে জানালেন সামিউল। বর্তমানে ইউএসএইড-এর একটি প্রকৃতি সংরক্ষণ প্রকল্প ‘ক্রেল’-এ কর্মরত আছেন তিনি। পেশার কারণেই বনে জঙ্গলে ঘুরে বেড়ানো ও বাংলাদেশের সংরক্ষিত বনাঞ্চল সংরক্ষণ করার কাজে নিয়োজিত। এ ছাড়াও বাংলাদেশ বনবিভাগ, ন্যাচার কঞ্জারভেসন ম্যানেজমেন্ট (নেকম) ও বাংলাদেশ বার্ডক্লাবের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বাংলাদেশের পাখি সংরক্ষণে কাজ করে চলেছেন। ‘জলচর পাখিশুমারি’-তে সেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করছেন গত নয় বছর ধরে। নিজের ও সম্মিলিতভাবে লেখা বৈজ্ঞানিক প্রকাশনা রয়েছে ১২টি ও গ্রন্থ ২টি। বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতির তোলা ছবি প্রকাশিত হয়েছে দেশি-বিদেশি নানা বই, প্রবন্ধ ও লেখায়। একক ও যৌথভাবে দেশে-বিদেশে চিত্রপ্রদর্শনী করেছেন ৫ বার। নতুনদের সম্পর্কে বলতে গিয়ে সামিউল বলেন, ‘আমি প্রায়ই সোশ্যাল মিডিয়াগুলো যেমন ফেসবুক, ফ্লিকার, ইন্সটাগ্রামে নবীন ন্যাচার ফটোগ্রাফারদের ছবি দেখি এবং ভীষণ মুগ্ধ হই ছবি তোলার অসাধারণ প্রতিভা দেখে। এছাড়া প্রতিনিয়তই নতুন মডেলের ডিজিটাল ক্যামেরা আসছে ফলে প্রযুক্তির দিক থেকেও তারা এগিয়ে থাকছে।’ তাদের প্রতি পরামর্শ দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘ন্যাচার ফটোগ্রাফির জন্য প্রকৃতিকে যারা যত বেশি মন দিয়ে অনুভব করবেন তারাই বেশি ছবিটিকে প্রাণবন্ত করে তুলে ধরতে পারবেন। আর একটি বাস্তব সত্য হচ্ছে নিজের ভালোলাগার দিকটি আগে খুঁজে বের করতে হবে। নিজে কোন বিষয়ে ছবি তুলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছি সেটাই প্রধান বিষয়। ছবি তোলার আগে ছবিটি মনে মনে দৃশ্যায়ন করতে পারার ক্ষমতা থাকাটা খুব জরুরি।’ সামিউল বিয়ে করেছেন তিন বছর হলো। স্ত্রী নুসরাত জাহান ও বাবা-মাকে নিয়ে তার ছোট্ট সুখী পরিবার।
সামিউল মোহসেনিন
ডাকনাম :সামিউল
জন্ম তারিখ ও স্থান :১৯ মে, ঢাকা
মায়ের নাম :সাফিনা ফেরদৌস
বাবার নাম :শফিউল মুজনেবিন
প্রথম স্কুল :সেন্ট জোসেফ হাই স্কুল
প্রিয় মানুষ :ইনাম আল হক
প্রিয় পোশাক :জিন্স ও টি-শার্ট
অবসর কাটে যেভাবে :বনে জঙ্গলে পাখি পর্যবেক্ষণ করে অথবা মুভি দেখে
সাফল্যের সংজ্ঞা :নিজের শখকে পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারা।
০০০০
মো. রবিউল ইসলাম
পেশায় স্থপতি। এর বাইরে যখনই তিনি সময় পান, ক্যামেরা নিয়ে ছুটে যান প্রত্যন্ত অঞ্চলে—কখনও হাওড়-বাওড়ে কখনও কোনো গ্রামের মেঠোপথ ধরে। প্রকৃতির এত কাছ থেকে তিনি উপলব্ধি করার চেষ্টা করেন পাখির ভাষা, খুঁজে পান তাদের আকুতি! আর তাই যখন স্থাপনার চর্চা করেন, সেখানেও থাকে প্রাণান্তকর চেষ্টা, যেন আমাদের প্রকৃতির এই সৌন্দর্যগুলো হারিয়ে না যায়। তার ছবি তোলার শুরুটা খুব আয়োজন করে হয়নি। বুয়েটে পড়ার সময়ই নিচের ক্লাসের একটা ছেলের কাছ থেকে সুন্দর একটি বাইনোকুলার পেয়েছিলেন। ফুয়াদ নামের সেই ছেলেটার কাছে ছিল বেশ কিছু ফিল্ড গাইডও। ব্যাস, বনে বাদাড়ে পাখি দেখা শুরু হলো তার। এরপর অবশ্য একটা সময় ক্যামেরা নিয়েই বেরিয়ে পড়লেন। যা দেখতেন, লেন্সে বন্দি করে রাখতেন। আর প্রকৃতি আপন মহিমাতেই সুন্দর হয়ে ধরা দিত ফ্রেমে। রবির বেশকিছু ক্লিক তখন বন্ধুমহলে সমাদৃত। একাধিক প্রদর্শনীতেও তার ছবির স্থান পেল। বাংলাদেশ ফটোগ্রাফিক সোসাইটির ‘বেস্ট ন্যাচার’ অ্যাওয়ার্ড পান তিনি। এরপর পড়াশোনার পাট চুকিয়ে যখন তিনি পেশাগত জীবনে ঢুকে গেলেন, তখনও নিয়মিত ঘুরে বেড়াতেন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। সহকর্মী কর্নেল শাহেদ এস সাবের এবং স্থপতি মোস্তাক কাদরীর সাথে কাজ করত গিয়েই মূলত গাছের প্রতি আগ্রহ জন্মে তার। কত বিচিত্র গাছ যে আমাদের এই সীমিত ভূখণ্ডে রয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। এখন অবশ্য প্রকৃতির এই বিচিত্রতা ক্যামেরাবন্দি করার জন্য দারুণ কিছু ইক্যুইপমেন্টস তিনি জোগাড় করে ফেলেছেন। পাখি আর প্রকৃতির কাব্যিক মিলবন্ধন রবির ক্যামেরাতেও যেন পায় ভিন্ন ভাষা। পেশাগত জীবনে রবি একজন স্থপতি। গ্রুপ অব আর্কিটেক্ট অ্যান্ড থিংকারস নামে তার একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। রবি নৈসর্গিক সৌন্দর্যের টানেই ফ্রেমবন্দি করে চলেছেন একের পর এক অসাধারণ আলোকচিত্র—কখনও পাখি, কখনও গাছ, কখনও জলজ কোনো জীব, কখনও বা দিগন্তের হাতছানি। রবির প্রকৃতিপ্রেমের রহস্য কিছুটা উন্মোচিত হয় তার শৈশবের গল্পে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরূপ আধার কাপ্তাইয়ে কেটেছে তার শৈশবের উচ্ছল দিনগুলো। বাবা-মা আর চার ভাইবোনের পরিবার। ভরদুপুরে সবাই যখন ঘুম, বারান্দায় বসে তিনি তখন একপলকে চেয়ে থাকতেন পাহাড়ের দিকে। পাশেই ছিল লেক, সুযোগ পেলেই কখনও লেকে কখনও বা পাহাড়ে ছুট দিতেন তিনি। খেলাধুলাকে ছাপিয়ে সেই অ্যাডভেঞ্চারেই যেন মনোযোগ ছিল বেশি। আজও শৈশবের সেই স্মৃতি নস্টালজিক করে দেয় তাকে।
মো. রবিউল ইসলাম
ডাকনাম :রবি
মায়ের নাম :শাহিন আক্তার
বাবার নাম :নূর হোসেন
জন্ম তারিখ ও স্থান :২৫ অক্টোবর, লক্ষ্মীপুর
প্রথম স্কুল :বাংলাদেশ নৌবাহিনী স্কুল
প্রিয় উক্তি :There is no special recepie, you have to just believe it.
প্রিয় পোশাক :ফতুয়া
অবসর কাটে যেভাবে :বনে বাদাড়ে বা হাওড়ে চলে যাই, গাছপালা পশুপাখি দেখে বেড়াই...
সাফল্যের সংজ্ঞা :খুবই আপেক্ষিক একটা বিষয়।
