রাজধানী ঢাকায় দেওয়াল লিখন এবং বিভিন্ন ব্যানার, ফেস্টুন ও পোস্টার বৃদ্ধি পাইয়াছে। নানা আকৃতি ও রঙের প্ল্যাকার্ড, বিলবোর্ড, সাইনবোর্ড, প্যানাসাইন ইত্যাদিও পরিলক্ষিত হইতেছে। প্রচার-প্রচারণা ও বিজ্ঞাপনের এসব উপকরণের ভাষ্য শুধু আসন্ন ঈদের শুভেচ্ছা জ্ঞাপন নহে, রাজনৈতিক নেতাদের নিঃশর্ত মুক্তি, শীর্ষস্থানীয় নেতা-নেত্রীদের উদ্দেশে তোষামোদি, কোচিং বাণিজ্য, ভর্তি বিজ্ঞপ্তি, চাকুরীর বিজ্ঞপ্তি ইত্যাদি বিষয়ভিত্তিক বিচিত্র পোস্টার ও অন্যান্য প্রচারপত্রে আচ্ছাদিত। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি-বেসরকারি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন ভবন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, এমনকী মসজিদ-মন্দির কোনকিছুই ইহার হাত হইতে রক্ষা পাইতেছে না। পোস্টারের আধিক্যের কারণে নগরীর কোন কোন দেওয়ালের নিজস্ব রং বুঝিবারও উপায় নাই। ইহা হইতে বাদ যাইতেছে না বিদ্যুতের খুঁটি, লাইটপোস্ট, রাস্তার পার্শ্ববর্তী গাছগুলিও। গাছের ওপর পেরেক ঠুকিয়া সাঁটিয়া দেওয়া হইতেছে লোহা ও টিনের বিভিন্ন সাইনবোর্ড। সেইসঙ্গে একজনের লেখা মুছিয়া অন্য পক্ষের লেখা, এক পোস্টারের ওপর আরেক পোস্টার সাঁটানোর অসুস্থ প্রতিযোগিতাও দৃষ্টিগোচর হইতেছে। যাহা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।
যত্রতত্র এই দেওয়াল লিখন ও পোস্টার-ব্যানারের কারণে রাজধানীর সৌন্দর্য নষ্ট হইতেছে বহুলাংশে। শব্দদূষণ ও বায়ূদূষণের ন্যায় ইহার নাম অনেকেই দিয়াছেন দৃষ্টিদূষণ। চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ ও সার্জনরা বলিতেছেন, সবুজের দিকে তাকাইলে আমাদের চোখ শান্তি পায়, আর অযাচিত বস্তুর দিকে দৃষ্টি গেলে তাহা চোখের পীড়ার কারণ হয়। মেজাজ হয় খিটমিটে। শুধু দৃষ্টিদূষণই নহে, ঢাকা শহরের অপরিচ্ছন্নতার জন্য দেওয়াল লিখন ও পোস্টার অনেকাংশে দায়ী। অথচ আমাদের দেশে ‘দেওয়াল লিখন ও পোস্টার লাগানো (নিয়ন্ত্রণ) আইন ২০১২’ নামে একটি আইন আছে। এই আইনের ৩ ধারায় বলা হইয়াছে, ‘ধারা ৪ অনুযায়ী নির্ধারিত স্থান ব্যতীত অন্য কোন স্থানে দেওয়াল লিখন বা পোস্টার লাগানো যাইবে না’। কিন্তু কে শোনে কাহার কথা? এই আইনে দেওয়াল লিখন বলিতে বোঝানো হইয়াছে যে, অর্থ প্রচার বা ভিন্নরূপ কোন উদ্দেশ্যে, যে কোন রং-এর কালি বা চুন বা কেমিক্যাল দ্বারা, দেওয়াল বা যানবাহনে কোন লিখন, মুদ্রণ, ছাপচিত্র বা চিত্র অংকন করা। আর কাগজ, কাপড়, রেক্সিন বা ইলেক্ট্রনিক মাধ্যমসহ যেকোন মাধ্যমে প্রস্তুতকৃত প্রচারপত্র, প্রচারচিত্র, বিজ্ঞাপনপত্র, বিজ্ঞাপনচিত্র; এবং যেকোন ধরনের ব্যানার ও বিলবোর্ডও পোস্টারের অন্তর্ভুক্ত। এই আইন অমান্যের জন্য ধারা ৬ অনুযায়ী অন্যূন পাঁচ হাজার টাকা এবং অনূর্ধ্ব দশ হাজার টাকা অর্থদণ্ড আরোপ, অনাদায়ে অনধিক পনের দিন পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ডের বিধান আছে। ধারা ৫ অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে নিজ খরচে দেওয়াল লিখন বা ক্ষেত্রমতে পোস্টার মুছিয়া ফেলা কিংবা অপসারণের নির্দেশ দেওয়া হইয়াছে। কিন্তু অন্য অনেক আইনের ন্যায় এই আইনেরও কোন প্রয়োগ লক্ষ্য করা যাইতেছে না। বর্তমানে ইহা কাগুজে আইনে পরিণত হওয়ায় কেহ এ ব্যাপারে অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজনবোধও করিতেছেন না। সিটি করপোরেশনের আইনেও রাজধানীর যত্রতত্র পোস্টার, ব্যানার প্রভৃতি লাগানো বা টাঙানো বেআইনি ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলিয়া গণ্য। কিন্তু এক্ষেত্রেও কর্তৃপক্ষের নজর নাই।
২০১২ সালে প্রণীত আইনটি বাস্তবায়ন করার কথা স্থানীয় সরকার ও জেলা প্রশাসনের। কিন্তু ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের অভাব আছে, এমন অজুহাত দেখাইয়া ইহা প্রতিপালন করা হয় না বলিয়া অভিযোগ আছে। বস্তুত এই ধরনের প্রবণতা আমাদের উপমহাদেশের সর্বত্র বিরাজমান। যতদূর জানা যায়, এই দেশে দেওয়াল লিখন ও পোস্টার সংস্কৃতির প্রবর্তক কমিউনিস্টরা। কিন্তু পুঁজিবাদীরাও তাহাদের পাল্লায় পড়িয়া এই ধরনের গর্হিত কাজ করিয়া যাইতেছেন। ব্যক্তিমালিকানাধীন অনেক বাড়ি বা প্রতিষ্ঠানে দেওয়াল লিখন বা পোস্টার লাগানোর অনুমতি লইবার সৌজন্যটুকু পর্যন্ত প্রদর্শন করা হয় না। ইহাতে তাহার বাড়ির বা ভবনের সৌন্দর্য যেমন নষ্ট হয়, তেমনি ঘষামাজা করিয়া তুলিতে, রং করিতে খরচও বাড়িয়া যায়। কোন সভ্য দেশে এমনটি হওয়ার কথা নহে। শিক্ষা ও রুচির অভাবই ইহার মূল কারণ। তাই কেবল আইন দ্বারা এরূপ প্রবণতা রোধ করা সম্ভব নহে। এজন্য সকলের মধ্যে নাগরিকবোধ জাগ্রত করিতে হইবে এবং নিজ নিজ অবস্থান হইতে সকলকে হইতে হইবে দায়িত্বশীল।
