জোয়ারে প্লাবিত বরগুনার অর্ধশতাধিক গ্রাম

আপডেট : ২০ জুলাই ২০১৪, ২২:৪১
টানা বর্ষণ ও পূর্ণিমার জোয়ারে নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে বরগুনার প্রায় অর্ধশতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। বিপদসীমার উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হওয়ায় এই উপকূলের মানুষের রাত কাটছে আতঙ্কে। এদিকে বগুড়ার সারিয়াকান্দিতে যমুনার ভাঙনে বিলীন হচ্ছে গ্রাম-জনপদ। বরগুনা (দক্ষিণ) প্রতিনিধি জানান, কয়েকদিনের টানা বর্ষণ ও পূর্ণিমার জোয়ারে অস্বাভাবিক পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় বরগুনায় প্লাবিত হয়েছে জেলার ৬ উপজেলার প্রায় অর্ধশতাধিক গ্রাম। পায়রা-বিষখালী-বলেশ্বর নদীতে পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। জোয়ারের পানিতে প্রতিদিন দুইবার করে তলিয়ে যায় জেলার বেশ ক’টি আবাসন এলাকা। পানির অস্বাভাবিক চাপে বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে প্রতিদিনই প্লাবিত হচ্ছে নতুন নতুন গ্রাম। গতকালও জেলা শহরের কয়েকটি সড়ক পানিতে প্ল¬াবিত হয়েছে। দিন-রাতে দুইবার জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হওয়ায় গভীর রাতে আতঙ্কে রয়েছে উপকূলের হাজার হাজার মানুষ। পানিতে ভেসে যাওয়ার আশঙ্কায় ঘর-বাড়ি ছেড়ে রাস্তায় বসে থাকেন দুর্গত মানুষেরা। সদর উপজেলার বালিয়াতলী গ্রামের রাশিদা বেগম বলেন, ‘দিনে তো ভালই থাহি, রাইতে ঘর থুইয়া (ছেড়ে) রাস্তায় থাহা (থাকা) লাগে। হক্কোল মোরা আতঙ্কে থাহি, কোন সময় মোগো পানিতে ভাসাইয়া লইয়া যায়।’ সদর উপজেলার ৯নং এম বালিয়াতলী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এম এ বারী বাদল জানান, ভাঙ্গা বাঁধ দিয়ে জোয়ারের পানি ঢুকে বসত-বাড়িসহ ফসলের সকল জমি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক ও পানি উন্নয়ন বোর্ডকে বারবার জানালেও কোন উপকারে আসছে না। বরগুনা পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে জেলায় ৫ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে। যার মধ্যে ১ কিলোমিটার ইতিমধ্যেই বিলীন হয়ে গেছে। ঐসব বাঁধ দিয়ে প্রতিদিন পানি ঢুকে বাড়ি-ঘর তলিয়ে যাচ্ছে। এদিকে গত ১৪ জুলাই বরগুনা জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধ মেরামত করার জন্য বরগুনা পানি উন্নয়ন বোর্ডে একটি চিঠি দেয়া হয়েছে। যেখানে বেড়িবাঁধের কমপক্ষে ২০টি স্থান জরুরি ভিত্তিতে মেরামত করার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে। বরগুনার জেলা প্রশাসক মীর জহুরুল ইসলাম জানান, দুর্গত মানুষের জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৪৫ মেট্রিক টন চাল এবং ৬০ হাজার টাকা ত্রাণ সহায়তা বরাদ্দ করা হয়েছে। বরগুনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী পরিচালক মো. আব্দুল মালেক জানান, তার অধিনস্ত সকল কর্মকর্তাকে সরেজমিনে পরিদর্শন করে ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধের প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে। এরপর তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে বাঁধ নির্মাণের জন্য বরাদ্দ চাইবেন। যমুনায় ভাঙন: সারিয়াকান্দি (বগুড়া) সংবাদদাতা জানান, যমুনার ভাঙন অব্যাহত থাকায় একের পর এক গ্রাম-জনপদ, বিভিন্ন স্থাপনা, ফসলি জমি ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যমুনার গর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে কাঁশিয়াহাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চিলা কাউরিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, নাড়াপালা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ৪২ কর্ণিবাড়ি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও আদবাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নদী ভাঙনের কবলে পড়েছে। ভাঙনের কবলে পড়ায় কর্তৃপক্ষ কাঁশিয়াহাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নিলামে দিয়েছে। অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোও নিলামে দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। এদিকে প্রবলস্রোত ও ঘূর্ণাবর্তে ভাঙন অব্যাহত থাকায় ১৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নবনির্মিত ৪ কি:মি: দীর্ঘ বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ, রৌহাদহ বাজার, রৌহাদহ-কড়িতলা পাকাসড়ক ভাঙনের কবলে পড়েছে। রৌহাদহ বাজারের দোকানপাট অন্যত্র সরিয়ে নেয়া হচ্ছে। এছাড়া ঐ এলাকার ১০ গ্রামের আড়াই হাজার বাড়িঘর অন্যত্র সরিয়ে নেয়া হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড বাঁধটি রক্ষার জন্য সেখানে বালিভর্তি জিও ব্যাগ ডাম্পিং করে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা করছে। ঐ বাঁধটি ভেঙে গেলে যমুনার পানি সহজেই জনপদে প্রবেশ করে সারিয়াকান্দি, ধুনট ও গাবতলী উপজেলার কয়েক হাজার হেক্টর জমির রোপা আমন ও অন্যান্য জমির ফসল তলিয়ে বিনষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, বর্ষা মৌসুমে ভাঙন শুরু হলে পাউবো লোক দেখানোর জন্য তড়িঘড়ি করে কিছু বালিভর্তি জিও ব্যাগ ডাম্পিং করে। কিন্তু যমুনার ভাঙ্গনের মুখে এই জিও ব্যাগ কোন কাজেন আসে না। এ ব্যাপারে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী নুরুল ইসলাম সরকার জানান, জরুরি ভিত্তিতে কাজ করার জন্য এক লাখ জিও ব্যাগের বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। এছাড়া স্থায়ী তীর সংরক্ষণ কাজের জন্য ৩০৪ কোটি টাকার উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রস্তাব ( ডিপিপি) পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করা হয়েছে। পাল্টে যাচ্ছে পদ্মার গতিপথ:গোদাগাড়ী (রাজশাহী) সংবাদদাতা জানান, রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে পদ্মা নদীর গতিপথ পাল্টে গিয়ে ভারতের দিকে চলে গেছে। বন্ধ রয়েছে রাজশাহীর সঙ্গে চাঁপাইনবাবগঞ্জের নৌ-যোগাযোগ। নদীর পাড়ে বসবাসকারী লোকজন জানান, বর্ষা মৌসুমে নদীর ওপারে চর আষাঢ়িয়াদহ, বয়ারমারী, নির্মল চর এলাকায় পদ্মা নদীর তীর ভাঙ্গছে। আর শুল্ক মৌসুমে নদীর এপারে প্রেমতলী, ফরাদপুর, নিমতলা, মোল্লাপাড়া, খরচাকার সামনে নদীর বুকে বিশাল চর জেগে উঠার কারণে নদীর গতিপথ পাল্টে যাচ্ছে। এসব গ্রামের জেলেরা নদীতে গিয়ে মাছ ধরতে পারছে না। এতে ২ শতাধিক জেলে বেকার হয়ে পড়ায় তাদের পরিবারের সদস্যরা মানবেতার জীবন-যাপন করছেন। এদিকে নদীর তীর সংরক্ষণে বাঁধ নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন নদী বিশেষজ্ঞরা। এ প্রসঙ্গে গোদাগাড়ী নাগরিক কমিটির সভাপতি অধ্যাপক শান্ত কুমার মজুমদার বলেন, ২০১০ সালে নাগরিক কমিটির পক্ষ থেকে গোদাগাড়ীতে পদ্মা নদী ড্রেজিং করে নাব্যতা বাড়ানোর জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আবেদন করা হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ভেড়ামারা জোনের প্রকৌশলীরা নদীতে জরিপ চালিয়ে ড্রেজিং করার জন্য একটি প্রকল্প প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠান। প্রধানমন্ত্রী প্রস্তাবিত প্রকল্পটি পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত প্রকল্পটি বাস্তবায়নে মন্ত্রণালয় কোন উদ্যোগ গ্রহণ করেননি। এ প্রসঙ্গে রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী হারুন অর রশিদ বলেন, নদীর গতিপথ পুনরুদ্ধারে গোদাগাড়ী থেকে চারঘাট পর্যন্ত ড্রেজিং করার পরিকল্পনা রয়েছে। আগামী বছর আলাতুলীতে ড্রেজিং-এর কাজ শুরু হবে। তিস্তার ভাঙ্গনে এক কিলোমিটার বাঁধ-রাস্তা বিলীন: রাজারহাট (কুড়িগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে কুড়িগ্রামের রাজারহাটে তিস্তা নদীতে প্রবল ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে বিদ্যানন্দ ইউপি’র মন্দির, পাড়ামৌলা, চতুরা ও তৈয়বখাঁ এলাকায় আবারও নতুন করে ৪০টি পরিবারের ভিটেমাটি, আদর্শ গ্রামের এক মাস পূর্বে দেয়া পল্লী বিদ্যুতের সংযোগের ৩টি খাম্বাসহ প্রায় এক কিলোমিটার বাঁধ-রাস্তাটি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এতে করে ওই এলাকার প্রায় ২২ হাজার মানুষের যাতায়াতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। অপরদিকে ৪টি বেড়িবাঁধ বিলীন হওয়ার ফলে ওই এলাকার আদর্শ গ্রামের মত্স্য খামার ও পাড়া মৌলা এলাকার নূর মোহাম্মদের প্রায় ১০ একর জমির মত্স্য খামারটি ডুবে যাওয়ায় প্রায় ১২ লক্ষাধিক টাকার মাছ ভেসে গেছে। ভাঙ্গন প্রতিরোধে শনিবার পর্যন্ত ওইসব এলাকায় কোন ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি। এ নিয়ে ভাঙ্গন কবলিতদের মধ্যে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে। ভাঙ্গন কবলিতদের আকুতি, গত দু’সপ্তাহ ধরে নদীর প্রবল ভাঙ্গন দেখা দেয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত সরকারি-আধাসরকারি এমনকি কোন এনজিও ওইসব পরিবারের খোঁজ-খবর নেয়নি। বাঁধ রাস্তাটি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার পর থেকে নদী তীববর্তী লোকজনের নির্ঘুম রাত কাটছে। আদর্শ গ্রামের আবাসন প্রকল্পের কোষাধ্যক্ষ আব্দুল বাতেন (৪৫) কান্নাজড়িত কণ্ঠে বললেন, ‘হামরা গুলা আর ইলিপ চাই না, নদী ভাঙ্গা থাকিয়া রেহাই চাই।’ রাজারহাট উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. সাজেদুর রহমান বলেন, বিষয়টি তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছেন এবং পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষকে অনতিবিলম্বে কার্যকরি ব্যবস্থা গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছেন। কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবু তাহের বলেন, ভাঙ্গন রক্ষার্থে বার বার মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করছি। কিন্তু বাজেট না আসলে কিভাবে কার্যকরি ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।