আধুনিক চিকিত্সা সরঞ্জাম সবই আছে, নেই জনবল

আপডেট : ২০ জুলাই ২০১৪, ২২:৪৫
কক্সবাজার জেলার সবখানে রোগীরা কাঙ্ক্ষিত সেবা পান না। জেলা সদর হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আধুনিক চিকিত্সা সরঞ্জাম প্রায় সবই আছে; কিন্তু সেগুলো চালনার জন্য নেই দক্ষ জনবল। ব্যবহার না করতে করতে এগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। রয়েছে ডাক্তার, নার্সের সংকট। জেলা সদরে ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট (আইসিইউ) ও করোনারী কেয়ার ইউনিট (সিসিইউ) থাকলেও জনবলের অভাবে এগুলো চালু করা হয়নি। অপারেশন থিয়েটার থাকলেও রোগীদের কোন কাজে আসে না। সরকারি ওষুধ পায় না রোগীরা। ওষুধ পাচার হয়ে যায়। হাসপাতালের খাবারের মান নিম্নমানের। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিত্সকের দেখা মেলা কঠিন। হাসপাতালগুলোর বাথরুম-টয়লেট ব্যবহার অনুপযোগী। হাসপাতাল এলাকায় ময়লা-আবর্জনা উপচে পড়ছে। জেলায় চিকিত্সকের পদ ২৬১টি অথচ আছেন ১০৯ জন। জেলায় ১৩টি ইউনিয়ন সাব সেন্টার ও ১৭০টি কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতাল কক্সবাজার সদর হাসপাতাল ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট হলেও রাজস্ব বরাদ্দ পায় মাত্র ১০০ শয্যার। এই হাসপাতালে ৬২ জন ডাক্তারের জায়গায় আছে মাত্র ৩৯ জন। নার্স ৯৬ জনের স্থলে আছেন মাত্র ৬২ জন। বাকি পদগুলো দীর্ঘদিন ধরে খালি। নেই চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডাক্তার, তাই নষ্ট হচ্ছে চিকিত্সার সরঞ্জাম। আইসিইউ-সিসিইউ’র যন্ত্রপাতিও নষ্ট হওয়ার পথে। সুইপার, আয়াসহ অন্যান্য পদও খালি। ডাক্তারদের বিরুদ্ধে যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন না করার অভিযোগ আছে। বিশেষ করে বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা সবচেয়ে বেশি অনিয়ম করে বলে অভিযোগ রোগীদের। সরকার ২৯ প্রকার ওষুধ রোগীদের জন্য বরাদ্দ দিয়ে থাকে। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রোগীরা এসব ওষুধ পায় না। হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাই তা ভাগবাটোয়ারা করে নেন। শুধু তাই নয়, এক্সরে, রক্তপরীক্ষাসহ অন্যান্য প্যাথলজি সেবা থেকেও বঞ্চিত রোগীরা। আবার কিছু চিকিত্সক ইনজুরি সার্টিফিকেট ব্যবসাতেই বেশি মনোযোগী। কিছু চিকিত্সক সরকারি হাসপাতালে গেলে প্রাইভেট চেম্বারে দেখা করার পরামর্শ দেন রোগীদের। কক্সবাজার সদর হাসপাতালের অবস্থা সম্পর্কে বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক ডা. রতন চৌধুরী বলেন, প্রায় তিন মাস আগে আমি সদর হাসপাতালে যোগদান করি। এরপর থেকে চিকিত্সা সেবা বৃদ্ধির চেষ্টা চালাচ্ছি। কক্সবাজার সদর হাসপাতালের চিকিত্সা সেবা এখন আগের চেয়ে অনেক ভালো হয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, আইসিও এবং সিসিও চালুর উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। এছাড়া চক্ষু চিকিত্সকের পদসহ শূন্য পদগুলো দ্রুত পূরণের জন্যও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বরাবর চিঠি দেয়া হয়েছে। সিভিল সার্জন কার্যালয় স্বাস্থ্য বিভাগের এই ইউনিটে ১৯৯টি চিকিত্সক পদের মধ্যে ১২৯টি পদই শূন্য। নার্স এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অধিকাংশ পদও খালি। জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের ৭৭৭টি তৃতীয় শ্রেণীর পদের মধ্যে ২৮২টি পদই শূন্য। ৮০ জন সিনিয়র স্টাফ নার্সের পদে আছেন মাত্র ২৯ জন। ৫১টি পদই খালি। সহকারী নার্সের ১০টি পদের ৯টিই খালি। মেডিক্যাল টেকনেশিয়ানদের ৮টি পদের ৭টিই শূন্য। স্বাস্থ্য সহকারীর ৬৬টি পদও শূন্য। চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের ১৭৩টি পদের মধ্যে কর্মরত আছে মাত্র ৮৪ জন। কুতুবদিয়া উপজেলা হাসপাতাল কক্সবাজারের দ্বীপ উপজেলা কুতুবদিয়ার ৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালে ২৭টি পদের বিপরীতে ডাক্তার আছে মাত্র ২ জন। এরমধ্যে একজন প্রশাসক। অর্থাত্ কুতুবদিয়ার দেড় লাখ মানুষের জন্য রয়েছে একজন চিকিত্সক। এ হাসপাতালের বাকী ২৫টি পদও দীর্ঘদিন ধরে খালি। ১২ জন নার্সের জায়গায় কাজ করছেন মাত্র ১ জন। পদায়নকৃত বাকী দুই জন নার্সের ১ জন ছুটিতে, আরেকজন বিনা অনুমতিতে অনুপস্থিত রয়েছেন বলে জানান কুতুবদিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্রশাসক ডা. শাহাবউদ্দিন। তিনি আরো জানান, বর্তমানে এ হাসপাতালে এক্সরে মেশিন নেই। এছাড়া বিদ্যুতের অভাবে নেবুলাইজার মেশিন চালানো যায় না। জেনারেটরের জন্য পর্যাপ্ত জ্বালানি তেল বরাদ্দ পাওয়া যায় না। উখিয়া উপজেলা হাসপাতাল উখিয়ার ৩১ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালে ১৪টি পদের মধ্যে ডাক্তার আছেন ৪ জন। আবার এই চারজনের মধ্যে দুইজন কর্মস্থলেই আসেন না। বাকী দুইজনের মধ্যে একজন প্রশাসক। অর্থাত্ মাত্র ১ জন ডাক্তার দিয়েই চলছে উখিয়ার আড়াই লাখ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা। এই হাসপাতালে নার্সসহ অন্যান্য পদও প্রায় খালি। এখানে ৯ জন সিনিয়র স্টাফ নার্সের পদে বর্তমানে ২ জন নার্স কর্মরত রয়েছে। প্রধান সহকারী কাম হিসাব রক্ষকের পদটি শূন্য দীর্ঘদিন ধরে। এ হাসপাতালে পরিসংখ্যানবিদ, কম্পিউটার অপারেটর, ল্যাব টেকনোলজিস্ট, টেকনোলজি রেডিও, চিকিত্সক সহকারী ও সহকারী নার্সের পদে এ পর্যন্তও কেউ যোগদান করেনি। অ্যাম্বুলেন্স থাকলেও চালক নেই। ২০০৪ সালে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাই-কমিশন এ হাসপাতালে একটি এক্সরে মেশিন দান করলেও গত ১০ বছর ধরে তা বাক্সবন্দি রয়েছে। এ উপজেলার ৫ ইউনিয়নে ৫টি উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ ও ১৫টি কমিউনিটি ক্লিনিক থাকলেও চিকিত্সক নেই। উখিয়া উপজেলা হাসপাতালের প্রশাসক ডা. এসএম আবু সাঈদ জানান, ডাক্তার ও টেকনিশিয়ান না থাকায় রোগীদের যথাযথ সেবা দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। এ ব্যাপারে তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছেন বলে জানান। টেকনাফ উপজেলা হাসপাতাল টেকনাফ ৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালে চিকিত্সকের ২৯টি পদের মধ্যে ১৬টিই খালি। এই হাসপাতালে ১১ জন বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে আছেন মাত্র ১ জন। ১১ জন নার্সের পরিবর্তে আছে ৩ জন। এক্স-রে মেশিন থাকলেও লোকবল না থাকায় গত ৮ বছর ধরে তা চালানো যাচ্ছে না। প্রধান সহকারী, হিসাব রক্ষক, ফার্মাসিস্ট, ওয়ার্ড বয়, আয়াসহ বেশির ভাগ পদ শূন্য থাকায় কাঙ্ক্ষিত চিকিত্সা সেবা প্রদান করা যাচ্ছে না বলে জানান টেকনাফ উপজেলা স্বাস্থ্য প্রশাসক ডা. শামসুজ্জাহান রকিবুন্নেসা। সেন্টমার্টিন হাসপাতাল সেন্টমার্টিন হাসপাতাল টেকনাফ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অধীনে একটি উপকেন্দ । ১০ শয্যা বিশিষ্ট এই হাসপাতালে দীর্ঘদিন ধরে কোন চিকিত্সক নেই। বর্তমানে একজন উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিক্যাল অফিসার বা ডিপ্লোমা চিকিত্সক দিয়ে চলছে কেন্দ টি। তবে হাসপাতাল হলেও রোগীদের থাকার কোন স্থান নেই এখানে। সেন্টমার্টিন হাসপাতালে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর ১৩টি পদের সবগুলোই খালি। জেনারেটর থাকলেও জ্বালানি তেলের বরাদ্দ না থাকায় যন্ত্রটি নষ্ট হওয়ার পথে। এ হাসপাতালে নার্স, আয়া, ফার্মাসিস্ট, নিরাপত্তা প্রহরী কোন পদেই লোকবল নেই। ফলে বর্তমানে এই হাসপাতালে নামমাত্র চিকিত্সা সেবা চলছে বলে জানান টেকনাফ উপজেলা স্বাস্থ্য প্রশাসক ডা. শামসুজ্জাহান রকিবুন্নেসা। পেকুয়া উপজেলা হাসপাতাল পেকুয়া ৩১ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালের ১৭টি পদের বিপরীতে চিকিত্সক আছেন মাত্র ৩ জন। এরমধ্যে আবার একজন প্রশাসক। বাকী দুইজন ডাক্তার দিয়ে চলছে পেকুয়ার প্রায় ৩ লাখ মানুষের স্বাস্থ্য সেবা। মাত্র এক যুগ আগে প্রতিষ্ঠিত এ হাসপাতালে পুরোপুরি অবকাঠামো সুবিধা এখনও গড়ে ওঠেনি। চিকিত্সক, নার্সসহ অন্যান্য পদে লোকবল সঙ্কট চিকিত্সাসেবাকে নাজুক করে তুলেছে। লোকবলের অভাবে একমাত্র এক্সরে মেশিনটি গত ১০ বছরেও চালু করা যায়নি। সেটি কি এখন ভাল আছে না অচল হয়ে গেছে, তাও জানার উপায় নেই বলে জানান উপজেলা স্বাস্থ্য প্রশাসক ডা. পুণ্যবর্ধন বড়ুয়া। তিনি আরো জানান, চালকের অভাবে হাসপাতালের একমাত্র এম্বুলেন্সটিও অকেজো হয়ে পড়েছে। মহেশখালী উপজেলা হাসপাতাল কক্সবাজারের দ্বীপ উপজেলা মহেশখালীর ৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল ২৯টি পদের বিপরীতে ডাক্তার আছেন মাত্র ৬ জন। বাকী ২৩টি পদ খালি। এই হাসপাতালের একমাত্র এক্স-রে মেশিনটি অপারেটর ও টেকনিশিয়ানের অভাবে গত ২০০৭ সাল থেকে বন্ধ রয়েছে। একমাত্র এম্বুলেন্সটিও চালকের অভাবে চালানো যাচ্ছে না। হাসপাতালে ১৪ জন নার্সের পরিবর্তে বর্তমানে রয়েছে মাত্র ৩ জন। উপজেলা স্বাস্থ্য প্রশাসক ডা. সুচিন্ত কুমার চৌধুরী এসব সংকটের কারণে কাঙ্ক্ষিত চিকিত্সাসেবা দেয়া যাচ্ছে না বলে জানান। চকরিয়া উপজেলা হাসপাতাল চকরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং এর অধীন দুটি উপকেন্দ মিলে চকরিয়ায় ডাক্তার থাকার কথা ৩৯ জন। কিন্তু চকরিয়া ৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালে ১৫ জন ডাক্তার থাকলেও ইউনিয়ন পর্যায়ের উপকেন্দ বদরখালী ও হারবাং হাসপাতালে দীর্ঘদিন ধরে কোন ডাক্তার নেই। এছাড়া এই হাসপাতালের এক্স-রে মেশিনটি ৩ বছর আগে নষ্ট হলেও এখনও মেরামত করা হয়নি বলে জানান উপজেলা স্বাস্থ্য প্রশাসক ডা. আনোয়ার আহমদ। তিনি জানান, কক্সবাজার জেলার বৃহত্তম ও গুরুত্বপূর্ণ এ উপজেলা হাসপাতালে টেকনিশিয়ানসহ গুরুত্বপূর্ণ অনেক পদ খালি। নার্স, ওয়ার্ড বয়, আয়াসহ কর্মচারীদের বেশিরভাগ পদও শূন্য। বান্দরবান পার্বত্য জেলার লামা ও আলী কদম উপজেলা চকরিয়ার নিকটস্থ হওয়ায় প্রায় সময় ওসব অঞ্চলের রোগীরা চকরিয়া হাসপাতালে চলে আসে। ফলে রোগীদের স্থান সংকুলান হয় না। রামু উপজেলা হাসপাতাল ২০০৮ সালে রামু হাসপাতালকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করার জন্য হাসপাতাল ভবনের সম্প্রসারণ কাজ শুরু করা হয়। সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার ২০১০ সালে কাজ সম্পন্ন না করে পালিয়ে যায়। বর্তমানে নতুন করে একজন ঠিকাদার নিয়োগের পাশাপাশি কার্যাদেশ দেয়া হলেও অজ্ঞাত কারণে ওই ঠিকাদার এখনও কাজ শুরু করেনি। ফলে নির্মিত অংশটিও এখন নষ্ট হতে চলেছে। উপজেলা স্বাস্থ্য প্রশাসক ডা. আক্তারুল আলম জানান, রামু ৩১ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালে ২০টি পদের মধ্যে ১৫টিই খালি। নার্স পদে আছে মাত্র ৩ জন। তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের মধ্যেও ১৯টি পদ খালি থাকায় কাঙ্ক্ষিত স্বাস্থ্যসেবা বিঘ্নিত হচ্ছে। এছাড়া সদর উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগে ১৩ জন চিকিত্সকের মধ্যে ৫টি পদ শূন্য রয়েছে বলে জানান সদর উপজেলা স্বাস্থ্য প্রশাসক ডা. পুঁচনো। উপজেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কে জেলা সিভিল সার্জন ডা. মোখলেসুর রহমান খান জানান, জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের অধিকাংশ চিকিত্সক পদ শূন্য থাকায় কাঙ্ক্ষিত চিকিত্সা সেবা দেয়া যাচ্ছে না। এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অবহিত করে শূন্য পদ পূরণের জন্য অতি দ্রুত ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। এছাড়া অন্যান্য সম্পর্কেও তাদেরকে অবহিত করা হয়েছে।