ট্রেনের টিকিট যেন সোনার হরিণ। অগ্রিম টিকিট কেনার একদিন আগেই কমলাপুর রেল স্টেশনে অবস্থান করেও টিকিট পেলেন না শত শত মানুষ। লাইনে দাঁড়িয়ে কলা-রুটি খেয়ে সেহরি সম্পন্ন করার পরও টিকিট না পাওয়ায় ক্ষুব্ধ তারা।
গতকাল রবিবার রেলওয়ের অগ্রিম টিকিট বিক্রি শুরু হলেও সারারাত লাইনে দাঁড়িয়েও টিকিট পাননি অনেকেই। ঈদ উপলক্ষে কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে প্রতিদিন বিভিন্ন আন্তঃনগর ট্রেনের প্রায় ১৮ হাজার টিকিট বিক্রির কথা থাকলেও বিক্রি শুরুর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে শেষ হয়ে যায় ২৪ জুলাইয়ের টিকিট। কোটায় খেয়ে ফেলছে রেলের ৪০ শতাংশ অগ্রিম টিকিট। অধিকাংশ টিকিট প্রভাবশালী থেকে শুরু করে রেলওয়ের কর্মকর্তাদের নিয়ন্ত্রণে। এদিকে, রাজধানীর ৭টি বিআরটিসি বাস ডিপো থেকে একযোগে টিকিট বিক্রি শুরু হলেও যাত্রীদের ভিড় ছিল কম।
রেলের অগ্রিম টিকিট বিক্রি শুরুর পর পরই সকালে কমলাপুর রেলস্টেশন পরিদর্শন করেন রেলমন্ত্রী মো. মুজিবুল হক। এ সময় ভোগান্তিতে পড়া নাগরিকরা মন্ত্রীর কাছে টিকিট দেয়ার সময় বাড়ানোর অনুরোধ করেছেন। রেলমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, এখানে যারা টিকিট বিক্রির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, তাদের সবাইকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে, যতোক্ষণ টিকিট থাকবে, ততোক্ষণ টিকিট বিক্রি চলবে। ট্রেনের টিকিট কালোবাজারির হাতে যাওয়ার সকল পথ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। অনলাইনে টিকিট পাওয়ার কথা থাকলেও ওয়েবসাইটের সমস্যার জন্য তা পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানান মন্ত্রী।
রেল কর্তৃপক্ষের ঘোষণা অনুযায়ী ঈদের সময় এবার বিভিন্ন গন্তব্যের ট্রেনে ১৬৬টি অতিরিক্ত কোচ এবং অতিরিক্ত লোকোমোটিভ সংযোজন করা হবে। যাত্রী পরিবহন নির্বিঘ্ন করতে রেলকর্মীদের ঈদের ছুটি আগেই বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মন্ত্রণালয়। কালোবাজারির ওপর নজরদারি চালাতে স্টেশনজুড়ে ১৬টি সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো হয়েছে। বিশেষভাবে ধারণ করা হচ্ছে টিকিট বিক্রির ভিডিওচিত্র। এছাড়া, টিকিটের সঙ্গে উল্লেখ করা হচ্ছে যাত্রীর বয়স এবং লিঙ্গ। এরপরেও কালোবাজারি ঠেকানো যাচ্ছে না। কাউন্টারে টিকেট না পেয়ে অনেকে ছুটেন কালোবাজারের খোঁজে। যদি টিকিট মেলে। কালোবাজার চক্রের সদস্য সন্দেহে গতকাল রেলওয়ে পুলিশ চারজনকে আটক করেছে। এই চক্রের বিরুদ্ধে কয়েকদফা অভিযানও চালিয়েছে রেল পুলিশ।
মহাসড়কে বিপর্যয়ে মাত্রারিক্ত চাপ বেড়েছে রেলপথে। এ জন্য অন্যান্যবারের তুলনায় এবারের ঈদে বিভিন্ন রুটের প্রতিটি ট্রেনেই যাত্রীর চাপ স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি। তবে সে তুলনায় রেলওয়ের আয়োজন সীমিত পরিসরে। পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে রবিবার সকাল ৯টায় টিকিট বিক্রি শুরু হয়। রেলস্টেশনের ২০টি কাউন্টার থেকে ২৪ জুলাইয়ের অগ্রিম চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী, খুলনাসহ গুরুত্বপূর্ণ সব রুটের টিকিট বিক্রি করা হয়; কিন্তু কমলাপুর রেলস্টেশনে টিকিট প্রত্যাশীদের অপেক্ষা শুরু হয়েছিল শনিবার সন্ধ্যার পর থেকেই। টিকিটের জন্য রাতভর অপেক্ষার পর যাত্রীদের মুখে ছিল ক্লান্তি আর উদ্বেগ। সকালে কাউন্টার খোলার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় টিকিট বিক্রি। লাইনের শুরুতেই যারা ছিলেন তারা টিকিট পেলেন। টিকিট পেয়ে আনন্দ-উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন তারা; কিন্তু হাজারো মানুষকে ফিরতে হলো খালি হাতে। এই ক্ষোভে অনেকে হৈ-চৈ শুরু করেন স্টেশনে। পুলিশের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। আজ সোমবার বিক্রি হবে ২৫ জুলাইয়ের টিকিট। মঙ্গলবার ২৬ জুলাই, বুধবার ২৭ জুলাই, বৃহস্পতিবার ২৮ জুলাইয়ের টিকিট বিক্রি হবে। পর্যায়ক্রমে ঈদের আগের দিন পর্যন্ত টিকিট বিক্রি অব্যাহত থাকবে। আর যাত্রার দিন কাউন্টার থেকে ছাড়া হবে দাঁড়িয়ে যাওয়ার টিকিট।
টিকিট সংকটের নেপথ্যে
গতকাল কমলাপুর থেকে ২৮টি ট্রেনের অগ্রিম টিকিট বিক্রি শুরু হয়। এই ট্রেনগুলোর মোট আসন আছে ১৭ হাজার ৯০৩টি। এই আসনের ৪০ ভাগই কোটার মাধ্যমে বিক্রি করা হচ্ছে। আর এতে ঘন্টার পর ঘন্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও টিকেট না পাওয়ার যন্ত্রণায় পড়েছেন হাজারো মানুষ। এই যন্ত্রণার নেপথ্যে টিকিটের কোটা পদ্ধতি। উদাহরণ হিসাবে দেখা গেছে, ঈদে কমলাপুর থেকে চট্টগ্রামগামী ‘সুবর্ণ এক্সপ্রেস’ ট্রেনের মোট আসন ৬৬৪টি। এরমধ্যে এসি ৪০৪টি। শোভন চেয়ার ২৬০টি। এই টিকেটের মধ্যে মোবাইলে এসএমএসের মাধ্যমে ২৫ ভাগ অর্থাত্ ১২১টি, ভিআইপি কোটা ৫ ভাগ অর্থাত্ ৩৩টি, কর্মকর্তা-কর্মচারি কোটা ৫ ভাগ অর্থাত্ ৩৩টি এবং রেগুলার কোটায় ৮৩টি। মোট ২৭০টি বিভিন্ন কোটায়। বাকি ৩৯৪টি টিকেট কাউন্টারে বিক্রি হবে। এরমধ্যে কমলাপুর স্টেশনের কাউন্টার থেকে ৭৫ ভাগ অর্থাত্ ৩১৫টি। বাকি ২৫ ভাগ টিকেট বিক্রি হবে বিমান বন্দরসহ অন্যান্য স্টেশন থেকে। গতকাল ‘সুবর্ণ এক্সপ্রেস’ ট্রেনের এই ৩১৫টি টিকেট ২ ও ৩ নম্বর কাউন্টারে বিক্রি করা হয়েছে। তখন সকাল পৌনে নয়টা। টিকেট বিক্রি শুরুর ১৫ মিনিট বাকি। এরমধ্যে এই টিকেটের জন্য লাইনটি তিনটি বাঁক নিয়ে স্টেশন থেকে রাস্তায় নেমে গেছে। লোকসংখ্যা হবে আনুমানিক দেড় হাজার। একজনের চারটি করে টিকেট নেয়ার সুযোগ। অর্থাত্ লাইনে দাঁড়ানো টিকেট প্রত্যাশীদের বেশিরভাগকেই ফিরতে হবে খালি হাতে। বেলা ১টায় টিকেট বিক্রি শেষে হলো।
রেলের এই কোটা পদ্ধতি অনেক আগে থেকেই স্বীকৃত। বছরের অন্য সময় কোটার টিকেটের বেশিরভাগই বিক্রি হয় কালোবাজারে। আর ঈদের সময় থাকে কোটাধারীদের দখলে। বাকি ৬০ ভাগ টিকেটের জন্য হাজার হাজার মানুষ ২৪ ঘন্টা লাইনে দাঁড়িয়ে টিকেট সংগ্রহ করেন। যারা টিকেট পান তাদের কাছে বিষয়টি যুদ্ধ জয়ের আনন্দের মত। তবে টিকেট না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরে যাওয়ার ব্যক্তির সংখ্যাই বেশি।
টিকিট প্রত্যাশীদের ক্ষোভ
কমলাপুর স্টেশনে দীর্ঘ লাইনে থাকা অনেকেই জানালেন, শনিবার রাত থেকে তারা কাউন্টারের সামনে মাদুর বিছিয়ে অবস্থান নেন। গতকাল সকাল ১০টায় লাইনের সামনের দিকেই থাকা খুলনার হামিদুল ইসলাম জানান, টিকেটের আশায় তিনি স্টেশনে এসে বসে আছেন শনিবার সন্ধ্যা থেকে। কাউন্টারগুলো থেকে টিকেট ছাড়ছে ধীরগতিতে। এ কারণে সবার দুর্ভোগ বাড়ছে। দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে অবশেষে চারটি টিকিট পান তিনি। একইভাবে ২৪ জুলাই বৃহস্পতিবারের চারটি টিকেটের জন্য ১৩ নম্বর কাউন্টারের সামনে দাঁড়ানো শফিউল হাসান, আমির হোসেনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা খুলনা যাবেন। পরিবারের বয়স্ক ও বাচ্চা সদস্য থাকায় ট্রেনের টিকেট তাদের লাগবেই। এজন্য আগের রাতে ১০টায় এসেছেন স্টেশনে। এরপর কাউন্টারের সামনে জায়গা চিহ্নিত করে পাশে বসেছিলেন সারারাত। সকাল টিকেট বিক্রি শুরু হলে হাসান টিকেট পেলেও চারটি এসি টিকেট পানি। তার আগে থাকা মাত্র ছয়জনই নাকি সব এসি টিকেট নিয়ে নিয়েছে। এই কাউন্টারের একটু পিছনের দিকে দাঁড়ানো বেশিরভাগ লোকই টিকেট না পেয়ে ফিরেছেন। তাদের অনেকে কোটার ব্যাপক সমালোচনা করে বলেছেন, দেশটা যেন ভিআইপিদের জন্য।
ধীরগতির সার্ভার
লাইনে দাঁড়িয়ে গতকাল যারা টিকেট সংগ্রহ করেছেন তারা জানিয়েছেন, টিকেট চাওয়ার পর টিকেট পেতে ৭/৮ মিনিট করে সময় লেগেছে। এর কারণ হলো কাউন্টারের সার্ভার ধীরগতির। আবার এবার একটি টিকেট নিলে বয়স ও যাত্রীর নাম বলতে হচ্ছে। এতেও বেশি সময় লাগছে।
ভিআইপিদের চাপ বেশি রেলে
প্রতিদিনই অগ্রিম ১৭ হাজার ৯০৩টি টিকিট বিক্রির করবে রেল কর্তৃপক্ষ। ২৮টি ট্রেনের মধ্যে এসিতে ৪০৪টি আসন বার্থের এর ৫ শতাংশ অর্থাত্ ২০টি ভিআইপিদের সংরক্ষিত। একইভাবে এসি চেয়ার আছে এক হাজার ৩৯৮টি। সেখান থেকে ভিআইপিদের পাওয়ার কথা ৭০টি। প্রথম শ্রেণীর ঘুমানোর কিংবা বসার আসন (নন-এসি) ৫৫৪টির ৫ ভাগ ২৮টি। বিশেষ ধরনের ৪৪২টি প্রথম শ্রেণীর আসনের মধ্যে ২২টি আসন। আর শোভন চেয়ার ও শোভন মিলে আসন ১৫ হাজার ৫০টির ৫ ভাগ ৭৫৩টি আসন। সব মিলিয়ে ভিআইপিদের জন্য একদিনে ৮৯৩টি টিকিট রয়েছে। কিন্তু ঈদের আগে ভিআইপিদের টিকেটের চাহিদা আরও অনেক বেশি বলে জানান রেল কর্মকর্তারা। আবার অনেক ভিআইপি শোভন চেয়ার বা শোভন শ্রেণীর কোনো টিকিট নেন না। তাদের সব চাহিদা এসি ও ঘুমানোর আসনের। ভিআইপিদের জন্য রক্ষিত ৫ শতাংশের মধ্যে এসি, ঘুমানো আর প্রথম শ্রেণীর সব টিকিটের অনুপাতে বরাদ্দ মাত্র ১৪০টি। কিন্তু প্রতিদিন গড়ে ৫০০টি উচ্চ শ্রেণীর আসন ভিআইপিদের দিতে হয়। এর বাইরেও তাদের সাধারণ শ্রেণীর টিকিটও দিতে হয়।
রেলের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ‘ইত্তেফাক’কে বলেন, রাজশাহীগামী ‘সিল্কসিটি’তে ১২টি, চট্টগ্রামগামী ‘তুর্ণা নিশীথা’য় ৩০টি এসি কক্ষ রয়েছে। অথচ মন্ত্রী, এমপি, সচিবদের চাহিদা এর কয়েকগুণ বেশি। ফলে কোটার বাইরেও তাদেরকে টিকেট ব্যবস্থা করে দিতে হয়। ফলে কাউন্টারে অনেক সময় যথাযথ পরিমাণ টিকেট থাকে না। তিনি বলেন, পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতসহ বেশিরভাগ দেশেই ট্রেনে কোটা পদ্ধতি নেই।
সক্রিয় কালোবাজারি চক্র
কমলাপুর রেলস্ট্রেশনে সারা বছরই সক্রিয় থাকে কালোবাজারি চক্র। রেলওয়ে পুলিশের ভাষায় সারা বছর যারা কালোবাজারি করে তারা পেশাদার চক্র। গতকাল কমলাপুর রেলস্ট্রেশন থেকে চারজনকে আটক করেছে রেলওয়ে পুলিশ। এদের একজন শফি। তিনি জানালেন, লাইনে দাঁড়িয়ে বা মোবাইলে এসএমএসের মাধ্যমে টিকেট বুকিং দিয়ে পাওয়া টিকেট তারা কিছু বেশি দামে বিক্রি করে দেন। আরেকজন কামাল জানান, কাউন্টারের সেল্সম্যানের কাছে আগে থেকেই ‘ম্যাসেজ’ দেয়া থাকে। টিকেট চাইলেই চারটি পরিবর্তে তাদেরকে চুক্তি অনুযায়ী ১৫/২০টি টিকেট একসঙ্গে দেয়া হয়। বাড়তি দামে বিক্রি থেকে টাকা ভাগাভাগি করে নেন তারা। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে কমলাপুর রেলওয়ে পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুল মজিদ বলেন, কালোবাজারি চক্রের সঙ্গে রেলওয়ে কর্মচারি বা সেলস্ম্যানদের যোগাসূত্রের বিষয় তিনি শুনেছেন। তবে এবার মাত্র ৫ দিন আগে টিকেট দেয়ায় কালোবাজারি চক্রের তত্পরতা কমেছে।
বিআরটিসির কাউন্টারে ভিড় কম
রাজধানীর ৭টি বিআরটিসি বাস ডিপো থেকে গতকাল একযোগে শুরু হয়েছে ঈদের আগাম টিকিট বিক্রি। তবে টিকিট কাউন্টারে ভিড় ছিল কম। বিআরটিসির এসি বাসের টিকিটের কদর বেশি ছিল যাত্রীদের কাছে। এ বছর রাজধানী ঢাকা থেকে ৪৫০টি বিআরটিসি বাস বিভিন্ন জেলায় চলাচল করবে। বিআরটিসি কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী এবার ‘অশোক লিল্যান্ডে’র ৪০টি ও অন্য কোম্পানির ৪০টি মোট ৮০টি এসি বাস ছাড়া হয়েছে। এছাড়া ডাব্ল ডেকার ১৫০টি বাস ঈদ উপলক্ষে চলাচল করবে। বাকি সব বিআরটিসি’র সাধারণ বাস চলাচল করবে। ঈদে ঘরমুখো যাত্রীদের জন্য মতিঝিল ডিপোতে টিকিট বিক্রির প্রথমদিনেই অনিয়মের অভিযোগ করেছেন যাত্রীরা।
রাজধানীর কল্যাণপুর ও মতিঝিল বিআরটিসি বাস ডিপো ঘুরে এবং অন্যান্য ডিপোগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তেমন ভিড় নেই। এসি বাসের টিকিট নিয়েও ধূম্রজালে ক্রেতারা। কারণ কল্যাণপুরসহ কয়েকটি বিআরটিসি এসি বাস কাউন্টারই বন্ধ ছিল। যাত্রীদের অভিযোগ, নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের জন্য এ কৌশল নিয়েছেন বাসের ইজারাদাররা। বিআরটিসি’র ডিজিএম (অপারেশন) রফিকুল ইসলাম তালুকদার বলেন, অগ্রিম টিকিট দেয়া শুরু হয়েছে। সরকার নির্ধারিত ভাড়া নেয়ার জন্য সকল বাস ডিপোতে নির্দেশনা দেয়া আছে। অতিরিক্ত ভাড়া নিলেই শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে সংশ্লিষ্ট বাস ডিপো কর্মকর্তাদের।
প্রথমদিনে টিকিট বিক্রির অবস্থা জানতে চাইলে কল্যাণপুর বিআরটিসি বাস ডিপো কাউন্টার মাস্টার মো. বেলাল হোসেন ‘ইত্তেফাক’কে বলেন, আমরা টিকিট দেয়ার জন্য বসে আছি। সকাল ৭টা থেকে এ পর্যন্ত রাজশাহীর মাত্র ৪টি টিকিট বিক্রি হয়েছে। রংপুরগামী বাসের একটি টিকিটও এ পর্যন্ত বিক্রি করতে পারিনি। টিকিটের চাহিদা কম কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের তো দ্বিতল বাস, তাই অনেকে এখানে আসতে চান না। অন্য জায়গায় টিকেট না পেলে বিআরটিসিতে আসেন। আশাকরি, আগামী দুই একদিনের মধ্য সব টিকিট বিক্রি হয়ে যাবে। তিনি জানান, ঢাকা থেকে রাজশাহী পর্যন্ত দ্বিতল বাসের ভাড়া ৪১০ টাকা। আর রংপুরের ভাড়া ৪৬২ টাকা। একই বাস ডিপোর এসি কাউন্টারে গিয়ে দেখা গেছে, কাউন্টার বন্ধ করে বাইরে বসে আছেন কর্মকর্তারা। কারণ জানতে চাইলে বিআরটিসি’র একজন এজেন্ট বাবলু বলেন, টিকিট বিক্রি শুরু হলেও আমাদের কাছে এখনও কোনো নির্দেশনা আসেনি। সোমবার আমরা টিকিট বিক্রি শুরু করবো।
বিআরটিসির মতিঝিল ডিপোতে যাত্রীদের তেমন কোনো ভিড় দেখা যায়নি। সকাল নয়টার দিকে যারা গেছেন, তারা টিকিট নিয়ে গেছেন। তবে চট্টগ্রাম ও নোয়াখালী রুটের টিকিট দেয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন নাগরিকরা। টিকিট নিতে আসা যাত্রী তারেক বলেন, তিনি সকাল সাড়ে নয়টা থেকে নোয়াখালীর টিকিটের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। কাউন্টারকর্মী মোহাম্মদ অলি তাকে বলেছেন, নোয়াখালী থেকে টিকিট না আসার কারণে টিকিট দেয়া যাচ্ছে না। সংবাদকর্মীদেরও তিনি একই কথা বলেন।
চট্টগ্রামে প্রথম দিনে ট্রেনের সাড়ে
৩ হাজার অগ্রিম টিকিট বিক্রি
চট্টগ্রাম অফিস জানায়, ট্রেনের অগ্রিম টিকিট বিক্রির প্রথম দিনে গতকাল রবিবার চট্টগ্রাম স্টেশনে সাড়ে ৩ হাজার টিকিট ছাড়া হয়েছে। গতকাল দেয়া হয় ২৪ জুলাইয়ের অগ্রিম টিকিট। সকাল ৯টায় টিকিট বিক্রয় শুরু হয়।
মাঝরাত থেকেই নানা বয়সের শত শত মানুষ লাইনে দাঁড়াতে শুরু করেন। টিকিট কিনতে আসা অনেককে স্টেশনেই সেহির সারতে দেখা যায়। অনেকে আবার টাকা দিয়ে লোক ভাড়া করে লাইনে দাঁড় করিয়ে রাখেন। টিকিট বিক্রয়কে কেন্দ করে আগের বছরগুলোতে অপ্রীতিকর ঘটনার নজির থাকলেও এবছর সুশৃঙ্খল পরিবেশ বজায় ছিল।
টিকিট বিক্রয়ে অনিয়ম ও কালোবাজারি রোধে ব্যাপক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে বলে রেল কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে। তবে কালোবাজারি সিন্ডিকেট ১০-১২ জনের গ্রুপ করে টিকিট হাতিয়ে নিয়েছে বলে যাত্রীরা অভিযোগ করেছেন। চট্টগ্রাম স্টেশনের ব্যবস্থাপক আবুল কালাম আজাদ এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, এবার টিকিট কালোবাজারির সুযোগই নেই। ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা দিয়ে টিকিট বিক্রয় কার্যক্রম মনিটর করা হয়েছে। কাউন্টারগুলোতে রেলের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সরাসরি টিকিট বিক্রয় কার্যক্রম তদারক করেছেন। স্টেশনে র্যাব, পুলিশ, রেলওয়ে পুলিশ, গোয়েন্দা এবং রেলওয়ে নিরাপত্তাবাহিনী মোতায়েন করা হয়।
চট্টগ্রাম রেলস্টেশন থেকে বিভিন্ন রুটে ১৩টি আন্তঃনগর, মেইল ও এক্সপ্রেস ট্রেন চলাচল করে। এছাড়া চট্টগ্রাম থেকে কুমিল্লা পর্যন্ত একটি কমিউটার ট্রেন এবং দোহাজারী ও নাজিরহাট লাইনে তিনটি লোকাল ট্রেন চলাচল করে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে একাধিক শাট্ল ট্রেন চলাচল করে।
খুলনায় ট্রেনের অগ্রিম
টিকিট বিক্রি শুরু
খুলনা অফিস জানায়, পবিত্র ঈদ-উল-ফিতর উপলক্ষে নিজ বাড়িতে ফেরা মানুষদের জন্য গতকাল রবিবার থেকে ট্রেনের অগ্রিম টিকিট বিক্রি শুরু হয়েছে। টিকিট কালোবাজারে বিক্রি রোধে বিশেষ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। পাশাপাশি নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। ঈদের আগে ও পরে ২৬ জুলাই থেকে ১০দিন খুলনা-ঢাকা রুটে ঈদ স্পেশাল ট্রেন চলাচল করবে। ঈদ স্পেশাল ট্রেনে ৯টি বগিতে ৫৮২টি আসনের ব্যবস্থা থাকছে বলে জানান খুলনা রেলওয়ের স্টেশন মাস্টার আমিরুল ইসলাম। আমিরুল ইসলাম জানান, ২৪, ২৫ ও ২৬ জুলাইয়ের টিকিট যথাক্রমে ২১, ২২ ও ২৩ জুলাই বিক্রি করা হবে। এছাড়া ২৭, ২৮ ও ২৯ জুলাইয়ের টিকিট বিক্রি হবে যথাক্রমে ২৫, ২৬ ও ২৭ জুলাই। প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত টিকিট বিক্রি করা হবে। একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ ৪টি টিকিট কিনতে পারবেন। টিকিট কালোবাজারি রোধে পুরুষ ও নারীদের আলাদা টিকিটের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। পুরুষদের টিকিটে এম এবং নারীদের টিকিটে এফ লেখা থাকবে। ফলে কেউ পুরুষের জন্য টিকিট কিনে নারীদের কাছে এবং নারীদের টিকিট পুরুষের কাছে কালোবাজারে বিক্রি করতে পারবে না। স্টেশন মাস্টার আরও জানান, ঈদ উপলক্ষে খুলনা-রাজশাহী রুটে একটি বিশেষ ট্রেন চালু করা হবে। এছাড়া যাত্রীদের সুবিধার্থে খুলনা-ঢাকা ট্রেনে একটি অতিরিক্ত বগি যোগ করা হবে ।
