৩২ বছরে ৪৫০ কোটি টাকা আত্মসাত্

আপডেট : ২০ জুলাই ২০১৪, ২২:৫৭
বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অবৈধ নিয়োগের মাধ্যমে বেতন ভাতার সরকারি অংশ উত্তোলন, বিলের ভ্যাট বাবদ টাকা সরকারি খাতে জমা না দেয়া, বিভিন্ন খরচের খাত দেখিয়ে অবৈধভাবে ভাউচারের মাধ্যমে টাকা তুলে নেয়াসহ নানা অনিয়মের সাথে জড়িয়ে সরকারের কোটি কোটি টাকা আত্মসাত্ করছেন এক শ্রেণীর শিক্ষক। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ) দীর্ঘ সময় ধরে এই টাকার পরিমাণ ও উত্স খুঁজে বের করে তা আদায়ের জন্য সরকারের কাছে সুপারিশ করেছে। তবে তদন্ত প্রতিবেদনে এ পর্যন্ত ৪৫০ কোটি টাকা আত্মসাতের প্রমাণ পাওয়া গেছে। তবে সুপারিশ বাস্তবায়ন বা কত শতাংশ টাকা শিক্ষকদের কাছ থেকে ফেরত আনা হচ্ছে এ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করছে খোদ ডিআইএ। তাদের বক্তব্য, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার আলোকেই তারা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন, তদন্ত এবং সুপারিশ পাঠায়। সুপারিশ বাস্তবায়নে ডিআইএ’র কোন ভূমিকা নেই। তাদের ধারণা, ১০ ভাগ সুপারিশ বাস্তবায়ন হচ্ছে না। তথ্য অনুযায়ী, ডিআইএ’র প্রধান কাজ প্রতিষ্ঠান সরেজমিন পরিদর্শন ও তদন্তের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক ও আর্থিক অনিয়ম-দুর্নীতি বের করে এ বিষয়ে সুপারিশসহ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়া। ডিআইএ সূত্র জানিয়েছেন, ডিআইএ প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নানা অনিয়মের তথ্য অনুসন্ধানের পাশাপাশি আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতি খুঁজে বের করছে। ১৯৮২ সাল থেকে এ পর্যন্ত সাড়ে চারশ’ কোটি টাকা অবৈধভাবে তুলে নিয়েছেন শিক্ষকরা-এমন তথ্যই রয়েছে ডিআইএ’র কাছে। ডিআইএ’র কর্মকর্তারা বলেছেন, দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিশেষ করে এমপিওভুক্তি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নানা অনিয়ম রয়েছে। সংশ্লিষ্ট পদে যোগ্যতা না থাকা এবং পদ না থাকার পরও নিয়োগ দেয়া হচ্ছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। এছাড়া সরকারি অর্থ নানা অনিয়মের মাধ্যমে আত্মসাত্ করা হচ্ছে। ডিআইএ’র তথ্যে দেখা যায়, ১৯৮১-৮২ সালে ১ হাজার ৬১০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তদন্ত ও পরিদর্শন করে ডিআইএ। ওই প্রতিবেদনে দেখা যায়, ১ হাজার ৬১০টি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক কর্মচারিদের একটি অংশ ১০ লাখ ৮২ হাজার টাকা সরকারি তহবিল থেকে অবৈধভাবে তুলে নিয়েছেন। ১৯৮২ সালের তদন্ত প্রতিবেদনে দেখা যায়, ওই বছর ডিআইএ ১ হাজার ৮২০টি প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়। ওই প্রতিষ্ঠানগুলোর কিছু শিক্ষক অবৈধভাবে তুলে নিয়েছেন ১ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। এভাবে ১৯৮৯-৯০ সালে প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২৩ কোটি ৩১ লাখ টাকা, ২০০৩-৪ অর্থ বছরের প্রতিবেদন অনুযায়ী ৩১ কোটি ৪১ লাখ, ২০০৭-২০০৮ সালে ৫৩ কোটি ৯১ লাখ, ২০০৬-২০০৭ সালে নেয়া হয় ৫৭ কোটি ১৩ লাখ, ২০০৫-২০০৬ সালে ২৫ কোটি ২৪ লাখ, ২০০৪-২০০৫ অর্থবছরে ৩০ কোটি ২২ লাখ, ২০০৩-২০০৪ অর্থবছরে ৩১ কোটি ৪১ লাখ, ২০০২-২০০৩ অর্থবছরে ১৬ কোটি ১৯ লাখ, ২০০১-২০০২ অর্থবছরে ৯ কোটি ৬২ লাখ, ২০০০-২০০১ অর্থবছরে ৪ কোটি ২০ লাখ, ১৯৯৯-২০০০ অর্থবছরে ৫ কোটি ৪৮ লাখ, ১৯৯৮-১৯৯৯ অর্থবছরে ৪ কোটি ৪০ লাখ, ১৯৯৭-১৯৯৮ অর্থবছরে নেয়া হয় ১৭ কোটি ৭৭ লাখ টাকা শিক্ষকরা অতিরিক্ত, ভুয়া বিল ভাউচায় দিয়ে তুলে নিয়েছেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। সর্বশেষ ২০১৩ থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত ১৮ কোটি ৪৮ লাখ টাকা তুলে নেয়া হয়েছে- এমন প্রতিবেদন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছে ডিআইএ। এছাড়া চলতি বছরের মে মাসে তদন্তে ২ কোটি, জুন মাসে ১ কোটি ৩ লাখ টাকা আদায়ের জন্য মন্ত্রণালয়ের কাছে সুপারিশ করা হয়েছে। ডিআইএ’র কর্মকর্তারা বলেন, জনবল সংকটের কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন ও শিক্ষকদের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতার বিষয়টি সঠিকভাবে যাচাই করা যাচ্ছে না। দেশে ৩০ হাজার স্কুল-কলেজ পরিদর্শনের জন্য সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরের মাত্র ৩০ জন কর্মকর্তা রয়েছেন। কম সংখ্যক কর্মকর্তা দিয়ে এতো বিপুলসংখ্যক প্রতিষ্ঠান সঠিকভাবে পরিদর্শন করা যাচ্ছে না। প্রতিষ্ঠানটির জনবল বাড়িয়ে সঠিকভাবে আর্থিক অনিয়মের বিষয়টি তদন্ত করা হলে আত্মসাতের পরিমাণ কয়েকশ’ কোটি ছাড়িয়ে যাবে-বিষয়টি প্রমাণ করা যাবে। ডিআইএ’র এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, কোন শিক্ষক কর্মচারির বিরুদ্ধে টাকা আত্মসাতের প্রমাণ পাওয়ার পরও তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। শিক্ষকের বিরুদ্ধে উত্থাপিক অভিযোগ সুরাহা না হলেও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা অবসর ও কল্যাণ ট্রাস্টের টাকা তুলে নিয়ে যাচ্ছেন। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয় নিরব ভূমিকা পালন করছে। সুপারিশ বাস্তবায়ন হচ্ছে না:ডিআইএ’র অভিযোগ, প্রতিবছর সহস্রাধিক প্রতিষ্ঠান তদন্ত ও পরিদর্শন করে সমপরিমাণ সুপারিশ দিচ্ছে ডিআইএ। কিন্তু ১০ ভাগ সুপারিশও বাস্তবায়ন হচ্ছে না। উদাহরণ হিসাবে বলা হয়, রাজধানীর মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে ২০০৭ সালে নানা অভিযোগের প্রমাণ পায় ডিআইএ। ওই সময় ১৭টি অনিয়ম তুলে ধরে তা বাস্তবায়নের সুপারিশ করে। পাশাপাশি শিক্ষকরা যে অতিরিক্ত টাকা তুলে নিয়েছেন তাও আদায়ের সুপারিশ করা হয়। পরবর্তীতে একাধিক তদন্ত প্রতিবেদনেও ওই সুপারিশ বাস্তবায়নের কথা বলা হয়। কিন্তু আজ পর্যন্ত ওই সুপারিশ বাস্তবায়ন করেনি শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও স্কুল কর্তৃপক্ষ। ডিআইএ বলছে, সুপারিশ বাস্তবায়ন হলে কোটি কোটি টাকা সরকারি তহবিলে ফেরত আসত। এছাড়া অভিযুক্ত শিক্ষক আর আর্থিক অনিয়ম করার সুযোগ পেতেন না। কিন্তু আত্মসাতের তথ্য মন্ত্রণালয় জেনেও কোন ব্যবস্থা নিচ্ছে না বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের। প্রতিমাসে শিক্ষকরা এখনো কোটি কোটি টাকা সরকারি তহবিল থেকে তুলে নিচ্ছেন। অতিদ্রুত এসব শিক্ষক-কর্মকর্তাদের খুঁজে বের করে টাকা ফেরত আনা এবং অবৈধভাবে অর্থ উত্তোলনের পথ বন্ধ করা প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মত দিয়েছেন। এ বিষয়ে ডিআইএ’র পরিচালক অধ্যাপক মফিজ উদ্দিন আহমেদ বলেন, যত বেশি তদন্ত করা যাবে, তত বেশি তথ্য পাওয়া যাবে। ডিআইএ’র জনবল বাড়ানো হলে আরো বেশি আর্থিক অনিয়মের তথ্য বের করা যাবে। তিনি আরো বলেন, আমরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অনিয়মের তথ্য অনুসন্ধান করে এই আত্মসাত্ করা টাকা শিক্ষকদের কাছ থেকে ফেরত আনার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সুপারিশ পাঠাই। আর সুপারিশ বাস্তবায়নের দায়িত্ব মন্ত্রণালয়ের।