গত কয়েক বছর ধরেই বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে। ফাঁসরোধে তদন্ত কমিটি গঠন ছাড়া তেমন কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি। চোখে পড়ার কথাও না। কারণ স্বয়ং শিক্ষামন্ত্রীই তাঁর একটি লেখায় লিখেছেন, “আমরা ২০০৯ সাল থেকে এসএসসি ও এইচএসসি এবং সমমানের পরীক্ষা গ্রহণ করছি। সর্বশেষ এসএসসি পরীক্ষা (ফল ১৭ মে প্রকাশিত হয়েছে) পর্যন্ত এ সময়ে একটি পরীক্ষারও প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে এমন অভিযোগ ওঠেনি।” শিক্ষামন্ত্রীর এমন বক্তব্যে বিস্মিত হতে হয়। তাঁর এ বক্তব্য প্রসঙ্গে কিছু লেখার আগে ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালের একটি লেখা থেকে কয়েকটি লাইন প্রাসঙ্গিকভাবে পাঠকের সামনে উপস্থাপন করছি। এইচএসসি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস সম্পর্কে তিনি লিখেছেন, “এবারে যে ব্যাপকভাবে প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে সেটি নিয়ে আমার কিংবা পরীক্ষার্থীদের মাঝে তিল পরিমাণ সন্দেহ নেই। পরীক্ষার আগে যে প্রশ্নটি এসেছে দু’দিন পর সেই প্রশ্নটিই পরীক্ষায় আসছে, এখানে সন্দেহ করার জায়গাটি কোথায়? কিন্তু সংবাদ মাধ্যমগুলো কেন জানি পুরো বিষয়টি এখনো নিশ্চিত সত্য বলে স্বীকার না করে এটি ‘অভিযোগ’ বলে গা বাঁচিয়ে সংবাদ পরিবেশন করে যাচ্ছে।” এইচএসসি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস সম্পর্কে শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য, “পরীক্ষার শুরুর দিনের আগের দিনই প্রচার হয় প্রথম দিনের প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে। বাংলা ২য় পত্র, ইংরেজি ১মপত্র সম্পর্কেও গুজব থাকলেও কোনোটাই প্রমাণ করা যায়নি।”
আমার প্রিয় লেখক মুহম্মদ জাফর ইকবালের উল্লিখিত বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করে বলতে চাই— এসএসসি পরীক্ষার সবগুলো বিষয়ের প্রশ্নই যে ব্যাপকভাবে ফাঁস হয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। শিক্ষামন্ত্রী তাঁর লেখায় দাবি করেছেন সর্বশেষ এসএসসি পরীক্ষার একটি প্রশ্নপত্রও ফাঁস হয়নি। অথচ এসএসসি পরীক্ষায় যে বিষয়ের পরীক্ষা যেদিন তার আগের দিনই ওই বিষয়ের প্রশ্ন পরীক্ষার্থীরা পেয়েছে— এটা অস্বীকার করার জো নেই। মেধাবী শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং শিক্ষকেরা প্রশ্নফাঁসে যারপরনাই উদ্বিগ্ন। প্রশাসনিক ঝামেলা, ভয় কিংবা সংশ্লি¬ষ্ট কর্তৃপক্ষের অবহেলার কারণে কেউ এ বিষয়ে অভিযোগ করে না। মানুষ ভাবে প্রশ্নফাঁসের বিষয়টি আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে অবহিত করলে তারা অভিযোগকারীকেই উলটো জেরা কিংবা হয়রানি করবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়, শিক্ষা অধিদপ্তর কিংবা শিক্ষা অফিসে অভিযোগ করলে তারা বিষয়টি আমলে নেবে না। আর এ কারণেই সাধারণ মানুষ প্রশ্ন ফাঁস নিয়ে টু শব্দ করে না।
এবারের এসএসসি পরীক্ষায় ইংরেজি ২য় পত্রের পরীক্ষার আগের দিন দুই ছাত্রী যথাক্রমে রাত ১১ টা ও ১২ টার সময় গ্রামার অংশের কিছু বিষয় এবং রাইটিং অংশের কম্পোজিশন, দরখাস্ত বিষয়ে আমাকে অবহিত করে এবং গ্রামার অংশের সমাধান চায়। পরদিন সকাল ছয়টায় পৃথক এক ছাত্রী গ্রামার অংশের সমাধানের জন্য বৃষ্টি উপেক্ষা করে অটো (তিন চাকার ইঞ্জিন চালিত যান) নিয়ে আমার বাসায় আসে প্রশ্নের সমাধানের আশায়। পরীক্ষার পর প্রশ্ন হাতে পেলে দেখি ফাঁস হওয়া প্রশ্নের সঙ্গে এর হুবহু মিল রয়েছে। ওই তিন পরীক্ষার্থীকে প্রশ্ন করেছিলাম তারা এই প্রশ্ন কোথায় পেয়েছে। তাদের অভিন্ন জবাব—ফেসবুকে পেয়েছি। ফেসবুকের কোন্ সাইটে এটি প্রদর্শিত হয়েছে তা অবশ্য দেখার সৌভাগ্য আমার হয়নি। ইংরেজি ১ম পত্রের পরীক্ষার আগের দিন আমার বাড়ির মোবাইলে একটি মেসেজ আসে। ইংরেজি ১ম পত্রের ক ও খ সেটের সমস্ত প্রশ্নপত্রের সার সংক্ষেপ এতে উল্লে¬খ ছিল। যে নম্বর থেকে মেসেজটি এসেছে সেই নম্বরও আমার অপরিচিত। ওই নম্বরে ফোন দিয়ে ফোন বন্ধ পাওয়া গেছে। ওই মেসেজের সঙ্গে প্রশ্নপত্রের মিল ছিল। ২০১৩ সালেও এভাবে প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছিল। এ থেকে বোঝা যায়, একটি সংঘবদ্ধ চক্র প্রশ্নফাঁস করে। সরকারকে বিব্রত করতেই তাদের এই অপপ্রয়াস। সরকারকে এই অপপ্রয়াস সম্পর্কে সজাগ হতে হবে। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। বিষয়টি অস্বীকার করা কোনো সমাধান নয়।
ফরিদপুর
