আজ পবিত্র লাইলাতুল কদর

আপডেট : ২৪ জুলাই ২০১৪, ২২:৪৩
আজ দিবাগত রাত পবিত্র লাইলাতুল কদর। মহা মহিমান্বিত ও মহা সম্মানিত পবিত্র রজনী। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, হাজার মাসের অপেক্ষা এই রাত শ্রেষ্ঠ। আজ ২৬ রমজান। দিনের শেষে আসন্ন রাতটি ২৭ রমজানের রাত হিসেবে চিহ্নিত। হাদিস শরীফের বর্ণনা অনুযায়ী আজকের রাতটি পবিত্র লাইলাতুল কদর হওয়ার সম্ভাবনা অধিক। মাসব্যাপী সিয়াম সাধনা শেষে অধিক সম্ভাবনার ভিত্তিতে আজ রাতে সারাদেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা পবিত্র লাইলাতুল কদর অন্বেষণ করে থাকেন। মাহে রমজানের বিশেষ ফজিলত ও গুরুত্ব অনেকাংশে মহিমান্বিত এ রাতের কারণেই বৃদ্ধি পেয়েছে। এ রাতে লাওহে মাহফুজ থেকে নিম্ন আকাশে মহাগ্রন্থ আল কোরআন অবতীর্ণ হয়। আল্লাহ্ তা’য়ালা সুরা কদরে বলেন, ‘নিশ্চয় এ কোরআন আমি লাইলাতুল কদরে নাজিল করেছি।’ পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা লাইলাতুল কদরকে হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম বলে অভিহিত করেছেন। এর অর্থ হলো, সাধারণ এক হাজার মাস প্রতিরাত জাগ্রত থেকে নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত ইত্যাদি নফল ইবাদত করলে যে সওয়াব হবে, এই এক রাতের ইবাদতে তার চেয়েও অনেক বেশি সওয়াব পাওয়া যাবে। শবে কদরকে আরবিতে লাইলাতুল কদর বলা হয়। আরবি ভাষায় ‘লাইলাতুন’ অর্থ হলো রাত্রি বা রজনী এবং ‘কদর’ শব্দের অর্থ ম্মান, মর্যাদা, মহাসম্মান। এ ছাড়া এর অন্য অর্থ হলো ভাগ্য, পরিমাণ ও তাকদির নির্ধারণ করা। লাইলাতুল কদর উম্মতে মোহাম্মদীর একক সৌভাগ্য। আর কোনো নবীর উম্মতকে এ ধরনের ফজিলতপূর্ণ কোনো রাত বা দিন দান করা হয়নি। আগেকার নবীদের উম্মতরা অনেক আয়ু পেতেন। এজন্য তারা অনেকদিন ইবাদত করারও সুযোগ পেতেন। সে তুলনায় উম্মতে মোহাম্মদীর আয়ু নিতান্তই কম। এজন্য আল্লাহ তায়ালা তাঁর বিশেষ দয়ায় মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের উম্মতকে মহিমান্বিত এ রাত দান করেছেন। যারা এ রাত ইবাদত করে কাটাবেন, তাদের জন্য রয়েছে মহাপুরস্কারের ঘোষণা। মুসলিম সমপ্রদায়ের কাছে সওয়াব হাসিল ও গুনাহ মাফের রাত হিসেবে শবে কদরের ফজিলত অতুলনীয়। হাদিস শরিফে আছে, ২০ রমজানের পর যেকোনো বিজোড় রাত কদর হতে পারে। তবে, ২৬ রমজানের দিবাগত রাতেই লাইলাতুল কদর আসে বলে আলেমদের অভিমত। এজন্য মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম রমজানের শেষ দশকে ইতেকাফ করতেন। মহান আল্লাহ এই রাত্রির ফযীলত ও মর্যাদা সম্পর্কে কুরআনুল কারীমে একটি পূর্ণাঙ্গ সূরা নাযিল করেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘‘নিশ্চয়ই আমি পবিত্র কুরআন লাইলাতুল কদরে অবতীর্ণ করেছি। (হে নবী) আপনি জানেন লাইলাতুল কদর কোনটি? কদরের রাতটি হাজার মাস থেকে উত্তম। এ রাতে ফেরেশতাগণ এবং জিবরাইল (আ.) তাদের প্রভুর অনুমতিক্রমে প্রত্যেকটি হুকুম নিয়ে অবতীর্ণ হন। এটা নিরাপত্তা যা (সন্ধ্যা হতে) সুবহে সাদেক পর্যন্ত অব্যাহত থাকে।’’ (সূরা আল কদর)। আল্লাহ তায়ালা স্বয়ং এ রাতের দু’টি নাম রেখেছেন। ১. লাইলাতুল কদর বা সম্মানিত রাত ২. লাইলাতুল মুবারাকাহ বা বরকতময় রাত। এ রাতের সূর্যাস্তের পর থেকে আরম্ভ হয়ে সুবহে সাদেক পর্যন্ত আল্লাহর খাস রহমত সর্বত্র বর্ষিত হতে থাকে। এ রাতে পৃথিবীর নিকটতম আকাশে আল্লাহ তাঁর রহমত পুঞ্জিভূত করেন এবং মানুষের প্রার্থনা কবুল করেন। আর তাঁর প্রিয় বান্দাদের উপর রহমত নাযিল করেন। এ রাতে ইবাদত করা হলে পূর্বের পাপসমূহ ক্ষমা করা হয়। (বুখারী প্রথম খন্ড পৃষ্ঠা- ১০) এ রাতে ফেরেশতাগণ বেহশত থেকে একটি সবুজ নিশান এনে কাবা ঘরের মাঝখানে গেড়ে দেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘‘জিবরাইলের ছয়শত ডানা আছে, তা থেকে দু’টি ডানা এমন আছে যা কদরের রাত ছাড়া আর কোন সময় খুলেন না। এ রাতে ডানা দু’টি বিস্তার করেন অতঃপর ডানা দু’টি পূর্ব প্রান্ত হতে পশ্চিম প্রান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত হয়’’। এ ডানা বিস্তারের মাধ্যমে জগতের মাঝে রহমত বর্ষণ করতে থাকেন। (আততারগীব, ২য় খন্ড, পৃষ্ঠা নং- ১০০) মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম বলেন, আল্লাহ তায়ালা এই রাতে ইবাদতকারীদের প্রতি সুদৃষ্টি নিক্ষেপ করেন এবং তাদেরকে সম্পূর্ণরূপে ক্ষমা করে দেন। এ রাত্রিতে ফেরেশতাগণ ঐ সমস্ত লোকদেরকে সালাম করতে থাকেন, যারা দাঁড়িয়ে, বসে ইবাদত করে এবং যারা নামাজ পড়ে, যারা আল্লাহকে স্মরণ করে (তারগীব দ্বিতীয় খন্ড-পৃষ্ঠা-১০০)। এ রাতে বেহেশতের মধ্যে বৃক্ষসমূহ রোপণ করা হয়। এ রাতে হযরত আদম (আ.) এর মূল উপাদানসমূহ একত্রিত করা হয়। হযরত আনাছ (রা.) বলেন, রমযান মাস এলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম বলেন, তোমাদের মধ্যে রমযান মাস উপস্থিত হয়েছে এর মধ্যে এমন একটি রাত আছে যাহা হাজার মাস হতে উত্তম। যে ব্যক্তি সে রাত্রির কল্যাণ থেকে বঞ্চিত রইল সে সমস্ত কল্যাণ থেকে বঞ্চিত রইল। সে রাত্রের কল্যাণ থেকে ভাগ্যহীন লোকেরাই বঞ্চিত থাকে। (ইবনে মাজাহ, মিশকাত, পৃষ্ঠা-১৭৩) মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম আরও বলেন, চার শ্রেণীর লোককে আল্লাহ তায়ালা এ রাত্রিতে ক্ষমা করেন না। ১. শরাবখোর ২. মাতা-পিতার অবাধ্যচারী নাফরমান ৩. আত্মীয়ের সাথে সম্পর্ক বিচ্ছেদকারী ও ৪. অপরের প্রতি হিংসা-বিদ্বেষ ও শত্রুতা পোষণকারী (আততারগীব ২য় খন্ড) এ রাত্রিটি যাবতীয় অনিষ্ট ও বিপদাপদ থেকে শান্তিস্বরূপ। (ইবনে কাসীর)। কদরের ফযীলত পাওয়ার উদ্দেশ্যে কিছু নফল ইবাদত করা, অসংখ্য রাকআত নফল নামায আদায় করা। কুরআন তিলাওয়াত করা, তাছবীহ তাহলীল ইত্যাদি পাঠ করা কর্তব্য। এ রাতের শ্রেষ্ঠ দোয়া হলো ক্ষমা চাওয়ার দোয়া। এ রাতে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম ক্ষমা চাওয়ার দোয়া শিক্ষা দিলেন যে, ‘তুমি আল্লাহর নিকট ক্ষমা চাও, ক্ষমা পাওয়ার জন্য দোয়া কর।’ হাদীস শরীফে আছে হযরত আয়েশা (রা.) মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ইয়া রাসূল আল্লাহ! যদি আমি বুঝতে পারি শবে কদর কোন রাত, তাহলে ঐ রাতে আমি কি বলব? আল্লাহর কাছে কি চাইব? প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম বলেন তুমি বলবে, ’আল্লাহুম্মা ইন্নাকা, আফুউন তুহেববুল আফওয়া, ফায়াফু আন্নি (‘‘হে আল্লাহ তুমি বড়ই ক্ষমাশীল। ক্ষমা করতে তুমি ভালবাস, তাই আমাকে ক্ষমা করে দাও।) রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর বাণী রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ পবিত্র লাইলাতুল কদর উপলক্ষে এক বাণীতে বাংলাদেশসহ মুসলিম বিশ্বের সকলকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও মোবারকবাদ জানান। তিনি বলেন, আমাদের ক্ষণস্থায়ী জীবনে হাজার মাসের চেয়েও বেশি ইবাদতের নেকি লাভের সুযোগ এনে দেয় এই রাত। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পবিত্র লাইলাতুল কদরে তাঁর অশেষ রহমত ও বরকত দ্বারা আমাদের সকলের জীবনকে পরিপূর্ণ করে দেন- এই দোয়া করি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার বাণীতে দেশবাসী এবং বিশ্বের সকল মুসলমানকে আন্তরিক মোবারকবাদ জানান। প্রধানমন্ত্রী বলেন, পবিত্র এই রাতে ইবাদত-বন্দেগির মাধ্যমে আমরা মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে পারি। অর্জন করতে পারি তাঁর অসীম রহমত, বরকত ও মাগফেরাত। এই পবিত্র রজনিতে আমি মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ ও মুসলিম জাহানের উত্তরোত্তর উন্নতি, অব্যাহত শান্তি ও কল্যাণ কামনা করছি। আজ পবিত্র জুমাতুল বিদা ও আল কুদস্ দিবস ইত্তেফাক রিপোর্ট আজ পবিত্র রমজানের শেষ শুক্রবার। আজ পবিত্র জুমা’তুল বিদা। এদিনে জুমার নামাজ আদায়ের জন্য সবার মন-প্রাণ আকুল থাকে। মহান আল্লাহ তায়ালার দরবারে বিগলিত চিত্তে নিজের জন্য এবং পুরো মুসলিম উম্মাহর জীবিত ও মৃত সবার জন্য মাবুদের কাছে ক্ষমা, মাগফিরাত, নাজাত, সওয়াব, পুরস্কার, জান্নাত এবং সর্বোপরি আল্লাহ পাকের দিদার কামনা করা হয়। ইসলামের সূচনাকালে মদিনায় যখন রমজান মাসের সিয়ামের হুকুম নাজিল হয় তখন থেকেই প্রতিবছর রমজান মাসের জুমাতুল বিদাকে ইসলামী জাহানের দেশে দেশে মসজিদে মসজিদে জোর তাগিদ দিয়েই পালন করা হয়। একই সঙ্গে আজ আন্তর্জাতিক পবিত্র আল-কুদ্স দিবস। মুসলমানদের প্রথম ক্বিবলা বায়তুল মোকাদ্দাস দীর্ঘদিন ধরে ইহুদীদের দখলে। বায়তুল মোকাদ্দাস পুনঃরুদ্ধারের দাবিতে প্রতিবছর রমজানের শেষ শুক্রবার বিশ্বব্যাপী পালিত হয় আল-কুদ্স দিবস। ইসলামের পবিত্র ভূমি মক্কা ও মদিনা মুনাওয়ারার পরে তৃতীয় পবিত্র ভূমি হলো বায়তুল মোকাদ্দাস। হিযরতের পর বায়তুল মোকাদ্দাস ইসলামের প্রথম কিবলা। বায়তুল মোকাদ্দাস দুনিয়ার অন্য অসংখ্য ভূখণ্ডের মত কোন সাধারণ ভূখণ্ড নয়। খাতেমুল আম্বিয়া হজরত মুহাম্মাদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম পবিত্র মেরাজ গমনের সময় মসজিদুল আকসায় উপস্থিত হয়ে নামাজ আদায় করেন। তিনি ছিলেন নামাজে অংশগ্রহণকারী সব নবী-রাসূলের ইমাম। হাজার হাজার নবী-রাসূলের স্মৃতিচিহ্ন বুকে নিয়ে আছে ফিলিস্তিনের ভূখণ্ডের আল-কুদস, মসজিদুল আকসা এবং আশপাশের এলাকাগুলো। বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদী ও উপনিবেশবাদী চক্র ইহুদি বর্ণবাদী জায়নিস্টদের ইন্ধন জুগিয়ে ফিলিস্তিনের অধিকার কেড়ে নিয়েছে এবং মুসলমান জনগণকে বর্বরোচিতভাবে সেখানকার শহর, গঞ্জ, বন্দর ও গ্রাম থেকে উচ্ছেদ করছে, পাইকারি হারে হত্যা করছে, কারারুদ্ধ করছে। ইসরাইলি বর্বরতার বিরুদ্ধে বিশ্ববাসী প্রতিবাদ করে আসছে এবং খোদ ফিলিস্তিনিরা সংগ্রাম ও যুদ্ধ করে চলছে। এবছর পবিত্র রমজান শুরুর পর বর্বর ইসরাইলি দানবরা গাজা ভূমি অবরুদ্ধ করে সেখানে নির্বিচারে গণহত্যা চালাচ্ছে। ফিলিস্তিনিরা আল-কুদস দিবস পেয়ে দখলমুক্ত হওয়ার আশায় বুক বেঁধেছে। এদিনে মুসলিম উম্মাহ এবং বিশ্বের বিবেকবান মানুষ সভা, সেমিনার, বিক্ষোভ মিছিল ইত্যাদির আয়োজন করে থাকে। আজও পালিত হবে এ দিবস সর্বত্র। বিশ্ব থেকে জালিম দখলদাররা উচ্ছেদ হোক এবং শান্তিকামী জনগণ নাজাত পাক আর বায়তুল মোকাদ্দাস মুক্ত হোক এই কাম্য থাকে এই দিনে।