মূলধারার শিক্ষা কার্যক্রমের পাশাপাশি আমাদের দেশে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে ইংরেজিমাধ্যম শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখিয়া আসিতেছে দীর্ঘদিন যাবত্। তাহাদের শিক্ষাদানের মাধ্যমই কেবল ইংরেজি নহে, পাঠ্যক্রমও স্বতন্ত্র। ফলে শিক্ষার্থীরা ইংরেজিতে দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি দেশে থাকিয়াই আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষার সহিত যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাইতেছে। আর এই সুযোগের সদ্ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমাদের শিক্ষার্থীরা কতোখানি পারঙ্গম তাহা বিশ্ব পরিসরে তাহাদের গত কয়েক বত্সরের ‘ও’ এবং ‘এ’ লেভেল পরীক্ষার ফলাফলের ওপর চোখ বুলাইলেই স্পষ্ট হইয়া যায়। বিষয়টি যে গর্ব করিবার মতো তাহাতে সন্দেহ নাই। তবে ইহার তাত্পর্য এইখানেই সীমিত নয়। বিশ্বায়নের এই যুগে উন্নততর জ্ঞানচর্চা ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের প্রায় সকল ক্ষেত্রে ইংরেজি যে অনেকটা অবিকল্প মাধ্যমে পরিণত হইয়াছে, তাহা সুবিদিত। কিন্তু নানা কারণে স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে এই ক্ষেত্রে আমাদের সামগ্রিক দক্ষতার যে উদ্বেগজনক অবনতি ঘটিয়াছে— তাহা অস্বীকার করিবার উপায় নাই। এই বাস্তবতা ইংরেজিমাধ্যম বিদ্যালয়সমূহের গুরুত্বকে নিঃসন্দেহে আরও বাড়াইয়া তুলিয়াছে।
পাশাপাশি ইহাও সত্য যে, ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে দেশে ইংরেজিমাধ্যম শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা যেইভাবে বৃদ্ধি পাইয়াছে, সেই হারে সর্বত্র শিক্ষার গুণগত মান সমভাবে রক্ষিত হইতেছে কিনা তাহা লইয়া প্রশ্ন আছে। সেই সাথে অস্বস্তি আছে বেতন-ভাতা নির্ধারণসহ আনুষঙ্গিক আরও কিছু বিষয়ে। বিগত বত্সরগুলিতে তাহার কিছুটা বহিঃপ্রকাশ ঘটিতেও দেখা গিয়াছে। ফলে দ্রুত বিকাশমান প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলির ক্ষেত্রে যেমন, তেমনি এই ক্ষেত্রেও একটি নীতিমালার প্রয়োজনীয়তার প্রশ্নটি সামনে আসিয়াছে। ইহা শুধু শৃঙ্খলাবিধানের প্রশ্ন নহে, বরং ইংরেজিমাধ্যম শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির বিপুল অবদানের নিরিখে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রণোদনার বিষয়টিও ইহার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। শিক্ষাখাতে সরকারের বিনিয়োগ বিশাল। ঐতিহ্যগতভাবে সেই ব্রিটিশ শাসনামল হইতে সকল সরকারই এই ক্ষেত্রে বিশেষ মনোযোগ প্রদান করিয়া আসিতেছে। কিন্তু ইংরেজিমাধ্যম শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ যে দীর্ঘদিন যাবত্ উপেক্ষার শিকার হইয়া আসিতেছে তাহা অস্বীকার করিবার উপায় নাই।
দীর্ঘদিন পরে হইলেও সরকার এই বিষয়ে একটি নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করিয়াছে। বিষয়টি নিঃসন্দেহে স্বস্তিদায়ক। তবে ঘরপোড়া গরু যেমন সিঁদুরে মেঘ দেখিলে ভয় পায়, তেমনি এই দেশের উদ্যোক্তারাও নীতিমালার কথা শুনিলে আতঙ্কিত বোধ করেন। আতঙ্কের কারণ, ‘নীতিমালা’ আর ‘নিয়ন্ত্রণ’ প্রায় সমার্থক শব্দ হইয়া উঠিয়াছে তাহাদের নিকট। আর নিজের গাঁটের পয়সা খরচ করিয়া যাহারা উদ্যোক্তার ভূমিকায় আবির্ভূত হন, সরকারি তথা আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণের জটিল ফাঁদে তাহারা পা রাখিতে যাইবেনই-বা কেন? অতএব, সরকার যেই নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়াছে তাহা যেন উদ্যোক্তাদের গলার ফাঁসে পরিণত না হয় সেইদিকে যেমন লক্ষ্য রাখিতে হইবে, তেমনি স্থায়ীভাবে এই ক্ষেত্রে বিরাজমান যাবতীয় বিশৃঙ্খলা, অসঙ্গতি ও অস্বস্তি নিরসনেও যথাযথ মনোযোগ দেওয়া উচিত। তাহা নিশ্চিত করিবার সর্বোত্তম পন্থা হইল, সংশ্লিষ্ট সকলপক্ষের মতামতের ভিত্তিতে যতদূর সম্ভব সকলের নিকট গ্রহণযোগ্য একটি নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা।
