ঈদ ঘনিয়ে এলেও গার্মেন্টস শ্রমিকদের বেতন-বোনাস নিয়ে অসন্তোষ থামেনি। ওয়াদা দিয়েও সময়মত বেতন-ভাতা পরিশোধ করেননি অনেক গার্মেন্টস মালিক। ফলে শেষ দিকে এসে বেশ কিছু কারখানায় শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ বেড়েছে। মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বেতন-বোনাসের ঝুঁকিতে থাকা কারখানার সংখ্যা ১০টিরও কম। তবে শ্রমিক সংগঠনগুলোর হিসাবে এ সংখ্যা অর্ধশতাধিক হবে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, প্রতিবারই ঈদের আগে বেতন-বোনাস নিয়ে এক শ্রেণির মালিক অহেতুক ঝামেলা তৈরি করেন। কিছু কারখানার মালিক ২/৩ মাসের বেতন বকেয়া রেখে কারখানা বন্ধ করে সটকে পড়েন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
শিল্প পুলিশের ডিজি আব্দুস সালাম ইত্তেফাককে জানান, গতকাল পর্যন্ত প্রায় ৪০ ভাগ কারখানা বেতন-বোনাস পরিশোধ করেনি। তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে। তিনি বলেন, প্রতিবারই বেতন নিয়ে ঝামেলা সৃষ্টি হয়। এ বিষয়ে স্থায়ী সমাধান দরকার বলে তিনি মনে করেন।
বিজিএমইএ সভাপতি আতিকুল ইসলাম আশা প্রকাশ করে বলেন, ঈদের আগের দিন পর্যন্ত প্রায় শতভাগ কারখানা বেতন-বোনাস দিতে পারবে। তবে সরকার ঘোষিত পাওনাদি পরিশোধের ডেডলাইন আজ শনিবার (২৬ জুলাই) শেষ হচ্ছে।
এদিকে দাবি আদায়ের জন্য বিজিএমইএ ভবনের সামনে অবস্থান বা বিক্ষোভ সামপ্রতিক সময়ে নৈমিত্তিক ঘটনা হলেও ঈদকে সামনে রেখে গত এক মাসে এটি অতীতের যে কোন সময়ের তুলনায় বেড়েছে। এছাড়া রাজধানীর মিরপুর, বাড্ডা ছাড়াও নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও আশুলিয়ায় ছোট-বড় অসন্তোষের ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ গতকাল শুক্রবার জুকি গার্মেন্টস নামে অপসোনিন গ্রুপের একটি কারখানার শ্রমিকরা বকেয়া বেতন-বোনাসের দাবিতে বাংলা মোটরে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কার্যালয় ঘেরাও করে। এর আগে বৃহস্পতিবার রাত দুইটা পর্যন্ত তারা বিজিএমইএ কার্যালয়ে অবস্থান করলেও রাতে পুলিশ তাদের বিজিএমইএ ভবন থেকে চলে যেতে বাধ্য করে বলে শ্রমিকরা অভিযোগ করেছেন।
অন্যদিকে গাজীপুরের ময়মনসিংহ রোডে ট্রেডমার্ক নামে একটি কারখানার শ্রমিকরা বেতন-বোনাস না পাওয়ায় গতকাল অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। এ ব্যাপারে শিল্প পুলিশের ডিজি আব্দুস সালাম ইত্তেফাককে বলেন, কারখানাটির মালিককে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। মালিককে খুঁজে না পাওয়া গেলে আগামীকালের মধ্যে (আজ শনিবার) কারখানার মেশিনপত্র বিক্রি করে পাওনাদি দেয়ার বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে। এর আগে গত বুধবার ৫টি কারখানার প্রায় এক হাজার শ্রমিক বকেয়া বেতনের দাবিতে দিনভর অবস্থান করেন বিজিএমইএ’র সামনে। তোবা গ্রুপের ৫টি কারখানা বুকশান গার্মেন্টস, তোবা ফ্যাশন, তোবা টেক্সটাইল লিমিটেড, তায়েব ডিজাইন ও মিতা ডিজাইনের এসব শ্রমিক গত তিন মাস ধরে বেতন পাচ্ছেন না। বকেয়া মজুরির দাবিতে এর আগেও একাধিকবার তারা রাস্তায় নেমেছেন। সর্বশেষ গত ২৩ জুন বিজিএমইএতে কারখানা কর্তৃপক্ষ, শ্রমিক প্রতিনিধি ও বিজিএমইএ’র প্রতিনিধিদের এক বৈঠকে গত ১৫ জুলাইয়ের মধ্যে জুনের বেতন পরিশোধের সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু মালিক পরিশোধ করেননি। একই দিন মিরপুরের ফোর উইংস এবং সাভারের একটি কারখানার শ্রমিকরাও বিজিএমইএ’র সামনে বকেয়া বেতনের দাবিতে বিক্ষোভ করেন।
জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক-কর্মচারী লীগের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম রনি বলেন, বেতন-বোনাস নিয়ে ঝামেলা তৈরি হতে পারে এমন কারখানার সংখ্যা অর্ধশতাধিক। তিনি বলেন, জুকি ও তোবা গ্রুপের ৫টি কারখানা ছাড়াও কাওরান বাজারের এ নাহার গার্মেন্টস, আশুলিয়ার ওশান ডিজাইন, ভাটারার স্পেস গার্মেন্টস, ফার্মগেট তেজতুরি বাজারের স্মরণিকা ফ্যাশন, গাজীপুরের মাওনায় কেএমসি সোয়েটার, তামান্না সোয়েটার, গোল্ডেন টাচসহ বেশ কয়েকটি কারখানায় বেতন-বোনাস নিয়ে অসন্তোষ চলছে। এছাড়া ধামরাইয়ের তিনটি কারখানায় সমস্যা নিয়ে আলোচনা চলছে। তিনি বলেন, সারা দেশে এমন কারখানার সংখ্যা ৫০ এর কম হবে না। অবশ্য শিল্প পুলিশের ডিজি দাবি করেছেন, সাভার, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামে বড় ধরনের কোন অসন্তোষ নেই।
বিজিএমইএ’র সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বেতন-বোনাস বিষয়ে গত ৯ থেকে ২৩ জুলাই ঝুঁকির তালিকায় থাকা ১ হাজার ৭০টি কারখানা পরিদর্শন করেছেন বিজিএমইএ’র সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। পরিদর্শনে দেখা গেছে, ৩৮টি কারখানায় বেতনের বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি। আর ২২টি কারখানা বোনাস দেয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। অবশ্য পরবর্তী সময়ে এ পরিস্থিতির আরো উন্নতি হয়েছে বলে ওই সূত্র জানিয়েছে।
অপসোনিন গ্রুপের জুকি গার্মেন্টসের শ্রমিকদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, গত মে মাস থেকে তাদের বেতন বকেয়া। কারখানাটি সংস্কারের কথা বলে মালিকপক্ষ ১৫ দিনের ছুটি দেয় শ্রমিকদের। কিন্তু পরবর্তীতে শ্রমিকরা কাজে ফিরে দেখে কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। এর পর থেকেই তারা পাওনার জন্য আন্দোলন করছেন।
কারখানাটির শ্রমিক রফিকুল ইসলাম ইত্তেফাকের এ প্রতিনিধিকে বলেন, আমাদের একের পর এক তারিখ দেয়া হচ্ছে। কিন্তু বেতন দেয়া হচ্ছে না। ঈদ চলে এসেছে। কোন টাকা নেই। কীভাবে কী করব কিছু জানি না।
এ ব্যাপারে বিজিএমইএ সভাপতি আতিকুল ইসলাম বলেন, অপসোনিন বড় প্রতিষ্ঠান। তারা কেন শ্রমিকদের বেতন নিয়ে সমস্যা সৃষ্টি করল তা আমাদেরও বোধগম্য নয়।
বিষয়টি নিয়ে গতকাল অপসোনিন গ্রুপের কর্মকর্তারা বৈঠক করেন বলে জানা গেছে। বিজিএমইএ’র লেবার স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান আহাদ আলী আনসারি ইত্তেফাককে বলেন, প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক সাইফুল ইসলাম তাকে জানিয়েছেন, আগামীকাল রবিবার জুকি গার্মেন্টসের শ্রমিকদের এক মাসের বেতন দেয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে।
ঈদের দিন মালিকদের বাসা ঘেরাওয়ের ঘোষণা
নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, ঈদের আগে বেতন-বোনাস পরিশোধ করা না হলে শ্রমিকেরা ঈদের দিন মালিকদের বাড়ি ঘেরাও করবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন বাংলাদেশ টেক্সটাইল গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমান ইসমাইল। ফিউচার নিটওয়্যার ও রিগ্যাল গার্মেন্টসের শ্রমিকদের বকেয়া বেতন ও বোনাসের দাবিতে গতকাল শুক্রবার সকাল ১১টায় শহরের পুরাতন কোর্ট এলাকায় সংগঠনের নারায়ণগঞ্জ জেলা শাখা আয়োজিত বিক্ষোভ সমাবেশে তিনি এই হুমকি দেন। প্রসঙ্গত, নারায়ণগঞ্জে শতাধিক গার্মেন্টসে শ্রমিকদের বেতন-বোনাস গতকাল পর্যন্ত পরিশোধ করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
