নান্দনিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি প্রাচীন জেলা কুমিল্লা। ঈদের ছুটিতে ঘুরে যেতে পারেন এ জেলার দৃষ্টিনন্দন স্পটগুলোতে। অপূর্ব সৌন্দর্যমণ্ডিত এ জেলার আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে প্রাচীনকালের অসংখ্য স্থাপত্য নিদর্শন ও দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা।
শালবন বিহার: শালবন বিহার বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন বৌদ্ধ বিহার। কুমিল্লা নগর থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার পশ্চিমে শালবন বিহার অবস্থিত। সপ্তম থেকে অষ্টম শতাব্দরী মাঝামাঝি সময়ে বৌদ্ধ রাজাদের শাসনামলে শালবন বিহার স্থাপিত হয়।
চারপত্র মুড়া: এই স্থানটি কুটিলা মুড়া থেকে প্রায় ১.৫০ মাইল উত্তর-পশ্চিমে ক্যান্টনমেন্ট অঞ্চলে অবস্থিত। এই পাহাড়ের শীর্ষ দেশ সমতল, আকারে ছোট এবং আশপাশের ভূমি থেকে ৩৫ ফুট উঁচু। ১৯৫৬ সালে পূর্ব-পশ্চিমে ১০০ ফুট দীর্ঘ ও উত্তর দক্ষিণে ৫৫ ফুট প্রস্থ বিশিষ্ট একটি ছোট চতুষ্কোণ বৌদ্ধ মন্দির আবিষ্কৃত হয়।
কুটিলা মুড়া: এই স্থানটি শালবন বিহার থেকে উত্তরে ৩ মাইল দূরে ক্যান্টনমেন্ট অঞ্চলে অবস্থিত। খননের ফলে এখানে প্রাচীনকালের ৩টি ‘স্তূপ নিদর্শন’ আবিষ্কৃত হয়েছে।
জাদুঘর: শালবন বিহারের পাশেই রয়েছে জাদুঘর। এই জাদুঘরে রয়েছে দর্শনীয় সব পুরাকীর্তি এবং বিভিন্ন রাজবংশীয় ইতিহাস, তাদের ব্যবহূত তৈজসপত্র, স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রা, ব্রোঞ্জের ছোট ছোট বুদ্ধ মূর্তি, দেব-দেবির মূর্তি, পোড়া মাটির ফলকচিত্র, অলংকৃত ইট, পাথরের মূর্তি, মাটি ও তামার পাত্র, দৈনন্দিন ব্যবহার সামগ্রী- দা, কাস্তে, কুঠার, ঘটি, বাটি, বিছানাপত্র ইত্যাদি। জাদুঘরের পাশে বন বিভাগ নতুন ২টি পিকনিক স্পট করেছে।
ইটাখোলা মুড়া: কোটবাড়ি থেকে অল্প পশ্চিমে বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়ন (বিজিবি) ক্যাম্প বরাবর উত্তর টিলায় ইটাখোলা মুড়া অবস্থিত। আঁকা-বাঁকা পাহাড়ের ঢাল বেয়ে উপরে উঠতে হয়। এখানে একটি বৌদ্ধ মূর্তি আছে।
আনন্দ বিহার: ময়নামতি লালমাই পাহাড়ের অসংখ্য বৌদ্ধ স্থাপত্য কীর্তির মধ্যে আনন্দ বিহারই সর্ববৃহত্। অষ্টম শতকের দেব বংশীয় প্রভাবশালী রাজা আনন্দ দেব কর্তৃক এখানে শালবন বিহারের অনুরূপ একটি বিশাল বৌদ্ধ বিহার স্থাপিত হয়েছিল। এখানে আবিষ্কৃত সম্পদের মধ্যে মৃণ্ময় দীপ, বৌদ্ধ দেব-দেবীর বিভিন্ন ব্রোঞ্জের মূর্তি, মুদ্রালিপি সম্বলিত ফলক, মৃত্ পাত্র ও গুটিকা ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।
লালমাই পাহাড়: লালমাই পাহাড় নিয়ে একটি গল্প প্রচলিত আছে। সেটি এরকম- লংকার রাজা রাবণ রামের স্ত্রী সীতাকে হরণ করে নিয়ে গেলে রাম তার ভাই লক্ষণকে নিয়ে উদ্ধার অভিযান চালায়। এতে লক্ষণ আহত হলে কবিরাজ বিশল্যাকরণী গাছের পাতা হিমালয় পাহাড় থেকে সূর্যোদয়ের পূর্বে এনে দেয়ার কথা বলেন। হনুমান গাছটি চিনতে না পেরে পুরো পর্বত নিয়ে আসে এবং কাজ শেষে পাহাড়টি যথাস্থানে রাখতে যাওয়ার সময় অনেকটা আনমনা হয়ে যায়। ফলে পাহাড়ের একাংশ লম লম সাগরে পড়ে যায়। সেটিই লালমাই পাহাড়।
রূপবান মুড়া: কোটবাড়ি বার্ডের প্রধান ফটকের অদূরে (পশ্চিমে) এই স্থানটি অবস্থিত। প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্যের পর এখানে একটি বিহার, একটি মন্দির, একটি ক্ষুদ্র স্তূপ ও একটি উচ্চ মঞ্চের স্থাপত্য নিদর্শন উন্মোচিত হয়। এখানকার কারুকাজ খচিত প্রাচীন মন্দিরটি সত্যিই দেখার মতো।
চণ্ডিমুড়া মন্দির: কুমিল্লা মহানগর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দক্ষিণে জেলার লাকসাম-বরুড়া-সদর উপজেলার ত্রিমুখী মিলনস্থলে পাহাড়চূড়ায় ২ একর ৬৮ শতক জায়গাজুড়ে চণ্ডি ও শিব নামক দুইটি মন্দির অবস্থিত। চণ্ডিমন্দিরের নামানুসারে এলাকাটি চণ্ডিমুড়া হিসেবে পরিচিত। এর অদূরেই রয়েছে দুতিয়া দীঘি।
ময়নামতি পাহাড়: কুমিল্লা-সিলেট সড়কের বুড়িচং এলাকায় ময়নামতি পাহাড় অবস্থিত। চতুষ্কোণ এই পাহাড়টির উপরিভাগ সমতল, উচ্চতা প্রায় ৪০ ফুট। এখানকার আবিষ্কৃত স্থাপত্য নিদর্শনগুলো আনুমানিক ১২শ-১৩শ শতাব্দরীর মাঝামাঝি সময়ে নির্মিত বলে ধারণা করা হয়।
চিড়িয়াখানা: জেলা প্রশাসকের বাংলোর পাশে চিড়িয়াখানা ও বোটানিক্যাল গার্ডেনের অবস্থান। প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে দর্শনার্থীরা এসে ভিড় জমান সেখানে। এ চিড়িয়াখানায় আরো নতুন নতুন প্রাণীর সমাবেশ ঘটানোর দাবি জানিয়েছেন দর্শনার্থীরা।
নূরজাহান ইকো পার্ক: মহানগরীর ইপিজেডের পূর্বপার্শ্বে নেউরা এলাকায় ৬৪০ শতক জমিতে ব্যক্তিগত উদ্যোগে নূরজাহান ইকো পার্ক স্থাপন করেন গায়ক ও সংস্কৃতিমনা মো. আবদুর রাজ্জাক।
শাহ সুজা মসজিদ: মহানগরীর মোগলটুলিতে অবস্থিত শাহ সুজা মসজিদ। সম্রাট আওরঙ্গজেবের ভাই শাহজাদা সুজার নামানুসারে এই মসজিদের নাম রাখা হয়েছে। এতে গম্বুজের সংখ্যা ৩টি, মিনার ৬টি, দৈর্ঘ্য ৫৮ ফুট, প্রস্থ ২৮ ফুট। দেয়ালের পুরুত্ব ৫-৮ ইঞ্চি।
রাজেশপুর ইকো পার্ক: জেলার সদর দক্ষিণ উপজেলার পূর্ব জোড়কানন এলাকা থেকে সড়কপথে ভারত সীমান্ত সংলগ্ন রাজেশপুর ইকো পার্কে যাওয়া যায়। এর আয়তন ৫৮৭ দশমিক ৮৯ একর। এই ইকো পার্কে রয়েছে নানা প্রজাতির গাছপালা, পশু-পাখি এবং কৃত্রিম বাঘ-বানর, ভাল্লুকসহ নানান প্রাণীর ভাস্কর্য।
জামবাড়ি: নগরীর প্রায় ৫ কিলোমিটার উত্তরে জামবাড়ির অবস্থান। নয়নাভিরাম জামবাড়ি এলাকা নাটক ও চলচ্চিত্রের শুটিং-এর জন্য নির্মাতাদের অন্যতম পছন্দের স্থান।
কোটবাড়ি বার্ড: বার্ডের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে ফি লাগে না, তবে অনুমতি নিতে হবে। বার্ডের ভেতরের সুন্দর রাস্তা দিয়ে সামনে এগুলেই দুই পাহাড়ের মাঝখানে দেখতে পাবেন অনিন্দ্য সুন্দর বনকুটির। ১৯৫৯ সালে বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমী (বার্ড) প্রতিষ্ঠা করেন ড. আখতার হামিদ খান।
নীলাচল পাহাড়: বার্ডের ভিতরে রয়েছে নীলাচল পাহাড়। নির্জন প্রকৃতির এক অকৃত্রিম ভাললাগার জায়গা হচ্ছে নীলাচল।
রাণীর বাংলো: কুমিল্লা-সিলেট সড়কের জেলার বুড়িচংয়ের সাহেববাজারে রাণীর বাংলো অবস্থিত। সেখানে এখনো খনন কাজ চলছে। এখানকার দেয়ালটি উত্তর-দক্ষিণে ৫১০ ফুট লম্বা ও ৪০০ ফুট চওড়া। সেখানে স্বর্ণ ও পিতলের দ্রব্যাদি পাওয়া গেছে।
কেটিসিসি পর্যটন কেন্দ্র: সদর উপজেলা পরিষদের পাশে অবস্থিত কেটিটিসির পর্যটন কেন্দ্র। এখানে শিশুদের জন্য রয়েছে চমত্কার একটি পার্ক। এছাড়া নগরীর চর্থায় দেখে যেতে পারেন উপ-মহাদেশের সঙ্গীত সম্রাট শচীন দেব বর্মণের (এসডি বর্মণ) বাড়ি।
কিভাবে যাবেন: ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট বা দেশের যে কোন জেলা থেকে কুমিল্লা যেতে আপনি রেলপথ বা সড়কপথের যে কোনটি বেছে নিতে পারেন। কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে ট্রেনে যেতে পারেন অথবা ঢাকার সায়েদাবাদ থেকে বাসেও যেতে পারেন ইতিহাস-ঐতিহ্যখ্যাত ও শত শত বছরের পুরানো পুরোকীর্তি সমৃদ্ধ দেশের অন্যতম প্রাচীন জেলা কুমিল্লায়।
কোথায় থাকবেন-খাবেন: কুমিল্লার বিখ্যাত স্থানসমূহ দেখার জন্য সেখানে কমপক্ষে দুই-তিন দিন থাকতে হবে। থাকার জন্য রয়েছে কুমিল্লা বার্ড (কোটবাড়ি), হোটেল নূরজাহান (পদুয়ার বাজার), ময়নামতি (শাসনগাছা), কিউ প্যালেস (রেইসকোর্স), আল রফিক, নগরীর প্রাণকেন্দ্র কান্দিরপাড়ে হোটেল অবকাশ, হোটেল সোনালী, হোটেল মেরাজ ও হোটেল আমানিয়ায় থাকতে পারেন। খেতে পারেন নগরীর রেড রফ, গ্রীন ক্যাসেল, সিলভার স্পোন, ক্যাপসিকাম, হোটেল ডায়না, বাঙলা রেস্তোরাঁ, কস্তুরী, হোটেল কাশ্মিরী, পিসি রেস্তোরাঁ, হোটেল রূপসী কিংবা ইউরোকিংয়ে। এছাড়াও খেতে পারেন ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পদুয়ার বাজারে হোটেল নূরজাহান, চৌদ্দগ্রামের হোটেল হাইওয়ে-ইন, হোটেল অফবিট, ডলি রিসোর্ট, ভিটা ওয়ার্ল্ড, টাইম স্কয়ার, হোটেল তাজমহল এবং আলেখারচরের হোটেল মিয়ামীতে।
