উপন্যাস

একটি কালো বোরখার রহস্য

আপডেট : ২৭ জুলাই ২০১৪, ১৪:০৬
প্রথম অধ্যায় কথা হল শুরু অনেক গল্পের নিয়তিই হচ্ছে নদী। নদীটা না থাকলে গল্পটাই হতো না। এ কথা পুরোপুরি বুঝতে হলে গল্পের শেষতক যেতে হবে। ফের গল্পের গোড়ায় যেতে হবে। কিন্তু তার আগে গল্পটা রয়েছে মাঝপথে। যেমনটা অনেক গল্পের ক্ষেত্রেই হয়ে থাকে। অর্থাত্ গল্পটা মাঝখান থেকে শুরু হয়। কেন মাঝখান থেকে শুরু? তার কারণ, গল্পটার একজন লেখক থাকলেও, গল্পটির কথকতার শুরুয়াত্ করেছে গল্পের নায়ক। তারপর আত্মকথা শোনাবে গল্পের নায়িকা। নায়কের নাম অনুভব। নায়িকার নাম সুপর্ণা। ওরা দুজন কথা বলবে। তারপর কণ্ঠস্বর শোনা যাবে লেখকের। এটাই এই গল্পটার রীতি। না, রীতি এই যে, কথা শুরু করছেন লেখক। তিনি শুরু করছেন নদীকে নিয়ে। আহা, শুরুতেই একটি তথ্যের ভুল হয়ে গেল। নদী এই গল্পে একটি নয়, দুটি। গল্পটির প্রথম নদী ভৈরব। যাকে গল্পে চকজমার নদী বলা হয়েছে। চকজমা আসলে নদীর একটি ঘাট। ঘাটের কথা বলবে সুপর্ণা। সুপর্ণা মুকুটি। যথা সময়ে বলবে। আর দ্বিতীয় নদীটি হল গঙ্গা। আসলে এটি ভাগীরথী। এই ভাগীরথী তথা গঙ্গার ধারে ধারে গল্পটি এগোবে। গঙ্গার তীরে দুটি শহর। লালবাগ আর বহরমপুর। গল্পটি আলগাভাবে ছুঁয়ে থাকবে এই দুই শহরের কিনারা। গঙ্গার ধার ঘেঁষে যে পথ, আমি সেই পথ ধরে এগোচ্ছি। একা। অর্থাত্ ভাগীরথীর পথ ধরে। একাকী এই পথহাঁটা, এটাই আমার প্রকৃত আহ্লাদ, আমার শখ। আমার নিঃসঙ্গ বিলাস; এতেই আমার মনে জমা হয় অজস্র-অব্যক্ত আত্মপ্রিয় অনুভূতি। এই নৈঃসঙ্গ-বিলাসে কষ্টও তো আছে। একা-একা গুমরে মরার কষ্ট। গঙ্গার ধারে চলতে চলতে ভৈরবকে মনে পড়ে। খুব মনে পড়ে দিদি! দিদির কথা একটু পরেই বলছি। দিদিকে ছাড়া এই গল্পটা তো হবে না। অতএব দিদির কথা আপনা থেকেই আসবে। তার আগে নদী দিয়ে হোক গৌরচন্দ্রিকা। নদীই নেশা। সেই ছেলেবেলা থেকেই। নদীর জলে এত টান কেন বলতে পারবে না সে। সেই ছেলেবেলা থেকেই। স্রোতের আবেগে গা ভাসানো রক্তের এক আশ্চর্য চঞ্চলতা বটে। জলে পড়লে দেহখানি আর ডাঙায় উঠতেই চায় না। দিদি পাড়ে দাঁড়িয়ে গলা চড়িয়ে ডাকছে, ‘আয় মোষ, আয় শুশুক, উঠে আয়। ও আমার মহিষ ভাই, ও আমার শুশুক ভাই, উঠে আয়।’ দিদি যে রেগে কাঁই তা ওই সুমিষ্ট তারস্বর থেকে বোঝার উপায় নেই। খুব রেগেছে দিদি লাবণ্য চক্রবর্তী। পাড়ে উঠলেই কান ধরে টানবে। হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে যাবে। কিন্তু নদীস্রোতে যে আবেগের প্রবাহ, যে টান, সে হদিশ তো দিদি পায় না কখনও। কেন পায় না? দিদি প্রায় দুই যুগের বড়। ভাইয়ের চেয়ে। ‘আয় শুশুকের বাচ্চা। আয় দিকিনি। বাড়ি চল তারপর দেখছি। পিঠে চ্যালা কাঠ না ভাঙি তো আমি লাবণ্যই নই। আয় মেষের ক্যাঁড়া! আজ তোর দিন কি আমার দিন। আগে তোকে বাইরের পালাঙ্গায় (প্রাঙ্গণে) আছড়াব, তারপর ভিতরের পালাঙ্গায় কুলগাছের তলায় নিয়া মারব।’ ইশ! দিদিটা বুঝলই না কিছু। নদীজলে অন্য এক মায়া। অন্য এক টান। এই তুমি জল ছেড়ে উঠলে পাড়ে। মন বলল, নেমে আয়। নদী বলল, আরে যাচ্ছ কেন ইয়ার। থাকো। থাকো। ব্যাস! আর তোমার যাওয়া হল না। পাড় থেকে ফের ঝাঁপ দিলে জলে। ‘আয় নচ্ছার ছেলে কোথাকার। সর্দি লাগবে। জ্বর হবে। তখন তো বিছানায় পড়ে কোঁকাবে বাছা। তখন এই লাবণ্যর কাজ বাড়ে। ইসলামপুরের তালুকদার ডাক্তারের কাছে ছোটো। কী হয়েছে ভাইয়ের? জ্বর। কী করে হল? ওই তো ডাক্তারবাবু মিশাডিহির ঘাটে পড়ে রইল ঘণ্টার পর ঘণ্টা। ভাইটি আমার শুশুক, ডাক্তারবাবু!’ ডাক্তার ননিগোপাল তালুকদার অবাক হয়ে শুধালেন, ‘কী বললে?’ ‘আজ্ঞে!’ ‘আর একবার বল!’ ‘কী বলব ডাক্তারবাবু?’ ‘তোমার ভাইটি যে কী?’ ‘আজ্ঞে শুশুক!’ তাই শুনে ডাক্তারবাবুর সে কী প্রচণ্ড অট্টহাসি। ওই হাসির মধ্যেই দিদি বলে ওঠে, ‘কেননা...’ হাসতে হাসতেই ডাক্তারবাবুর প্রশ্ন, ‘কেননা?’ দিদি বললে, ‘কেননা ভৈরবে শুশুকের অন্ত নাই। রাতদিন ডোবে আর ওঠে। ভোঁস-ভোঁস করছে নদীটা। ২৪ ঘণ্টা। বিরাম নাই ডাক্তারবাবু।’ ডাক্তারবাবু তখনও অল্প অল্প হাসছেন। হাসতে হাসতে থামলেন। তারপর বললেন, ‘ছেলেমানুষ কিনা। হবেই। কোন ক্লাস যেন?’ ‘থ্রি। থ্রি-র অ্যানুয়াল দিয়েছে। ক্লাসে ফার্স্ট হয়। সেকেন্ড হয় না।’ ‘তোমার ভারি গর্বের ব্যাপার লাবণ্যপ্রভা।’ ‘কিন্তু ভয়ও তো হয় ডাক্তারবাবু।’ ‘ভয়! কিসের ভয়?’ এবার আর রা কাড়ে না লাবণ্য, যার পুরা নাম লাবণ্যপ্রভা চক্রবর্তী। ‘কী হল! চুপ করে রইলে কেন! পরেশ তো মিক্সচার বানাচ্ছে। খাবে। জ্বর নেমে যাবে।’ ‘আজ্ঞে। কথা মিক্সচারে না। কথা শুশুকেও না। কথা অন্যখানে। ভয় যে কিসে বলতে পারি না।’ ‘বটেই তো লাবণ্যপ্রভা। বটেই তো।’ লোকের সঙ্গে গল্প করাটা ননী ডাক্তারের স্বভাব। তাঁর যেন সবার সব খবর রাখা চাই। লাবণ্যপ্রভার সঙ্গে ডাক্তারবাবুর দোস্তি আরও বেশি। কারণ লাবণ্যর ভাই ক্লাসে ফার্স্ট হয়। ডাক্তারবাবু ঘোড়া চড়ে রুগি দেখতে যান সারাটা দিগরে। মাথায় সোলার হ্যাট পরেন। থুতনিতে ফিতে আটকে থাকে। নরম ধরনের ফুলপ্যান্ট পরেন। প্যান্টটাকে তলার দিকে ক্লিপ দিয়ে আঁট করে রাখেন। হ্যাটের রং খাঁকি। ঘোড়ার রং ধপধপে বকের চেয়ে সাদা, গন্ধেশ্বরী পূর্ণিমার রাতে নাকি ঘোড়ার পেটের দুপাশে রামধনুর রং-মাখানো ডানা গজায়! ‘আচ্ছা ডাক্তারবাবু। এই নেশাটা ছাড়বে কিসে? ওষুধ নাই?’ ‘কী যে বল লাবণ্যপ্রভা। বানবন্যায় কী করে ভাইটি? নদী পার হয়?’ ‘সেটাই তো ভাবনার কথা ডাক্তারবাবু। আট পূর্ণ হল। তাইতেই বর্ষা আসার আগে-আগে নদীর অর্ধেকটা চলে যায়। তখন তো বর্ষার জল খানিকটা পড়ে। ভয়ডর আছে ছেলের। অথচ দেখুন, ছেলে কিন্তু ক্লাসে ফার্স্ট হয়।’ ‘ভালই তো। সেরা ছাত্র। ভাল সাঁতারু।’ ‘আমার তো মনে হয় অনিটা আস্ত একটা শুশুক। আর সে বলে কিনা, শুশুক ফোঁস ফোঁস করে ডোবে আর ওঠে। মনে হয়, নদীটা শ্বাস-প্রশ্বাস নিচ্ছে। শুশুক হচ্ছে নদীর ফুসফুস। ভাবুন কথাটা!’ ‘তাই বলে নাকি?’ ‘তা হলে আর বলছি কী ডাক্তারবাবু।’ ‘চমত্কার!’ ‘কী বললেন! কথাটা শুনতে আপনার ভাল লাগল?’ পর্দার আড়ালে মিক্সচার তৈরি হচ্ছে। রুগি বা রুগির বাড়ির লোক বসেছে কাঠের বেঞ্চিতে পর্দার ওপারে। ওইদিকে দেওয়াল ঘেঁষে ডাক্তারবাবুর জায়গা। জানালাটার কাছে। জানালা দিয়ে আমের বাগান চোখে পড়ে। ডাক্তারবাবু বসেন চেয়ারে। সামনে টেবিল। টেবিলে চামড়ার ডাক্তারি ব্যাগ। স্টেথো। আর নানান ওষুধের শিশি। একটি দেওয়াল আলমারি ওষুধের বিবিধ নমুনা-শিশিতে পূর্ণ। পাল্লা দুটি খোলা অবস্থায় দেওয়ালে ঠেকা নিয়ে রয়েছে। মধ্য চল্লিশের ডাক্তারবাবু। মধ্য তিরিশের লাবণ্যপ্রভা। অথচ কথা বলে যেন বা দুই বন্ধুতে কথা বলছে। এমন আন্তরিক ডাক্তার সংসারে বিরল। সারাটা তল্লাটে ওই একজনই। ‘শোনো লাবণ্যপ্রভা। এই যে বললে, শুশুক হচ্ছে নদীর ফুসফুস। এমন কথা বলতে কে পারে। তুমি আমি পারি। কই অ্যাদ্দিন তো নদীর ধারে ধারে রুগি দেখতে গ্রামগুলোতে ঘোড়া করে যাই, শুশুক ডুবছে আর ইয়ে করছে, কই মাথায় তো এল না যে, ওটা নদীর ফুসফুস! ভাবো।’ ‘আজ্ঞে!’ ‘একে বলে কল্পনাশক্তি। এ জিনিস একটা মস্ত বস্তু লাবণ্যপ্রভা। সবার থাকে না। কারও কারও বেলায় ভগবান এই রকম করে থাকেন। নদীর জলে সবার টান সমান হয় না। বর্ষাকালে আধেক নদী সাঁতরে যাচ্ছে আট বছরের বাচ্চা। তারপর সাঁতরে ফিরে আসছে নদীটার কাঁখে। কম কথা!’ ‘এমন কথা কি আর সত্যিই কোনও ভাল কথা ডাক্তারবাবু! যাই বলুন। বড্ড ভয় করে আমার। একদিন ওকে সঙ্গে আনব, একটু তো সমঝে দেবেন। শিশাডিহার জলঘের তো ভাল জায়গা না। এখানে মার্ডার কেসের লাশ এসে গোত্তায় পড়ে গিয়ে এপারে-ওপারে যায় আর ঘুরতে থাকে। আসে আর যায়—ওপার থেকে এপারে এবং কেবলই ওই ঘেরের মধ্যে ঘুরতে থাকে। ওই ঘেরের মধ্যে সাঁতার দেয় অনি।’ ‘কম কথা তো নয়।’ ‘বলছি কী তা হলো!’ এই বলে এবার কিছুটা দম নেয় লাবণ্য চক্রবর্তী। বাগানের দিকে তাকায়। ওই দিকে এক ঝাঁক ফরিয়াদী টিয়া পেয়ারা গাছে ঝাঁপ দিয়ে পড়েছে। ঝটাপাট লাগিয়ে দিয়েছে। ভাইটা দেখলে একেবারে হাঁ হয়ে যেত। আহা বেচারা, দেখতেই পেলে না। জ্বরে একেবারে কেতরে গেছে কিনা। নইলে সঙ্গে আসত, জ্বরের অতটা ধাঁধোশ না হলে মিক্সচার নিতে সঙ্গে আসত আর দেখতে পেত টিয়ার মচ্ছব। যা হোক। এই রকম এক নদীকে ঘিরে অনুভব মুখোপাধ্যায়ের জীবন শুরু হয় আর সেই জীবনকে পাহারা দিয়ে লালন করে এক দিদি লাবণ্যপ্রভা চক্রবর্তী। ভৈরব এখানে পশ্চিম থেকে পুবে যাচ্ছে। ফলে এই নদীকে আকাশ ও দিগন্ত-প্রকৃতি অন্যভাবে রাঙিয়ে তোলে। এর রূপের কোনও তুলনা নেই। নদীর ধারে ধারে এক-একলা কিশোরকে দেখা যায়। নদীর পাড় ধরে পথ। কাঁচা পাড়ন। বর্ষায় এই পথ মাস খানেকের জন্য ডুবে যায় অংশে-অংশে। সাইকেল চালিয়ে কোথাও যাওয়ার জো নেই। তখন মানুষের খুব কষ্ট। কারণ নদীর একপাড়ে ভাঙন। শিশাডিহা গ্রামটা ভাঙনের মুখে পড়ে শুধুই পিছু হটছে উত্তরের দিকে। এই গ্রামের গা-লাগা যে বিশাল আবর্তযুক্ত ঘাট তারই নাম শিশাডিহির ঘাট। এই ঘাটেই জলের আবর্তের সঙ্গে দস্যিপনা করে অনি। অর্থাত্ অনুভব। এখানে পাড়ের খাঁড়ি খুব সাংঘাতিক। যেখানে খাঁড়ি ছুঁচলো হয়ে শূন্যে ঝুলে আছে, তাকে এখানকার লোকে বলে চুঁট। অবশ্য নদীর সর্বত্র খাঁড়ি সমান নয়। সর্বত্র চুঁটও নেই। অনেক জায়গায় খাঁড়ি তত উঁচু নয়। ভাঙন সেখানে তত তীব্র নয়। সেই রকমই একটি জায়গায় সাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে অনুভব। দাঁড়িয়ে রয়েছে পশ্চিমমুখো হয়ে। তার থেকে মাত্র এক রসি তফাতে ‘অসর’-এর বৈকালিক নামাজ পড়ছেন একজন ভিনগাঁয়ের লোক। তাঁর পিছনে স্ট্যান্ড দিয়ে খাড়া করা রয়েছে একটি সাইকেল। সাইকেলের কেরিয়ারে বড় একটা গাঁটরি। কেরিয়ারটাও অনেকখানি লম্বা। দেখেই বোঝা যাচ্ছে গাঁটরিটা হাট-ফেরত রেডিমেড পোশাকের গাঁট। বোঝাই যাচ্ছে, নমাজরত মানুষটি একজন হাটমারা পোশাক বিক্রেতা। দিদির স্বামী পরাণপ্রিয় চক্রবর্তীও একজন জামাকাপড়ের ব্যবসায়ী, তবে ওই জামাইবাবু হাটুরে নয়। গঞ্জে স্থায়ী দোকান আছে। রেডিমেড পোশাকের ব্যবসায়ী সবিশেষ ধার্মিক। নদীজলে ওজু করেছেন এবং নমাজে দাঁড়িয়েছেন এই অপরাহ্নে। শিশাডিহার মসজিদে যান নাই। গেলেই পারতেন। আষাঢ়-শ্রাবণ নদীতে জল বাড়ে। ভাদ্র থেকে প্লাবিত নদীতট ও খালবিলের জল কমতে থাকে। ছোটনদী, খালবিলের জল ফেরত যায় ভৈরবে। এই সময়ই ভাঙন বেশি হয়। এখন নদী প্রায় কানায়-কানায়। পাড়ের এক কি আধ ইঞ্চি নীচে দিয়ে বইছে। কলকল করে ছুটছে। প্রকৃতিতে শরতের ছোঁয়া লেগেছে মাত্র। জলস্রোতে বেশ তাড়াহুড়ো। ফেনিয়ে উঠছে স্রোত। কানায়-কানায় দুরন্ত। থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছে অনি। সে নিতান্ত অবাক। নদীর এই অংশটা তুলনায় নিচু। পিছনের দিকে খাঁড়ি বেশ উঁচু হয়েছে। একটি বড় চুঁটের উপর ঝুলে রয়েছে শিশাডিহার ছোট মসজিদ। এত ছোট মসজিদ সারা তল্লাটে দ্বিতীয়টি নেই। এখানেই শিশাঘাট। গ্রাম ছোট। মসজিদ আরও ছোট। বারো ঘরের বাস। তাই এই মসজিদটাকে বারোঘরার শিশা মসজিদও বলে অনেকে। মসজিদটা লাল ইটের গাঁথুনি দিয়ে তৈরি। ছাদ নেই। আছে টালির চালা। এ বছর চুঁটের উপর ঝুলছে। শুরু হয়েছে ফিরতি জলের ভাঙন। ভাঙন দেখতে কষ্ট আর কেমন একটা হাহাকার জাগে বুকের ভেতরে অনির। নদীতে হচ্ছে আশ্চর্য সূর্যাস্ত। একজন হাটুরে পোশাক-বিক্রেতা নমাজ পড়ছেন জলস্রোতের কিনারা ঘেঁষে। স্রোতের তাড়ায় ফুটছে জল। মাঝে মাঝে ছলাত্-ছলাত্ করে সেই জল কিনারা ছাপিয়ে উছলে পড়ছে। হঠাত্ মনে হল, নদীর কিনারে ঘাসের যে চাপড়ার উপর বসে ধার্মিক ব্যবসায়ী নমাজ পড়ছেন, সেটা হঠাত্ স্রোতের ধাক্কায় ধসে যায় যদি! বা পিছনের চুঁটসুদ্দো মসজিদটা যদি নদীগর্ভে চলে যায়। হা ঈশ্বর! অনির বয়েস তখন কত হবে? সদ্য এগারো। ক্লাস সিক্সে উঠল সদ্য-সদ্য। যা হোক। সূর্যাস্ত হচ্ছে। ত্রিমোহনীর ঘাটের মাঝ বরাবর সূর্যের থালাটা জল ছুঁয়ে ধীরে ধীরে সাঁঝ হবে। তারপর সেই সাঁঝ হওয়া দেখতে দেখতে অনি আত্মহারা হবে। এক আশ্চর্য মধুর বিষণ্নতায় মনটা কেমন যে করে উঠবে! নীল আকাশে ভেসে থাকা লাল মেঘ, দূরে সাদা মেঘের চুড়ো, সেটা পুব-দক্ষিণ আকাশে রয়েছে। সূর্য ডুবে যাওয়ার আগেই দেখা দেবে আশ্চর্য উজ্জ্বল সন্ধ্যা তারা। নমাজ শেষ হল তাঁর। দুই কাঁধের ফরিস্তাকে সালাম ফেরানোর পর মোনাজাত সাঙ্গ করলেন দূর গাঁয়ের ওই মানুষটি। মসজিদে আজান হয়েছিল। সেখানেও নমাজ শেষ হল। তারপরই হাহাকারময় সোরগোল শোনা গেল। চমকে উঠে পিছনে চাইল অনি। ‘আমি জানতাম।’ বলে উঠলেন হাটুরে জামাকাপড় বিক্রেতা। দ্বিতীয়বার চমকে উঠে মানুষটার দিকে ফিরে তাকাল অনি। বলল, ‘কী জানতেন বাবা?’ ‘আমার নাম গোপাল আনসারি, বুঝলা খোকা! পন্নাম (প্রণাম) পুরের বাসিন্দে। ওয়াক্তি নমাজে কামাই দিই না বাদল! খোদাভক্ত মানুষ আমি।’ ‘আমার নাম বাদল নয় কাকা!’ ‘কী তা হলে বাছা?’ ‘অনি। পুরা নাম অনুভব মুখোপাধ্যায়। পরাণপ্রিয় চক্রবর্তী, চক্রবর্তী ক্লথ হাউসের মালিক, আমার জামাইবাবু।’ ‘ভাল কথা। তুমি আমার নমাজ পড়া দেখলে মন দিয়ে?’ ‘জি।’ ‘ওই দেখ! বারোঘরা শিশা মসজিদটা গেল। জানতাম। আজই যাবে।’ গ্রামটা ডিহির উপর। এত ছোট গ্রাম নদীতীরে আর কোথাও নেই। গ্রামের পথটা অত্যন্ত নীচে। সেই পথ উত্তরের গ্রামগুলি থেকে এসে নদীপাড়ের পথে মিশে নদীর ঘাটে নেমেছে। ঘাটের এই জায়গাটা পশ্চিমে নিচু হয়েছে, পুব দিকে পাড় হয়েছে উঁচু। উঁচু হয়ে ডিহি ছুঁয়েছে। তার পর ডিহি পেরলে পুব পাড়ের পথ কিছুটা নেমে দক্ষিণমুখো গঞ্জে চলে গেছে। কিন্তু ঘাটের এই জায়গাটা নিচু হয়ে পশ্চিমমুখী পাড়ের পথ আরও নিচু হয়ে গেছে। ফের এই জায়গাটায় এসে নদী বাঁক নিয়েছে। পাড় হয়েছে অর্ধচন্দ্রাকৃতি, যেভাবে আকাশে অর্ধচন্দ্র অল্প কাত হয়ে দেখা দেয়, সেই রকম। যেখানে পাড় ঘাট থেকে পুব দিকে উঁচু হল ডিহি তথা গ্রাম বরাবর, সেখানে বাঁশবনের গা-লাগা ছিল শিশা মসজিদ। যা ভাঙনের চুটে ঝুলছিল। ঘাট ছাড়িয়ে এক রসি পশ্চিমে ঢালের পাড়ে নমাজ পড়ছিলেন গোপাল আনসারি। নমাজের আসন পেতে ছিলেন, যা ছিল একটি সাদা রঙের পাতলা চাদর। সেই চাদর গুটিয়ে তুলে কাঁধে ফেলে দাঁড়িয়ে তিনি দেখছেন একটি মসজিদের ভাঙনের গ্রাসে ধসে যাওয়ার মর্মান্তিক দৃশ্য। মসজিদ ধসে সশব্দে নদীর জলে চলে গেল। অনুভব চমকে শিউরে উঠল। অথচ এই মসজিদ বারোঘরা সম্বন্ধে এক অন্য গল্প চালু হয় ক-বত্সর যাবত। এই যে শিশাঘাটের বাঁক, যেখানে তয়ের হয়েছে এক মস্ত জনঘূর্ণি এপার-ওপার জুড়ে তার জলঘের যদ্দুর পর্যন্ত যায়, ঘটনাচক্রে মসজিদটা ছিল সেই আবর্তের এক্তিয়ারের বাইরে। ফলে কিছু বছর ধরে এখানে ভাঙনের দাপটে নিতান্ত কমে গিয়েছিল। সবই ঘটছিল এক অব্যাখ্যাত দৈব অনুগ্রহে। মসজিদ হল খোদার ঘর। এ কথা অনুভব শুনেছে। ‘নিবাস আনসারির চাকরিটা গেল। হায় খুদা!’ এক অদ্ভুত হাহাকার শোনা গেল গোপালের গলায়। সেই সঙ্গে দেখা গেল বারোঘরার ছেলেবুড়া, নরনারী, শিশু ও কিশোরী, সারাটা গ্রাম এসে জড়ো হয়েছে নদীর ধারে। কে একজন পাগলের মতো নদীজলে ঝাঁপ দিয়ে পড়ল। যুবক মতন। ‘হায় আল্লা! নিবাসই তো ঝাঁপ দিলে হে! বেচারা পাগল হয়ে গেল।’ ‘কী কষ্ট কাকা!’ ‘বড়ই কষ্ট অনুভব। নিবাস আমার মামাত ভাই। তার সাথে হামেশা বেহেস হত, মসজিদটা থাকবে নাকি যাবে! নিবাস তো বারোঘরার মোয়াজ্জেম। অমন মধুর কণ্ঠের আজান সংসারে পাইবা না অনুভব!’ ‘জি!’ ‘ওই দেখো, বেচারা শুশুকের ডুবকির কাছটায় ভাইসা গেল। হা রসুল, অত ভাল গলা, এখন কী করে! কী খায়! আমিই কি কুনো গুনাহ করলাম! কেন বললাম যে, মসজিদটা ই-বার যাবে। কেন বলনু খুদা হে।’ সূর্যাস্ত হচ্ছে। নদীর পশ্চিমে ত্রিমোহনী ঘাটের মাঝ বরাবর জলের ঠিক এক-মানুষ উচ্চতায় সূর্য লাল আলো ছড়াচ্ছে। একবার সেদিকে কেন যেন চোখ চলে গেল অনুভবের। তার বুকে কেমন একটা চাপা দুঃখবোধ ছলছল করছে। সে হঠাত্ বলে ওঠে, ‘আমি শুনেছি কাকা!’ ‘কী শুনেছ বাবু?’ ‘আজান। নিবাস মোয়াজ্জিনের আজান। সূর্য ডোবার আগে। অসরের আজান। তারপর সন্ধ্যায়, মগরিবের আজান। আমি সব জানি। বারোঘরার আমলনামা আমার জানা। নমাজি মানুষকে চিনি।’ ‘কিন্তু...’ এই বলে কথা সম্পূর্ণ করতে পারেন না গোপাল আনসারি। বেদনাপূর্ণ চোখে চেয়ে থাকেন মোয়াজ্জিনের ভেসে যাওয়া নদীর জলছবির দিকে। পাড়ের ডিহিতে লোকজন কিছুক্ষণ হাহাকার করার পর হঠাত্ই কারও নির্দেশে থেমে গেছে। সম্ভবত নদীগর্ভে চলে যাওয়া বারোঘরার সবচেয়ে ছোট যে শিশা মসজিদ, তার ইমাম সাহেব সকলকে থেমে যেতে বলায় সকলে থেমে গেছে। ‘কিন্তু কী কাকা?’ শুধায় অনি। ‘আচ্ছা, আগে বলো, তুমি কোথাকার বাসিন্দে।’ ‘রথতলা দেবনাথপাড়া।’ ‘অ।’ ‘জি কাকা। কিন্তু মুনশিপাড়ার মকবুল হাসান আমার বেস্ট ফ্রেন্ড। আমি তাই নমাজ ব্যাপারে সব জানি। আমি অত্যন্ত মন দিয়ে আজান শুনি কাকা।’ গোপাল অপলক চেয়ে আছেন। চোখে জল। সেই অশ্রুতে চিকচিক করছে সূর্যাস্তের আলো। ‘আপনি কাঁদছেন কাকা?’ ‘জি আব্বা।’ অত্যন্ত মিষ্ট স্বরে অনিকে হঠাত্ ‘আব্বা’ বলে সম্বোধন করেন গোপাল আনসারি। ওঁর ‘গোপাল’ নামটাও অত্যন্ত হিন্দুঘেঁষা। যদিও এ ব্যাপারে বিশেষ কিছু বিচলিত নয় অনুভব মুখোপাধ্যায়। মকবুলদের মুনশিপাড়ার একটি বাগালের নাম মদন শেখ। সর্দার পাড়ায় একজন প্রবীণ ধার্মিক মানুষ বাস করেন যার ডাক নাম কল হাজি। অবস্থাপন্ন লোক। জমিজিরেত অনেক। তাঁর রয়েছে দুখানি আখ-মাড়াই কল। ভাড়ায় খাটে। তাই থেকে জীবন হাজির নাম হয়েছে কল হাজি। একজন মুসলিম হাজির আসল নাম জীবন। আশ্চর্য বটে। কিন্তু এ নিয়ে ভাবতেই শেখেনি অনি। মকবুলও শেখেনি। তারা কল হাজিকে কল হাজিই মনে করে। বা জীবনকে জীবনই ভাবে। কখনও মনে হয় না, মুসলিম নাম এ রকমও হয়ে থাকে কেন। আসলে এই রকমই হয়ে থাকে। হঠাত্ ঘাসের ঘনত্বের মধ্যেও ফাট চোখে পড়ে। চোখে পড়ে অনুভবের। সে শিউরে ওঠে। ‘সরে আসুন কাকা।’ বলে ওঠে সতর্ক সুরে অনুভব। ‘কী বুললে আব্বা?’ ‘সরে আসুন। চাঙড় পড়বে।’ ‘কুথায় বাপা?’ ‘আপনার পায়ের তলায় কাকাবাবু। যে মাটিতে নমাজ পড়লেন। সেখানে। চট করে সরে আসুন। সাইকেলটাও টেনে নিন।’ নিজের পায়ের দিকে চকিতে তাকালেন আনসারি। তারপর তড়াক করে লাফ দিলেন সামনে। এক ঝটকায় স্ট্যান্ড করা সাইকেল নিলেন টেনে। রাস্তায় এসে পড়লেন। অনুও রাস্তায় এল। তারপর দেখা গেল সেই অমোঘ দৃশ্য। নদীগর্ভে নেমে গেল আনসারির সিজদা করা নদীপাড়ের মাটি। মাত্র ‘ঝুপ’ করে একটা শব্দ হল। ‘হা খুদা। মুই তো ‘গুনেহগার’ নিকলা আব্বা। হা গফুর-উর-রাহিম, এমন কেন হল!’ আশ্চর্য হাহাকার জেগে উঠল ভৈরব নদীর পাড়ে। এমনই এক নদীকে দেখেছিল অনুভব। অত্যন্ত গরিব বারোঘরার মানুষদের আপন হাতের তালুর মতো চিনত সে। নদী মানুষকে এত দুঃখ দিত, তবু সেই নদীকেই ভালোবেসেছিল অনুভব মুখোপাধ্যায়। ঝুপ করল নদী। ধক্ করে উঠল অনির বুকের ভেতরটা। বয়স বেড়েছে অনুভবের। নদীগ্রাম শিশাডিহা বারোঘরা ওই ভাঙনের তাড়ায় ধীরে ধীরে উত্সন্ন হয়ে গেল। দেখতে দেখতে চোখেরই সামনে ঘটল সব। যৌবনের একেবারে গোড়ায়, ঠিক যাকে পূর্ণ কৈশোর বলে, তখন এই নদীকে দেখার চোখ কিছু বদলেছে এই গল্পের নায়কের, ফের বালক কালের সরল মুগ্ধতাও তার দেখার ভেতরে রয়ে গেছে। যা হোক। নদীগ্রাসে গ্রামের বসত চলে গেলে, গ্রামের লোকগুলো যায় কোথায়? লোকেরা পিছিয়ে যায়। শিশাডিহা গেল একটি কলোনিতে। তারা আর গ্রাম রইল না। তারা বিঘা তিন জমির উপর টালির চালের বসত গড়ল। নাম হল বারোঘরার কলোনি। গ্রাম বারোঘরা থেকে কলোনি বারোঘরার জন্ম হল। নদী সেই কলোনি থেকে খুব কিছু দূরবর্তী নয়। কাছেই। তবু নদীঘোর কাটল না অনুভবের। সে নদীকে কী বলে অভিশম্পাত দেবে ভেবে পায় না। তার কানে গুঞ্জন তোলে আনসারির অতীত বিশ্রুত কণ্ঠস্বর। ‘মুই তো গুনেহ্গার নিকলা আব্বা’। সাইকেল নিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে অনুভব, নদীর এই বাঁকটার কাছে এসে। এখানে নদী অদ্ভুত কাণ্ড ঘটিয়েছে। এই জায়গাটা আগে বলা জলঘের বা বিপুল আবর্ত থেকে সিকি মাইল দূরে। এখানে নদী তার তীব্র ভয়াবহ স্রোত-জিহ্বা দিয়ে পাড়কে চাটতে চাটতে হঠাত্ একটা ঝোঁকে চিরে দিয়েছে। একে মুর্শিদাবাদী ভাষায় বলা হয় গাভলা পড়া। এটি অত্যন্ত সরু একটা খাল বলা যায় বা তদৃশ কিছু। যতদূর ঢুকেছে এটি শস্যপ্রান্তরে, তার রসি খানেক তফাতেই কলোনি। দুটি বৃহত্ চালা। খাপরার বা টালির চাল। তাইতেই ভাগ করে করে দেওয়াল তোলা ঘর। দেওয়াল মাটির। নদী এখানে তার জিহ্বা দিয়ে ছলাত্-ছল শব্দে মানুষকে ভয় দেখায়। এই গাভলার কাছে এসে নদীর পাড়ের পথের ছেদ পড়েছে। বারোঘরার কলোনির দিকে গাভলার একটি বাহুপথ ধরে যেতে হবে। তারপর অন্য বাহু ধরে গাভলার ওপারের পথ, যা মূল পথ, সেটা ধরতে হবে। সাইকেল গড়াতে গড়াতে কলোনির কাছে এল অনি। তারপর চোখে পড়ল মাঠের ভেতর দিক থেকে মকবুল এদিকেই আসছে। অনিকে দেখতে পেয়েছে। খুবই দ্রুত, যেন প্রায় ছুটেই এল মকবুল হোসেন। ‘কী দেখছিস অমন করে? অ্যাই অনি!’ অনুভবের কাঁধের পাশে এসে দাঁড়িয়ে শুধালে মকবুল। অনুভব গাভলার জলের ছলাত্-ছল শুনছিল আর সেই ছলাতের সঙ্গে এক ধরনের খপখপ শব্দ করছিল নদী। নদীর এই ভাষা গ্রাস করারই সংকেত। ‘আচ্ছা মকবুল, নদী যে এভাবে খপখপ করছে, মানে কী, আবার কি খাবে? কলোনিটাকে ফের শেষ করে দেবে?’ বলে ওঠে অনি। মকবুল জলের খপখপ নামের ওই শব্দের ক্ষুধার্ত দোলা দেখতে দেখতে নিচু গলায় বলল, ‘তোর এই এক প্রবলেম অনি। শুদুমুদু ভেবে মরিস। আসলে গাভলার ওই দিকের পাড়ের মুখটা মাটি ফেলে বন্ধ করা দরকার। নদীর পানি আর বিঘত খানেক নামলে ওই মুখ বন্ধ করা যাবে।’ ঔদাস্যমাখা গলায় অনুভব বলল, ‘তবু ভাল।’ ‘দাদিমা কী বলে, জানিস তো?’ ‘কী?’ ‘নদীর ধারে বাস/ ভাবনা বারো মাস।’ ‘তা হলে কেন বললি, আমি শুদুমুদু ভেবে মরি!’ এবার চুপ করে রইল মকবুল। তারপর হঠাত্ বলল, ‘তারা পাল মশাই জমি না দিলে বারোঘরা কোথায় যে ভেসে যেত, দেখ ভাই, বারোঘরা পুরা মুসলমান পাড়া, তাই না?’ অত্যন্ত সংকীর্ণ এই পাড়চেরা খাল গোছের জলধারা থেকে চোখ তুলে নদীর ওপারের আকাশ-দিগন্তে চাইল অভিনব। দিগন্তাভিসারী চাউনিতে একটা কেমন শূন্যতা। অভিনব বলল, ‘তুই ওই রকম কেতায় ভাবিস নাকি মকবুল? হ্যাঁ রে ভাই!’ ‘কী রকম?’ ‘এই যে হিন্দু -মুসলমান!’ ‘না ভেবে উপায় কী অনি! বারোঘরায় তো একটিও হিন্দু নেই। এদিকে তোরা যে রথতলায় থাকিস, যেখানে একটিও মুসলমান নেই। এইভাবেই তো হিন্দু-মুসলমান গ্রাম-ভিত্তিক আলাদা । এমনি করেই তো চলছে ভাই।’ ‘তা ঠিক। এমনি করেই চলছে। অথচ দেখ...’ বলে নদীর ওপারের ভাদুরে আলোর মধ্যে উড়ন্ত বকের সারি দেখে থেমে যায় অভিনব। এখন বিকেলের রঙে সন্ধ্যার আভাস লেগেছে। হঠাত্ অভিনব বলল, ‘অথচ আমরা দুজন সব কেমন অন্য রকম করে ভাববার চেষ্টা করি।’ বন্ধুর মনের প্রতিটি তরঙ্গ টের পায় মকবুল। সে বলল, ‘আমরা ঠিক হিসেবের মধ্যে পড়ি না অনি। যেমন ধর, এই যে নদীটাকে তোর এত ভাললাগে, ফের এই নদীর ওপর এত রাগ, এই ব্যাপারটা লোকে বুঝবে! বুঝবে না। তুই সূর্য ডোবার ব্যাপারে পাগল, এত কী আছে ওতে, বোঝাতে পারবি! তোর আনন্দের কথা তোর দিদি খানিক আন্দাজ করে, কিন্তু পুরাটা কি পারি?’ ‘না।’ ‘সেই হচ্ছে কথা! ব্যাস!’ এবার আচমকা গলা তুলে হা-হা করে হেসে ওঠে অনি। মকবুলের কথার স্টাইলে তার অদম্য হাসি পেয়ে গেছে। মকবুল এমন একটা ঝোঁক দিয়ে ‘ব্যাস’ বলে উঠেছে যে এবং ‘সেই হচ্ছে কথা’ বলাটাও যেন বন্ধুর ওই আনন্দকে যথাযথ আবিষ্কার যে, তাইতেই অনির হাসি পেয়ে গেল। ভৈরব নদীতে সূর্যাস্ত হচ্ছে। তার যে আনন্দ, তা যে সত্যিই কাউকে বোঝানো যায়, তা তো নয়। একাই সে আনন্দ উপভোগ করে অনি। শুধু কখনও কখনও অনির সঙ্গে সঙ্গ দেয় মকবুল। ওরা গাভলা ছেড়ে পশ্চিম দিকে এগোতে থাকে। অর্থাত্ ওরা সূর্যাস্তের দিকে এগিয়ে যায়। ত্রিমোহনীর ঘাটের দিকে। ‘হ্যাঁ ঠিকই।’ ‘কী?’ ‘তারা পাল মশাই, বারোঘরাকে জায়গা না দিলে সত্যিই ওরা যে কোথায় ভেসে যেত। ঠিকই ভেবেছিস মকবুল। অথচ তারা পালের নামে বদনাম শোনা যায়, মানুষটা কমিউনাল। আশ্চর্যই বটে।’ ওরা দুজন এখন একাদশ শ্রেণির ছাত্র। ওল্ড হায়ার সেকেন্ডারির একাদশ শ্রেণি। দুই বন্ধুই দেখতে অত্যন্ত সুন্দর। ওদের বন্ধুত্বও তল্লাটে প্রসিদ্ধ। মকবুল যেতে যেতে চোখ তুলে নদীর সূর্যাস্ত-ঝিলিমিলি দেখে নদীজলের আলোড়নে, ওই দূর পর্যন্ত চেয়ে দেখে সে। ওই দূর ত্রিমোহনী পর্যন্ত। তারপর ভাবে, সত্যিই তো এই দৃশ্যের কোনও তুলনা নেই। তার বন্ধু অনুভবই তো এভাবে দেখতে শেখাল তাকে। এই কথা ভাবতে ভাবতে মকবুল মুখে বলল অন্য কথা। বলল, ‘এই একটা ব্যাপার বটে, হ্যাঁ আশ্চর্যই বটে।’ অনি বলল, ‘বোঝা তো যায় না। মনের মধ্যে কার কী আছে! যাক তুই খুব প্রগ্রেসিভ ভাবছিস, সে মনের মধ্যে কী পুষে রেখেছে ঠাহর করা কঠিন। অবচেতনে সুপ্ত রয়েছে তার আসল মনোভাব, সে কমিউনাল কতদূর তা কিন্তু সে সচেতন মনে জানেও না। সব সময় মুখের কথায় মানুষকে বোঝা যায় না। অপর পক্ষে তারা পাল মুখে মুখে কমিউনাল। মনে নয়। মুসলমানকে গাল দেয় আবার আসল বিপদে মুসলমানের ত্রাতা সেই তারাই। শুনছি, ওই তিন বিঘার সঙ্গে বাকি জমিটাও নাকি বারোঘরাকেই দেবে। শেষ পর্যন্ত ওর বাইশ বিঘাই হবে নতুন একটা গ্রাম। মকবুল বলল, ‘অবচেতনে যে সাম্প্রদায়িকতা সুপ্ত, তেমন প্রগ্রেসিভ মানুষ তারা পাল নয়—এই বলছিস তো?’ ‘ঠিক তাই।’ ‘আমি তোর সঙ্গে হান্ড্রেড পার্সেন্ট এগ্রি করি। সুপ্ত সাম্প্রদায়িক কারা জানিস তো! বাবুরা।’ ‘ঠিক।’ এই পর্যন্ত বলার পর ওরা দুইজনই দম নেয়। বেশ কিছুক্ষণ ওরা দুই বন্ধু চুপচাপ হাঁটতে থাকে নদীতীর বরাবর পশ্চিম মুখো। ওরা এই পথের সবচেয়ে উঁচু একটা ডিহি মতন জায়গায় গিয়ে দাঁড়াবে। তারপর দেখবে কেমন করে নদীর জলের মধ্যে সেঁধিয়ে যাচ্ছে সূর্যের গোল থালাটা। তখন পশ্চিম আকাশের অস্তরাগ-মাখা আশ্চর্য প্রশান্তি দুই বন্ধুর মনকে স্পর্শ করবে। ‘কী দেখছিস মকবুল! মনটার প্রশান্তির মধ্যেও কেমন যেন একটা লোকসানের ব্যথা, যেন কী একটা হারিয়ে যাচ্ছে, তাই না?’ ‘তোর মনে এই সব হয়?’ ‘হয় বইকি! না হলে আর বলছি কেন!’ ‘তোর এটা কিন্তু এক ধরনের কবি-কবি ব্যাপার। তাই না?’ ‘হয়তো হবে। কিন্তু সেটা কোনও শখের ব্যাপার নয়—যদি এটা কোনও সুপ্ত কবিত্বই হয়, হলে হবে। আমি তো আর কবিতা লিখতে যাচ্ছি না কোনও। শুধু এই নদীটাকে ভালবেসে এই সব হল। ওই দেখ মকবুল, সূর্যের আধাখানা থালা, যা নদীর জলের উপর দেখছিস, ভাল করে দেখ।’ ‘হ্যাঁ দেখছিই তো অনি।’ ‘ঠিক ওই থালটার পাশে ডুবছে আর উঠছে। তিন-তিনটে শুশুক। ভারি আশ্চর্যের দৃশ্য। এ জিনিস সবার তো ভালোলাগা উচিত। আমি জানতে চেয়ে শুধিয়ে দেখেছি, এটা অনেক চাষীবাসী মানুষেরও আশ্চর্য ভাললাগে। শুধু একা আমার নয়। তাই বলে সবার ভাললাগে এমন কিন্তু বলছি না মকবুল। বলছি, চাষীবাসী মানুষও প্রকৃতির এই দৃশ্যে অবাক হতে জানে।’ চাষীবাসীই যদি ওই দৃশ্যে অবাক হয়, তা হলে মকবুল হবে না কেন! অনির কথা মুগ্ধ হয়ে শোনে মকবুল। সাইকেল খাড়া করে রেখে ওরা দুই বন্ধু ঘাসের উপর বসে। তারপর আধডোবা সূর্যের থালার দিকে চেয়ে থাকে দুজনা। কথা বলে না কিছুক্ষণ। একটা পাল-তোলা রঙিন নৌকা সূর্যের প্রায় গা-ঘেঁষে এদিকে আসছে তরতর করে। আসছে ভাটির টানে স্রোতের অনুকূলে। একে তো উজান বাওয়া বলে না। হাওয়া যখন স্রোতের উল্টা দিকে বইবে তখন পাল টাঙালে অন্য দৃশ্য দেখা যাবে। হঠাত্ অনি বলে ওঠে, ‘কিন্তু মকবুল, খারাপ লাগে যখন নদীতে লাশ বয়ে আসে। লোকে বলে, কোথায় যেন খুনোখুনি হয়েছে, তারই নমুনা এই লাশগুলো। খুন করে নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছে।’ মকবুল বলল, ‘হয়ই তো!’ ‘হয়?’ ‘কেন হবে না! খুনখারাবি তো লেগেই আছে। তা ছাড়া ডাকাতরা লোক মারে!’ ‘মানুষ এত হিংস্র কেন, তাই ভাবি।’ এবার চুপ করে থাকে মকবুল। ‘কী রে মকবুল কথা ক’।’ মকবুল অগত্যা মুখ খোলে, ‘কী বলি বল তো! প্রত্যেক বছর হুড়সিতে মানুষ খুন হয়! আমার দাদি কী বলে জানিস তো। বলে...’ ‘হ্যাঁ, কী বলে বল!’ ‘ওই দেখ মনি, নৌকাটার পিছনে একটা কী যেন ভেসে থাকা জিনিস ফেলে রেখে পেরিয়ে এল। মনে হচ্ছে লাশই হবে।’ অনি চমকে উঠে বলল, ‘লাশ!’ মকবুল বলল, ‘মনে তো হয়, আমি সহি বলছি।’ ‘সহি!’ মকবুল তার কথা সহি কিনা তার অপেক্ষায় চুপ করে থেকে হঠাত্ বলে ওঠে, ‘চল, তা হলে দেখি!’ ‘কোথায়!’ ‘লাশ দেখতে জলঘেরে যাই। বারোঘরা নাই কিন্তু দম কমে এলেও ওই শিশাডিহার ঘাটে জলঘের তো আছে। একটা ব্যাপার তো হয়েছে!’ ‘কী?’ দু’দণ্ড চুপ করে থেকে মকবুল বলল, ‘বারোঘরার যখন বসত ছিল, তখন শিশা ঘাটের ভাঙনের পাড়ে লোক জমত, লাশ দেখতে। এই একটা কঠিন ব্যাপার ছিল তো! এখন হয় কী!’ ‘কী হয়?’ ‘লাশ একা-একা ঘোরে। কেউ দেখে না। ধর লড়াই হল!’ ‘হ্যাঁ।’ ‘দাদিমা যেটা বলে! খুনটুনের ব্যাপারে। বলে, সবই হচ্ছে, বিটি আর মাটির লড়াই। শুনে কথাটা ভাল লাগে না। কিন্তু দাদি মায়ের কথা ফেলতেও তো পারি না।’ ‘এ কথা আমার দিদিও বলে মকবুল। মুর্শিদাবাদী লবেজ কিনা ওই ‘বিটি’, সেই সবজে দিদিও কথা বলে। বিটি আর মাটি। ব্যাস, গল্প শেষ।’ ‘আমি তো অনি, আধমরা মানুষকেও ভেসে যেতে দেখেছি। জলঘেরে পড়ে মৃদু গলায় বলছে, বাঁচাও, নয় তো ঠেলে দে লগি দিয়ে, ওগো বাপ! ঠেলে দে, হাসপাতালে যাই। চক-ইসলামপুরের ঘাটে পৌঁছালে হাসপাতাল পাবে।’ ‘তো, তুই কী করলি?’ ‘কী করব। ওটা ছিল মাটির লড়াই। শুধালাম, কে মেরেছে। ওই আধমরা লোকটা বললে, ভাইয়ে প্যাটে (পেটে) হাঁসুয়ার কোপ মেরে গামছা বেঁধে দিয়ে বলেছে গঞ্জে হাসপাতালে যা। আল ঠেলাঠেলির ব্যাপার আব্বা! ঠেলে দে!’ ‘কী সাংঘাতিক কথা!’ বলে ফ্যালফেলে চোখে বন্ধুর মুখের দিকে অনেকক্ষণ নিষ্পলক চেয়ে রইল অনুভব। তার চোখের সামনে মকবুলের বর্ণিত দৃশ্য ভেসে ভেসে উঠছিল, যেন সে আধমরা মানুষটাকে দেখতে পাচ্ছিল। আল-ঠেলাঠেলি যে কী পদার্থ অনুভব তা জানে। ভাইয়ে-ভাইয়ে এটা ঘটে থাকে। জমির প্রতি মানুষের লোভ এক অকাট্য জিনিস। নারীর প্রতি লোভের চেয়েও বাড়া। বা এই দুই জিনিসই তূল্যমূল্য; একই তৌলে সমান-সমান হবে। অনুভব এবং মকবুল বস্তুত বুঝে পায় না, ভাইয়ে ভাইয়ে এমন কেন হবে! চাষের সময় আলের বাঁধ উপড়ে পড়ে, তখনই তৈরি হয় সমস্যার গোড়াটা। বর্ষায় আইলের বাঁধ নড়ে যায় কিংবা ফ্যালো মেশিনের পাম্পে তোলা জলের যে সেচ তাতেও লাঙলের ফলার ধাক্কায় আইলের বা আলের বাঁধ যায় নড়ে। সেখানে এক চাষী ভাবে, আলটা হয়তো তার দিকেই ঠেলে আসবে যদি না সতর্ক থাকা যায়, ফলে সে আধ-বিঘত ভাইয়ের ভুঁইয়ের দিকে ঠেলে চলে যায়, সে বুঝতেও পারে না, লোভের বশেই সে এ কাজ করছে। এক বর্ষায় রহিম ঠেলে ঢুকেছে ভাই করিমের জমিতে। আর এক বর্ষায় করিম ঢুকে এল ভাই রহিমের জমিতে। এরপর বেধে উঠল বিবাদ। বিবাদ জমল ভাই-বউয়ের সঙ্গে ভাই-বউ অবধি। আধ-বিঘতও নয়, তারও অর্ধেকের অর্ধেক, মাত্র পাঁচ আঙুল করে লম্বা আল বরাবর জমি এদিকে বা ওদিকে সাঁধ করিয়ে নেওয়া গেছে লোভবশত। ভাই হেঁসো মারল ভাইয়ের পেটে। নিরক্ষর চাষী। হেঁসো মেরে, একে বলে ঢবঢবি ফাঁসানো। অর্থাত্ ভুঁড়ি ফাঁসিয়ে দেওয়া। তারপর কী হল। কী আর হবে। ওই কাটা ঢবঢবি ভেতরসুদ্দো যাতে বার হয়ে না আসে, তার জন্য গামছা বেঁধে দেওয়া হল। এবং ভৈরব নদীর জালে ফেলে দেওয়া অর্ধমৃত ভাইকে। এমনটাই অভিজ্ঞতা মকবুলের। ‘কথাটা আর একবার বল মকবুল!’ ‘আবার কী বলব অনি!’ ‘ওই যে, কী বলে যেন গরিব চাষী তার আধমরা দেহটাকে ঠেলে বাইরে বার করে দিতে বলছে, যাতে সে স্রোতের বেগে ভেসে গিয়ে উঠতে পারে গঞ্জের ঘাটে এবং গঞ্জের হাসপাতালে গিয়ে চিকিত্সা নিয়ে বেঁচে উঠতে পারে—আবার তো জমিটা চাষ করতে হবে। ফসল ফলাতে হবে। নইলে সংসার তো বাঁচবে না। ওই জমিতে তো আর নিজের রক্ত পড়েছে, সেই রক্তেই তো ধানের চারা রোয়া হবে। কী সেই কথাটা!’ মকবুল ক্ষীণ অশ্রু-জড়ানো ঈষত্ স্বর ভারী হয়ে ওঠা গলায় বলল, ‘আল ঠেলাঠেলির ব্যাপার আব্বা! ঠেলে দে। মানে সে লগি ধরবে দুহাতে, আমি তাকে জলঘেরের বাইরের স্রোতে টেনে নিয়ে যাব। ঠেলে দে আব্বা, ঠেলে দে! এ রকমই বলেছিল খয়বর মন্ডল।’ শুধু হতবাক-বিস্ময়ে আর্ত গলায় অনি বলে উঠল, ‘অ।’ তারপর তার কেমন যেন এক দুর্বোধ্য কান্না পেতে লাগল, যা অত্যন্ত চাপা। বুকটা ফেটে যাচ্ছে, চোখে চিকচিক করছে জল। পালতোলা রঙিন নৌকোটার দিকে চেয়ে রয়েছে অনুভব। তার চোখে যে চিকচিক করছে, তা নজর এড়ায় না মকবুলের। মকবুল বলল, ‘ক।’ অর্থাত্ যে লাশটা ভেসে আসছে, সেটা দেখতে চায় দুজনে জলঘেরে গিয়ে। হয়তো বুঝতে চায় বিটি না মাটির লড়াই। অনুভব কিন্তু বলল, ‘দাঁড়া! কথাটা আর একবার বল!’ ‘আবার! কেন রে!’ ‘আমাকে বুঝে নিতে মকবুল! বল, তোর ওই গলার স্বাভাবিক স্বরটা আমার চাই।’ মকবুল অগত্যা বলল, ‘আল-ঠেলাঠেলি ব্যাপার আব্বা! ঠেলে দে।’ ওরা জলঘেরের কাছে এল। যা বলা হয়নি, তা হল, পড়তি প্রবীণ বিকেলেই আকাশে প্রকাণ্ড চাঁদ এসে গেছে। টলটলে চাঁদ। ভাদ্রের আকাশ পূর্ণ শরতের আগাম ছোঁয়ায় আশ্চর্য নীল এবং সেখানে সাদা মেঘের পাহাড়। সূর্যাস্তের রঙে সে এক ম্যাজিক রঙের উদ্দীপনা। মিনিট বিশেক সময় নিল লাশটা। তারপর জলঘেরের মধ্যে ঢুকে পড়ল। দুই বন্ধু চলে এল নদীর লাগোয়া খালের কাছাকাছি। লাশটা এদিকেই ঠেলে আসবে বলে মনে হচ্ছে। মকবুল বলল, ‘তোকে একটা কথা বলব-বলব করেও বলতে পারছি না অনি। অথচ না বললেও নয়। হায়রে সেকেন্ডারি পাস করে আমার কিন্তু ভাই কলেজে পড়া হবে না। বাপ কলেজ পড়ার খচ্চা টানতে পারবে না। আমি ওই রকম পালতোলা নৌকো করেই ভাটির দেশ কালুপুর যাব। মামাবাড়ি। দর্জির কাজ শিখে খলিফা হব। মুখে হয়তো নুর রাখব। আমার নাম হবে মকবুল খলিফা। কেমন?’ ‘মানে। এর মানে কী?’ ‘মানে এই যে, গরিব মুসলমান কী করবে! সে খলিফা হবে অনি। ওই দেখ, লাশটা এসে গেছে।’ ‘তোর মোটামুটি বড়লোক দিদি আছে না! বলি কি, মকবুল খলিফার কিন্তু তোর সঙ্গে ভবিষ্যতে দেখা করতে লজ্জা করবে। খলিফা মানে কিন্তু দর্জি। বুঝলি অনি। ওই দেখ, লাশটা এসেছে। কী আশ্চর্য লাশটা হুবহু কার মতো যেন দেখতে! বল, কার মতো। ‘গোপাল।’ ‘হ্যাঁ ভাই। গোপাল আনসারি। আনসারি মানে জোলা। মনে পড়ে নিবাস মোয়াজ্জিনও এই নদীতে ভেসে গেছে। তোকে কিন্তু আব্বা বলে ডেকেছিল আনসারি, তাই না।’ ‘হ্যাঁ মকবুল! বলেছিল, হা খুদা। মুই তো গুনেহগার নিকলা আব্বা। দে ভাই ঘেরের বাইরে ঠেলে দে বেচারিকে। কেন যে খুন হল! হয়তো জানবও না কখনও। কী বলিস?’ কোথা থেকে লগি এনে লাশ ঠেলতে থাকে মকবুল। তারপর একদিন এই নদীপথেই শুরু হয় বিটির গল্প একটি। নাম তার সুপর্ণা মুকুটি। সে গল্পেও খলিফা আছে। দ্বিতীয় অধ্যায় অনুভবের কথা ইদানীং এই সব হচ্ছে, আমি সব কেমন ভুলে-ভুলে যাচ্ছি। সব বলতে সবই, তা কিন্তু নয়। বাছা-বাছা ঘটনা বা খাসা খাসা কিছু একটা ভুলে গেলে মনটা খারাপ করে আর অদ্ভুত ব্যাপার, যা আমি মনে করতে পারছি না, তা কিন্তু নিকট অতীতের ঘটনা, অবশ্য সব ঘটনা নয়, অথচ একটু আগে মনে হল, অমুক ঘটনা তো, ওটা ঠিকই মনে করতে পারব, কিন্তু মনে করার কাজটা শুরু করার পর দেখলাম আমার বিস্মরণ ঘটেছে। নিকট-অতীত মুছে মুছে যাচ্ছে। অথচ দূর অতীত, দূরতর অতীত আমার চোখের সামনে কিছুকিছু একেবারে ঝলমল করছে, যেন হাত দিয়ে সব ছোঁয়া যাবে। কেন এমন হবে! অতীত এভাবে বিভক্ত হয়ে গেল কেন? দুদিন আগের ঘটনা আর কুড়ি বছর আগের ঘটনা—এক কথা তো নয়। কুড়ি বছর আগের ঘটনা তারও আগের ঘটনা আমার মনে আছে। শৈশব মনে আছে। কৈশোর মনে আছে। যৌবনের গোড়াকার অনেক কথা স্পষ্ট স্পষ্ট মনে আছে। ভুলিনি। ভুলে যাচ্ছি কাছের অতীত। এই রকমই সময়ে ঘটনাটা ঘটল। আমার ঘরের দরজার কাছে, ভোররাতের দিকে, কেউ এসে অঞ্জলি উপচানো ফুল, ঠিক যেন অর্ঘ্যের মতো করে নিঃশব্দে রেখে দিয়ে যাচ্ছে। কে সে? এবং কেন সে এভাবে ফুল দিতে আসবে? সে কি কোনও পুরুষ? নাকি নারী? এরই মধ্যে কবে যেন, কোনও এক ভোরে বোঝা গেল, সে পুরুষ নয়। সে নারীই। তার কারণ একটি সাদা ফুলের গায়ে জড়ানো ছিল একটি দীর্ঘ চুল। মেয়েদের যেমন হয়ে থাকে, তেমনই লম্বা চুলটা। আমি অবাক হয়ে দেখতে থাকি চুলের দৈর্ঘ্য আর নারীচুলের গড়ন। কিংবা চুলটার স্বাস্থ্য। তা হলে কে সে? কোন নারী? তার বয়েস কত? কোনও বালিকা নয় তো? না বালিকা কেন হতে যাবে? ওটা নারীই। আমার বয়েস এখন চল্লিশ ছুঁইছুঁই। ঠিক যাকে মধ্য বয়েস বলে তা এখনও হইনি। একশো বছরের পুরানো ডিস্ট্রিক লাইব্রেরির আমি হেড লাইব্রেরিয়ান। দুপুর দুটোর পর লাইব্রেরি খোলে, রাত ৯টা পর্যন্ত খোলা থাকে। দুপুর ১২টায় খোলার কথা। খোলা হয় না। যা হোক। এটাই আমার চাকরি। জানি, আমি খুব সামান্য মানুষ। সামান্য চাকরি করি। বই ঘাঁটাঘাটির কাজ। তবে যা বলবার কথা, তা হচ্ছে, এই মফস্বল শহরে বই পড়বার লোকের নিতান্ত অভাব। পাঠক কই! টেনেটুনে দু’চার জন, কোনও দিন মাত্র একজন হয়তো এল। এল। বই নিল। চলে গেল। কখনও কচ্চিত্ বই নিয়ে চেয়ার-টেবিলে রেখে বসে হয়তো পড়ল দু-এক ঘণ্টা, কেউ-কেউ। অথচ এক কালে এই লাইব্রেরি পাঠক-সমাবেশে গমগম করত। কিন্তু আজ প্রায় পাঠকশূন্য লাইব্রেরি। কেন? আশা করি, একদিন হয়তো আবার পাঠকে ভরে উঠবে লাইব্রেরির ঘরগুলো। কিন্তু কবে সেই আশা ফলবতী হবে! তবু আশায় আশায় রয়েছি। হয়তো, সত্যিই অনেক পাঠকে গুঞ্জিত হবে পুরাতন পাঠাগার। তার আগে কেবলই নির্জন আখরে ঘুমন্ত এই লাইব্রেরি। আর আমি একা বন্দী এই শৃঙ্খলিত মূক ও বাঙ্ময় অক্ষর-সমুদ্র-তীরে, ভীষণই একাকী। আমি একাই অক্ষরদিগকে কথা বলাই। কিন্তু এই রকম একজন মানুষকে ফুলের অর্ঘ্য দিচ্ছে কে? আমি তো দামি লোক নই। একেবারেই নই। আর আমার সংসারে আছে বলতে এক দিদি। বয়েসে আমার চেয়ে ২২ বছরের বড়। সেই দিদিও থাকে দূরে। মাঝ দিয়াড়া রথতলা। আমার বাল্য-কৈশোর ওই রথতলায় কেটেছে। দিদির দৌলতেই আমার পড়াশুনা, মানুষ হওয়া। দিদিই শহরের হস্টেলে রেখে আমাকে অনার্স গ্র্যাজুয়েট করায়। সেই রথতলায় কত বছর হয়ে গেল আমি আর যাই না। ওই রথতলাতেই আমার হূদয় লুঠ হয়ে গেছে। রথতলার নসিপুর গঞ্জের চকের ডিহিতে আমার জীবনের সকল সর্বনাশ ঘটে গেছে। ওখানে আর যাব না। সুপর্ণা মুকুটি ওই ডিহির হাজারি তালতলায় গ্যাং রেপড হয়েছিল। আমি আর ওখানে যাব না। কিছুতেই যাব না ওখানে। আমি তা হলে যাব কোথায়? কোথাও না। এই শহরেই আমার পথ হাঁটা। এখানেই জলঘের ঘূর্ণির মতো। ঘুরে-ঘুরে একা-একা থেকে যাওয়া। পুরাতন এই লাইব্রেরিতে একা-একা চাকরি করা। আমি হেড লাইব্রেরিয়ান, আমার সহকারী নেই। পথ-দুর্ঘটনায় সহকারীর মৃত্যু হলে পদ শূন্যই থেকে গেছে। পূর্ণ হয়নি। (হবে কেন? পাঠক কোথায়?) আর আছে জুবেদা খাতুন। তার পদ একটা আছে, পরিচারিকাসুলভ। সে কানে কম শোনে। টুলের উপর বসে আপন মনে সোয়েটার বোনে বা রুমালে ফুলকারির সূচিকর্ম করে। তাকে হুকুম করা যায় না। করলেও শোনে না বলে আমি আর করি না। সে আসে আর যায়। মাইনে পায়। আমার সঙ্গে তার কথা হয় না। দূরে টুলের উপর বসে থাকে। আমি বইয়ের নিঃসঙ্গ আত্মার ঘুমন্ত হরফে বন্দী। কোথাও যাওয়ার জায়গাও নেই আমার। কোনও কাজও নেই। তবে বই পড়ি। একেলা-একা-একাকী। দু’একটি পাঠক এলে মৃদু কথাবার্তা হয়। এই রকম লোকের জীবনে ফুল আসছে কেন এভাবে? যেন দেবতাকে ফুল দিয়ে প্রণাম করে নিঃশব্দে চলে যাচ্ছে কেউ। কত ভোরে সে আসে? কত দূর থেকে আসে? কেমন মানুষ সে! নারী তো বটে, কেমন নারী? ভাবতে গেলে সবই এক মধুর রহস্য। এই রহস্য ভেদ করা চাই। সুতরাং, বহুকালে বাদে একটা কাজ পাওয়া গেল। রহস্যভেদ। সে আসে সূর্য-ওঠার অনেক আগে। ভোররাতে। অর্থাত্ ভোরও নয়, রাতও নয় এমনই কোনও এক সময়ের কোনও এক মুহূর্তে। ফুল রাখে। হয়তো দুহাত অঞ্জলিবদ্ধ করে কপালে ঠেকিয়ে আলতো একটা প্রণাম কারও উদ্দেশ্যে নিবেদন করে সে চলে যায়। এক দণ্ডও দাঁড়ায় না। এদিকে আমার হয়েছে কি, রাতভর ঘুম ছিঁড়ে-ছিঁড়ে যায় আর ভোররাতের দিকেই ঘুমে জুড়ে আসে দুটো চোখ, তার আগে বিছানায় শুয়ে চোখ বুজে ছটফট করি। আমি কি খুব হতাশা প্রকৃতির মানুষ? না, তা ঠিক নয়। জীবনের গাঢ় নির্জনতায় অক্ষরের দুনিয়ায় আমি বেশ আছি। আমার কোনও বন্ধু নেই। কোনও নারী-সংসর্গ নেই। বিয়েও করিনি। বিয়ের ইচ্ছেও আর নেই। আমি নিজেকে বই-মানুষ বলে পরিচয় দিই নিজেরই কাছে। কারণ, বই-মানুষ বা বই-পুরুষ কথাটাই বুঝবে না অন্যে। যারা অবশ্য কবিতাপ্রবণ তারা বুঝবে বই-মানুষ কাথাটার মানে। সহজ করে বললে, বই ছাড়া যে মানুষের জীবন এক পা-ও চলে না, যার জীবন বইময় বা বই-ই যার জীবন, সে-ই বইমানুষ। বই যার জীবনের প্রত্যয়, সে বইপুরুষ। আজ বিছানায় জেগে বসে রাত কাবার করলাম। পাছে, ঘুম এসে আমাকে আচ্ছন্ন করে অতলে সাঁধ করে ডুবিয়ে দেয়, তাই নিজেকে জাগিয়ে রাখতে একের পর এক জীবনানন্দ দাশের কবিতা আউড়ে গেলাম। আমার কণ্ঠস্বর কাজী সব্যসাচীর মতো ভরাট আর উদাত্ত এবং মিষ্টও। ছেলেবেলা থেকেই আমি আবৃত্তির নেশায় মগ্ন, স্কুলের স্যার অঞ্জনকান্তি (নাট্যকার-নাট্যপরিচালক এবং বাংলা স্যার) আমাকে আবৃত্তির তালিম দেন। ফলে আমি হয়ে উঠি একজন দক্ষ বাচিক শিল্পী। কিন্তু সেই আবৃত্তি চর্চাও আজ আর নেই। থেমে গেছে। থেমে গেছে সভা-সমাবেশ বাচিকতার শিল্প। কচ্চিত্-কখনও নিজে-নিজে গেয়ে উঠে নিজেকে শোনাই নিভৃত কোনও কবিতার স্বর। মনে পড়ে, আমার এই বাচিক-শিল্প-স্বর পাগলের মতো ভালবেসেছিল সুপর্ণা মুকুটি। আমি ছিলাম রথতলা হাইস্কুলের বরাবরের ফার্স্টবয়। ফলে তল্লাটে আমার সমীহ-বিজড়িত সুনাম ছিল বুনো ফুলের স্নিগ্ধ সুবাসের মতো ছড়ানো। মুরুব্বিরাও আমাকে সমাদর করে কথা বলত। তা ছাড়া বাচিক-শিল্প-দক্ষতা আমার সুনামকে করেছিল আরও মোহময় ও দিগন্ত-বিস্তৃত। দেড় কাঠা জমির উপর এক তলা এই বাড়িটা কষ্টেসৃষ্টে করেছি। একাই থাকি। সারাটা বাড়ি বইয়ে ঠাসা। বই দিয়েই বাড়িটা সাজানো। দেওয়ালে রয়েছে রবীন্দ্রনাথ নজরুল শরত্চন্দ্র জীবনানন্দের বাঁধানো বৃহদাকৃতির ফোটো। আর রয়েছে দুই নারীমুখের বাঁধানো ফোটো। একজন কিশোরী। অন্যজন মাঝবয়েসী। সুপর্ণা মুকুটি আর লাবণ্য চক্রবর্তী। লাবণ্য আমার দিদি। মা-সমান। আমি বাপ-মাকে ছেলে বেলায় হারিয়েছি। সুপর্ণারও তাই। শৈশবে বাপ-মাকে হারিয়ে মামাবাড়িতে আশ্রয় নেয়। আরও একটা জবর মিল ওতে-আমাতে ছিল, আর তা হচ্ছে, সে-ও ছিল ক্লাসের সেরা ছাত্রী। ফার্স্ট বই সেকেন্ড হয়নি কখনও। ফলে ওতে-আমাতে একটা অকথিত টান অন্তরে অন্তরে দল মেলেছিল। সে ছিল ফার্স্ট, অথচ অপ্রখর-স্নিগ্ধ সুুন্দর এক রূপ; চোখ জুড়ানো এক সৌন্দর্য মধুর-বিস্ময় রচনা করত চোখের সামনে। তাকে চোখের সামনে পেলে হূদয়ে এক অব্যক্ত মুখ বয়ে যেত। সুপর্ণাকে ওর মামি পছন্দ করত না। পড়াশোনা করে মেয়েটা মানুষ হোক তা কিন্তু মোটেও চাইত না মামি। চাইত ভাগ্নীটা ফেল করুক। সর্বক্ষণ সুপর্ণাকে গতর খাটানোর কাজে ব্যস্ত রাখতে চাইত। যদিও মামা সনাতন ভট্টাচার্য সুপর্ণাকে বড্ড ভালবাসতেন। ভাগ্নীকে গেরস্তালির কাজে জুতে দেওয়া হয়েছে দেখলে মামা সুপর্ণার হাত থেকে কাজ কেড়ে নিয়ে বলতেন, ‘পড় গে যা, তুই কি এ বাড়ির চাকরানি! তুই সন্তান, শশী-সুধার মতো তুইও সন্তান। ওরা পড়ছে, তুইও পড়গে যা। ওরা ডাল-মাথা, তুই তো নোস। ওরা (শশী-সুধা) পারে না, তুই পারিস। তুইও সন্তান। তোর মাথা ভাল, ফার্স্ট-গার্ল, ওরা না পারলে নাইবা পারলে, তুই মানুষ হ।’ এমন করে বলতেন মামা। তারপরই মামির সঙ্গে লেগে যেত তুমুল। মামির তীব্র-তীক্ষ গলা ঝাঁ-ঝাঁ করে উঠত। ‘ওরা না পারলে, নাই বা পারলে!’ এই কথা মামি সহ্য করে কী করে! ঝগড়া বেধে যেত। তবে সনাতন ভট্টাচার্য ঠিকই বুঝেছিলেন, শশীশেখর (পুত্র), সুধাময়ী (কন্যা) ভোঁতা বুদ্ধির বলেই পড়াশোনায় তারিফযোগ্য কিছুই করতে পারবে না। বরং সুপর্ণা মানুষ হোক। ছেলে-মেয়ের ব্যাপারে যথাসময়ে যা করবার তিনি করবেন। দেখা গেল, যথাসময়ে তাঁর নিজ-কন্যা ও পুত্রের ব্যাপারে সনাতন যথাবিহিত ব্যবস্থা গ্রহণ করলেন। মেয়ে বড়। মাধ্যমিক পাশ করলে অবস্থাপন্ন ঘরে ভারী যৌতুক দিয়ে বিবাহ দিলেন, সেটা নিতান্ত কিশোরী-বিবাহ হলেও তিনি সেই বিবাহ সম্পন্ন করলেন। আর পুত্র শশী কোনও প্রকারে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করলে সনাতন তাকে নিজের কাপড়ের দোকানের ব্যবসায় জুড়ে দিলেন। বললেন, ‘ছেলের আর কলেজ পড়ে নাফা নেই হৈম, দোকানে বসুক, তাতেই মঙ্গল।’ মামি হৈম অর্থাত্ হৈমবতী স্বামীর মুখের উপর তেমন কোনও প্রতিবাদ করতেই পারলেন না। কারণ মামিও ছেলে-মেয়ের রেজাল্ট দেখে বুঝে গিয়েছিল, বাপের সিদ্ধান্তই ঠিক। শশীসুধার মাথা দুইটা যাকে বলে ডাল, ঘিলুতে গোবর ভরা। ভাইবোন উভয়ই শিক্ষাকে ভয় পায়। পড়তে বসলে ঘুম পায়। হৈমবতী এই যে মেনে নিল, সেটা গ্রামের সকলকে বেশ অবাক করেছিল। হৈমবতী বললে, ‘বেশ তো, হবে না যখন, তখন হবে না। সুধার বিয়ে হল। শশী ব্যবসার টাটে বসল—এই সবও তো হওয়া ভট্টচার্য মশাই। একটা রোখ কিন্তু তো আমার মাথাতেও চেপেছে নতুন কোরে। হবে তো হোক। সুপর্ণাও তো সন্তান। সে যেন ডেপিটগিরি করে।’ অর্থাত্ ডেপুটিগিরি করবে সুপর্ণা মুকুটি। তার মানে হয়তো হৈমবতী সুপর্ণাকে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট দেখতে চায়। বা অন্য কোনও ডেপুটি। ডেপুটিগিরি বলা বাহুল্য তার কাছে এক মস্ত লবেজা। হৈমবতীর স্বপ্ন এইভাবে পূর্ণতা পেতে চাইল, শশীসুধার ব্যর্থতা পূর্ণ করবে সুপর্ণা। হৈম তার স্বামীকে বলল, ‘লাবণ্যর ভাইটাকে ঘরের মাস্টার রাখলে কেমন হয় ভট্টচার্য মশাই। মাঝে-মিশেলে তো সুপর্ণাকে অনুভব দেখিয়ে-টেখিয়ে দেয়। অনুভবকে পার্মানেন্ট করা যায় না?’ মামা বললেন, ‘ঘরের মাস্টার করবে অনুভবে, এই কথা তুমিই বলছ হৈম?’ ‘আইজ্ঞা, সেই কথাই তো বলছি, কেন, সেইটে কি খারাপ কথা হল ভটচার্য মশাই?’ ‘পার্মানেন্ট চাইছ?’ ‘আইজ্ঞা। অনুভব কি রাজে হবে না?’ ‘কী করে হবে? ও তো নিজেই ছাত্র হৈমবতী! মাঝে-মিশেলে দেখায়-টেকায়, এই মাত্র। তা-ও তো আমি বলেছি বলে এড়াতে পারে না। বলেছি, দেখ বাবা, ভাগ্নীটা আমার ফার্স্টগার্ল, যদি পড়াও তো ফার্স্ট কিছুতেই আর সেকেন্ড হয় না। ফার্স্টই থাকে। চাও না? তুমিও তো ফার্স্ট!’ ‘বললেন?’ ‘হ্যাঁ, বললাম।’ ‘এবার বলুন। ঘরের মাস্টার হোক, একেবারে পার্মানেন্ট। একটা ন্যায্য, কী বলে, হাত-খচ্চা দেওয়া হবে।’ সনাতন আমাকে প্রস্তাব দেন তাঁর স্ত্রীর কথা মোতাবেক হাত খরচার। বললাম, ‘ দেখুন মামাবাবু। টাকা আমি নেব না। তবে দেখিয়ে যেমন দিই, তাই-ই দেব। সুপর্ণা যাতে সেকেন্ড না হয়, আমি দেখব।’ মামা বললেন, ‘পার্মানেন্ট?’ আমি মাথা নেড়ে বললাম, ‘পার্মানেন্ট।’ সে বছর উচ্চ মাধ্যমিক দেবে সুপর্ণা। পড়াতে বসেছি। জানলার কাছে তক্তাপোষ। দিগন্তে প্রকাণ্ড গোল চাঁদ। ঘরে বালেবর কমলা-হলুদ আলো। আশ্চর্য মাদকতা শরীরে। বাসন্তী সন্ধ্যা। মাতাল দখিনা হাওয়া সুপর্ণার চুল ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে। ওর ডাগর কাজল-টানা চোখ, ওর শরীর থেকে বয়ে আসছে একটি মিষ্টি ঘ্রাণ, আশ্চর্য মাদকতাপূর্ণ। হঠাত্ আমি বলে উঠি, ‘আমি তোমার পার্মানেন্ট, জানো তো?’ সুপর্ণা চমকে উঠে মুখ তুলল। বসন্তের ওই জ্যোত্স্নাময়ী চন্দ্রমা, ওই দখিনার মৃদুমন্দ গতি, সুপর্ণার শরীরের মাদকতাপূর্ণ ঘ্রাণ, ওই বয়েসেই তার বক্ষ-পূর্ণিমার পূর্ণ বিকাশ তার ব্লাউজ ঠেলে বাইরে ফেটে পড়তে চাইছিল, সেই অমৃত সৌন্দর্য এক ঝলক চেয়ে দেখেই আপন মনে লজ্জা পেয়ে বাইরে পূর্ণ গোল চাঁদের দিকে চাইলাম। বাসন্তী আলোয় আমার অস্ফুট কামনা, আমার লজ্জা পাওয়া, আমার প্রেম, হা ঈশ্বর, কীভাবে ব্যক্ত করি এই আকুল বিস্ময়-ঘোর, অবাক হই, সুপর্ণার চোখেও কামনার হিম অগ্নিকণা সুদূর নক্ষত্রকণিকার মতো জ্বলছে—তার হাত এগিয়ে আসছে একটু-একটু করে বিছানার চাদরে ভর দেওয়া আমার হাতের দিকে। আমার হাতটা আলতো ভাবে উপুড়-করা। তার ওপরে এসে ওঠে সুপর্ণার হাতের তালু ও আঙুল এবং মৃদু চাপ দেয় সে। ‘অনিদা, প্লিজ! আমাকে বকবে না কিন্তু। হাতটা রাখতে দাও!’ ‘মামি দেখে ফেলবে যে।’ ‘না। দেখবে না। মামি বাড়ি নেই।’ আমি বিস্ময়ে-আনন্দে অভিভূত হয়ে গেছি। বিশ্বাসই করতে পারছি না, আমাকে ও-ভাবে স্পর্শ করেছে সুপর্ণা। এই আত্মসমর্পণ অনির্বচনীয় সুখে দোলাচ্ছে আমাকে। তারপর সময় বছর তিন কি সাড়ে তিন পার হয়েছে। আমরা দুজন দুজনাকে অবলীলায় স্পর্শ করে মনে মনে মাতাল হয়েছি। আমাদের সুখের সীমা ছিল না। ‘আমাকে বিয়ে করবে তো অনিদা?’ নিরাকুল কামনাভরা জানতে চাওয়া সুপর্ণার। আমার ডাকনাম অনি। জবাব দিতে দেরি করছি দেখে সুপর্ণা বলে ওঠে, ‘তোমায় না পেলে আমি বাঁচব না অনিদা।’ মনে মনে আমি বিড়বিড় করে বললাম, ‘আমিও কি বাঁচব?’ শুনেছি, প্রেম করলে প্রেমিক-প্রেমিকার মনে, ‘তুমি ছাড়া বাঁচব না’—এই জাতীয় তীব্র আকুল এক মনোভাব জন্মে, আমরা দুজন সেই এক সুতীব্র আকুলতার শরিক হয়েছিলাম। এই মনোভাব যে মোটেও ঠুনকো ছিল না, তা পরবর্তী জীবনে মর্মে মর্মে বুঝেছি। ভাবতেও পারিনি এই পৃথিবী আসলে কেমন জায়গা। কারা এর আসল অধীশ্বর। সেদিন সুপর্ণার (ইতিহাস অনার্সের) পার্ট ওয়ানের রেজাল্ট বার হয়েছে, ভাল রেজাল্ট করেছে সে। বহরমপুর কাদাই-এর একটি বইয়ের দোকানে বুকলেট থেকে রেজাল্ট জেনে বাসে করে রথতলা ফিরছিল। তখনকার দিনে সেলফোন চালু হয়নি। মাড়োয়ারির গদির টেলিফোনের কাছে আমি বসে রয়েছি। কাদাই বুক স্টোর্স-এর টেলিফোন থেকে সুপর্ণার ফোন আসবে। আমি অপেক্ষায় রয়েছি। এটি শিব মহেশ্বরীর পাটের আড়তের গদি। মাত্র আট আনা খরচ করে এখান থেকে ফোন করা যায়। তখনকার সময়ে আধুলির দাম ছিল। অনেক সময় শিব বাবু ওই আট আনি নেন না, ফ্রি ফোন করতে দেন। পাঁচটা নাগাদ ফোনটা এল। শিববাবু ফোন কানে নিয়ে বললেন, ‘হ্যাঁ ভাই। অনুভব গদি পার হ্যায়। লো ভাই। সুপর্ণার কল। পাকড়ো।’ হ্যাঁ, ঠিকই। শিব মহেশ্বরীর গদির উপরই তো আমি বসে রয়েছি। এই ফোনটিরই অপেক্ষায়। শিব ফোনটা আমার দিকে হাত বাড়িয়ে এগিয়ে দিলেন। রিসিভার কানে ধরলাম আমি। ‘হ্যাঁ, অনিদা। ভাল খবর। আর ৩টা নম্বর বেশি পেলে সিক্সিটি পার্সেন্ট হয়ে যেত। ইশ! মাত্র থ্রি মাকর্স কমতি হয়ে গেল অনিদা। যাক গে। তুমি আবার দুঃখ করতে বোসো না যেন। পার্ট-টু-এ পুষিয়ে নেবো, দেখো। আচ্ছা, রাখছি। বাস ধরব। তুমি ঘোড়াপিরের আস্তানার ওখানে পাকুড়তলায় থেকো। চাঁদ উঠলে তবে চকের ডিহি পার হব। তুমি হাজারি তালতলায় চাঁদ উঠলে পৌঁছে যেয়ো। ঠিক আছে। রাখলাম।’ ‘রাখলাম’ বলেই রিসিভার নামিয়ে না ফেলে দ্রুতই বলে ওঠে সুর্পণা, ‘শোনো, চাঁদ ওঠার আগেই পৌঁছে যেও। জায়গা ভাল না। শোনো, আমার ভয় করে। বুলেট-বাইকে লোকটা ঘুরে বেড়ায়। কচি বাচ্চামেয়েকে পর্যন্ত খুরাক করে ওরা, ওই লুম্পেনগুলো, পার্টি ওদের ব্যাক করে, জানোই তো? আমার বড্ড ভয় করে অনিদা! দেরি করো না। চলে এসো। রাখলাম।’ এই জীবন একটাই। প্রেমও কি একবারই নয় অনুভব? নিজেকে যতবারই এই প্রশ্ন করেছি, ততবারই আপন মন থেকে জবাব পেয়েছি, জীবন একটাই। প্রেমও একবারই। বার বার বিভিন্ন নারীতে নিজেকে হয়তো জড়াতে পারবো না। সুপর্ণা আমার জীবনে এক ও অদ্বিতীয় ঈশ্বরী। ‘একদিন তোমার সর্বাঙ্গে আমি চুম্বন করব সুপর্ণা! একদিন।’ ডিহির উপর উঠে আকাশে চাইলাম। চাঁদ উঠবে। আকাশের তলায় একটা কমলা রঙের ফোয়ারা দেখা দেবে। আমি আপন মনে কথা বলছি সুপর্ণার সঙ্গে। ‘আমি এখানে সুপর্ণা। ডিহি ধরে ঘোড়াপীরতলায় যাব? কোথায় দাঁড়াব? নসিপুরের ডিহি, নাকি হাজারি তালতলার ডিহি? পাকুড়তলায় দাঁড়াব?’ আমি দাঁড়িয়ে রইলাম নসিপুর গঞ্জের উত্তরে, চকের ডিহির কাছে। তারপর কী মনে করে পাকুড়তলায় চলে গেলাম। কিন্তু কী করে বুঝব চাঁদ ওঠার আগেই হাজারি তালতলার চটানে বটতলার খাদে, নদীর কিনারে সর্বনাশ হয়ে গেল। চাঁদ ওঠেনি। ওই দিকে ঝলসে উঠল বুলেটের হেডলাইটের দগদগে আলো। আকাশের তলায় ঝাপটা দিয়ে গেল সেই আলো। প্রায় মাইলটাক দূরে ওই আলো দেখা গেল। তা হলে কি সুপর্ণা হাজারি তালতলার ঘাট পেরিয়ে এসেছে? আমি ছুটে গেলাম। ‘একদিন তোমার সর্বাঙ্গে আমি চুম্বন করব সুপর্ণা! একদিন।’ কথাটা বুকের মধ্যে হাহাকারের মতো বেজে উঠল। কু গেয়ে উঠল মনটায়। আমি হাজারি তালতলার চটানের দিকে পাগলের মতো ছুটতে থাকি। কাছাকাছি পৌঁছতে কানে আসে নারীকণ্ঠের চাপা আর্তনাদ, বটতলার খাদে ‘গ্যাং রেপড্’ হচ্ছিল সুপর্ণা মুকুটি। যৌন-মৃগয়ার পুরুষ-উল্লাস শোনা যাচ্ছিল। আমি চিত্কার করে উঠলাম। ‘অ্যাই, অ্যাই, ছেড়ে দে, ওরে ছেড়ে দে, লোচ্চার দল!’ ‘সুপর্ণাকে ছেড়ে দে ভাই’ এই বলে কান্নায় গলা বুজে আসে। লোচ্চার দলকে ‘ভাই’ বলে সম্বোধন করলেও সুপর্ণাকে ছাড়ল না ওরা। ওই ধর্ষক-লুম্পেনের গ্যাং। ওই দলে এমএলএ-এর ভাইপোও ছিল। ওর নাম খোকা বড়াল। পুরা নাম খোকনচাঁদ বড়াল। বিখ্যাত লম্পট কে সি বড়াল। ‘ওরে বড়াল, তোকে তো আমি চিনেছি রে! দে ছেড়ে দে। ছেড়ে দে ভাই।’ হঠাত্ ও আমার দিকে তেড়ে ছুটে এল। হাতে ওর চেন। আমাকে মারতে থাকল। হঠাত্ আমার মাথার পিছনে শক্ত কিছুর একটা ঘা পড়ল। কারণ আমি তখনও মার খেতে খেতে চিত্কার করে চলেছি। ঘা খেয়ে আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। জ্ঞান হারাতে হারাতে মনে হল, একটা তীব্র আলো পথ ধরে ছুটে আসছে। তারপর আমার আর কিছুই মনে নেই। কিছুই মনে নেই। কিন্তু ওই তীব্র আলো এখনও মগজে ঢুকে আসে কোনও কোনও রাতে। যখন দিগন্তে চাঁদ ওঠে। একটাই জীবন। প্রেমও একবারই। তারপর আমাদের আর দেখা হয়নি সুপর্ণা। তুমি আর তোমার মামাবাড়ি ফিরে আসোনি। তুমি কি বেঁচে আছো? নাকি তোমাকে ধর্ষণের পর খোকা বড়ালের দল খুন করে লাশ নদীতে ফেলে দেয়? তীব্র আলো। ধর্ষণের চাপা গোঙানি, তার সঙ্গে চাপা যৌন-উল্লাস। দিগন্তে চাঁদ উঠি-উঠি কমলা রঙের চাঁদের আলোর আঁঁট। ধর্ষকদের ছায়ামূর্তির নদীর কিনারে, খাদে। আমার পায়ের কাছে সাদা-শুভ্র-পবিত্র এক গেছো ফুল। ভোর রাতের আঁঁধার ফিকে হয়ে আসছে। হঠাত্ চোখে পড়ল ‘সে’ রাস্তা দিয়ে চলে যাচ্ছে। বাইরের গ্রিলের গেটটা খোলার শব্দ হল। সচকিত হয়ে চাইলাম। একটি মূর্তি দেখা গেল। আমি ঘরের দরজা খোলা রেখেই বাইরে বেরিয়ে গ্রিলের গেটের কাছে এলাম। একটা ক্ষিপ্রতায় ছুটে এসে রাস্তায় নামলাম দেখি, দ্রুত পা চালিয়ে সে এগিয়ে যাচ্ছে। পিছন থেকে ডেকে উঠলাম, ‘দাঁড়াও, যেয়ো না। দাঁড়াও। শুনছ, দাঁড়াও।’ সে একটি কালো বোরখা মোড়া মূর্তি। ডাক শুনে পায়ের গতি আরও বাড়িয়ে দেয় ওই বোরখা। এরপর শুরু হয় ওই বোরখার পিছু ধাওয়া। অবাক হই, ও ওভাবে আসে কেন? ফুল দেয় কেন? কে ও? কী চায়? কখনও কোনো মুসলিম মেয়ের সঙ্গে তো আমার সম্পর্ক হয়নি, এমন সম্পর্ক, যাতে করে সে আমায় ফুল দিতে আসবে। দৃশ্যটাই অদ্ভুত। আমি তার পিছু পিছু যেতে থাকি। সে দ্রুত এগিয়ে যায়। যেন কতকটা উড়েই যাচ্ছে। ‘দাঁড়াও। শোনো।’ শোনে না। এগিয়ে যায়। ‘কী চাও?’ জবাব দেয় না। স্কোয়ার ফিল্ডটা সে এক কোণ থেকে আর এক কোণের দিকে ফিরে চলে গেল যেন। তারপর সে গঙ্গার ধারের উঁচু বাঁধের রাস্তা ধরে লালবাগের দিকে এগিয়ে চলল। ঠিক করলাম, আমি ওর সঙ্গে শেষ পর্যন্ত যাব। কোথা থেকে আসে ওই বোরখা। কেন আসে? কী চায়? ওইভাবে পুষ্পার্ঘ্য দেয় কেন? ‘তুমি কে? কথা বলছ না কেন? কে তুমি? এভাবে আসো কেন? দাঁড়াও।’ দাঁড়ায় না। জবাব দেয় না। আমি ওকে শেষ পর্যন্ত অনুসরণ করি। সে গঙ্গার ধার ছেড়ে লালবাগের রাস্তা ধরে। রাস্তার দু’পাশে আমের বাগান। কাপাস ডাঙার পথটা যেখানে লালবাগের পথের সঙ্গে এসে মিশেছে। সেখানে পৌঁছে সে কিছুক্ষণ থমকে দাঁড়ায়। তারপর আরও দ্রুত সে হাঁটতে থাকে। আমি অনুসরণ করি। বোরখা নতুন গ্রাম নামে যে-গ্রাম বহরমপুর থেকে লালবাগ যেতে পথে পড়ে, সেই গ্রামে ঢুকে যায়। আমি থমকে দাঁড়িয়ে পড়ি। বোরখা কোনও একটা বাড়ির আড়ালে চলে যায়। তারপর ওই বাড়ির ভেতর থেকে মেয়েদের সমবেত হাসির গুঞ্জন ভেসে আসে। আমার এই ছুটে আসাই হাসির কারণ। কী করি? আমি বোকার মতো গোরাবাজার রুটি মহলের দিকে ফিরে আসতে থাকি। সুপর্ণার কথা আমার মাথার ঠিক নেই। আমি কিছুটা পাগল হয়ে গেছি। কিছুটা পাগল। পুরোটা নয়। আমি আমার শরীরের ব্যাপারে এবং মনের ব্যাপারেও, অকাট্য রূপে শুদ্ধতাবাদী। এই যে মনোভাব, এটা কোথা থেকে আমার মধ্যে এল, আমি বলতে পারব না। আমি তো ছেলেবেলা থেকেই নিজেকে বাপ-মা-হারা অনাথ বলেই জেনে এসেছি, মামা-মামিই আমাকে যাবতীয় সহবত শিক্ষে দিয়েছে; তবে তারা যে ওই শুদ্ধতার শিক্ষা দিয়েছে, তা-ও তো নয়। এই যুগেও আমি সাহিত্যের অনুরক্ত পাঠক। শরত্চন্দ্র আমার প্রিয় লেখক। এ যুগেও। আমি যখন টুয়েল্ভ পাস করলাম, তখন সেলফোন-কম্পিউটার-নেট-যুগ দূরে-দিগন্তেও উঁকি দেয়নি। আমি অনুভবকে মাড়োয়ারির গদিতে থাকা ব্যবসায়ী টেলিফোনে ফোন করি। বহরমপুরের কাদাই থেকে; ফোনটা করি বইয়ের দোকান থেকে। পার্ট ওয়ান অনার্সের রেজাল্ট জানাতে। প্রেম জিনিসটা আমি শরত্চন্দ্র থেকেই নিই। একনিষ্ঠতা, সম্পর্কের ভেতরে, চাই। এ ছাড়া প্রেম হয় না। শরত্চন্দ্র পড়ে এই জিনিসটার একটা মানসিক গড়ন তয়ের হয়। এমনকি, আমার ভেতরে অকাট্য একটাবোধ জন্মে আর তা হচ্ছে, প্রেম ছাড়া জীবনের কোনো মানে নেই। কিন্তু সে তো গেল, শরত্চন্দ্র থেকে পাওয়া প্রেমের সাহিত্যিক অনুভূতি। আর তখন সম্মুখে ছিল অনিদা, যাকে অবলীলায় হূদয় জড়াতে চাইলে, মনটা আমার বশেই রইল না। সেই যুগ যখন একটা মেয়ে ধর্ষিত হলে আত্মহত্যা করত। যারা বেঁচে থাকত, তাদের বিয়ে হতো না। যে-যুগে গ্রামে মফস্বলে মোটামুটি লেখাপড়া জানা মেয়েরা শরত্চন্দ্রের বিধবা-উপাখ্যান পড়ে (যে বিধবা প্রেম করত, কিন্তু তার বিয়ে হতো না) চোখের জল ফেরত। আমি তা হলে কেমন মানুষ! আমিই তো ধর্ষিত হয়েছি, হাজারি তালতালায়। আমাকে খোকা বড়ালের দল চারজনে মিলে বলাত্কার করে। পুরুষরা প্রাচীন কালে যখন অরণ্যে থাকত, তখনও কি দলবেঁধে নারী-ধর্ষণ করত! শিশুকন্যা ধর্ষণ করতো বুড়া মানুষের দল! ধর্ষণ কবেকার কথা! কবে এর শেষ হবে! লোচ্চা-পুরুষ কবে থামবে? কবে নারী তার শরীরে নিজের অধিকার বুঝে পাবে। কবে? কবে? কবে? পুরুষ কবে অনুভবের মতো মানুষ হবে! আমার অনিদাও তো পুরুষ! আবার লিখছি কথাটা, পুরুষ কবে অনুভবের মতো মানুষ হবে! আমার অনিদাও তো মানুষ! অনিদা আমার সর্বাঙ্গে চুম্বন দিতে চেয়েছিল, তারই প্রথম চুম্বনে আমি রোমাঞ্চিত হব, তার মানে, সেটাই তো কথা ছিল অনিদা। আমার এই বুক জোড়ায় প্রথম এবং শেষ চুম্বন করেছে লম্পট খোকা বড়াল আর তার গ্যাং; আমার আর কোনও দাম নেই নিজেরই কাছে। তারপর আমি আর নিজেকেই চিনতে চাইনি অনিদা। আমাকে ওরা ধর্ষণ করে আধমরা অবস্থায় চকজমার নদীতে ফেলে দেয়। আর সেটাও ঘটে রাস্তার বাঁকে জিপের একটা ঝলসানো তীব্র আলো জ্বলে উঠেছিল বলে। ওটা ছিল ধনীরাম বাবুর জিপ। ওরা ভয় পেয়ে আমাকে নদীতে ফেলে দেয় আর অনুভবকে অর্ধ-চৈতন্য অবস্থায় খাদের ওই দিকে হাজারি তালতলার চটানে ফেলে পালায়। আমি তখন নদীতে ভেসে যাই। তখন দিগন্তে চাঁদ ভেসে উঠেছে। আমি ভেসে যাচ্ছি। ভাসতে ভাসতে মনে হলো, আমার কেন মরণ হল না! ওরা কেন আমাকে মেরে ফেলে দিলে না? আমি বেঁচে রইলাম কেন? মামির ওখানে আমার জায়গা হবে না। অনিদা! তুমিও যদি আমায় না নিতে চাও? এমন কথাও আমি ভেবেছিলাম। তারপর আমি আরও দূরে ভেসে গিয়েছিলাম। সরিষাবাদের ঘাটে পৌঁছে আমার ধর্ষিত জীবনে অন্য গল্প শুরু হয়। গ্রীষ্মের নদীতে গা ডুবিয়ে নদীর জলের শীতলতা শুষে নেয় মোষ, সন্ধ্যার পর। রাত হয়ে গেলেও মোষ আধডোবা হয়ে নদীজলে বিশ্রাম নেয়। কখনও নিজে থেকে, কখনও রাখাল-বাগাল বা বাড়ির লোকের পাচন দেখানো তাড়া খেয়ে বাড়ি ফেরে। দুটি মোষ ওইভাবে ভাসছিল। আমার ভেসে আসা দেহ ঠেকল এসে একটি মোষের গায়ে। মোষটাকে আঁঁকড়ে ধরে আমি নদীর ওই ঘাটে হাউহাউ করে কেঁদে ফেললাম। মোষ আমাকে পিঠে করে নিলে। তারপর ওর মনিবের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিলে। লণ্ঠনের একটি আলো গোয়াল ঘরে ও বর্হিপ্রাঙ্গনে ঘোরাফেরা করছিল। আকাশের তলা থেকে অনেকখানি উপরে চাঁদ টইটই করছে আর নীচে গোয়ালঘরে টলটল করঠে লণ্ঠন। আগের দিন বৃষ্টি হয়েছে বলে আকাশে চৈত্রের ধুলা নেই। দুটি মোষ আগে-পিছে এসে দাঁড়িয়েছে টের পেয়ে লণ্ঠন কপালের কাছে তুলে ধরে ৩৭ বছর বয়সী ঘরণী বলে ওঠেন, ‘ওমা! তোর পিঠে এটি আবার কে রে বাছা মুক্তার! ওম! এ যে মাইয়া মানুষ। ওরে সুফিয়া, রতন! ইদিকে আয় তো একবারটি! ঘাট থেকা একটি সোন্দরী খুকি রে পিঠে কর্যা আনছে মুক্তার। নামা, নামায়ে লে, বাছা রে!’ মানুষের এমন মিষ্ট স্বর, এমন মায়াময়, আগে কখনও শুনিনি। আমাকে রতন আর সুফিয়া মোষের পিঠ থেকে নামিয়ে অর্ধ-চৈতন্য আমাকে বাড়ির ভিতরে ধরাধরি করে নিয়ে গেল। শুইয়ে দিলে রোয়াকের উপর। ‘তোমার কী হয়েছে মা! নদীতে ভাসে এলে ক্যানে? ওমা! এই মেয়ের উপর বড্ডাই অত্যেচার হয়েছে গো! ওরে সুফি, এই বোনডারে পোশাক বদলায়ে দে, ঘরে নিয়া যা।’ বললেন ধরণী। গুলেজান বিবি। একটি আশ্চর্য ধার্মিক পরিবারে আমার জায়গা হল। এই বাড়ির কর্তা হলেন আমার আব্বা। কর্ত্রী হলে আমার আম্মা। দুই ভাইবোন সুফিয়া আর রতন (রজব আলি খলিফা) হল আমার ভাইবোন। এই পরিবারের কর্তার নাম দ্বীন মহম্মদ খলিফা। ইনি খলিফা মানে দর্জি। ইনি একাধারে দর্জি এবং ইমাম। মোষ দুটি দ্বীনের ভাইদের। গোয়ালে খলিফার একটি গাই ও একটি বাছুর রয়েছে। লণ্ঠনের আলোয় সেই গাই-বাছুর কেমন আছে দেখছিলেন গুলেজান। দ্বীন মহম্মদের বাকি দুই ভাই ঘোরতর চাষী। যদিও তাঁরা ধার্মিক নিশ্চয়। ধার্মিক লবেজ বাড়ি পাঁচবেলা গুঞ্জিত হয়ে ওঠে। বয়েস বছর বারো হয়ে গেলে মেয়েদের এখানে বোরখা পরতে হয়। আমাকেও বোরখা দেওয়া হল। সুফিয়ার ব্লাউজের সঙ্গে কালো বোরখা। অদ্ভুত ব্যাপার! আমার মন্দ লাগল না। ধর্ষিত আমি। অসহায় আমি। অনাথ আমি। মনে হল, কোথাও আমার ফেরার জায়গা তো নেই। গুলেজানের ওই মিষ্ট কণ্ঠস্বর কত যে আপনার বলে মনে হল! গুলেজান যখন আমার মুখের উপর ঝুঁকে পড়ে সুমিষ্ট স্বরে জানতে চাইলেন, ‘তোমার নাম কী মা!’ কী যে হলো আমার, আমি বলে বসলাম, ‘আমার নাম...’ ‘হ্যাঁ, বল। ভয় কী!’ ‘বেগম রোকেয়া!’ ‘রোকেয়া বেগম, তোমার নাম?’ ‘না আম্মা। আমার নাম, বেগম রোকেয়া!’ ‘অ। আচ্ছা। আগে বেগম, তারপর রোকেয়া, তাই না?’ ‘জি, আম্মা!’ হ্যাঁ অনিদা। এইভাবে আমি মুসলমান হলাম। একটি বোরখার আড়ালে আমার জায়গা হল। যদিও কলমা-সিদ্ধ মুসলিম তখনও হইনি। ‘কিন্তু মা, আমি নমাজ-রোজা এক বর্ণ জানি না।’ ফের সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলাম। ‘ক্যানে মা, মানো না?’ শুধালেন গুলেজান। আমি জবাব দিলাম, ‘আমি অনাথ। ছেলেবেলায় বাপ-মা হারিয়েছি। একটি হিন্দু ফ্যামিলিতে মানুষ।’ ‘অ!’ গুলেজানের গলায় একটা কেমন মৃদু সন্দেহের গন্ধ। মনে হল, জীবন অত সহজ নয়। আমি সুপর্ণা মুকটি। নিজের জীবনের বাঁক নিজেই আমি এভাবে মোচড় দিয়ে বদলে নিতে চাইলাম। কিন্তু কাজ সহজ হল না। ‘আমি আর ফিরব না আম্মা! আমাকে আশ্রয় দাও।’ বলে উঠলাম। ‘ওরা যদি খোঁজ নেয় কখনও?’ প্রশ্ন করলেন গুলেজান। ‘আমি বোরখা ছেড়ে বার হব না। মা! ধর্ষিতাকে কেউ কি আর ফেরত নেয় আম্মা!’ আর কথা না বাড়িয়ে চুপ করে গেলেন গুলেজান বিবি। কেবল ফ্যালফ্যাল করে আমার মুখের দিকে চেয়ে রইলেন। তাঁর চোকে সন্দেহ। ঠান্ডা সংশয়। মজার ব্যাপার এই যে, এই ঘটনার সাত দিনের মধ্যে দ্বীন মহম্মদ খলিফার জীবনে অন্য এক পরিবর্তন এল। লালবাগ-লাগোয়া নতুন এক বসতি, নতুন গ্রামের মসজিদে ইমামের চাকরির সমাদরপূর্ণ আহ্বান এল। তিনি সরিষাবাদের বসত ছেড়ে সপরিবারে নতুন গ্রামে রওনা দিলেন। আমাকেও সঙ্গে নিলেন খলিফা। নতুন গ্রামে এসে আব্বা একদিন আমাকে বললেন, ‘দেখ মা, ঘরের মেয়ে সর্বক্ষণ বোরখা এঁটে থাকবে এ সহবত ঠিক না। যখন দূরপারে যাবে, বাইরে সভা-দরবারে যাবে তখন পরবে। নতুন জায়গায় এলাম। এখানে রাতদিন বোরখা নিয়ো না। যদি মুসলমান হও, হও। আমি তোমার মুসলিম ঘরে শাদির ব্যবস্থা করি। বল, তোমার আসল নাম কী?’ বুঝলাম, যেভাবেই হোক, আমি ধরা পড়ে গেছি। আমি সব কবুল করলাম। বললাম, ‘আমাকে আব্বা আপনি রোকেয়া বলেই ডাকবেন। এই নতুন গ্রামে আমি আমার কাজ শুরু করতে চাই। আমি এখানে একটা প্রাইমারি স্কুল গড়তে চাই। আমি এ যুগে একজন ক্ষুদ্র বেগম রোকেয়া হয়ে বাঁচতে চাই। আপনি ইমাম হয়েও এবং আমি হিন্দু জেনেও আমাকে মুক্ত হাওয়ায় বাঁচার মতন স্বাধীনতা দিলেন, এ আমার সৌভাগ্য আব্বা!’ দ্বীন মহম্মদ বললেন, ‘তুমিই নিজ মুখে বলছ, তুমি বেগম রোকয়া, ফের নিজেকে হিন্দু বলছ কেন? এসো তোমাকে কলমা পড়িয়ে মুসলমান করে নিই। এখনও বলনি, তোমার হিন্দু জন্মে নামটা কী ছিল!’ বললাম, ‘আমার নাম সুপর্ণা মুকুটি, আব্বা!’ ‘মুকুটি টাইটেল?’ ‘জি আব্বা! মানে, মুখোটি।’ ‘ব্রাহ্মণ?’ ‘জি!’ এরপর কলমা পড়িয়ে আমাকে প্রকৃত মুসলমান করা হল। ছোট ছোট কিছু আয়েত শুনিয়ে মুখ দিয়ে বলিয়ে নেওয়া হল। ‘তুমি রোকেয়া।’ ‘জি।’ ‘আমার প্রথম সন্তান।’ ‘জি।’ ‘তোমার পর সুফিয়া। তারপর রতন।’ ‘জি।’ তারপর নতুন গ্রামেই আমার সাত বছর কেটে গেছে। গ্রামের মধ্যেই থাকতাম। কোথাও বাইরে যেতাম না। লালবাগে এক এসআই আর এক এমএলএ-এর কাছে যেতাম স্কুলের সরকারি মঞ্জুরীর ব্যাপারে। তা-ও যেতাম বোরখা পরে। ওই গ্রামে শিক্ষার আলো, আধুনিক শিক্ষার আলো আমিই নিয়ে গেলাম। ওই গ্রামে মাত্র একটি মক্তব ছাড়া কিছুই ছিল না। মনে পড়ে, উচ্চ মাধ্যমিকের মার্কশিট স্কুল থেকে আনবার সময় আব্বাকে সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলাম। তখনও বোরখা পরে গিয়েছিলাম। হেড মাস্টার মশাই এবং স্যারেরা অবাক হয়ে গেছিলেন আমার বোরখা পরা দেখে। এবং আরও আশ্চর্য হয়েছিলেন দ্বীন মহম্মদকে ‘আব্বা’ সম্বোধন করতে দেখে। সরিত্ স্যার আমার খুব কাছে সরে এসে বলেছিলেন, ‘ধর্মত্যাগ করলেই কি সংসার ধর্ষিতাকে আপনার করে নেয় সুপর্ণা?’ ‘আমি আশ্রয় পেয়েছি স্যার। পুনর্বাসন চাইনি। আব্বা বলেছে, দূর দেশে, চাই কি বাংলাদেশে বিয়ে দেবে। কথাটা মনে করে অনিদাকে বলবেন স্যার!’ বলেই অবাক হলাম, এ কথা বললাম কেন সরিত্ স্যারকে! তারপর থেকে কতদিন ভেবেছি, ওই কথাগুলো কি অনুভবের কাছে সরিত্ গাঙ্গুলি স্যার পৌঁছে দিয়েছিলেন কখনও? মার্কশিট নিয়ে ফিরছিলাম। আব্বা হঠাত্ বলেলন, ‘তোমার বাংলাদেশে বিয়ে দিব, এ কথা তো কখনও বলি নাই রোকেয়া।’ ‘দূর দেশে দেব বলেছেন।’ ‘তা বলেছি।’ ‘বাংলাদেশ কাছে থেকেও দূর। তাই না?’ ‘ঠিক আছে।’ ‘না আব্বা ঠিক নেই।’ ‘বটে! অনিদা কে, বলবে আমারে?’ ‘আমার খোদাকেও সে কথা শুনাতে ভয় পাই আব্বা!’ ‘তোমার অনেক কষ্ট মুকুটি। চল।’ এইভাবে এক আশ্চর্য আব্বাকে পেয়েছিলাম আমি। এমন সহানুভূতিপূর্ণ হূদয়সত্তা কোথায় বা দেখেছি আর! একজন সামান্য দর্জি। একজন সামান্য ইমাম। নিতান্ত গরিব। অথচ অত্যন্ত বুদ্ধিমান। আমি যেন তাঁর সত্যিকারের মেয়ে। কী চমত্কার এই জীবন দেখ তো অনিদা। সুফিয়া তখন ক্লাশ এইটে পড়ত। ভাই রতন পড়ত সিক্সে। হ্যাঁ অনিদা, আমি হলাম ওই দুই ভাইবোনের গৃহশিক্ষক। ‘আব্বা এদের আমি মানুষ করব।’ ‘তাই করো।’ মনে হয়েছিল, শিক্ষার আলো ছাড়া এ সমাজে কিছুই হবে না। মক্তবী শিক্ষায় কী হবে! আধুনিক শিক্ষা চাই। প্রাইমারি স্কুল হল। আমিই সে স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা। সে স্কুলের সরকারি মঞ্জুরীও হল। চাকরির প্রথম মাসের মাইনেটা পুরোটা বাবার হাতে দিলাম। আব্বা টাকাটা হাতে নিয়ে সেদিকে একদৃষ্টে চেয়ে থাকতে-থাকতে বললেন, টাকাটা তো রথতলার ভট্টচার্য মশাইয়ের হাতে যাওয়ার কথা! এই টাকা হৈমবতী দেখলে কী বলতেন জানা নাই, ফির এই টাকা অনুভব মুখুজ্জের হাতে যেতে পারত রতনের মা, দেখ-দেখ! খুদার কী তামাশা হে রাসুল!’ এই বলে টাকার গোছা কপালে হালকা ভাবে মারতে থাকেন। আম্মা বললেন, ‘আর কেন ওই সব কথা রতনের আব্বা! যা যেয়েছে, তা যাক।’ আব্বা বললেন, ‘কিছুই যায় নাই গুলু খাতুন। সব তাজা হয়ে বুকের মধ্যে থিকে গেছে গো! চমকাইও না। ই-বার তা হলে বড় বিটির বিহা দিই? কী কহ সুফির আম্মা!’ ‘না-না আব্বা! এই বত্সর সুফিয়া গ্র্যাজুয়েট হবে। গড়াবাসা হাইস্কুলের হেডমাস্টার এ বাড়িতে বিয়ে করতে চাইছে!’ ‘সে লোক তো রোকেয়াকে শাদি বসাইতে চায় বড় খুকি!’ বলে ওঠেন দ্বীন মহম্মদ। মাঝে-মিশেলে রোকেয়াকে দ্বীন স্বাদু গলায় ‘বড় খুকি’ বলে ডেকে ওঠেন। নিতান্ত শখের ডাক। আমি বললাম, ‘গড়াবাসা তো কাছের দিগর আব্বাজান। আমার তো দূর দেশে যাওয়ার কথা। তা ছাড়া সুফিয়ার বিয়েটা নিজে হাতে করাতে চায় আব্বা!’ দ্বীন মহম্মদ বললেন, ‘সে তোমার হবার নয় রোকেয়া! তোমার রূপ আনোখা। তুমি সামনে থাকলে সুফিকে বিহা তো করতে চাইবে না হবু জামাই। সে চাহিবে তোমাকে।’ ‘এরপর ব্যবস্থা হবে আব্বা। সুফিয়াকে যখন জামাই-পক্ষ দেখতে আসবে, আমি আঁঁট করে বোরখা পরে থাকব। দেখবেন আব্বাজান।’ কপালে বারবার সুপর্ণার মাইনের টাকা দিয়ে আলতো আঘাত করতে করতে, যেন ভাগ্যকেই প্রহার করছেন এমনই ভঙ্গি করে প্রায় স্বগোক্তির সুরে দ্বীন বললেন, ‘এই টাকা নিয়ে কী করত হৈমবতী!’ এ বার চমকে উঠে বললাম, ‘আপনি আব্বা এভাবে বলছেন কেন? আপনি মামা-মামিকে কতটুকু জানেন!’ ‘আমি নানান জায়গায় ওয়াজ-নসিহতে, ধর্মের জলসায় যাই। রথতলায় প্রত্যেক সন যেয়েছি। সব খবরই তো কানে এসেছে মা!’ ‘কী খবর আব্বা!’ এবার কপালে টাকার তাড়া ঠেকিয়ে আঘাত না করে থেমে রইলেন দ্বীন মহম্মদ। দু’চোখ বন্ধ করে রইলেন। ‘আব্বা! চুপ করে রইলেন কেন?’ এবার চোখ খুলে খলিফা-ইমাম বিকেলের সূর্যের নরম আলোর দিকে চাইলেন। সাদা-সাদা পায়রার দল ছটফট করে পাখা ঝাপটাচ্ছে হেলে পড়া সূর্যকে ছাড়িয়ে দিগন্তের সীমানায়। দ্বীন মহম্মদ বললেন, ‘তুমি এভাবে নদীর পানিতে ভাইসে এলে মা! বোরখার ভিতরে নিজেকে সেঁধালে। তারপর কী হল! অনুভব পাগল হয়ে কোথায় বার হয়ে গেল, পাঁচ বত্সর কারও কাছে খবরই রইল না। একদিন সে ফিরল। তারপর কী-একটা পড়াশোনা করে বছর তিন হল এই শহরেই লাইব্রেরিতে চাকরি করে। মাথার গোলমাল এখনও যায় নাই। তুমি তারই আমানত রোকেয়া। আমার কেউ না। তুমি কারে ফুল দাও, আমি তো জানি আম্মা!’ লেখকের কথা সরিত্ গাঙ্গুলি সব কথাই বলেছিলেন। স্যার সরিত্ গাঙ্গুলি। বলেছিলেন, যাকে বলার তাকেই। অর্থাত্ সুপর্ণার অনিদাকেই বলেছিলেন, সুপর্ণা বেঁচে আছে এবং সে ধর্মত্যাগ করেছে। এ জন্মে তাকে পাওয়ার আর উপায় নাই। সরিত্ স্যার সত্য বলেছিলেন জ্ঞানত এবং তাঁর জগত্ সম্বন্ধে যা বিশ্বাস ও ধারণা, সেই মোতাবেক। যেই কথাটা তাঁর মুখে উচ্চারিত হল, এ জন্মে তাকে অর্থাত্ সুপর্ণাকে পাওয়ার আর উপায় নাই, তত্ক্ষণাত্ অনুভবের মাথাটা কেমন করে উঠল। ওই ধাক্কাটা তার স্নায়ু সইতে পারল না। সে বলল, ‘উপায় নাই স্যার?’ সরিত্ মাথা নেড়ে বললেন, ‘নাই।’ তারপর পাগলের মতো রাস্তায় নেমে গেল অনুভব। দিদি লাবণ্য চক্রবর্তী পাগলেরই মতো ভাই অনুভবকে খুঁজে বেড়িয়েছেন নানান জায়গায়। কোথাও অনুভবের হদিশ মেলেনি। বছর পাঁচ বাদে দূর পৃথিবীর পার থেকে আপনা থেকেই দিদির উঠোনে ডালিমতলায় এক জ্যোত্স্না প্লাবিত রাত্রিতে ফিরে এসেছিল অনুভব মুখোপাধ্যায়। তার ওইভাবে চলে যাওয়া এবং ফিরে আসা যে মনের তাড়নায় ঘটেছিল, তা একটি পাগলেই মন সন্দেহ নেই, কিন্তু সেই মনের নিরুদ্দেশ গতি নির্ণয় করা কঠিন, আমরা সে কথায় যাব না। আমরা দেখব, আধা-পাগল একজন মানুষ কীভাবে এই সংসারে টিকে রইল এবং জগত্ সংসার থেকে এক প্রকার বিচ্ছিন্ন হয়ে রইল; সে থেকেও নেই, আবার না থেকেও আস্ত অস্তিত্ববান রয়েছে। সে নিকট অতীতকে কিছু কিছু ভুলে যেতে থাকে। যেমন সরিত্ স্যার বলেছিলেন... কী বলেছিলেন? কী যেন বলেছিলেন... মনে পড়ছে না। অথচ মনে পড়াটা নিতান্ত জরুরি। এরকম হলে বড্ড কষ্ট হয় দিদি। কষ্ট হলে দিদিকেই ডাকে অনুভব। দিদির ফোটোর সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। দিদির পাশের ছবির দিকে তাকিয়ে থেকে অনুভব বলে, ‘তোমার নামটা, যা সরিত্ স্যার বলেছিলেন, কী নাম সেটা? বল, কী সেই নাম?’ সেই নাম কিছুতেই আর মনে পড়ে না। অথচ অনুভবের মনে হয়, এ নাম তো তার নিতান্ত চেনা। এমন কেন হল! এই নামটাকে তা হলে কি সে মোটেও মনে রাখতে চায়নি? কেন মনে রাখতে চাইলো না! হ্য ঈশ্বর! কেন আমি ওই সুন্দর নামটা মনে রাখতে চাইলাম না? ভাবতে ভাবতে আশ্চর্য চঞ্চল হয়ে ওঠে অনুভব। তার নিজেকে, তারপর অসম্ভব পাগল-পাগল লাগে। কী করলে তার সেই নামটা মনে পড়বে? নিজেকেই অতঃপর ধন্যবাদ দেয় অনুভব। বলে, ‘ভালই করেছ এই রকম লাইব্রেরি সায়েন্স পড়ে চাকরিটা জোগাড় করতে পেরে। আশ্চর্য নির্জনতার চাকরি। কাজ প্রায় নেই বললেই চলে। অথচ চাকরি আছে। আগে শুনেছি, পাঠক ছিল, গ্রন্থাগার গমগম করতো। কিন্তু কোথায় কী? সব ফাঁকা। অবশ্য আমার মতো পাগলের পক্ষে এ চাকরি আর্শীবাদ।’ বলা মাত্র কাচের ভেতর দিয়ে চোখে পড়ে একটি বই। কেন যেন অনুভবের মনে হয়েছিল, এই গ্রন্থাগার তাকে ওই বিস্মৃত নাম ফিরিয়ে দেবে স্মৃতিতে। দিলও তাই। কাচ ঠেলে বই সে বার করে নেয়। বইটি, বেগম রোকেয়া রচনা-সংগ্রহ। মনের আকাশজুড়ে খেলে যায় বিস্ময়-বস্ফািরিত-বিদ্যুত্। তারপর এক অতি-প্রত্যুষে চলমান বোরখার পিছন থেকে আধা-পাগল অনিদা আবেগঘন গলায় তার সুপর্ণাকে ডেকে ওঠে, ‘রোকেয়া! বেগম রোকেয়া!’ এই প্রত্যুষে আকাশে জুড়ে মেঘ জমে। আশ্চর্য মাতাল হাওয়া বইতে থাকে। তারপর বৃষ্টি নামে। বহরমপুরের সুবৃহত্ স্কোয়ার ফিল্ডের চারপাশের বৃহত্ গাছপালায় চলে বিষাদ হাওয়ার পাগলামি। মাঠের মাঝখানে বসে পড়ে তুমুল বৃষ্টিতে ভিজে চলেছে সুপর্ণা মুকুটি। তারপর রোকেয়া উঠে দাঁড়ায়। ভিজতে ভিজতে বোরখা খুলে ফেলে। বোরখা ঘাসে পড়ে থেকে ভিজতে থাকে। বোরখার ভেতর থেকে বার হয়ে আসে সুপর্ণা মুকুটি। সে ধীরে ধীরে সিধে চলে আসে তার অনিদার কাছে। দু’হাতে বুকে টেনে নেয় অনুভবকে। বৃষ্টিতে ভিজতেই থাকে স্খলিত বোরখা। সুপর্ণার আর একবার ধর্মান্তর শুরু হয়। 