শুধু মুদ্রানীতিই যথেষ্ট নহে, স্বস্তিকর পরিবেশও দরকার

আপডেট : ২৭ জুলাই ২০১৪, ২১:৩৭
বিনিয়োগ বাড়াইবার লক্ষ্য নিয়া নূতন মুদ্রানীতি ঘোষণা করিয়াছে বাংলাদেশ ব্যাংক। জুলাই-ডিসেম্বর সময়কালে অর্থনীতির গতিপ্রবাহ ঠিক রাখিতে মুদ্রা সরবরাহ কী হারে বাড়ানো হইবে, তাহার প্রক্ষেপণই হইতেছে মুদ্রানীতি। ইহার অন্যতম লক্ষ্য হইতেছে মূল্যস্ফীতি রোধ করা এবং সরকারের দৈনন্দিন ব্যয় মিটাইবার জন্য ব্যাংক ব্যবস্থা হইতে যে পরিমাণে ঋণ নিতে হইবে, তাহার আগাম ধারণা লওয়া। পরবর্তী ছয় মাসে অভ্যন্তরীণ ঋণ, মুদ্রা সরবরাহ, অভ্যন্তরীণ সম্পদ, বৈদেশিক সম্পদ কতটুকু বাড়িবে বা কমিবে তাহার একটি পরিকল্পনা তুলিয়া ধরাই হইতেছে মুদ্রানীতির কাজ। অনেকেই হয়তো বলিবেন, মুদ্রানীতির মাধ্যমে দেশে বিনিয়োগ বান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি তথা মুদ্রা সরবরাহ বাড়াইয়া উত্পাদন বাড়াইতে এই নীতি সহায়ক হইবে। আদতে ইতোপূর্বেকার মুদ্রানীতি তাহা প্রমাণ করে নাই। এইবারেও আগামী ছয় মাসের জন্য যে মুদ্রানীতি ঘোষিত হইতেছে তাহা মূলত মূল্যস্ফীতির হার কমাইবার পদক্ষেপ ছাড়া আর কিছুই নহে। ইহা করা হইবে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ কমাইবার মাধ্যমে। এইবারে একইভাবে মূল্যস্ফীতি কম হইবার বিষয়টি বড় করিয়া দেখানো হইতেছে। আসলে ঋণের যোগান কম এবং খাদ্য বহির্ভূত পণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণে থাকিবার কারণেই মূল্যস্ফীতির হার কমিয়াছে। অন্য কোন কারণে নহে। নূতন মুদ্রা নীতিতে গত ছয়মাসের তুলনায় আগামী ছয় মাসের জন্য সাড়ে ১৬ শতাংশ ঋণ যোগাইবার কথা বলা হইয়াছে। ইহার মধ্যে আবার বিদেশী ঋণও অন্তর্ভুক্ত করা হইয়াছে। গত ছয় মাসের মুদ্রানীতিতেও সাড়ে ১৬ শতাংশ ঋণ বেসরকারি খাতে দেওয়ার জন্য প্রক্ষেপণ করা হইয়াছিল। বাস্তবে তাহা সম্ভব হয় নাই। মে পর্যন্ত ১১ দশমিক ৪ শতাংশ ঋণ যোগানো হইয়াছিল। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ বাড়াইলে মূল্যস্ফীতি বাড়িয়া যাইবে, সেই কারণেই ঋণ প্রবাহ সংকুচিত করিবার উদ্যোগ লওয়া হইয়াছিল। গত শনিবার নূতন মুদ্রানীতি ঘোষিত হইবার কালে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান বলিয়াছেন, এইবারের মুদ্রানীতিতে বড় ধরনের সারপ্রাইজ থাকিতেছে না। মুদ্রানীতির ভঙ্গিটিও হইবে বিগত ষান্মাসিকের মুদ্রানীতির মতোই সতর্ক ও বিনিয়োগ-বান্ধব। তিনি আরো বলিয়াছেন, রফতানিমুখী খাতসহ উত্পাদনমুখী সকল কর্মকান্ডে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও পরিবেশবান্ধব অর্থায়ন খাতে পর্যাপ্ত মাত্রায় যোগান সহায়তা দিয়া প্রবৃদ্ধিকে জোরালো ও গতিশীল করা হইবে। তিনি বলিতে চাহিয়াছেন যে, নূতন মুদ্রানীতি বাস্তবায়িত হইবার মাধ্যমে প্রবৃদ্ধির হারও বাড়িবে। এই কথা ঠিক যে, উত্পাদনমুখী খাতে ঋণ যোগান দিতে পারিলে দেশে বিনিয়োগ বাড়িবে। বিনিয়োগ বাড়িলে কর্মসংস্থান হইবে এবং জাতীয় উত্পাদন বাড়িবে। যাহা আমাদের অর্থনীতির জন্য খুবই প্রয়োজন। কিন্তু প্রশ্ন হইতেছে যে, বাস্তবে ঋণ যোগান কতোটা সম্ভবপর হইবে। ব্যাংকিং খাত হইতে প্রকৃত উদ্যোক্তাদের ঋণ পাওয়া ততটা সহজ নহে। যতটা মুখে বলা যায়। তদুপরি, শুধুমাত্র ঋণ যোগান দিলেই তো হইবে না, উচ্চ সুদের হার লইয়া ঋণ বিনিয়োগযোগ্য করা এবং তাহা উত্পাদনশীলতার মাধ্যমে প্রবৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা রাখা একেবারেই সহজ কাজ নহে। আরো কিছু কারণও রহিয়াছে যাহা সরাসরি নীতির সহিত সম্পৃক্ত নহে। যেমন, রাজনৈতিক পরিস্থিতি যদি স্থিতিশীল না থাকে, তাহা হইলে অর্থনীতির গতিপথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হইবে। এইরূপ নানা ফ্যাক্টরও রহিয়াছে যাহা বিবেচনায় লইতে হইবে। এই কথা সর্বাগ্রে সত্যি যে, বিনিয়োগের জন্য একটা স্বস্তিকর পরিবেশ দরকার। সর্বত্রই একটা স্বস্তিকর পরিবেশ তৈরী হইলে বিনিয়োগ বাড়িবে, দেশ উন্নত হইবে এবং কর্মসংস্থানও বাড়িবে। এই স্বস্তিকর পরিবেশ সৃষ্টির উদ্যোগও লইতে হইবে। নতুবা শুধু মুদ্রানীতি দিয়া বিনিয়োগ বাড়িবে না। আর বিগত মুদ্রানীতিই তাহা প্রমাণ করে। আমরা দেখিয়াছি যে, সমপ্রতি বিনিয়োগ নিবন্ধনের পরিমাণও কমিয়া গিয়াছে। ইহার মানে হইতেছে যে, বিনিয়োগকারীরা এখনো আস্থাশীল হইতে পারেন নাই। তাহাদের মাঝে আস্থা যোগাইবার কাজটিও করিতে হইবে। নূতন মুদ্রানীতিতে শেয়ার বাজারে বিনিয়োগের কথাও আসিয়াছে। বলা হইয়াছে, এইবারের মুদ্রানীতিতে এমন কোন নীতি গ্রহণ করা হয় নাই যাহার মাধ্যমে পুঁজিবাজার ক্ষতিগ্রস্ত হইতে পারে। ইহা ছাড়া শেয়ারবাজারে ব্যাংকের অতিরিক্ত বিনিয়োগ নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই সমন্বয় করিতে বলা হইয়াছে। কিন্তু বাজারের ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের জন্য ৯০০ কোটি টাকার পুন:অর্থায়ন তহবিলের অর্থ ছাড়ের বিষয়টি এখনো অস্পষ্টই রহিয়া গিয়াছে। কাজেই মুদ্রানীতি শুধু ঘোষণা করিলেই চলিবে না, ইহার সঙ্গে সংযুক্ত অন্যান্য ইস্যুগুলিও সঠিক ভাবে তুলিয়া ধরিতে হইবে।