শুল্ক ফাঁকি নিয়ে ক্ষুব্ধ রাজস্ব বোর্ড

আপডেট : ৩১ জুলাই ২০১৪, ২১:৩৬
বন্দরগুলোতে একের পর এক বড় ধরনের শুল্ক ফাঁকির ঘটনায় নড়েচড়ে বসেছে রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। সমপ্রতি বেশকিছু বড় শুল্ক ফাঁকির ঘটনায় চট্টগ্রামসহ অন্যান্য বন্দরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছে এনবিআরের শীর্ষ পর্যায় থেকে। আমদানিকৃত পণ্য চালান কাস্টমসের আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই বন্দরের বাইরে চলে যাওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এসেছে এনবিআরে। অন্যদিকে বন্ডের সুবিধায় দেদারসে পণ্য ও কাঁচামাল আনার সুযোগ করে দিচ্ছেন কর্মকর্তারা। আবার কারণ ছাড়াই এক বন্দরের পণ্য অন্য বন্দরে চালান হয়ে যাচ্ছে। বন্দর থেকে খালাস হওয়া অন্তত ৩০ শতাংশ আমদানিকৃত পণ্য মিথ্যা ঘোষণায় আনা। এমন বেশকিছু সুনির্দিষ্ট অভিযোগ সমপ্রতি এনবিআরের শীর্ষ পর্যায়ে এসেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে সমপ্রতি চট্টগ্রাম, ঢাকা, কমলাপুর আইসিডি, বেনাপোল, মংলা, পানগাঁওসহ সব কাস্টম হাউজের কমিশনারকে অভিযোগের বিষয়ে এনবিআর থেকে একটি চিঠি পাঠানো হয়েছে। চিঠি পাঠানো হয়েছে ঢাকা ও চট্টগ্রামের বন্ড কমিশনার, শুল্ক গোয়েন্দার মহাপরিচালক এবং সব ভ্যাট কমিশনারের কাছেও। ‘অতি জরুরি’ ওই চিঠিতে পণ্য পরীক্ষায় কর্মকর্তাদের অবহেলা, অদক্ষতা এমনকি শুল্ক ফাঁকিতে যোগসাজশের অভিযোগ পাওয়া গেছে বলে জানানো হয়। অভিযোগের বিষয়ে কর্মকর্তাদের কাছ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। ওই চিঠিতে রাজস্বের জন্য ক্ষতিকর কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করে তাদের বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে কোন ধরনের গাফিলতি হলে কমিশনারদের দায় নিতে হবে বলে হুঁশিয়ার করা হয়েছে। সদ্য সমাপ্ত ২০১৪-১৫ অর্থবছরে শুল্ক খাত থেকে কাঙ্খিত পরিমাণে রাজস্ব আদায় করতে পারেনি সরকার। গত বছরে রাজনৈতিক কারণ ছাড়াও এ জন্য বড় আকারের শুল্ক ফাঁকিকে দায়ী করা হচ্ছে। বড় আকারের শুল্ক ফাঁকির অভিযোগ হরহামেশাই এনবিআরে আসছে। চট্টগ্রামসহ দেশের অন্যান্য বন্দরে কর্মকর্তাদের যোগসাজশে শুল্ক ফাঁকির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। নানামুখী উদ্যোগ নেয়া হলেও ফাঁকি কার্যত কমানো যায় নি। চট্টগ্রাম বন্দরের শুল্ক ফাঁকি ও কর্মকর্তাদের অবৈধ লেনদেন নিয়ে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) একটি গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। গত ১৪ জুলাই প্রকাশিত ওই গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজে প্রতিদিন গড়ে অর্ধকোটি টাকার অবৈধ লেনদেন হয়। এর বাইরে চট্টগ্রাম বন্দরে অবৈধ লেনদেনের পরিমাণ ১৭ লাখ টাকা। সেই হিসেবে কেবল চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজ ও বন্দরেই বছরে অবৈধ লেনদেনের পরিমাণ সোয়া দুইশ’ কোটি টাকা। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বন্দরে অবৈধ লেনদেনের মাধ্যমে প্রতিবছর শুল্ক ফাঁকি হয় কয়েক হাজার কোটি টাকা। দেশের আমদানির প্রধান দ্বার হচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দর। এনবিআরের হিসাব অনুযায়ী, দেশের ৮৭ শতাংশ আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম হয় চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে। আর চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজের মাধ্যমে মোট আমদানি ৫৩ শতাংশ এবং রপ্তানির ৪৫ শতাংশ সম্পাদন হয়ে থাকে। কেবল ২০১২-১৩ অর্থবছরে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজ থেকে সাড়ে ২৩ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায় হয়েছে। টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজ অটোমেশন করা হলেও প্রকৃত উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন হয়নি। শুল্কায়নে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা চালু করার পরও দুর্নীতির এই মাত্রায় অবাক হয়েছি। তিনি বলেন, শুল্ক কার্যক্রম পুরোপুরি অটোমেশন করা গেলে সেবা প্রদানকারী ও গ্রহীতার মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ থাকবে না। তখন দুর্নীতির মাত্রা কমে আসবে। তবে তিনি বলেন, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা চালু হওয়ার পরও শুল্কায়ন প্রক্রিয়ায় মাত্রাতিরিক্ত ধাপ রেখে দেয়ার উদ্দেশ্য হচ্ছে দুর্নীতিকে জিইয়ে রাখা। টিআইবি’র প্রতিবেদন প্রকাশের একদিন পরই কমিশনারদের কাছে এনবিআর চিঠি পাঠাল। এনবিআর সদস্য ফরিদ উদ্দিন স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে বলা হয়, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন বন্দরে আমদানিকৃত মালামাল শুল্কায়ন ছাড়া খালাস এবং বন্ড সুবিধার অধীনে মাত্রাতিরিক্ত আমদানি স্বত্ব দেয়ার অভিযোগ আছে। এসব কারনে সরকার বিপুল পরিমাণ ন্যায়সঙ্গত রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বেশকিছু অভিযোগের বিস্তারিত তুলে ধরে চিঠিতে বলা হয়, কাস্টমসের কিছু কর্মকর্তা এবং আমদানিকারকদের যোগসাজশে শুল্কায়ন ছাড়াই পণ্য গোপনে বন্দর থেকে পাচার করা হয়। এসব অভিযোগ এর আগেও এসেছে। বন্দরে আমদানিকৃত পণ্য চালানের সঙ্গে শুল্কায়িত ও খালাসকৃত চালানের সংখ্যা মিলিয়ে দেখতে বারবার নির্দেশ দেয়ার পরও কোন কমিশনার বা মহাপরিচালক তা করেননি। বন্দর থেকে খালাস হওয়া পণ্য চালানের অন্তত ৩০ শতাংশ পণ্যই মিথ্যা ঘোষণায় আমদানি হওয়া। এসব পণ্য মূলত বাণিজ্যিক ও বন্ড সুবিধায় আনা পণ্য ও কাঁচামাল। মূলত বন্ড লাইসেন্সের ইউপিতে (ইউটিলিটি পারমিশন) অসত্য তথ্য ও মিথ্যা রপ্তানি ঋণপত্রের (এলসি) মাধ্যমে এ ফাঁকি দেয়া হয়। এছাড়া পণ্যের এইচএস কোড (পরিচিতি কোড), শুল্ক মূল্য ও পরিমাণের মাধ্যমে মিথ্যা ঘোষণা দেয়া হয়ে থাকে। গার্মেন্টসসহ অন্যান্য খাতের জন্য বন্ড সুবিধায় আনা পণ্যের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি শুল্ক ফাঁকির অভিযোগ। চিঠিতে প্লাস্টিক খাতে বন্ড সুবিধায় পণ্যের আমদানি স্বত্ব দেয়ার ক্ষেত্রে বড় রকমের অনিয়মের কথা উল্লেখ করা হয়। অথচ দেশের রপ্তানিমুখী প্লাস্টিক শিল্পের জন্য এই পরিমাণ পণ্য বা কাঁচামালের প্রয়োজন হয় না। প্রসঙ্গত, সদ্য সমাপ্ত ২০১৩-১৪ অর্থবছরে বন্ড সুবিধার আওতায় ২ লাখ মেট্রিকটন প্লাস্টিক পণ্যের উপকরণ আমদানি করা হয়েছে। এর আগের অর্থবছরে আমদানি করা হয়েছে ১ লাখ ৬৬ হাজার মেট্রিক টন। চলতি ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ১ লাখ ৪৯ হাজার ৭২০ কোটি টাকার রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে আমদানি শুল্ক থেকে আদায় হবে ৩৬ হাজার ৬৪০ কোটি টাকা।