ক’টা মাস ভালোয় ভালোয়ই কাটলো। কিন্তু এখন ভয় হচ্ছে; ভীষণ ভয়! ‘ঈদের পর সরকার পতন আন্দোলন’ খালেদা জিয়ার এমন বক্তব্য এবং বিরোধী দলের তা প্রতিহত করার ঘোষণায় আমরা দেশবাসী ভীষণ ভয় পাচ্ছি। আবহাওয়াটা ফের গোমট ঠেকছে। রাজনীতির আকাশে আবারও কালো মেঘ দেখে এমন ভয় হচ্ছে। বোধ করি আলোর দেখা মিলবে না। যুদ্ধ আরও হবে। আবারও অশান্তির দাবানলের ভয়; পেট্রোল বোমে জ্যান্ত মানুষ পুড়ে মরার ভয়; পুলিশের গুলিতে জীবন যাওয়ার ভয়; শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন নাসের ভয়; মিথ্যা মামলা হামলার ভয়; জীবন-জীবিকা অনিশ্চিত হওয়ার ভয়; সম্পদ নষ্টের ভয়; সর্বোপরি ব্যবসা-বাণিজ্য ধ্বংসে ভয় আমাদের বেশ পেয়ে বসেছে। এর আগে ‘সহসাই আন্দোলন নয় : দল গোছাবে বিএনপি’ এমন সংবাদে জনজীবনে স্বস্তি ফিরে আসে। বিএনপিসহ সমমনা দলগুলো সদ্যসমাপ্ত উপজেলা নির্বাচনে অংশ নেয়ার পর শংকা আরও কেটে যায়। একেবারেই আন্দোলন মুক্ত থাকবে দেশ তা কিন্তু ভাবিনি। তবে ক’টা মাস যে শান্তি পাওয়া যাবে, শান্ত থাকবে দেশ, এমনটাই ভাবছিলাম আমরা। ভেবেছিলাম অন্তত কিছুটা সময় ভালোয় ভালোয় কেটে যাবে। কিন্তু বেগম জিয়ার বক্তব্য এবং সরকার দলের পাল্টা হুঙ্কারের পর ভাবনা যেন গুড়ে বালি। হাল সময়ে তাদের বক্তব্যে বোঝা যাচ্ছে সেই যুদ্ধ আবারও শুরু হবে। যুদ্ধ যুদ্ধ খেলায় আবার বদ হবে দেশের আমজনতা।
এর আগে রাজনৈতিক আন্দোলনের নামে আমরা প্রতিদিন কী দেখেছি? দেশজুড়ে নৈরাজ্য দেখেছি। সে কথা এখনো ভুলে যাইনি আমরা। হতভাগ্য বাবার চোখের সামনে গুলিবিদ্ধ কিংবা পেট্রোল বোমায় ঝলসে যাওয়া ছেলের চিত্কার শুনেছি। সম্পদ হারিয়ে পথে বসতে দেখেছি অনেককে। এরা তো সবাই রাষ্ট্রেরই সুনাগরিক ছিলো? এদের তো বাঁচার আর সম্পদ রক্ষার অধিকার আছে। এসব রক্ষায় সরকারেরও দায় ছিলো। কিন্তু ঐসব দানবদের হাত থেকে কেউই আমাদের রক্ষা করতে পারেনি। প্রতিনিয়ত চোখের সামনেই এসব ধ্বংসযজ্ঞ দেখেছি। কিছুই করতে পারিনি আমরা।
যারা হরতাল আহ্বান করে রাষ্ট্রীয় সম্পদ বিনষ্ট করছে আর পৈশাচিকভাবে নিরীহ মানুষকে হত্যা করছে এসব ঘটনার দায় তো তাদের ওপরই বর্তায়। এ সহিংসতা তো মানুষকে আতঙ্কিত করার জন্য। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাত বেশ লম্বা, তাই চেষ্টা করলে তারা এসব প্রতিহত করতে পারে অনায়াসে। আমরা আর হরতাল অবরোধের নামে নৈরাজ্য চাই না। এ কথাও সত্য যে বিরোধী দলের আন্দোলন করার অধিকার আছে। তারা বঞ্চিত হলে; তাদের প্রতি অবিচার করা হলে; গণতন্ত্র নস্যাত্ হলে, জুলুম হলে, তারা তো আর ঘরে বসে থাকবে না? তাদের প্রতিবাদ প্রতিরোধ করতেই হবে। তবে এটা অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে, সে প্রতিবাদ যেন কখনই জনগণের বিরুদ্ধে না হয়। দেশের মানুষের সম্পদ নষ্ট করে, মানুষ হত্যা করে হরতাল অবরোধ কোনটাই করা যাবে না। এটা যৌক্তিকও নয়? আমরা এ জাতীয় প্রতিবাদ আর চাই না।
কিছুতেই জানমাল নষ্ট করে আন্দোলন করা যাবে না। দেশের মানুষ সে আন্দোলনকে ঘৃণা ভরে প্রত্যাখ্যান করবে। তবে কথা হলো বিরোধী দল কেন হরতাল অবরোধ করতে চায়? পুনরায় অবাধ ও নিরপেক্ষা নির্বাচন এবং গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠাই তাদের মূল দাবি। এজন্য আশু সংলাপ দরকার। আমাদের বিরোধী দলগুলোর যেমন ধ্বংসাত্মক কর্মসূচি পরিহার করা উচিত তেমনই সরকারেরও উচিত কেন বিরোধীরা আন্দোলনে যাচ্ছে তার কারণ বের করা। সেসঙ্গে তার সমাধান করা।
কিন্তু বিএনপির কাছে মানুষ চায় দায়িত্বশীল আচরণ। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর আন্দোলন স্থগিত করে বিএনপি সেই আচরণ দেখিয়েছেও। এবারও দেখাবে আসা রাখি। তারা হরতালের নামে দেশজুড়ে নৈরাজ্য সৃষ্টি করবে না, জ্বালাও-পোড়াও করবে না, সম্পদ নষ্ট করবে না এটাই দেশবাসীর চাওয়া। আন্দোলনের নামে দেশের জনগণের জানমাল নষ্টের কারো অধিকার নেই। তবে সরকারি দলের নেতারা বলছেন, বিএনপির সঙ্গে কোনো সংলাপে তারা আর বসবে না। এমনটি হলে দেশের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কাটবে কী করে? আর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় দেশ কোথায় যাবে? দেশ চলবে কী করে? এ অবস্থায় বিএনপিকে আন্দোলনের দিকে ঠেলে দেয়া সরকারের কোনোভাবেই উচিত হবে না। আমরা সরকারের কাছে দায়িত্বশীল আচরণ প্রত্যাশা করি। বিএনপির সঙ্গে সংলাপে বসব না- এ ধরনের উক্তি মোটেও দায়িত্বশীল আচরণ নয়। সংলাপ শুরু করতে হবে এখনই। এজন্য নিয়ামকের ভূমিকা পালন করতে হবে সরকারকেই। সরকারকে বুঝতে হবে, দেশের জনগণসহ বিদেশিরাও সংলাপ চায়। সরকার এটি উপেক্ষা করতে পারে না।
এ অবস্থায় বিরোধী দলের আবারও আন্দোলনের ঘোষণায় ভয়তো হবেই। অর্থনীতিবিদদের আশংকা, আবারও দীর্ঘস্থায়ী সহিংসতা হলে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির কাঠামো একেবারে দুর্বল হয়ে পড়বে। তখন দেশ আর মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে না। এর আগের হরতাল অবরোধে দেশের শিল্প, বাণিজ্য, কৃষি, ব্যবসা প্রভৃতি প্রতিটি খাতই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তখন কারণে-অকারণে নির্বিচারে কলকারখানা, বিদ্যুত্ কেন্দ্র ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে হামলা চালানো হয়েছে। আবারও দেশে এ জাতীয় নৈরাজ্যে মূলধনী, মধ্যবর্তী ও কাঁচামাল আমদানি করতে ব্যর্থ হয়ে অনেক শিল্পকারখানা অচল হয়ে পড়বে। উত্পাদন দারুণভাবে ব্যাহত হবে। দেশে রফতানি কমে যাবে। এ অবস্থায় আমরা আশা করব যে, রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টদের শুভবুদ্ধির উদয় হবে। দেশের অর্থনীতিতে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে, এমন কাজ থেকে আমাদের রাজনৈতিকগণ বিরত থাকবেন এটা দেশবাসীর দাবি। দেশকে নৈরাজ্যকর অবস্থা থেকে যেকোন মূল্যে বের হতে হবে। দেশের বিকাশমান অর্থনীতিকে বাঁচাতে এজন্য সম্মিলিত রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন। প্রয়োজন সমঝোতার রাজনীতির।
[ লেখক: সাংবাদিক]
