ইকোসিস্টেমের (প্রতিবেশ) পরিবর্তনের কারণে সমতল ভূমি বনের বন্যপ্রাণী অবলুপ্ত হচ্ছে। দেশের তৃতীয় বৃহত্তম এই বন বৃহত্তর ঢাকার সাভার, গাজীপুর সদর, কাপাসিয়া, শ্রীপুর কালিয়াকৈর, কালীগঞ্জ, বৃহত্তর ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা, ভালুকা, ফুলবাড়িয়া, টাঙ্গাইলের মধুপুর, ঘাটাইল, জামালপুর, শেরপুর ও নেত্রকোনার সীমান্তবর্তী এলাকাসমূহ, রংপুরের মিঠাপুকুর, দিনাজপুর সদর, বিরামপুর ও হাকিমপুর, রাজশাহীর বরেন্দ্র এলাকা, কুমিল্লার লালমাই, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কসবা ও আশুগঞ্জ জেলা ও উপজেলাসমূহে অবস্থিত। বনের আয়তন সোয়া লাখ হেক্টর।
শতাব্দীকাল পূর্বে বনে হরহামেশাই হাতি, হরিণ, চিতাবাঘ, নেকড়ে, বানর, হনুমান, বনবিড়াল, মেছো বিড়াল, খেকশিয়াল, খাটাস, ভোদর, বেজী, বন মহিষ, সাম্বার হরিণ, মায়া হরিণ, বন্য শূকর, কাঠ বিড়ালি, সজারু, বন মোরগ, কালো তিতির, হরিয়াল, তিলা ঘুঘু, গোলাপী ঘুঘু, রাম ঘুঘু, পার ঘুঘু, ওয়াজ ঘুঘু, টিয়া, কুল ময়না, বক, হাড়গিলা, অজগর, সোনাগুই, গোখরা, দারাজ, কালনাগ, কচ্ছপ, প্রভৃতি বন্যপ্রাণী ও সরীসৃপকে অভয়ে বিচরণ করতে দেখা যেত। ক্রমান্বয়ে মানুষের আবাসস্থল সৃষ্টি, চোরাচালান ও বেআইনী শিকার, কীটনাশক প্রয়োগ এবং বিদেশি আগ্রাসী প্রজাতির বৃক্ষ রোপণের কারণে ইকোসিস্টেমের ভারসাম্যে পরিবর্তন ঘটায় উপরোক্ত প্রাণীদের মধ্যে অনেকগুলো বিলুপ্ত হয়ে গেছে। অবশিষ্ট টিকে থাকা বন্য প্রাণীও অবলুপ্তির পথে। মধুপুর ও মুক্তাগাছার রসুলপুর জঙ্গলে এককালে বন্য হাতি শঙ্কার কারণ ছিল। এরা আজ অবলুপ্ত। স্থান সংকুলানের প্রয়োজনে মানুষ বন কেটে আবাসভূমি সৃষ্টি ও দেশীয় বড় বড় পুরাতন গাছ কেটে ফেলায় বন্য প্রাণীর বাসস্থানের অভাব, প্রজনন, আহার ও বিশ্রাম ব্যাহত হচ্ছে। মানুষ শখ ও লোভ চরিতার্থ করার জন্য অনেক দুর্বল প্রজননক্ষম প্রজাতির প্রাণীসমূহকে বন থেকে ধরে এনে আপনগৃহে পোষ মানায়। বনে অবৈধ অনুপ্রবেশের মাধ্যমে মানুষ বন্যপ্রাণী হত্যা করে। ফসল রক্ষার্থে প্রয়োগকৃত কীটনাশকের প্রভাবে মৃত কীট-পতঙ্গ খেয়ে মারা যায় অথবা প্রজননের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে অনেক প্রাণী । অভিজ্ঞমহল জানান, বিদেশি রাবার (হেবিয়া) গাছ খেয়ে পশু-পাখির মৃত্যুর শিকার হচ্ছে। পাশাপাশি বনের আকাশমনি, ইউক্যালিপটাস, পাইন এসব বিদেশি প্রজাতির গাছ বন্যপ্রাণীর খাদ্য ও আবাসস্থল হিসেবে উপযোগী নয় ।
জানা যায়, ১৯৬১ সালে গঠিত বন্যপ্রাণী তহবিল সমতল ভূমি বনের অবলুপ্ত প্রাণীদের রক্ষার্থে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়নি বলেও অনেকাংশে বর্তমান অবস্থার জন্য দায়ী। বাংলাদেশ সরকার ১৯৭৩ সালে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে বিভিন্ন উপায় উদ্ভাবন করে। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের আইন, শিক্ষাদান, নির্ধারিত বনাঞ্চল সৃষ্টি, উদ্যান প্রতিষ্ঠা, শিকার সংরক্ষিত এলাকা সৃষ্টি, বন্যপ্রাণীর নিবাস এবং বিনোদন পার্ক স্থাপন । সমতল ভূমির বন, সুন্দর বন এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে ২৬১ দশমিক ৮৯ বর্গমাইল অঞ্চল বন্য প্রাণীর নিবাস হিসেবে নির্ধারিত হয় । ১৯৬২ সালে মধুপুরে ও ১৯৭৪ সালে সালনায় ৩৩ হাজার ২৪১ একরে দুটি ন্যাশনাল পার্ক গড়ে তোলা হয়। মধুপুরের লঘুরিয়ায় ১ বর্গমাইলের চিড়িয়াখানা সৃষ্টি করা হলেও অর্থাভাবে তা বন্ধ হয়ে যায়।
একজন উদ্ভিদ বিশেষজ্ঞ জানান, ফুলে পরাগ রেণুর উপস্থাপন এবং বীজ ও ফল এক স্থান থেকে অন্য স্থানে স্থানান্তরিত হয়ে উদ্ভিদকুল তার বংশ বৃদ্ধি করে থাকে। বিশেষ উদ্ভিদের পরাগায়ন একটি বিশেষ প্রাণী দ্বারা সম্পন্ন হয় । অপরপক্ষে নির্দিষ্ট ধরনের ফল ও বীজ ভক্ষণ করে একটি প্রাণী বেঁচে থাকে। আবার ঐ সকল বীজ মলত্যাগের ফলে মাটিতে অঙ্কুরোদগমের মাধ্যমে দূরবর্তী স্থানে গাছ সৃষ্টি হয়। নির্বিচারে বণ্যপ্রাণী হত্যার কারণে পরাগায়ন অথবা বীজ বিসরনে নির্ভরশীল সকল উদ্ভিদের বংশ বৃদ্ধি করা সম্ভব হয় না। ময়মনসিংহ বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মঈনউদ্দিন জানান, অর্থনৈতিক, পরাগায়ন ও বীজ বিসরণ, খাদ্য, শিক্ষা, বৈজ্ঞানিক কারণ ছাড়াও চিত্তবিনোদনের ক্ষেত্রে বণ্যপ্রাণী বিশেষ ভূমিকা পালন করে। তাই এদের সংরক্ষণ একান্ত প্রয়োজন।
