খুলে যায় বেহেস্তের দরোজা

আপডেট : ৩০ মে ২০১৯, ২২:১৫

রাত প্রায় দশটা গাড়ি চালিয়ে বাড়ি ফিরছি। জানালা খোলা। নিয়নবাতির হাইজ্যাক আলোয় পার্কসার্কাসের মোড়ে ভেসে উঠল পরপর কয়েকটা হোডিং। বাংলা আর উর্দুতে বড় বড় হরফে লেখা—দাওয়াত-এ—ইফতার, ইফতার পার্টির আমন্ত্রণ। পুলকিতবোধ করলাম। তাহলে ধর্মীয় অঙ্গনে, উর্দুর পাশাপাশি গুরুত্ব পাচ্ছে আমাদের মাতৃভাষা।

বুধবারের কাগজে খবর দেখলাম, গন্ডি পেরিয়ে ইফতারি স্বাদে মেতে উঠছে কলকাতা। কোথাও কোথাও গানে, গল্পে বেড়া ভাঙছে আনুষ্ঠানিক মুহূর্ত। জেলায় জেলায় মহিলাদের উদ্যোগে বাড়ছে ইফতারের সাড়ম্বর আয়োজন।

ভালো লক্ষণ। আশা করছি, বিভিন্ন সম্প্রদায় নানা জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণে এসব ইফতার পার্টি উদ্ভাসিত হয়ে উঠবে। মঞ্চে বসে হাতে শরবতের গ্লাস নিয়ে আলোকিত নক্ষত্রেরা হাসি ছড়াবেন। উঁচিয়ে ধরবেন সম্প্রীতি আর ঐক্যের মহামন্ত্র। সমাজের বাহ্যিক সংহতি এভাবে হয়তো খানিকটা দৃঢ় হতে পারে। বাড়তি জোর পাবে গৌরবের দ্যুতিময় গতি। তবে নির্বিশেষের সমাজ অন্তরে যে সৌহার্দ্য দাবি করছে, সে যেভাবে তার প্রতিবেশীকে জানার, প্রতিবেশীর পর্ব-পার্বণের সহজিয়া ও গূঢ়তত্ত্বে প্রবেশ করে বৃহত্তরের অন্তর্জগতকে জানতে চায়, সে আগ্রহ কতটা পূর্ণ হবে বলা মুশকিল।

এই উপমহাদেশে ইসলামের বয়স হাজার বছর পেরিয়ে গেল। উপকূলবর্তী বাংলা, গুজরাট, কেরল আর মহারাষ্ট্রে বাণিজ্য ও সুফিবাদের হাত ধরে মুসলিমদের আসা যাওয়া ও বসতিস্থাপন শুরু হয় আরো আগে। এত দীর্ঘ পাশাপাশি বসবাসের পরেও আমরা পারস্পরিক পরিচিতির পরিসরকে বড় করতে পারিনি। গোষ্ঠীবদ্ধ এক সমাজের কাছে, নিকটবর্তী আরেক সমাজের বহুমাত্রিক অভ্যাস ও পুরাণকথা অজানা হয়ে রইল। এখনো। এর কারণ কী? ইতিহাসের ভুল ব্যাখ্যা? বৌদ্ধিক সীমাবদ্ধতা? না ভেতরের স্বাভামানী রক্ষণশীলতা?

আমাদের দুর্ভাগ্য, রমজানের মতো উপবাসময় অনুষ্ঠান আর ঈদের সার্বজনীনতার কাহিনী রামায়ণ মহাভারতের গল্পতত্ত্ব, দুর্গা ও কালীর ক্রমোবিবর্তন, এমন কী ধর্মবিষয়ক সাধারণ তথ্যাটিও আমরা একে অন্যেকে সানন্দে জানাতে চাইলাম না। এই উদাসীনতার এই পীড়াদায়ক অবরোধের উত্স খুঁজে দেখা জরুরি। জরুরি আরোপিত অনীহার গ্রন্থিমোচন। না হলে ইফতার পার্টির এসব নিনাদিত উদযাপন ঈদের আগে সঙ্ঘবদ্ধ উপাসনার ময়দানে আমাদের বাণী নিবেদন আর দুর্গোত্সবে সাম্প্রদায়িক বেড়া অতিক্রমের প্রদর্শন নিছক হুজুগ হয়ে থাকবে।

হূদয়ের যে আর্তিসমূহকে জানতে চায়, চায় ভালোবাসতে, তার কাতরতার ঐকান্তিক উচ্চারণ সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। লৌকিক ইচ্ছাও বাহ্যিক আড়ম্বরের চাইতে বহু বেশি উঁচু। রমজান যেহেতু চলছে, ঈদও সামনে। এ কারণে এই দুই অনুষ্ঠান ও উত্সবের লক্ষ্য সমাজতত্ত্ব, লোকজ ধ্যান ধারণার নৃতত্ত্ব খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। এতে মিলনের আন্তরিকতা একটুও যদি বাড়ে খুশি হব।

ঈদুল ফিতর দুনিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি জনপ্রিয় উত্সবের অন্যতম। ইসলামি অনুষঙ্গে এ পার্বণ ঈদ-উল-সগির—ছোট ঈদ, ঈদ-উল-সদকা—দান খয়রাতের উত্সব অথবা রমজানের ঈদ বলে  পরিচিত। মাসজুড়ে উপবাসের পর অনুষ্ঠিত হয় বলেই এ পার্বণ ও তার মেজাজ অপেক্ষাকৃত উচ্ছল। রমজান ইসলামের নবম মাস। রমজান ছাড়া অন্য কোনো মাসের নাম কোরানে উল্লেখিত হয়নি। কোরানের দ্বিতীয় সূরা অল বকরের (‘বকর’ শব্দটি হিব্রু ‘বকন’ থেকে গৃহীত। ‘বকন’-এর অর্থ গাভী এবং আরবি ‘বকর’ মানে গো বাছুর) ১৮৫ নম্বর আয়াতে এ মাসের উল্লেখ রয়েছে। মাসটি ইসলামে পবিত্রতম। হযরত মুহম্মদ (দ) তাঁর হাদিসে এ মাসের মহিমা কীর্তন করেছেন। বলেছেন এ মাসে খুলে দেওয়া হয় বেহেস্তের দরজা এবং রুদ্ধ হয়ে যায় নরকের দ্বার। শয়তান তখন লাগামবন্দি। যারা উপবাস করেন তাদের জন্যে এ মাসে উন্মুক্ত থাকে স্বর্গের বিশেষ দুয়ার ‘রায়হান’। রমজানকে এইভাবে মর্যাদাপূর্ণ বলে চিহ্নিত করার কারণ সম্ভবত এই যে, এ মাসে নাজিল হয়েছিল কোরান, আকাশ পথে নৈশ ভ্রমণেও (মেরাজ) গিয়েছিলেন হযরত মুহম্মদ এবং এ মাসেই প্রথম প্রত্যাদেশ পেয়েছিলেন তিনি। পবিত্র মাসের ধারণার সঙ্গে প্রাচীন আরব ও অন্যান্য সেমিটিক জনগোষ্ঠীর পরিচিতি ছিল। তবে তাদের পবিত্র মাস কী ছিল, রমজান না অন্য কোনো মাস— তা বলা কঠিন। তিরিশ-একত্রিশ দিনজুড়ে উপবাস পালনের সঙ্গে আরবদের পরিচয় ছিল কিনা সঠিকভাবে জানা যায় না। কিন্তু উপবাসব্রতের প্রচলন যে ছিল এবং আত্মশুদ্ধির জন্যে কিছু কিছু মানুষ যে উপবাস করতেন— তার প্রমাণ রয়েছে।

‘রমজান’ শব্দটি আরবি ‘রমজ’ ধাতু থেকে আগত। রমজ মানে দাহ, তাপ, পোড়ানো। আরবি শব্দতাত্ত্বিকদের ধারণা চান্দ্রবর্ষ চালু হওয়ার অনেক আগে, প্রাচীনকালে গরমের মরশুমে এ মাস পড়ত বলে এর নাম হয় রমজান। রমজানের সঙ্গে উপবাসের আরবি প্রতিশব্দের ধ্বনিগত কোনো মিল নেই। উপবাসের আরবি প্রতিশব্দ সওম। এর অর্থের সঙ্গেও উপবাসব্রতের সদৃশ নেই। এর অর্থ আরাম বা বিশ্রামে থাকা। মক্কা থেকে মদিনায় যাওয়ার আগে মাসব্যাপী উপবাসের সঙ্গে মুসলানদের আনুষ্ঠানিক পরিচয় ছিল না। মদিনায় চলে যাওয়ার পর এর সঙ্গে সরাসরি তাদের যোগাযোগ ঘটে এবং তখনই সম্ভবত ইহুদি-সিরিয়াক সূত্র থেকে উপবাসের প্রতিশব্দ হিসেবে ‘সওম’ গৃহীত হয়। কোরানতাত্ত্বিকেরা ‘সওম’-এর ভিন্ন অর্থ ব্যাখ্যা করেছেন। নীরবতা অথবা পর্দা বলে। সূরা মরিয়মে ‘সওম’-এর প্রত্যাদেশ আসে মক্কায়। হিজরতের আগে। মদিনায় নয়। অতএব ঐ নির্দেশ কখনো উপবাসের নয়। দ্বিতীয়ত, যা আগেই বলেছি যে হিজরতের আগে মুসলমানদের মধ্যে রোজা পালনের প্রচলন ছিল না। তবে মুহম্মদের (দ) সমসাময়িক স্বাধীনচেতা, প্রকৃতিবাদী হানিফদের মধ্যে ইহুদি বিশ্বাসজাত এ প্রথা চালু ছিল। একথা বলেছেন কোনো কোনো ইউরোপীয় নৃতাত্ত্বিক। মক্কায় ইসলামের অনুগামীদের মধ্যেও উপবাসের প্রচলন ছিল বলে উল্লেখ করা হয়। কিন্তু কেউই এ ব্যাপারে যথার্থ প্রমাণ পেশ করতে পারেননি। সে যাই হোক আনুষ্ঠানিক ও আবশ্যিক উপবাসের সঙ্গে মুসলানদের প্রথম পরিচয় ঘটে মদিনায়। মদিনায় কৃষিজীবী ইহুদিরা মহররমের দশ তারিখ আশুরা দিবস উপবাস পালন করতেন। তারা ভাবতেন, এখনো ভাবেন আশুরা দিবসে সৃষ্টি প্রক্রিয়া শুরু করেন ঈশ্বর। ইহুদিদের দেখাদেখি হোক অথবা অন্য কারণে হোক, আশুরা দিবসে ইসলাম অবলম্বীদের উপবাস পালনের নির্দেশ দেওয়া হয় এবং এ নির্দেশের পর থেকে আনুষ্ঠানিক উপবাস পালন শুরু। কালক্রমে ইহুদিদের সঙ্গে আরব মুসলিমদের সম্পর্কের অবনতি ঘটে। সম্ভবত এরই পরিপ্রেক্ষিতে, আশুরা উপবাসের পরিবর্তে মাসজুড়ে রোজা রাখার নির্দেশ আসে দ্বিতীয় হিজরিতে সূরা বাকরাহ-এর ১৮৩-১৮৫ আয়াতে। আর এ নির্দেশ অনুসারে রমজানের উপবাস আবশ্যিক হয়ে ওঠে।  

২৭ রমজানের (শব-এ-কদর) রাতটি একটি বিশেষ পার্বণের রাত বলে গুরুত্বপূর্ণ। কোরান এই রাতের মহিমাকীর্তন করেছে, এ রাতেই প্রথম কোরান আবির্ভূত হয়। প্রাচীন আরবদের মধ্যেও অনুরূপ একটি বিশেষ মহিমান্বিত রাতের সন্ধান মেলে। প্রাক ইসলামি আরবদের মহিমাময় রাতটি কী কারণে সুচিহ্নিত ছিল, কী ছিল তার গুরুত্ব তার সন্ধান দিতে পারেননি পশ্চিমী সমাজতাত্ত্বিক ও সামাজিক নৃতাত্ত্বিকরা। তারা ইসলামের লায়লা তুল কদর, মহিমাময় রাত এবং ইহুদিদের আশুরা পর্বের মধ্যে সামঞ্জস্য খুঁজে পেয়েছেন। তাদের অনুমান কোরান আর্বিভাবের ধারণায় এবং ইহুদিদের সৃষ্টি প্রক্রিয়ার বিশ্বাসে এ দুদিন রাতের গুরুত্ব সমার্থক।

অতএব পূর্বগামী ইহুদিদের আনুষ্ঠানিকতায় পরবর্তী মুসলমানের বিশ্বাস প্রভাবিত হয়ে থাকতে পারে। কিন্তু যুক্তি দিয়ে কষ্টকল্পিত এ তথ্য কায়েম করা শক্ত। কেননা কোরানের আবির্ভাব আর জগত্ সৃষ্টির ধারণা এক নয়। এক হতে পারে না। এখানে কল্পনার আশ্রয় বড়ো বেশি। লায়লা তুল কদর এবং আশুরা পর্বের মধ্যে যোগাযোগ থাক অথবা না থাক, আশুরাকে মুসলমানরাও মর্যাদা দেন। এদিন অনেকেই অতিরিক্ত পুণ্যের আশায় উপবাস করেন। ইহুদিদের আশুরা উপবাসের তুলনায় রমজানের উপবাসের নিয়মকানুন অনেক বেশি কঠোর ও দীর্ঘমেয়াদি। রমজানের উপবাসের সঙ্গে পূর্বাঞ্চলীয় খ্রিষ্টীয় আচার-অনুষ্ঠানের সাদৃশ্য রয়েছে। খ্রিষ্টানদের উপবাসের মেয়াদ আরো দীর্ঘ। ৪০ দিন ধরে অনাহারের রেওয়াজ মেনে চলেন পূর্বাঞ্চলীয় খ্রিষ্টানরা। মুসলমানদের দীর্ঘমেয়াদি ৩০ দিনের উপবাস থেকে খ্রিষ্টীয় অভ্যাসের দূরত্ব কতটা? পূর্বগামীদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানের ছায়া কীভাবে ছড়িয়ে আছে সর্বকনিষ্ঠ সেমিটিক ধর্মের অনুষ্ঠানে—এসব প্রশ্নের জবাব অধরা।

রমজানের উপবাস অবসানের প্রতীক হিসেবে আবির্ভূত হয় ঈদুল ফিতর। ঈদের প্রচলিত অর্থ উত্সব। কিন্তু তার আভিধানিক অর্থ পুনরাগমন কিংবা বারবার ফিরে আসা। ধর্মীয় অনুষ্ঠানজ্ঞাপক অধিকাংশ শব্দের মতো ঈদও মূলত সিরিয়াক। আরবি ভাষায় কখন কোন অবস্থায় সিরিয়াক শব্দটি গৃহীত ও স্বীকৃত হয়েছে আরবি শব্দতত্ত্বে তার উল্লেখ নেই। ঈদুল ফিতর এর প্রচলিত অর্থ উপবাস ভাঙার উত্সব। ঈদ শব্দটির মৌলিকতার সঙ্গে আজকের অর্থের যোগাযোগ নেই, কিন্তু সামাজিক উত্সবের প্রকৃতিতে অর্থবহ করে তোলে তার আদি অর্থ। উত্সব বার বার ফিরে আসে আর ঈদ শব্দের মূল অর্থেও রয়েছে এই ইঙ্গিত। ঈদের আনুষ্ঠানিক ক্রিয়াকর্ম খতিয়ে দেখলে মনে হয় হয়তো এককালে এ ধরনের কোনো সামাজিক উত্সবের সঙ্গে পরিচিত ছিল প্রাচীন সিরিয়াক জনগোষ্ঠী। হয়তো কৃষিজ আচারের অন্তর্ভুক্ত ছিল এ উত্সব এবং তাদের কাছ থেকেই আচার অনুষ্ঠানবাহী শব্দের মতো আরবরা আমদানি করে এ উত্সবের মহিমা আর উদযাপন।

ঈদের আনন্দমুখর প্রকৃতিতে কৃষিজ আচার অনুষ্ঠানের লক্ষণ বিস্তর। ঈদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রমজান ও সওম শব্দদ্বয়ের আদি আর প্রচলিত অর্থেও রয়েছে এরকম নৃতাত্ত্বিক ইঙ্গিত। ঈদ, সওম এবং রমজানের মূল অর্থ এবং তাদের উত্সভূমিতে প্রাচীন জনপদের আনুষ্ঠানিক সংযম। আর উত্সবাদির মেজাজ বিচার করে নৃত্যত্ত্বিকদের ধারণা, বাণিজ্যনির্ভর মক্কায় জন্ম নেয়নি ঈদ কিংবা রোজার উপবাস, তার আরম্ভ ভিন্ন কোনো কৃষিনির্ভর সমাজে। সম্ভবত প্রাচীন সিরিয়ায়।

n লেখক : ভারতের সাংবাদিক। আরম্ভ পত্রিকার সম্পাদক