বরগুনা জেলা সদরসহ ৬টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স রয়েছে। ইউনিয়ন পর্যায়ে রয়েছে সাব সেন্টার এবং ওয়ার্ড পর্যায়ে রয়েছে কমিউনিটি ক্লিনিক। সরকারিভাবে এসব হাসপাতালে চাহিদা অনুযায়ী ওষুধসামগ্রী সরবরাহ করা হয়ে থাকে। এতসব ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও বরগুনা জেলায় চিকিত্সাসেবা নিয়ে নিদারুণ হয়রানি আর ভোগান্তির শিকার হতে হয় রোগীদের। চিকিত্সক, নার্সসহ জনবলের অভাব দীর্ঘদিনের। অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি, অনিয়ম, ওষুধ পাচার ও খাবার সরবরাহের নামে চলে হরিলুট। প্রতিটি হাসপাতাল নোংরা, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। বরগুনা জেলায় সরকারিভাবে চিকিত্সকের পদ ১৪১টি। এর মধ্যে ১১৫ জন চিকিত্সকের পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। ২৬ জন চিকিত্সক রয়েছেন এ জেলার ১২ লাখ মানুষের স্বাস্থ্য সেবার জন্য। আবার এদের অনেকেই থাকেন না কর্মস্থলে। পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও যন্ত্রপাতি অব্যবহূত অবস্থায় পড়ে থাকে। রোগীদের পাঠিয়ে দেয়া হয় বেসরকারি ক্লিনিকে। অপারেশনের ব্যবস্থা থাকলে বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক নেই। অজ্ঞানকারী চিকিত্সক না থাকায় উপজেলায় অপারেশন বন্ধ রয়েছে। যন্ত্রপাতি বিকল হয়ে গেছে। হার্টঅ্যাটাক, ডেলিভারিসহ সংকটাপন্ন রোগীদের এ জেলায় কিযে ভোগান্তি হয় তা বর্ণনা করা কষ্টকর। ঢাকা, বরিশাল কিংবা পটুয়াখালী হাসপাতালে নেয়ার পথে রাস্তায় মারা যায় অনেক রোগী।
বরগুনা জেনারেল হাসপাতাল
গত আওয়ামী লীগ সরকার ঘোষিত ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট বরগুনা জেনারেল হাসপাতাল ৫০ শয্যার হাসপাতালের অবকাঠামো ও জনবল দিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে। তবে ইতিমধ্যে ১০০ শয্যার অনুমোদন পেলেও জনবল বাড়ানো হয়নি। এখানে ২১ জনের পদ থাকলেও কর্মরত আছেন মাত্র ৮ জন ডাক্তার। এ হাসপাতালে দীর্ঘ দিন ধরে মেডিসিন, ইএনটি, অর্থপেডিক, রেডিওলজি, চক্ষু, অ্যানেসথেসিয়া ইত্যাদি পদে কোন বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক নেই। আশ্চর্যের বিষয় হাসপাতাল চালুর পর থেকে এ যাবত্ কোন ডেন্টাল সার্জন এখানে যোগদান করেননি। আধুনিক ডিজিটাল এক্স-রে মেশিন থাকলেও রেডিওগ্রাফার আব্দুল মোমেন নানাভাবে রোগীদের বেসরকারি ক্লিনিকে যেতে বাধ্য করেন।
বরগুনা জেনারেল হাসপাতালে ৩৭ জন নার্সের মধ্যে ২৭ জন কর্মরত আছেন। অ্যাম্বুলেন্স দুটি সচল থাকলেও প্রয়োজনের সময় ড্রাইভার রোগীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করেন নানা রকম টালবাহানা করে।
বরগুনা সদর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স
এখানে মেডিক্যাল অফিসারের পদটি শূন্য রয়েছে। এ উপজেলার ফুলঝুড়ি, আয়লা, নলীহাট, বালিয়াতলী, বুড়িরচর, গৌরীচন্না, আয়লাপাতাকাটা, নলটোনা স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোর মধ্যে শুধুমাত্র ফুলঝুড়িতে একজন চিকিত্সক রয়েছেন। বাকিগুলো মেডিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট দিয়ে চলছে। ফলে গরীব ও দরিদ্র রোগীরা চিকিত্সা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এসকল স্বাস্থ্য কেন্দ্রে প্রয়োজনীয় ওষুধের ব্যবস্থা থাকলেও তা রোগীদের দেয়া হয় না এমন অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায়।
আমতলী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স
এ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২০টি পদের মধ্যে ৭ জন কর্মরত আছেন। উপজেলার কুকুয়া ১০ শয্যা বিশিষ্ট পল্লী স্বাস্থ্য কেন্দ্রসহ গাজীপুর, গুলিশাখালী, আরপাঙ্গাশিয়া, হলদিয়া, পচাকোড়ালিয়া, চাওড়া, কড়ইবাড়িয়া স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোতে ১১ জন চিকিত্সকের পদ থাকলেও একটিতেও কোন চিকিত্সক নেই। চলছে মেডিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট দিয়ে। একটি মাত্র অ্যাম্বুলেন্সে যান্ত্রিক ত্রুটি লেগেই আছে। নার্সের ১৫টি পদে কর্মরত আছেন ১৩ জন।
পাথরঘাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স
৩১ শয্যা বিশিষ্ট এ হাসপাতালে ২০ জন চিকিত্সকের বিপরীতে মাত্র দুজন চিকিত্সক কর্মরত আছেন। ১৫ জন নার্সের পদে কর্মরত আছেন ১৩ জন। ফলে এ উপজেলার ২ লক্ষাধিক মানুষের চিকিত্সা সেবা চরম বিপর্যয়ের মধ্যে রয়েছে। পল্লী চিকিত্সকরাই একমাত্র ভরসা। রোগীদের মঠবাড়িয়া, বরগুনা, বরিশাল হাসপাতালে ছুটতে হয় প্রতিনিয়ত। অ্যাম্বুলেন্সটি সচল আছে।
এ উপজেলার কালমেঘা ও কাকচিড়া উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রসহ রায়হানপুর, নাচনাপাড়া, কাঁঠালতলী, চরদুয়ানী ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোতে কোন চিকিত্সক নেই। এমনকি কালমেঘায় একজন ছাড়া অন্য কোন স্বাস্থ্য কেন্দ্রে উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিক্যাল অফিসারও নেই।
বেতাগী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স
৩১ শয্যার এ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২০ জন চিকিত্সকের পদে কর্মরত আছেন মাত্র ৪ জন। জুনিয়র কনসালটেন্ট (শিশু) ডা. মো. আলমগীর হোসেন বরগুনা জেনারেল হাসপাতালে প্রেষণে আছেন। ১৫ জন নার্সের পদে কর্মরত আছেন ১৩ জন। অ্যামু্বলেন্সটি সচল আছে।
এছাড়া কাউনিয়া উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রসহ বেতাগী, হোসনাবাদ, কাজিরাবাদ, মোকামিয়া, বিবিচিনি ও সরিষামুড়ি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রে কোন চিকিত্সক নেই।
বামনা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স
বামনা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আট জন চিকিত্সকের পদ থাকলেও কর্মরত আছেন মাত্র দুজন। এরা হলেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মদন গোপাল পাল এবং মেডিক্যাল অফিসার ডা. মো. আতিকুল হক। পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাকে অফিসের কাজে প্রায়শই ব্যস্ত থাকতে হয়। এক্ষেত্রে একজন চিকিত্সকের পক্ষে রোগীদের সেবা দিতে হিমশিম খেতে হয়। এই হাসপাতালে নয়টি পদে নয়জন স্টাফ নার্স কর্মরত থাকলেও সহকারী নার্স, মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট ডেন্টাল, ল্যাব পদগুলো খালি রয়েছে দীর্ঘ দিন। এছাড়া ডৌয়াতলা, বুকাবুনিয়া, রামনা ও বামনা ইউনিয়ন পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে কোন চিকিত্সকই নেই। ফলে চিকিত্সার জন্য স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দুজন চিকিত্সকই এ উপজেলার রোগীদের একমাত্র ভরসা।
তালতলী হাসপাতাল
বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষা নবগঠিত তালতলী উপজেলার ২০ শয্যা বিশিষ্ট তালতলী হাসপাতালে ভবন, বেড, চিকিত্সা সরঞ্জাম থাকলেও কোন এমবিবিএস ডাক্তার নেই। চিকিত্সকের অভাবে বছরের পর বছর আন্তঃবিভাগ বন্ধ রয়েছে। একজন চিকিত্সা সহকারী দিয়ে শুধুমাত্র বহির্বিভাগ চালু রাখা হয়েছে। ফলে এ উপজেলার লক্ষাধিক মানুষের স্বাস্থ্য সেবা চরম সংকটের মধ্যে রয়েছে।
স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এ উপজেলার মানুষের স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করার জন্য ২০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল ভবন নির্মাণ করা হয়। ২০০৬ সালে আমতলী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে ১৭ জন স্টাফ প্রেষণে এনে হাসপাতালের কার্যক্রম শুরু করা হয়। কিন্তু দুই মাসের মাথায় স্টাফদের প্রেষণ আদেশ বাতিল হলে তারা আগের জায়গায় ফিরে আসে। ফলে বন্ধ হয়ে যায় এ হাসপাতালের চিকিত্সা কার্যক্রম। বর্তমানে মংপ্রু নামে একজন ইউনিয়ন মেডিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট দিয়ে বহির্বিভাগ কোন রকমে চালু রাখা হচ্ছে। ডাক্তার এবং কর্মচারী সংকটের কারণে তালতলী উপজেলার সাতটি ইউনিয়নের লক্ষাধিক মানুষ চিকিত্সা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। প্রতিদিন শত শত রোগীকে ভয়াল পায়রা নদী পাড়ি দিয়ে বরগুনা, পটুয়াখালী এবং বরিশালে গিয়ে ডাক্তার দেখাতে হয়।
বরগুনার সিভিল সার্জন ডা. মো. আনিসুর রহমান বলেন, চিকিত্সক সংকটের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে, শিগগিরই এসমস্যার সমাধান হবে।
