আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যাপক তত্পরতার কারণে জঙ্গি সংগঠনগুলো অনেকটা কোণঠাসা অবস্থায় রয়েছে। লোকালয় এখন তাদের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ। এ কারণেই পাল্টানো হয়েছে জঙ্গি কার্যক্রমের কৌশল ও স্থান। এ কৌশলের অংশ হিসাবেই বান্দরবানের গহীন অরণ্যে জমি লিজ নিয়ে তৈরি করা হয়েছিল কৃষি ও মাছের খামার। এ খামারে চাষাবাদের আড়ালে আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আল কায়েদার আদলে প্রশিক্ষণ দেয়া হতো জঙ্গিদের। প্রশিক্ষণের জন্য বিস্ফোরকসহ অন্যান্য উপকরণ নেয়া হতো রাজধানী থেকে। আর জঙ্গি কর্মকাণ্ডের জন্য অর্থের যোগান দিত একাধিক এনজিও, বেসরকারি সংস্থার বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) জিজ্ঞাসাবাদে এ তথ্য জানিয়েছেন নিষিদ্ধ ঘোষিত জামায়াতে মুজাহিদিন বাংলাদেশের (জেএমবি) নেতা শামিন মাহফুজ ওরফে সুমন ওরফে ম্যানরিং মরং (ছদ্মনাম)। শামিন মাহফুজ গাইবান্ধা জেলার বাসিন্দা।
গত ৩০ জুন রাজধানীর সায়েদাবাদ এলাকা থেকে ডিবি পুলিশের হাতে গ্রেফতার হন শামিন ও তার দুই সহযোগী। যাত্রাবাড়ী থানায় দায়ের করা দুইটি মামলায় ডিবি পুলিশ তাদেরকে ৬ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি অকপটে স্বীকার করে জানিয়েছেন তার জীবনের নানা প্রসঙ্গ। তবে এ নিয়ে তার কোন ধরনের অনুশোচনা বা কোন ধরনের উদ্বেগ উত্কণ্ঠা নেই। তার কর্মকাণ্ডকে মেনে নিতে পারেনি বলে প্রথম স্ত্রীকে তিনি ডিভোর্স দিয়েছেন। গহীন অরণ্যে দ্বিতীয় স্ত্রীকে নিয়ে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন জঙ্গিদের। জঙ্গি তত্পরতার কারণে গ্রেফতার হয়ে জেল খেটেছেন। মুক্তির পর আবার ফিরেছেন একই কর্মকাণ্ডে।
শামিন মাহফুজ জানান, ১৯৯২ সালে এসএসসি পরীক্ষায় রাজশাহী বোর্ডে মেধা তালিকায় তিনি পঞ্চম হয়েছিলেন। এসময় ইসলামি ছাত্র শিবির থেকে তাকে সংবর্ধনা দেয়া হয়। এরপরই জড়িয়ে পড়েন শিবিরের সঙ্গে। ভর্তি হন রংপুর ক্যাডেট কলেজে। কিন্তু কলেজ ক্যাম্পাসে শিবিরের হয়ে কর্মকাণ্ড চালাতে গিয়ে ১৯৯৩ সালে বহিষ্কৃত হন। এরপর ভর্তি হন রাজশাহী জেলার দুর্গাপুর উপজেলার দাউকন্দি কলেজে। ১৯৯৪ সালে এইচএসসি পরীক্ষায় মানবিক বিভাগে একই বোর্ড থেকে মেধা তালিকায় সপ্তম স্থান অধিকার করেন। ১৯৯৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সমাজ বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। ২০০১ সালে এমএসএস করেন। এখানেও স্থান ছিল তালিকায়। ২০০৩ সালে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে। এসময় বাদ দিয়েছিলেন জঙ্গি সংশ্লিষ্ট তত্পরতা। কিন্তু উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরির সময় ভাতিজা শরিফ মোহাম্মদের মাধ্যমে জড়িয়ে পড়েন জঙ্গি সংগঠন জামায়াতুল মুসলিমিনের সঙ্গে। ছাড়েন চাকরি। পাশাপাশি ছাড়াছাড়ি হয় প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে। মাঝে পিএইচডি করার জন্য সুযোগ পেয়েছিলেন সুইডেনে। জঙ্গি তত্পরতার কারণে সে সুযোগও প্রত্যাখ্যান করেন।
মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার ছানোয়ার হোসেন বলেন, বেশ কয়েক বছর আগে শামিন মাহফুজ আদিবাসী সমপ্রদায় খুমিদের উপর পিএইচডি করার জন্য বান্দরবানের থানচিতে যান। কিন্তু এই পিএইচডি করার আড়ালে তিনি জঙ্গি তত্পরতা চালাতেন। থানচি এলাকার বনিবাজার, বলাইপাড়, কমলাপাড়া এলাকায় বেশ কয়েক একর জমি লিজ নিয়ে গড়ে তোলেন কৃষি খামার। আর এই কৃষি খামারে চাষাবাদের আড়ালে শুরু করেন জঙ্গি প্রশিক্ষণ। আর এ প্রশিক্ষণের মাধ্যমেই ভেঙ্গে পড়া জঙ্গি তত্পরতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছিলেন।
তিনি আরও বলেন, শামিন মাহফুজ স্বীকার করেছেন, সর্বশেষ চলতি বছরের মার্চ মাসে রাজধানীর ভাসানটেক এলাকায় জঙ্গি তত্পরতা নিয়ে তাদের অনুসারীদের মধ্যে আলোচনা হয়। সেখানে পাঁচটি বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এরমধ্যে রয়েছে আলেমদের মধ্যে মেমোরি কার্ডের মাধ্যমে জাওয়াহিরির বক্তব্য প্রচার করা। আনসার ( যারা টাকা দিয়ে সাহায্য করবে) জোগাড় করা। যারা জিহাদ করবে তাদের প্রস্তুত করা। আসলিহাত (অস্ত্র) সংগ্রহ করা। ত্রিশালের জঙ্গি ছিনতাই ঘটনার কারণে নিজেদেরকে সতর্ক করা।
