দৃশ্যপটই পাল্টে গেছে। পাল্টে গেছে তিলোত্তমা ঢাকা। ঈদের ছুটিতে ব্যস্ত রাজধানীর এই শান্ত রূপটির জন্যই অপেক্ষা করে থাকেন ঢাকার বাসিন্দারা। তাদের কাছে ঈদের ছুটির সাথে এই শান্ত ঢাকা শহর যেন এক বাড়তি পাওনা। রাজপথগুলোতে নেই দুর্বিষহ যানজট। নেই উদয়াস্ত মানুষের ছুটে চলা। ব্যস্ত নগরীর এই কয়েকদিনের টানা অবসর নগরবাসীকে দিয়েছে স্বস্তির অনুভূতি। ঢাকার ফাঁকা নির্জন রাস্তাগুলোতে ঘুরে বেড়ানোই এ কয়েকটি দিন হয়ে উঠে ছিল রাজধানীবাসীর বিনোদনের প্রধান অংশ। দুর্বিষহ যানজট ঢাকার বাসিন্দাদের বিরক্তির সবচেয়ে বড় কারণ। সেই যানজট না থাকায় সবাই গাড়ির চেয়ে রিকশায় করে ঘুরে বেরিয়েছেন পথে, পথে।
পুরো সপ্তাহ পার হয়ে গেলেও ঈদের ছুটির আমেজ কাটেনি এখনো। মানুষের মনে ঈদের আনন্দের রেশ মিলিয়ে যাক আর না যাক, রাজধানীর ব্যস্ত সড়কে ঈদের রেশ যেন কাটছেই না। যে সড়ক দিনরাত যানবাহন চলাচলে সরগরম থাকে, জ্যামের কারণে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকতে হয়, সেসব সড়ক এখন পড়ে পড়ে ঘুমাচ্ছে। ধানমন্ডি থেকে গুলশান চোখের নিমিষে পৌঁছে যাওয়া যাচ্ছে। এই ফাঁকা ঢাকায় মহাআনন্দে ঘুরে বেড়াচ্ছেন সবাই।
প্রতিটি রাস্তার সিগন্যালগুলো ফাঁকা, কোন গাড়ির জ্যাম নেই। অনেকেই এই ফাঁকা রাস্তাঘাটে ঘুরে বেরিয়ে আনন্দের উপলক্ষ খুঁজে নিচ্ছেন।
গতকাল সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবসেও রাজধানী ছিল শান্ত। সড়কগুলোতে যানবাহনের চলাচল যেমন কম ছিল- সচিবালয়ে, অফিস-আদালতেও দর্শনার্থীদের উপস্থিতি ছিল কম। অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারিরা প্রায় সবাই চলে এলেও দর্শনার্থীদের আনাগোনা নেই। ফলে আড্ডার আমেজেই দিন কেটেছে সবার।
গতকাল ১৫ মিনিটেই গুলশান থেকে ধানমন্ডি ফিরেছেন কর্পোরেট অফিসের কর্মকর্তা আদনান বশির। তিনি বললেন, সাধারণত দু্ই ঘণ্টা সময় লাগে প্রতিদিন বাসায় ফিরতে, আজ ১৫ মিনিট বিশ্বাস হতে চায় না।
অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা জিয়াউদ্দিন আহমেদ তার স্ত্রীকে সাথে নিয়ে বেরিয়েছিলেন ঢাকার রাজপথে রিকশায় করে বেড়াবেন বলে। তিনি বললেন, ‘ঢাকা এই ৪০ বছর আগেও এখনকার ঈদের ঢাকার মতই এমন ছিমছাম ও শান্ত ছিল। কিন্তু সেই শান্ত শহরটিকে আমরা রক্ষা করতে পারিনি। তাই সেই হারানো দিনগুলোর সুখ-স্মৃতি ফিরিয়ে আনে এই ছুটির নগরী।’
তার স্ত্রী আসমা খাতুনও নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত। তিনি বললেন, ‘আহ্ সে এক শহর ছিল ঢাকা। মেয়েদের হাঁটাচলার জন্য যেমন নিরাপদ, ঘুরে বেড়াবার জন্যও ছিল না কোন বাধা। সে শহরটা আর রইলো না। ’তবে রাতের বেলা আলো ঝলমলে রাজধানীতে ঘুরে বেড়াতে বেশ ভালো লাগে।
ছুটির এ কটা দিন শহরের আবাসিক এলাকাগুলোতে মানুষের চলাফেরা থাকলেও অফিস পাড়া মতিঝিল, দিলকুশায় ভর করেছিল নিঃসীম শূন্যতা। ব্যস্ত এক্সিকিউিটিভদের হাঁটাচলা, হকারদের হাঁকডাকে সরগরম হয়ে থাকা ফুটপাতগুলো ছিল নির্জীব, জনমানবহীন।
তবে, জ্যামের পুরানো ঐতিহ্য বজায় রেখে জমজমাট ছিল শাহবাগ, টিএসসি চত্বর। শিশুপার্কের সামনে ছিল সীমাহীন মানুষের ভিড়। শাহবাগ আর সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ছিল বন্ধুদের মিলনকেন্দ । বন্ধুদের খণ্ড খণ্ড জটলায় বিকাল থেকে রাত পর্যন্ত চলেছে আড্ডা।
এদিকে, দুপুর থেকে গভীর রাত অবধি নগরীর রেস্টুরেন্টগুলো বিনোদনপ্রেমী মানুষের আনাগোনায় বেশ সরগরম। ঈদের ছুটি শেষ হয়ে গিয়েছে বুধবারেই। খুলেছে ব্যাংক, অফিস, আদালত। তবে মানুষের মন থেকে ছুটির রেশ কাটেনি। শহর ঢাকাও যেন এখনো ছুটি কাটিয়ে জেগে ওঠেনি। ঈদে যারা ঢাকা ছেড়েছিলেন তারা ফিরতে শুরু করেছেন। বাস টার্মিনালগুলোতে বেশ ভিড়। যাত্রীদের চোখেমুখে ঈদ কাটিয়ে ঘরে ফেরার প্রশান্তি। ঘরে ফেরার পথে এই শান্ত শহর তাদের জন্যও এক চমক।
আর কটা দিন, মানুষের মনের এই ছুটির আমেজ এক লহমায় উড়িয়ে নিয়ে যাবে প্রতিদিনের ব্যস্ততা। তিলোত্তমা ঢাকাও ফিরে পাবে তার সেই চিরচেনা চেহারা।
