পদ্মায় লঞ্চডুবি, নিখোঁজ শতাধিক

আপডেট : ০৪ আগস্ট ২০১৪, ২২:৫৫
আবারও লঞ্চ ডুবি। এবার ঈদশেষে ঢাকায় কর্মস্থলে ফেরার পথে ঘটলো এই দুর্ঘটনা। ধারণ ক্ষমতার আড়াইগুণের বেশি অর্থাত্ আড়াই শতাধিক যাত্রী নিয়ে মাদারীপুরের কাওড়াকান্দি থেকে ছেড়ে আসা এমএল পিনাক-৬ নামের লঞ্চটি মুন্সীগঞ্জের মাওয়া লঞ্চঘাট থেকে আধা কিলোমিটারেরও কম দূরত্বে পদ্মা নদীতে গতকাল সোমবার সকাল ১১টার দিকে ডুবে যায়। এর মধ্যে সাঁতরে ও উদ্ধারকর্মীদের সহায়তায় অনেকেই তীরে উঠতে সক্ষম হন। এরপরও গতকাল রাত সাড়ে ১২টায় এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত শতাধিক যাত্রী নিখোঁজ ছিল। নিখোঁজ যাত্রীদের স্বজনদের আহাজারিতে মাওয়া ঘাটের বাতাস ভারি হয়ে উঠেছে। দুর্ঘটনার সময় দুই জনের লাশ উদ্ধার করা হয়। পরে আহত অবস্থায় উদ্ধার করা আরো চার যাত্রী মারা যায়। উদ্ধার হওয়া যাত্রীদের মধ্যে ১২ জনকে মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। নিহত ৬ জনের মধ্যে ৫ জনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তারা হলেন মাদারীপুরের শিবচরের হিরা (২০), ফরিদপুরের ভাঙ্গার আবদুল আজিজ (৪৫), একই এলাকার কমল মণ্ডল (২২), মাদারীপুরের বাতেন আলী (৪৫) ও মাদারীপুরের শিবচরের গার্মেন্টস কর্মী আনোয়ার হোসেন (২৫)। এছাড়া পরিচয় না পাওয়া অপর এক বৃদ্ধার বয়স আনুমানিক ৬৫ বছর। বিআইডাব্লিউটিএ সূত্রে জানা গেছে, পিনাক-৬ লঞ্চটির সর্বোচ্চ ধারণ ক্ষমতা ১১৫ জন। লঞ্চটির মালিক মাওয়া এলাকার আবু বক্কর সিদ্দিক কালু মিয়া। দুর্ঘটনার পরপরই ঘটনাস্থলে পৌঁছেন নৌ পরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান, বিআইডাব্লিউটিএ-এর চেয়ারম্যান ড. শামসুদ্দোহা খন্দকারসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। ফায়ার সার্ভিস, নৌবাহিনী ও বিআইডাব্লিউটিসির ডুবুরিরাও নামে নিখোঁজদের উদ্ধার অভিযানে। কিন্তু প্রবল স্রোতের কারণে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে উদ্ধার কাজ। উদ্ধার কাজ চালাতে বিআইডাব্লিউটিএ’র উদ্ধারকারী জাহাজ হামজা বরিশাল থেকে রওনা দিয়েছে। আরেক উদ্ধারকারী জাহাজ এমভি রুস্তম নারায়ণগঞ্জ থেকে রওনা দিয়ে রাত সাড়ে নয়টার দিকে দুর্ঘটনাস্থলে এসে পৌঁছায়। বিআইডাব্লিউটিএ চেয়ারম্যান ড. শামসুদ্দোহা খন্দকার জানান, ডুবুরিরা লাশের সন্ধান করছে। তবে প্রবল স্রোতের কারণে উদ্ধার কাজ ব্যাহত হচ্ছে। তবে মঙ্গলবার ভোর থেকে ভাটির দিক থেকে লাশ উদ্ধার করা হতে পারে। ঘটনার পর পর মাওয়া লঞ্চ ঘাটে নিখোঁজদের স্বজনরা ভিড় করতে থাকে। তাদের আহাজারি আর কান্নায় এক বিভীষিকাময় দৃশ্যের অবতারণা হয়। একজন আরেকজনকে জড়িয়ে চিত্কার করতে থাকেন। কেউ বুক চাপড়িয়ে মাটিতে গড়াগড়ি করছেন। লঞ্চ ঘাটে বিআইডাব্লিউটিএ, মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রশাসন ও পুলিশ সুপার কার্যালয় ক্যাম্প খুলেছে। লৌহজং থানার ওসি তোফাজ্জল হোসেন জানান, রাত ৯টা পর্যন্ত ৭৩ জন নিখোঁজ রয়েছেন বলে তালিকা করা হয়েছে। নিখোঁজদের স্বজনরা ভিড় করছেন ক্যাম্পে। কেউ তার ভাই, কেউবা তার স্ত্রী আবার কেউবা পরিবারের মা-বাবা, ভাই-বোন নিখোঁজ রয়েছেন বলে তাদের নাম তালিকাভুক্ত করছেন। যেভাবে লঞ্চ ডুবে যায় ঃ প্রত্যক্ষদর্শী লঞ্চের যাত্রী রিপন মিয়া জানান, ফরিদপুরের ভাঙ্গায় শ্বশুরবাড়িতে সপরিবারে ঈদ উদযাপন করতে গিয়েছিলেন। গতকাল ঢাকায় ফেরার জন্য কাওড়াকান্দি ঘাট থেকে এমএল পিনাক-৬ লঞ্চে ওঠেন। সঙ্গে ছিল তার স্ত্রী সীমা ও ছয় মাসের সন্তান জান্নাত। ঈদে ঢাকামুখী মানুষের কারণে লঞ্চে যাত্রী ছিল ঠাসাঠাসি। লঞ্চটি মাওয়া ঘাটের কাছাকাছি আসার সময় যাত্রীরা নামার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। বেশিরভাগ যাত্রী লঞ্চের ডেকের একদিকে অবস্থান নেয়। এসময় প্রচণ্ড জোরে বাতাস বইছিল। লঞ্চের সামনের দিক থেকে একটি বড় ঢেউ এসে ভিতরে আছড়ে পড়ে। এতে লঞ্চের ভিতরে পানিতে ভেসে যায়। এক পর্যায়ে যে দিকে যাত্রীরা দাঁড়িয়ে ছিলেন, ঐ দিক হেলে পড়ে। চারদিক চিত্কার, হাউমাউ কান্নার শোরগোল পড়ে যায়। তার স্ত্রীর কোলে জান্নাত ছিল। স্ত্রী তলিয়ে গেলো। তার ওপর আরো ৫/৬ জন মানুষ পড়ে গেলো। তিনি পানিতে তলিয়ে যাওয়ার পর সাঁতরিয়ে ওঠেন। তীরে এসে খুঁজতে থাকেন তার স্ত্রী ও জান্নাতকে। অনেকক্ষণ পর দেখেন তীরে সীমা বুক চাপড়িয়ে কান্নাকাটি করছেন। পানিতে ডুবে যাওয়ার সময় সীমার কোল থেকে জান্নাত ছিটকে পড়ে। জান্নাতকে তিনি আর খুঁজে পাচ্ছেন না। পদ্মা তীরে দেখা গেল, ১২ বছরের সীমা আক্তার কাঁদছেন। সে জানাল, তার বাবা-মা ও ভাই-বোনকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তাদের বাড়ি মাদারীপুরের শিবপুরের চাঁন্দেরচর গ্রামে। তার কান্নাকাটি দেখে ঘাটের ক্যাম্পের পুলিশ তাকে হেফাজতে নেয়। এই শিশু এখন কী করবে তা বুঝতে পারছে না। সীমা জানায়, লঞ্চ ডুবে যাওয়ার সময় সে তার মাকে জড়িয়ে ধরেছিল; কিন্তু পানির মধ্যে হাবুডুবু খাওয়ারও সময় কে বা কারা তাকে টেনে একটি ট্রলারে তোলে; কিন্তু বাবা-মা, ভাই-বোনের খোঁজ পায়নি। তারা বেঁচে আছে নাকি মারা গেছে তাও সে জানে না। বেঁচে যাওয়া যাত্রীদের মধ্যে রুবেল জানান, মাদারীপুরের শিবচরের কাদিরপুরে বাড়ি। ঈদ শেষে দুই বোন, দুই ভাগ্নে-ভাগ্নিসহ তারা ঢাকায় যাওয়ার জন্য ঐ লঞ্চে চড়েন। লঞ্চ ডুবে যাওয়ার সময় তিনি দোতলায় ছিলেন। পরে তার এক বোন ও ভাগ্নি উদ্ধার হলেও ছোট বোন ফালানি এবং ভাগ্নি এখনো নিখোঁজ। বগুড়া সেনানিবাসের সৈনিক আলামিন তার পরিবারের পাঁচ সদস্যসহ নিখোঁজ রয়েছেন। দুর্ঘটনাস্থল ঃ মাওয়া লঞ্চঘাট থেকে আধা কিলোমিটার দূরে পদ্মা নদীর মিডপয়েন্টে এই লঞ্চটি ডুবেছে। বিআইডাব্লিউটিএ-এর সূত্র মতে নদীর এই পয়েন্টটি সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। এখানে ডুবোচরে প্রায়ই লঞ্চ আটকে যায়। এই কারণে এই এলাকা দিয়ে বেশিরভাগ লঞ্চ ঘাটে ভিড়ে না; কিন্তু ঘটনার সময় প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, লঞ্চটি তড়িঘড়ি করে ঘাটে ভিড়ানোর জন্য হয়তো চালক এই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা দিয়ে লঞ্চ চালিয়েছিল। বিআইডাব্লিউটিএ-এর অপর একটি সূত্র জানায়, প্রচণ্ড বাতাস ও স্রোতের কারণে লঞ্চটি দিক থেকে সরে গিয়ে এই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় আসে। ফায়ার সার্ভিস ঢাকা বিভাগের সহকারী পরিচালক মাসুদুর রহমান জানান, খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের ৩০ সদস্য উদ্ধার কাজে নিয়োজিত হয়। ছয় ডুবুরী পানিতে লাশের সন্ধান করতে থাকে; কিন্তু তাত্ক্ষণিকভাবে মাত্র দুইটি লাশ উদ্ধার করা সম্ভব হয়। নৌ পরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান বলেন, লঞ্চে আড়াইশর মতো যাত্রী ছিল। তবে এই ধরনের লঞ্চে এটি অতিরিক্ত যাত্রী ছিল। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া ও প্রচণ্ড স্রোতের কারণেই লঞ্চটি ডুবে গেছে। তদন্ত কমিটি ঃ ঘটনার তদন্তে দুইটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম-সচিব (টাস্কফোর্স) নূর-উর-রহমানকে আহ্বায়ক করে সাত সদস্যের তদন্ত কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন- বুয়েটের একজন প্রতিনিধি, বিআইডাব্লিউটিএ-এর সদস্য (প্রকৌশল), বিআইডাব্লিউটিসির প্রধান প্রকৌশলী, সমুদ্র পরিবহন অধিদফতরের চীফ নটিক্যাল সার্ভেয়ার, মুন্সীগঞ্জের জেলা প্রশাসক ও মাদারীপুরের জেলা প্রশাসক। কমিটিকে আগামী ১০ কার্যদিবসে রিপোর্ট জমা দিতে বলা হয়েছে। এছাড়া সমুদ্র পরিবহন অধিদফতর ঐ অধিদফতরের ইঞ্জিনিয়ার ও শিপ সার্ভেয়ার নাজমুল হককে প্রধান করে চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন- সমুদ্র পরিবহন অধিদফতরের নটিক্যাল সার্ভেয়ার ক্যাপ্টেন গিয়াস উদ্দিন, মেরিন সেফটির বিশেষ কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম ও মুখ্য পরিদর্শক শফিকুল ইসলাম। এই কমিটিকেও ১০ কার্য দিবসের মধ্যে রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছে।